কথাসাহিত্যিক এবং চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানী শাহাদুজ্জামান লেখালেখি করছেন তিন দশকেরও অধিক সময় ধরে। গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, গবেষনাসহ নানা ধারায় লিখেছেন তিনি। তার কাজ এবং ভাবনা বিষয়ে বক্তৃতা দেবার জন্য তিনি আমন্ত্রিত হয়েছেন বিভিন্ন অনুষ্ঠানে। তেমনি কিছু নির্বাচিত বক্তৃতার সংকলন এই বইটি। সমকালীন সাহিত্যের এই বিশিষ্ট লেখকের বক্তৃতায় সাহিত্য, সমাজ এবং জীবন-জিজ্ঞাসার নানা প্রসঙ্গ উঠে এসেছে।
Shahaduz Zaman (Bangla: শাহাদুজ্জামান) is a Medical Anthropologist, currently working with Newcastle University, UK. He writes short stories, novels, and non-fiction. He has published 25 books, and his debut collection ‘Koyekti Bihbol Galpa’ won the Mowla Brothers Literary Award in 1996. He also won Bangla Academy Literary Award in 2016.
কিছু লেখকের প্রজ্ঞা তাদের লেখা পড়তে শুরু করা মাত্র ধরা যায়। কঠিন কঠিন শব্দ ব্যবহার করে, দেশি বিদেশি মনীষীদের উদ্ধৃতি দিয়ে, নিজেদের বিস্তর জানাশোনার প্রমাণ দিয়ে তারা তাক লাগিয়ে দিতে পারেন। শাহাদুজ্জামান এই শ্রেণিতে পড়েন না। তিনি নিছক গল্প বলার ছলে এগিয়ে যান, কোনোভাবেই নিজের কর্তৃত্ব জাহির করেন না। ধীরে ধীরে কিন্তু নিশ্চিত পদক্ষেপে তিনি তার কথার গভীরে নিয়ে যান আমাদের। শাহাদুজ্জামান এমনভাবে একটা বিষয় উপস্থাপন করেন যাতে নিতান্ত গোবেচারা ধরনের পাঠকও তা বুঝতে পারে। এটা একটা দুর্লভ গুণ। এ বইটা যেহেতু বক্তৃতা সংকলন, তাই এখানে লেখক আরো বেশি সরল।সাহিত্য, দীপেশ চক্রবর্তী, একবিংশ শতাব্দীতে জীবনের লক্ষ্য, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির - সব বিষয়েই শাহাদুজ্জামান সহজ এবং সারগর্ভ। বারবার পড়লেও এই লেখাগুলোর আবেদন কমবে না।
এই জীবন লইয়া কি করিব – এই বইয়ের নামটাই আমার বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাই কিছু না ভেবেই বইটা নেয়া। অনেকে অনেক প্যাঁচাল পাড়ছে, জীবন নিয়ে কি করবো, লাইফ ইজ মিনিংলেস অথবা অ্যাবসার্ড অথবা জীবনের মানেই হচ্ছে জীবনকে উপভোগ করতে শেখা – এসব কিছু নিয়ে। যা জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে সত্যি মনে হয়, আমি তা অস্বীকার করছি না। বাট, জীবনের কোন মিনিং নাই বলে অথবা কি করিব প্রশ্ন করে আমরা জীবনকে মিনিং দেওয়ার চেষ্টা কয়জনই বা করি? যে প্রশ্নগুলো আমার মাথায়ও আসে মাঝে মাঝে – যেমন টুইটার, ফেসবুক অথবা ইনস্টা তে আপনাদের বলা মিডিয়া সেলিব্রিটি অথবা সোশ্যাল মিডিয়া সেলিব্রিটি রা মাঝে মাঝে বিভিন্ন পোস্ট দিয়ে আইডিয়া প্রেজেন্ট করেন, কয়জন অ্যাকচুয়ালি ওই আইডিয়া ইমপ্লিমেন্ট করেন? অথবা “পলিটিশিয়ানস” অথবা “ইন্টেলেকচুয়ালস(?)” – এই যে অনেক সমস্যার কথা নিয়ে ফেসবুক এ বড় বড় স্ট্যাটাস দেন বা দিচ্ছেন, কয়জন অ্যাকচুয়ালি বড় কথা বলে লাইক, শেয়ার, ফ্যান, ফলোয়ার না কামিয়ে সমস্যার সলিউশন করেছেন? আর কয়দিন পরে নিউ ইস্যু আসলেই সেটা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়া তে লেখালিখি অথবা সমালোচনা করা ছাড়া, আর ম্যাক্সিমাম মেয়েদের পোস্টে শাহবাগী(গায়ে গন্ধ বলা ছাড়া) – এই জীবন নিয়ে এখন পর্যন্ত কিছু করেছেন? রিমেম্বার হ্যাশট্যাগ রিভার্স ড্রেন বাংলাদেশ? রিমেম্বার জুলাই আপরাইজিং? সেটা নিয়ে রিলস বানানো ছাড়া আর কিছু কি হয়েছে?
