বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধার্থ ছিলেন -- ইতিহাসের স্তূপে আলো জ্বালানোর এক ধৈর্যশীল যাত্রা: একটি অন্বেষণাত্মক পাঠসমালোচনা
“There are only two mistakes one can make along the road to truth: not going all the way, and not starting.” — Gautama Buddha
“ন হি বস্তুনি রম্যাণি ন চ গ্রন্থেষু সৌষ্ঠবম্।
ইতিহাসেন হীনানাং ন খলু স্পৃহণীয়তা॥”
(— বৌদ্ধ সূত্র, অর্থাৎ: “যে রচনায় ইতিহাস নেই, তা সত্যিই আকর্ষণীয় নয়—বস্তুর রমণীয়তা ও গৌরব গ্রন্থের অলঙ্কার দিয়ে গঠিত হলেও না।”)
১। প্রস্তাবনা: ইতিহাস ও অনুসন্ধানের সন্ধিক্ষণে
দীপন ভট্টাচার্য রচিত বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধার্থ ছিলেন কেবলমাত্র একটি বই নয়; এটি এক মননশীল পাঠকের চোখ দিয়ে ইতিহাসের স্তূপে অন্বেষণ করা এক প্রজ্ঞাপূর্ণ যাত্রা। বাংলা ভাষায় এমন গবেষণা-নির্ভর, প্রত্নতত্ত্বভিত্তিক কাজ বিরল। বইটি একদিকে ইতিহাসের নিক্তিতে ফ্যাক্ট যাচাই করে, অন্যদিকে কিংবদন্তি ও পুরাণের প্রলেপ সরিয়ে আপনাকে নিয়ে যায় বুদ্ধের শৈশবভূমির বাস্তব অনুসন্ধানে—কপিলাবস্তুর বর্তমান অবস্থান, লুম্বিনীর প্রামাণ্য তথ্য, চীনা পরিব্রাজক ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং-এর বিবরণ, ১৯শ শতকের ব্রিটিশ পুরাতাত্ত্বিকদের নাটকীয় তদন্ত—সব মিলিয়ে এক ঐতিহাসিক থ্রিলার।
লেখকের স্পষ্ট ঘোষণা—এটি কোনও রোম্যান্টিক ভ্রমণকাহিনি নয়, বরং গবেষণামূলক অনুসন্ধান। “আলোকিত কিংবদন্তির আড়ালে অবচেতন সত্যকে খুঁজে বার করাই এই যাত্রার লক্ষ্য।” বুদ্ধদেবের ঐতিহাসিক জন্ম, শাক্যদের বিনাশ, পিপরাওয়া স্তূপ ও তিলৌরকোটের ধ্বংসস্তূপকে ঘিরে যে প্রত্নতাত্ত্বিক ও তথ্যভিত্তিক সংগ্রাম, তা দীপনের অনুসন্ধানে ফিরে আসে নতুন মাত্রায়।
ক। প্রত্যক্ষতা ও প্রামাণ্যতার দ্বৈতবলে নির্মিত পাঠ
“Believe nothing, no matter where you read it or who said it, unless it agrees with your own reason and your own common sense.”
— The Kalama Sutta
এই উক্তিটি যেন দীপনের অনুসন্ধানী দৃষ্টিভঙ্গির মূলমন্ত্র। তথ্য যাচাই ও যুক্তির আলোয় গ্রন্থটি গড়ে উঠেছে এক ব্যতিক্রমী পাঠ-অনভিজ্ঞতায়। প্রতিটি অধ্যায়ে মানচিত্র, প্রত্নচিত্র, ব্রাহ্মীলিপি, রিপোর্টের উদ্ধৃতি—সব কিছুই নিছক আলঙ্কারিক নয়, বরং তারা গবেষণার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। বৌদ্ধ ইতিহাসের পাঠ্যসূত্র হিসেবে এই বই পড়তে পড়তে পাঠক নিজেই যেন এক সময় হিউয়েন সাং কিংবা দেবলা মিত্রের সহযাত্রী হয়ে ওঠেন।
আর সবচেয়ে অভিনব বৈশিষ্ট্য—চ্যাপ্টারের শেষে QR কোড স্ক্যান করলে পাওয়া যায় প্রাসঙ্গিক ডকুমেন্টারি বা ফিল্ডফুটেজ। এটি শুধু বই নয়—এ এক গবেষণালব্ধ ডিজিটাল আর্কাইভ, এক সজীব পাঠ।
খ। ইতিহাস ও কিংবদন্তির সংলাপ
“However many holy words you read, however many you speak, what good will they do you if you do not act upon them?”
