রহস্য-রোমাঞ্চের প্রতি‚ ভয়ের প্রতি আকর্ষণের বীজ মানুষের রক্তে গভীরে প্রোথিত। আমরা ভয় পেতে ভালোবাসি‚ শিহরিত হতে চাই। উত্তেজনার পারদ যত চড়তে থাকে‚ অ্যাড্রিনালিন ক্ষরণের সঙ্গে সঙ্গে বেড়ে চলে তৃপ্তি। এই বই তাই ভয় পাওয়ায়। মনের গোপন অন্ধকার কোণে নিঃশব্দে ঘুমিয়ে থাকা অচেনা ‘আমি’-কে টেনে বাইরে নিয়ে আসে। দাঁড় করিয়ে দেয় মুখোমুখি। আমরা রোমাঞ্চিত হই‚ আতঙ্কিত হই‚চমকে উঠি। ‘এবং রক্তচাঁদ’ বইটিতে সংকলিত হয়েছে এমনই দশটি কাহিনি। কোনওটি অলৌকিক‚ কোনওটি নিখাদ রহস্য। আবার কোনওটি মনের গহন গোপন অন্ধকারের গল্প শোনায়। পাঠকের হাত ধরে নিয়ে যায় শিহরণের দুনিয়ায়।
সোমজা দাসের জন্ম উত্তরবঙ্গের জেলাশহর কোচবিহারে। সেখানেই বেড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা সেই শৈশব থেকে। জলপাইগুড়ি গভর্নমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ থেকে তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন এবং কলকাতায় একটি বহুজাতিক তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থায় কর্মজীবন শুরু করেন। লেখকের এখন অবধি প্রকাশিত একক বইগুলি হল ‘এক কুড়ি পাঁচ গল্প’, ‘টাপুরদির গোয়েন্দাগিরি’, ‘কৃষ্ণগহ্বর’ ও ‘নিকষিত হেম’, ‘কাল-কূট’ ও ‘মৃতেরা কোথাও নেই’। আনন্দবাজার এছাড়াও পত্রিকা, আনন্দমেলা, কিশোর ভারতী, বর্তমান পত্রিকা, সাপ্তাহিক বর্তমান, সুখী গৃহকোণ, উত্তরবঙ্গ সংবাদ, গৃহশোভা ও আরও অনেক পত্রপত্রিকা ও গল্প সংকলনে লিখেছেন এবং লিখছেন। লেখালেখি ছাড়াও প্রচুর পড়তে ভালোবাসেন তিনি। নিজেকে তিনি লেখকের চাইতে মগ্ন পাঠক হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন।
পরিচ্ছন্ন লে-আউট ও শুদ্ধ বানানে শোভিত, চমৎকার অলংকরণে সমৃদ্ধ এই বইটিতে মোট দশটি গল্প আছে। তারা হল~ ১. অভিশাপ (রহস্য); ২. রক্তচাঁদ (মনস্তাত্ত্বিক ও অলৌকিক); ৩. মাকড়সা (ডার্ক ফ্যান্টাসি); ৪. সমীকরণ (মনস্তাত্ত্বিক); ৫. মরণ রে তুঁহু মম (রহস্য); ৬. স্মরগরল (ডার্ক ফ্যান্টাসি); ৭. কালনিশি (রহস্য); ৮. যূথীগন্ধা (মনস্তাত্ত্বিক ও অলৌকিক); ৯. বিন্যাস (মনস্তাত্ত্বিক); ১০. গেমপ্ল্যান (রহস্য)। গল্পগুলো ছিমছাম, গতিময়, সূচিমুখ। এদের তিনটি বৈশিষ্ট্য বিশেষভাবে আমাকে প্রভাবিত করল। তারা হল~ (ক) অলৌকিক কাহিনির চালক হিসেবেও মনকেই চিহ্নিত করেছেন লেখক। (খ) ডার্ক ফ্যান্টাসি আখ্যানেও বীভৎসতা বা অত্যধিক বিবরণের পরিবর্তে আভাস বা ইঙ্গিতকেই ব্যবহার করেছেন তিনি। (গ) রহস্য গল্পগুলোতে চরিত্রদের আমাদের চারপাশ থেকেই তুলে এনেছেন লেখক। ফলে তাদের চিনতে, মোটিভ বুঝতে, হয়তো বা কার্যকারণ সম্পর্কটুকুও বুঝে নেওয়া সহজ হয়— যে ফেয়ার-প্লে না থাকলে রহস্য গল্প পড়ার আনন্দ কমে যায়। সব মিলিয়ে এই ছিমছাম, আপাতদৃষ্টিতে অন্ধকারাচ্ছন্ন অথচ পরিশেষে স্নিগ্ধ আলোয় দীপ্ত সংকলনটি পড়তে ভারি ভালো লাগল। ভরসা রাখি যে আগামী দিনেও তাঁর লেখনী আমাদের এমন আরও বহু কাহিনি উপহার দেবে।