দেশের বইপাড়ার কথাই বলি – এই দেশে কয়জন বর্তমান সময়ের রাইটার আছেন যাদের মেইন প্রফেশন রাইটিং? আর কয়টা প্রোকাশনী রাইটার দের হয়ে বইয়ের প্রচারণা করেন? আপনারা ড্যান ব্রাউন এর বই বের হওয়ার আগেই ট্রান্সলেশন এর জন্য কাড়াকাড়ি করেন, কয়জন নিজের দেশের বই নিয়ে ইভেন্ট করেন বইমেলার সময় ছাড়া, কখনো কখনো তখনও না। দেশে এত এত ভালো রাইটার আছেন – শুধুমাত্র প্রচারণার কারণে আমরা নাম পর্যন্ত শুনিনি। যা একজন রিডার হয়ে খুবই লজ্জার বিষয়! কিন্তু আমরা ঠিকই জনপ্রিয় কোনো রাইটার এর বই নিয়ে রিডার, প্রকাশক থেকে শুরু করে ছোট ছোট বুকস্টোর পর্যন্ত বিজনেস করার ধান্ধায় থাকি। একমাত্র বাংলাদেশ এর প্রকাশনীগুলোতেই বইয়ের প্রচারবিমুখতা দেখলাম – যেটা, লাইক...একটা বই বের করলাম, রাইটার দের রয়্যালটি দিয়ে দিলাম, এখন বই কোনো নরকে যাক অথবা স্বর্গে যাক সেটা আমাদের দেখার বিষয় না!
ওয়েল, তাই শাহাদুজ্জামান বলেছে ক্রিয়েটিভিটি কে একমাত্র প্রফেশন হিসেবে নেওয়া এই দেশে সম্ভব না, আর নারী হলে সেটা আরও কঠিন।
গুডরিডস-এ এক সময় এক আপুর সাথে পরিচয় হয়েছিল, প্রায় আট-নয় বছর আগে প্রোবাবলি... আমি একটা জিনিস নোটিস করতাম – আপু খুব ননফিকশন পড়ে। আমরা যেরকম রেগুলার ফিকশন পড়ি আর মাঝে মাঝে নন-ফিকশন, আপু ছিল ঠিক উল্টো। আর আমার জিনিসটা বেশ ভালো লাগতো। বাট আমি কখনো সেভাবে নন-ফিকশন পড়ে মজা পেতাম না। হয়তো তখন বেশ ছোট ছিলাম তাই, অথবা শাহাদুজ্জামানের মতো করে সুন্দর সাবলীল ভাষায় আমার জন্য কেউ নন-ফিকশন লেখেনি তাই হবে। যদিও এই বই মূলত তার বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তৃতার সংকলন। তিনি অনেক থট-প্রোভোকিং বিষয় নিয়ে লিখেছেন, কিছু বিষয় নিয়ে জানার আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে লেখকের আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং শহীদুল জহির কে নিয়ে স্মৃতিচারণ। মানে আমি যখন আখতারুজ্জামান কে নিয়ে পড়ছিলাম, আমার এত আনন্দ হচ্ছিল আর খুব প্রাউড লাগছিল যে বাংলা সাহিত্যে খোয়াবনামা-র মতো একটা সৃষ্টি আছে! আর শহীদুল জহির – আমার ওয়ান অফ দ্য মোস্ট ফেভারিট রাইটারস অ্যান্ড আই থিংক আই’ম গোনা রিরিড হিম।
আর সবশেষে ছিল এস এম সুলতান আর এই জীবন লইয়া কি করিব। কয়দিন আগে কারো ইনস্টা পোস্ট দেখেছিলাম এস এম সুলতান কে নিয়ে (এখন ঠিক মনে নাই) – বাট এস এম সুলতানের ভুবন পড়তে গিয়ে ওই পোস্ট এর কথা মনে পড়ে গেল।