— Dhammapada, Verse 19
দীপনের লেখায় ‘কিংবদন্তি বনাম ইতিহাস’ কোনো রূঢ় দ্বন্দ্বে পরিণত হয় না; বরং, কিংবদন্তির স্তরে স্তরে লুকিয়ে থাকা ঐতিহাসিক ছায়াগুলিকে ছাঁকনি দিয়ে বিশ্লেষণ করেন। পালি নিখায়, জাতক, ললিতবিস্তর, তিব্বতি সূত্রাদি থেকে তিনি বিশ্লেষণ করেন—কোনটা ঐতিহাসিক মিথ, আর কোনটা সোর্স লেভেল ফ্যাক্ট।
লুম্বিনীর শিলালিপি “hida budhe jate sakya muniti”—বৌদ্ধের ঐতিহাসিকতার প্রমাণ। আবার, পিপরাওয়া স্তূপ থেকে উদ্ধার হওয়া কঙ্কাল ও শিলালিপি যে বুদ্ধদেবের দেহাবশেষ হতে পারে, সেই দাবির পেছনে প্রত্নতাত্ত্বিক যুক্তি এবং রিপোর্টকে দীপন শৈল্পিক দক্ষতায় তুলে ধরেছেন।
গ। একটি অনুসন্ধান, যা নিজেই একটি শিক্ষণপাঠ
“As a flower that is lovely and beautiful, but is scentless, even so fruitless are the fair words of one who does not act accordingly.”
— Dhammapada, Verse 51
এই বই পাঠককে শেখায় গবেষণার পদ্ধতি, প্রত্নতত্ত্বের ভিত্তি ও প্রমাণের প্রতি শ্রদ্ধা। এটি সেই পাঠ, যা তথ্য দিয়ে শাসন করে না, বরং যুক্তি দিয়ে পথ দেখায়। কপিলাবস্তুর অবস্থান ঘিরে নানা বিতর্ক—WC Peppe, Fuhrer, Mukherji, Debala Mitra—সবার গবেষণা পড়েই দীপন পৌঁছেছেন একটি তুলনামূলক, সুস্থ, ও স্বচ্ছ সিদ্ধান্তে।
ঘ। অনুসন্ধান কখনও শেষ হয় না
“Just as a candle cannot burn without fire, men cannot live without a spiritual life.”
— Gautama Buddha
বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধার্থ ছিলেন কেবল ইতিহাস নয়, এটি সেই বৌদ্ধিক দীপশিখা, যা প্রত্নতাত্ত্বিক স্তূপের মধ্যেও এক আত্মিক দীপ্তি জ্বালিয়ে তোলে। বইটির পাঠ অন্তর্গত এক ধ্যানের মতো—যেখানে প্রতিটি তথ্য এক প্রার্থনার মতো, প্রতিটি চিত্র এক ধ্যানদৃশ্যের মতো।
এই গ্রন্থ শুধুমাত্র বুদ্ধের পদচিহ্ন অনুসরণের চেষ্টা নয়—এটি গবেষণার পরম্পরাকে জীবন্ত রাখা, ঐতিহাসিক সত্যকে ছাঁকনিতে ঢেলে পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার প্রয়াস। দীপনের এই বই নতুন প্রজন্মের ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য এক উজ্জ্বল মানদণ্ড।
যতদিন থাকবে জিজ্ঞাসা, ততদিন চলবে অনুসন্ধান। আর এই বই, সেই যাত্রার প্রথম দীপ্ত দীপশিখা।
২। প্রত্যক্ষতা ও প্রামাণ্যতার দ্বৈতবলে নির্মিত পাঠ
“The fool who knows he is a fool is that much wiser. The fool who thinks he is wise is a fool indeed.”
