২০২০ সালের কোভিড কবলিত সময়েও ‘নারাচ’ উপন্যাস প্রকাশ হওয়ামাত্র পাঠক মহলে সাড়া ফেলে দেয়। অনূদিত হয় ইংরেজি ভাষাতেও।
এর প্রধান কারণ উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট ও ঘটনার বিস্তার। নারাচ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট ছিল উনবিংশ শতাব্দীর পরাধীন ভারত, যখন লাতিন আমেরিকার নির্বিচারে পাচার হচ্ছিল অভাগা শ্রমিকরা! নারাচ সে সময়কার শেষ, তারপর থেকে শুরু ‘মগ্ননারাচ ’।
এই উপন্যাসের পটভূমি ভারতের আসাম রাজ্যের চা বাগান। সেখানের দালাল-আড়কাঠির মাধ্যমে, নানা প্রলোভনে দেখিয়ে মানুষ পাচার করা হচ্ছিলো। কী ঘটলো সেইসব হতভাগ্য মানুষের কপালে?
পাশাপাশি এই উপন্যাসে এসেছে ডাঃ কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়ের অক্লান্ত লড়াই, রয়েছেন তাঁর স্বামী দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, গগনচন্দ্র, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, নেপালের রাজপরিবার এবং নবাব ওয়াজেদ আলী শাহর পরবর্তী মুমূর্ষু মেটিয়াবুরুজ। এর সঙ্গে মিশে গেছে ভুবনমণির মতো কাল্পনিক চরিত্ররা, যাঁদের অনেকেই ছিলেন 'নারাচ' উপন্যাসে।
‘মগ্ননারাচ’ কি প্রকৃত অর্থে ‘নারাচ’ উপন্যাসের সিকুয়েল ? কেন এই উপন্যাসের এমন বিচিত্র নাম?
এ বইয়ের পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে এইসব প্রশ্নের উত্তর।
দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের স্বচ্ছন্দ কলমে ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাস
Debarati Mukhopadhyay is presently one of the most popular and celebrated authors of Bengali Literature and a TED Speaker having millions of readers worldwide.
A young Government Officer by profession and awarded with several accolades like Indian Express Devi Award 2022, Tagore Samman, 2022, Literary Star of Bengal etc, she has written 25+ bestselling novels in West Bengal from leading publishing houses. Global publishers like Harper Collins, Rupa Publication have published her English works worldwide.
A no. of novels are already made up into movies starting Nusrat Jahan, Mithun Chakraborty, Dev etc by big production houses like SVF, Eskay etc. Her stories are immensely popular in Sunday Suspense, Storytel etc.
Her Novel ‘Dasgupta Travels’, has been shortlisted for ‘Sahitya Akademi Yuva Pursakar, 2021’.
Her Novel ‘Shikhandi’ created a history when it was acquired for film by SVF within 24 hours of it’s publication. Beside this, she contributes in Bengal’s prominent literary magazines and journals regularly.
She has been selected as Country's only Bengali Literature Faculty for the esteemed Himalayan Writing Retreat.
An excellent orator, Debarati motivates people through her way of positive thinking, voluntarily guides aspirants for Government job preparation in leisure.
She’s a regular speaker in eminent institutions like Ramakrishna Mission and other educational seminars and often considered as youth icon of Bengal. She’s extremely popular in Bengal and having more than 5,00,000+ followers in Social media.