“অনেক এলোমেলো কথা বলা হলো – তবে এই জীবন লইয়া কি করিব, সেই প্রশ্নের উত্তরটা ঠিক দেওয়া হলো না। সত্যি বলতে, এই প্রশ্নের তো একক কোনো উত্তর নেই। যার যার উত্তর তাকেই খুঁজে নিতে হয়।”
লেখক শাহাদুজ্জামান এর সাতটি বক্তৃতার সংকলন এ জীবন লইয়া কী করিব ও অন্যান্য। খুবই চমৎকার বই। চমৎকার সময় কেটেছে লেখকের বিদগ্ধ আলোচনায়। এত কঠিন কঠিন বিষয় আমার মত গবেট শ্রেণীর পাঠককে কিভাবে তিনি গেলালেন সেটা একটা রহস্য হতে পারে। যা বুঝেছি সাতটি বক্তৃতা থেকে তার মূল বিষয় নিয়ে একটু না বলার লোভ সামলাতে পারছিনা-
১. বিশ্বায়নের কালে লেখালেখি এখানে মূল আলোচনাটা এসেছে সামগ্রিক জীবনে গ্লোবালাইজেশন এর প্রভাব। এখন তো আমরা কেউ কারো দূরে নই। কিভাবে বিশ্বায়ন আমাদের চিন্তা, সংস্কার কে পরিবর্তন করছে। এইরকম একটা যুগে বসে ক্রিয়েটিভিটির চ্যালেঞ্জটা কি করে মোকাবিলা করা যায় তা নিয়েই এই বক্তব্য।
২. ডিজিটাল মানব নোয়াম চমস্কির একটা উক্তি দিয়ে এই বক্তৃতার মূল অংশটুকু কিছুটা কভার করা যায়- "শত শত কোটি টাকা প্রতিদিন খরচ হচ্ছে তোমার ও আমার ভাবনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য।" না, এই আলাপে তিনি কোনো কন্সপায়রেসি থিওরি নিয়ে আলোচনা করেন নি। বেশ চমৎকার সব উদাহরণ দিয়ে নানান যুক্তিখন্ডন করেছেন।
৩. চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যে উপনিবেশবাদের নির্মাণ এই আলাপটা একটু জটিল, তবে খুব ইন্টারেস্টিং। ইতিহাসবিদ দীপেশ চক্রবর্তীর গবেষণার ভিত্তিতে ইতিহাসের একটা গমনপথ বা আউটলাইন দাঁড় করিয়েছেন। এবং বলতে চেয়েছেন 'দেয়ার আর ডাইভার্�� ওয়ে্স অব বিয়িং ইন দিস ওয়ার্ল্ড'। ইউরোপীয় সভ্যতাই শ্রেষ্ঠ সভ্যতা, বাকিসব ধর্মান্ধতা আর কুসংস্কার এমন চিন্তাকে সমালোচনা করেছেন। যেমন সাঁওতালদের ব্রিটিশবিরোধী লড়াই চলেছিল বনের দেবীর নামে, সেটা আপনার নজরে কুসংস্কার মনে হলেও তারা লড়েছিল আপন ইতিহাস ও ধর্মীয় বিশ্বাসকে পুঁজি করে। চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানও যে এত মজার একটা টপিক হতে পারে আমি হঠাৎ আবিষ্কার করলাম। কিভাবে এই অসভ্য দেশের অসভ্য মহামারি 'কলেরা', যাকে হিন্দুরা ডাকতো 'ওলাদেবী' আর মুসলমানরা ডাকতো 'ওলাবিবি'; সেই কলেরা ইউরোপীয়দের ভুগিয়ে, সামরিক, রাজনৈতিক সেতু পার করে বাধ্য করেছে এই দেশে অ্যালোপেথিক চিকিৎসা নিয়ে আসতে- এই জার্নিটা চিন্তা করলেই অবাক লাগে। মূলতঃ এই আলোচনাটি ছিল চিকিৎসা নিয়ে। কিন্তু এর সাথে রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক উপাদান গুলো কিভাবে জড়িত এই হল উপপাদ্য।