— Dhammapada, Verse 63
দীপন ভট্টাচার্যের লেখনীতে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অভিজ্ঞতা হল এই—তিনি কখনও একতরফাভাবে পাঠককে জ্ঞান দিতে চান না। বরং প্রতিটি অনুচ্ছেদে, প্রতিটি তথ্যচিত্রে, তিনি যেন পাশে বসে বলেন: “চলো, একসঙ্গে ভাবি, একসঙ্গে খুঁজি।” এই দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে গবেষণার বিনয়, অন্যদিকে পাঠককে সহযাত্রী করে তোলার এক উচ্চতর শিল্প। পাঠকের অনুভব হয়—তাঁর হাতে কেবল একটি বই নেই, তাঁর পাশে আছেন একজন জ্ঞানান্বেষী সাথী।
বইটি তথ্যমূলক, নিঃসন্দেহে। কিন্তু তথ্যের অরন্যে ক্লান্ত করে না একটুও। QR কোড থেকে সংযুক্ত ডকুমেন্টারি, ঐতিহাসিক মানচিত্র, দুর্লভ প্রত্নচিত্র, লিপি ও স্তম্ভের ছবি—সব কিছু মিলিয়ে এটি এক বহুস্তরীয়, ইন্দ্রিয়গম্য পাঠ: চোখ, কান, হৃদয়—সব কিছু একযোগে সক্রিয় হয়ে ওঠে। একে কেবল “বই পড়া” বলা চলে না; একে বলা চলে "অনুভব"।
এই বইয়ের পঠনকৌশল যেন ত্রিপিটক-এর পাঠে উৎসুক এক বৌদ্ধ শিষ্যের ধ্যানচর্চা—দ্রুত নয়, ধীরে। শ্লোক পড়ে থেমে ভাবা, চিহ্ন দেখে মানচিত্র মেলানো, QR কোড স্ক্যান করে ফিরে গিয়ে আবার প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদে ফিরে আসা—পাঠ প্রক্রিয়াটি হয়ে ওঠে চক্রবৎ; একগামী নয়, আবর্তনশীল।
“As the bee collects nectar and departs without harming the flower, so should the sage dwell in his village.” — Dhammapada, Verse 49
ঠিক এইভাবেই দীপনের অনুসন্ধান গ্রন্থটি জ্ঞান আহরণ করে—বিনম্র, অনুপ্রবেশহীন, অথচ গভীর প্রভাবসঞ্চারী। তিনি তথ্যের গায়ে ছুরি চালান না, তাদের সৌন্দর্য ও প্রেক্ষাপটকে অক্ষুণ্ণ রেখে প্রশ্ন তোলেন। সেইসব প্রশ্ন—“এই নিখিল স্তুপ কি সত্যিই কপিলাবস্তুর অন্তিম চিহ্ন?” কিংবা “পিপরাওয়ার দেহাবশেষ কি ঐতিহাসিক সিদ্ধার্থের?”—এগুলো কেবল উত্তর খোঁজার প্রশ্ন নয়, এরা পাঠককে উদ্বুদ্ধ করে গবেষক হয়ে উঠতে।
এই বইয়ের অভিজ্ঞতা অনেকটা যেন পুরোনো কোন সত্তিপটঠান সুত্র পাঠের মতো—যেখানে আপনি নিজের শ্বাস পর্যবেক্ষণ করছেন, বাহ্যজগৎ নয়, কিন্তু সেই অন্তর্জগতে থেকেই খুলে যাচ্ছে বাইরের স্তরও।
এ বইয়ের পাঠক হয়ে ওঠেন তথ্যের পর্যবেক্ষক, যুক্তির সঙ্গী, আর ইতিহাসের এক আত্মিক দর্শনার্থী। যেন কোনও প্রত্নতাত্ত্বিক স্তূপ খুঁড়ে তোলা নয়—বরং তার স্তরের স্তরে হাত বুলিয়ে ইতিহাসের নিঃশব্দ শ্বাস গ্রহণ।
৩। ইতিহাস ও কিংবদন্তির সংলাপ: গাথার স্তরে ইতিহাসের স্পন্দন