৪. আখতারুজ্জামান ইলিয়াস: টুকরো ভাবনা এখানে লেখক- গ্রেট আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে টুকরো টুকরো ভাবনাই বলে গেছেন। কখনো অভিজ্ঞতা নিয়ে, কখনো সাহিত্য নিয়ে, কখনো শুধু তাঁর হাসি নিয়ে। একটা অংশ আমি উদ্ধৃত করি- 'আমার কাছে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের প্রধান শক্তি হচ্ছে লেখায় জীবনকে এর সামগ্রিকতায়, এর টোটালিটিতে উপস্থিত করতে পারার চেষ্টায়। তিনি তার গল্প, উপন্যাসে একটা সময়কে, চরিত্রগুলোকে এর শক্তি, সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে নানা বৈপরীত্যসহ উপস্থিত করেন। দর্শনের পরিভাষায় বলতে গেলে বলতে হয়, তিনি পজিটিভিস্টদের মতো একটা হাইপোথিসিসের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে লিখতে বসেন না, বরং ফেনোমেনোলজিস্টদের মতো হাইপোথিসিস জেনারেট করেন। একেকটা চরিত্র একেকটা অনুবিশ্বের মতো উপস্থাপিত হয়।'
৫. শহীদুল জহিরের দিকে দেখি আরেক প্রিয় লেখক শহীদুল জহিরের 'মুখের দিকে দেখি' উপন্যাসের আদলে দেয়া বক্তব্যের শিরোনাম। শহীদুল জহির এর ভাষা নিয়ে লেখক নিজের সূচারু দর্শন বর্ণনা করেছেন এখানে। জহিরের প্যারেন্থিসিস ব্যবহার করে করা রচনা, মুক্তিযুদ্ধ, মানুষের ভাবনা, জীবন কিভাবে তিনি দেখেন এসব বিষয় উঠে এসেছে। অনেক নতুন কিছু জানলাম। আরও জানলাম, শহীদুল জহির ছিলেন সেই লেখক, যিনি একটা কমার দুঃখে দ্বিতীয়বার একটা গল্প ছাপান।
৬. এস এম সুলতানের ভুবন এসএম সুলতানের সামগ্রিক দর্শনকে এ আলোচনায় তিনি বুঝতে চেয়েছেন। কি কারণে এ দেশের প্রতি তিনি অভিমান করেছিলেন তা খুঁজেছেন। ২২ বছর সুলতান কেন চুপ ছিলেন, কেন ছবি আঁকেননি তা খুঁজে বের করেছেন। সবচাইতে কমন যে প্রশ্নটা, সুলতানের ছবিতে যে পেশিবহুল কৃষকদের দেখা যায়, এর পেছনে কারণ কি- তা তিনি সুলতানের ভাষ্যেই ব্যাখ্যা করেছেন।
৭. এ জীবন লইয়া কি করিব এই বক্তৃতার নামেই এ বইয়ের নাম। এই পৃথিবীর সবচাইতে পুরানো প্রশ্ন যার বিষয়। এর তো উত্তর হয়না এত সহজে, তবে নানা মুনির নানা মত আর নিজের ছেঁড়া ছেঁড়া দর্শন নিয়ে তিনি ইন্টারেস্টিং আলোচনাটি করেছেন। এতে তিনি কেন লেখেন সেই প্রশ্নের অন্তত উত্তর আছে।
চমৎকার লেগেছে আমার বইটা। প্রায় প্রতিটি বক্তব্যেই লেখককে ঔপনিবেশিকতা, ইউরোসেন্ট্রিসম নিয়ে হতাশ হতে দেখা গেছে। একে তিনি অস্বীকার করেন নি, বরঞ্চ প্রশ্ন তুলেছেন বারবার 'নিজেদের স্বকীয়তা কি নেই?' এই বলে। আরোপিত আধুনিকতা আর ডিকলোনাইজেশনের কথা প্রায় প্রতিটি বক্তৃতায়ই চোখে পড়েছে।