“Monks, be islands unto yourselves, be your own refuge, with no other refuge. Let the Dhamma be your island and your refuge.” — Mahāparinibbāna Sutta (DN 16)
এই বইয়ের অন্যতম অমূল্য দান হল ইতিহাস ও কিংবদন্তির পরস্পরসংলাপ নির্মাণ—দ্বন্দ্ব নয়, বরং দ্বৈত থেকে দীপ্তি। আধুনিক ইতিহাসচর্চার আলোয় কিংবদন্তির অন্তর্লীন বয়ানসমূহ কীভাবে যাচাইযোগ্য, সে বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি একদিকে যুক্তিনিষ্ঠ, অন্যদিকে কাব্যিক।
লুম্বিনী ও কপিলাবস্তুর ভৌগোলিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে চলে আসা বিতর্ক, বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক দলিলের ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা, এবং ধর্মীয় বিশ্বাসের ছায়ায় ঢেকে-যাওয়া বাস্তবতাকে দীপন তুলে ধরেছেন শল্যচিকিৎসকের মতো সূক্ষ্ম কুশলতায়। তিনি কাহিনি ভাঙেন না—তিনি তলদেশে নামেন। কিংবদন্তিকে “ভ্রান্ত” বা “মিথ্যা” বলে বাতিল না করে, তিনি দেখান কিভাবে একটি সাংস্কৃতিক বয়ানকে বিশ্লেষণ করে ইতিহাসের মূল ধ্বনি পাওয়া যায়।
এখানে লেখক পাঠককে পরিচিত করে তোলেন আকর পাঠের রীতির সঙ্গে—পালি নিখায়, অভধান, জাতক, ললিতবিস্তর, দিব্যাবদান, এবং তিব্বতের মুলসর্বাস্তিবাদিন সূত্র—এ সমস্ত গ্রন্থ থেকে তিনি নিপুণ হাতে আলাদা করেছেন “পুরাণ”, “প্রচলিত উপাখ্যান” ও “ইতিহাসযোগ্য ন্যারেটিভ”।
“He who sees Dhamma sees me; he who sees me sees Dhamma.” — Samyutta Nikaya, SN 22.87
লেখকের অনুসন্ধান পাঠককে চোখে আঙুল দিয়ে শেখায়—যে ‘দর্শন’ আমরা বুদ্ধের নামে জানি, তা আদতে বহু শতাব্দীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক চাপের ভিতর দিয়ে তৈরি হয়েছে। আর এই নির্মাণের পেছনে কাজ করেছে টেক্সট ও প্রসঙ্গের চুম্বকীয় টানাপোড়েন।
উদাহরণস্বরূপ, লুম্বিনীর অশোক স্তম্ভের শিলালিপি— “Hida Budhe jate Sakyamuniti” (অর্থাৎ: “এইখানেই বুদ্ধ, শাক্য মুনি জন্মেছিলেন”)—এই একটিমাত্র শিলালিপি হয়ে ওঠে উপমহাদেশের ইতিহাসে বৌদ্ধ ঐতিহাসিকতার প্রথম দৃষ্টিগ্রাহ্য ও শিলায় খোদিত প্রমাণ।
শুধু এই এক লাইন নয়—লেখক যুক্ত করেন ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাং-এর বিবরণ, দেবলা মিত্র ও মুখার্জির রিপোর্ট, ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ ফিউরার ও পেপ্পের বিতর্কিত ব্যাখ্যা। প্রতিটি দলিল, প্রতিটি কিংবদন্তি, প্রতিটি টেক্সট—সব কিছুর মধ্যেই দীপন খোঁজেন গূঢ় সত্যের রেশ, “প্রচার”-এর আবরণে ঢাকা “প্রমাণ”-এর স্পন্দন।
এইখানেই দীপনের বই দাঁড়িয়ে যায় “আধুনিক ইতিহাসচর্চা”-র প্রান্তসীমায়। পাঠকের মনে প্রশ্ন আসে—"গল্পটা কোথা থেকে এল?" আর ঠিক তখনই লেখক দেখান, তথ্য কীভাবে গল্প হয়, আর গল্প কীভাবে তথ্য হতে পারে—যদি আপনি জানেন কীভাবে “সূত্র”-কে প্রশ্ন করতে হয়।
এ অধ্যায়ের পাঠ একটি প্রশান্ত বুদ্ধপূর্ণ পরামর্শের মতো:
“Rely not on the teacher, but on the teaching; not on the words, but the meaning.” — Four Reliances (Mahāyāna Tradition)
অর্থাৎ, পাঠকের দায় নিজস্ব অনুসন্ধানের প্রতি। আর এই অনুসন্ধানেই দীপনের পাঠ আপনাকে ইতিহাসের সঙ্গে কিংবদন্তির নিবিড় আলাপচারিতায় বসিয়ে দেয়—যেখানে শোনা যায় শিলালিপির নীরব ভাষা, স্তূপের নিঃশব্দ কান্না, আর কিংবদন্তির মৃদু ব্যাকরণ।
৪। গবেষণার নৈতিকতা ও পাণ্ডিত্যের বিনয়: জ্ঞান যেখানে অহঙ্কারবর্জিত
“He who has knowledge, but does not act accordingly, is like a man who lights a lamp but shuts his eyes.” — Buddhist Proverb
বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধার্থ ছিলেন বইটির পাঠে বারবার একটি বিষয় অনুরণিত হয়—লেখক কখনওই নিজেকে মতবাদধারী, অথবা একচোখা মতানুগ অনুসন্ধানকারীর ভূমিকায় উপস্থিত করেন না। বরং, দীপন ভট্টাচার্যের শৈলীতে যে আত্মগত বিনয় ও একাডেমিক শৃঙ্খলা দেখা যায়, তা আজকের তথাকথিত 'অপিনিয়নেটেড স্কলারশিপ'-এর মাঝে এক প্রশান্ত ও পবিত্র ব্যতিক্রম।
তাঁর প্রতিটি তর্ক, সিদ্ধান্ত, অনুমান ও সন্দেহ নির্মিত হয়েছে প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান ও নিরপেক্ষ পাঠে। সোর্সের প্রতি তার যে নিষ্ঠা—তা পাঠকের আস্থাকে সুনির্মিত করে তোলে। তাঁর জার্নালে নেই কোনও ‘হ্যাঁ-না’-র মুখরতা, নেই মতামতের জাঁকালো শিরদাঁড়া। তিনি যেন একজন কুসল বিক্খু, যিনি কেবল দেখেন, বোঝেন, এবং তারপর যতোখানি বলেন ততটাই দরকার।
“যঃ পটিভেজ্জ ধম্মং সেয়্যো”— (“যে নিজে অন্বেষণ করে সত্য উপলব্ধি করতে পারে, সেই শ্রেষ্ঠ।”) — বৌদ্ধ সূত্র
এই সূত্রটি যেন দীপনের গবেষণার ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়। তিনি কাউকে সত্য “বলা”র চেষ্টা করেন না, বরং তথ্যের সূত্রে পাঠককেই নিয়ে যান সেই অন্বেষণের পথে—যেখানে সত্য উপলব্ধি হয় একক চিন্তায়, কৌতূহলের আলোর তলায়। আজকের ‘তাত্ত্বিক অপব্যাখ্যার’ যুগে, তাঁর এই নিষ্কম্প ধ্যানমগ্নতা প্রশংসনীয়।
তাঁর অনুসন্ধান কোনো স্ববিরোধী জট নয়, বরং একধরনের একাডেমিক সাধনা। পিপরাওয়া স্তূপের অস্থি, লুম্বিনীর স্তম্ভ, মুখার্জি রিপোর্ট, ফিউরারের জালিয়াতি, দেবলা মিত্রের পর্যবেক্ষণ, ফাহিয়েন ও হিউয়েন সাংয়ের বিবরণ—এই সমস্ত উপাদান তিনি একধরনের সন্ন্যাসীর মন নিয়ে, নিরাসক্ত হাতে বিশ্লেষণ করেন। ফলত, গ্রন্থটি হয়ে ওঠে তথ্যভিত্তিক বোধি।
“Do not accept anything by mere tradition... But when you know for yourselves that, ‘These things are wholesome... accepted and practiced, they lead to welfare and happiness,’ then you should live accordingly.” — Kalama Sutta
এই কালাম সূত্র যেন লেখকের শিরদাঁড়া। তিনি কোনও প্রাচীন সূত্রকে পবিত্র বলেই গ্রহণ করেন না; আবার আধুনিক তত্ত্বকেও চোখ বুজে মানেন না। বরং, নিজস্ব অনুসন্ধানে খুঁজে নেন তার কার্যকারণ, সময়, প্রেক্ষাপট ও ব্যবহারিক অবস্থান।
এই সততা, এই বিনয়, এই আত্মস্থ ধ্যানমগ্নতা বইটিকে কেবল গবেষণার উপকরণ করে তোলে না; এটি হয়ে ওঠে একটি আত্মিক শিক্ষানুষ্ঠান—যেখানে গবেষণা মানে তথ্যের জমাটি ‘শো’ নয়, বরং ‘সত্যে পৌঁছাবার নিরব সাধনা’।
“Silence is better than meaningless words.” — Buddha
আর তাই দীপনের আলোচনায় কোথাও শব্দের বাড়াবাড়ি নেই, তথ্যের ছড়াছড়ি নেই—যা আছে তা হল গভীর নিরবতা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিভঙ্গি, এবং প্রশান্ত যুক্তি। আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে যেখানে অনেক লেখক তথ্যকে অতি সরলীকরণে পর্যবসিত করেন, সেখানে দীপন তার গভীরতা অক্ষুণ্ণ রেখে বইটিকে পাঠকের চিন্তানির্ভর অনুসন্ধানে রূপান্তর করেন।
৫। উপসংহার: ইতিহাসের স্তূপ থেকে জন্ম নেয় আলো
“From the heap of dust, a lotus may rise.” — Buddhist aphorism
দীপন ভট্টাচার্যের বুদ্ধদেব যখন সিদ্ধার্থ ছিলেন কেবল ইতিহাস শেখায় না—এই বই শেখায় কিভাবে ইতিহাস খোঁজে; কিভাবে কিংবদন্তিকে বিশ্লেষণ করে, টেক্সটের অন্তর্লীন স্তরকে বুঝে, এবং টেরিটোরির প্রতিটি ধুলিকণাকে জিজ্ঞাসায় জ্বালিয়ে তোলে।
এটি শুধু একাডেমিক অনুসন্ধান নয়—এ হল এক ধরণের সাক্ষাৎ ধ্যানযাত্রা, যেখানে ইতিহাসের স্তূপগুলো নিঃশব্দে মুখ খুলতে শুরু করে। বুদ্ধের ঐতিহাসিকতা নিয়ে আজ যে দোটানা, প্রচার-নির্ভর সংশয়, বা মতবাদভিত্তিক দাবির চিৎকার, সেইসবের থেকে দূরে থেকে দীপনের লেখা আমাদের শেখায়—কীভাবে “প্রমাণ”-এর চোখে সত্যকে চিনতে হয়।
এই গ্রন্থ যেন পাঠকের হৃদয়ে একটি প্রাজ্ঞ অনুরণন তোলে—যেখানে অনুসন্ধান মানে কেবল পাদটীকা ঘেঁটে দেখা নয়, বরং প্রতিটি শিলালিপি, প্রতিটি স্তূপ, প্রতিটি পৌরাণিক বর্ণনার ভিতরে ইতিহাসের অনুরণন শোনা।
“As a solid rock is not shaken by the wind, so the wise are not moved by praise or blame.” — Dhammapada, Verse 81
এই নিঃসঙ্গ নির্লিপ্ততা এবং ইতিহাস-পাঠে নিরপেক্ষতার মন্ত্রই দীপনের কাজের ভিত্তি। তাঁর অন্বেষণ কেবল তথ্য নয়, একধরনের মনোভাব: যে মনোভাব বুদ্ধের মতো করে দেখায়—ভিতর থেকে, সংযত দৃষ্টিতে, নির্বিকার আলোয়।
তাঁর অনুসন্ধান দেখায়, ইতিহাস কেবল ‘বিষয়’ নয়, এটি মনস্কতা—যেখানে প্রতিটি উপাদানকে শ্রদ্ধা, যুক্তি এবং নিরবিচারে বিবেচনা করতে হয়। পাঠ শেষে পাঠক যেন নিজেকেই প্রশ্ন করেন—আমিও কি পারি সত্যের প্রতি এতখানি শ্রদ্ধাশীল হতে?
গৌতম বুদ্ধ একবার শিষ্য আনন্দকে বলেছিলেন— “Attānaṃ dīpaṃ karotha”—নিজেই নিজের দীপ হও।
এই গ্রন্থ তার প্রতিধ্বনি। যখন তথ্যের আলো, প্রত্নতত্ত্বের স্পর্শ, কিংবদন্তির ছায়া, এবং যুক্তির দৃঢ়তা একত্রে মিশে যায়, তখন পাঠকের চিত্তে সত্যিকার বোধি-আলোকের জন্ম হয়।
এই বইয়ের শেষ পাতায় পৌঁছেও পাঠক যেন কোথাও পৌঁছান না—বরং শুরু করেন এক নতুন যাত্রা। পাঠক আর লেখকের ভেদরেখা মুছে গিয়ে সৃষ্টি হয় এক সংবেদী অনুসন্ধানীর পরিসর।
এ যেন সেই বহ্নিশিখা, যার চারপাশে পতঙ্গ হয়ে জড়ো হন ইতিহাসপ্রেমীরা—কিন্তু এখানে পতঙ্গেরা পুড়ে যান না, বরং দীপ্ত হন। কারণ এই আলো দহন করে না, দিশা দেখায়।
“This is my last birth. There is now no more coming to be.” — Last words of the Buddha, Mahāparinibbāna Sutta
আর পাঠক তখন বুঝতে পারেন—এই বই কেবল একটি বই নয়। এটি এক নির্জন স্থবির বোধির নিচে বসে থাকা, একবার অন্তর দেখার অভ্যাস শুরু করে ফেলা, ইতিহাসকে নিয়ে না শুধু “জানা”—বরং তাকে নিয়ে “জেগে ওঠা”।
প্রচ্ছন্ন ধন্যবাদ, দীপনবাবু— আপনি পাঠকদের শেখান কীভাবে ইতিহাসের দিকে তাকাতে হয়, এবং তার ভেতরে কীভাবে নিজেকে খুঁজে পেতে হয়।
এই বই শুধুই তথ্য নয়, এটি এক অনুশীলন—যেখানে পাঠক হয়ে ওঠেন পর্যবেক্ষক, আর পর্যবেক্ষণ থেকে জন্ম নেয় উপলব্ধি।
যে আলো আপনি জ্বালিয়েছেন, তা যেন পথ দেখায় আরও বহু জিজ্ঞাসু মনের— বইটি ছুঁয়ে যাক হাজার হাজার ইতিহাস-অনুরাগীর হৃদয়, যারা আজও বিশ্বাস করেন— "To know what came before is to awaken to what is."
অলমতি বিস্তরেণ।