আহা, কী পড়িলাম! মগ্ননারাচ দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের এমন এক উপন্যাস যা কেবল ইতিহাস নয়, এক নিঃশব্দ রক্তপাতের দলিল। এখানে ব্রিটিশ শাসনের দমবন্ধ করা কলকাতা আছে, বিপ্লবীদের গোপন মিটিংঘর, ধুলোমাখা প্রেসের শব্দ, পুলিশের সদর দপ্তরের গন্ধ, আর আছে জেলখানার অন্ধকার সেল যেখানে স্বপ্ন ভেঙে রক্ত ঝরে।
দেবারতি মুখোপাধ্যায় ইতিহাসকে কাগজের নোট নয়, রক্তমাংসের মানুষে রূপ দেন। তাঁর ভাষা এমনই প্রাঞ্জল, যেন আমরা চোখের সামনে দেখি সেই যুবককে যে বোমা বানাতে বানাতে নিজের আদর্শকেও জিজ্ঞাসা করে, সেই মেয়েটিকে যে প্রেমিকের শেষ চিঠি পকেটে নিয়ে থানার দরজায় দাঁড়িয়ে থাকে, সেই চরকে যে দুটো টাকার জন্য বন্ধু বিক্রি করে দেয়, আর সেই পুলিশের বড় বাবুকে যে জানে কিভাবে ‘রক্তে রাজনীতি’ লেখা হয়।
মগ্ননারাচ এমন এক খোদাই করা অস্ত্রের নাম, যা নিজের গায়ে খোঁদল করে রাখে বিপ্লবী আন্দোলনের সমস্ত বেদনা, দ্বন্দ্ব, বিশ্বাসঘাতকতা আর আত্মদহন। এই উপন্যাসে বিপ্লবী আন্দোলন রোম্যান্টিক নয়, গৌরবময়ও নয়—এটা নিষ্ঠুর, নোংরা, অথচ ভয়ঙ্করভাবে মানবিক।
সব চরিত্র ত্রুটিপূর্ণ, বাস্তব। কেউ নিজের গরিব মায়ের মুখ মনে করে থমকে যায়, কেউ পুলিশের মারের কাছে ভেঙে পড়ে, কেউ দেশপ্রেমের নামে রক্তে নেশাগ্রস্ত হয়। ইতিহাসের বইয়ে যাদের নাম নেই, সেই সব হারিয়ে যাওয়া বাঙালিদের রক্ত-ঘাম-কান্না এই উপন্যাসে পাওয়া যায়।
দেবারতির ভাষা সহজ অথচ তীক্ষ্ণ। তিনি শ্লেষ, আবেগ, সংলাপ আর বর্ণনার মধ্য দিয়ে সেই ভয়াবহ সময়কে জীবন্ত করে তোলেন। পাঠক হিসেবে কখনো গায়ে কাঁটা দেয়, কখনো চোখ ভিজে যায়, কখনো নিজের বিশ্বাসকেও প্রশ্ন করতে হয়।
মগ্ননারাচ আসলে এক ট্র্যাজেডি—কারণ এখানে স্বপ্নভঙ্গ অবশ্যম্ভাবী। বিপ্লবী হওয়ার অর্থ বীরত্ব নয়, নিজের মানবিকতা বিসর্জন দেওয়া। আদর্শবাদ আর স্বার্থপরতা এমন সূক্ষ্ম সীমানায় দাঁড়িয়ে থাকে যে কখন সেটি পার হয়ে যায়, তা বোঝা যায় না।
এ বই ইতিহাসপ্রিয় পাঠকের জন্য নয় শুধু। এটি তাদের জন্য, যারা সাহিত্যে খুঁজতে চান সেই শ্বাসরোধ করা বাস্তব, যে বাস্তব হাসায়ও না, সান্ত্বনা দেয়ও না—শুধু বলে, “এই ছিল তোমার পূর্বপুরুষদের কাহিনি। রক্তে লেখা। ভুলে যেও না।”
মগ্ননারাচ বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসের ধারায় এক ক্লাসিক, এক কালজয়ী সংযোজন। সময়ের ওপারে দাঁড়িয়ে এই বই বলবে, ইতিহাস কেবল বিজয়ীর লেখা নয়—হারানো, বিক্রি হয়ে যাওয়া, বেদনায় ভেঙে যাওয়া মানুষেরাও ইতিহাসের শরিক।
এক নিঃশব্দ শ্রদ্ধার্ঘ্য তাঁদের প্রতি, যাদের রক্তে লেখা হয়েছিল দেশের নাম।
একটি যাত্রীবাহী জাহাজ বোঝাই করা কিছু মানুষ এসে নামলেন ডিপোতে। যেখানে একটি ঘরে জন্তু জানোয়ারের থেকেও খারাপ অবস্থায় গাদাগাদি করে থাকবে তারা কিছুদিনের জন্য। তারপর আবার জাহাজ বোঝাই করে এরা চালান হয়ে যাবেন সুদূর ল্যাটিন আমেরিকার কোনো আঁখের ক্ষেতে। তাঁদের ওপর চলবে অকথ্য অত্যাচার ও শোষণ। সেই তথাকথিত ' কুলির ' ভূমিকায় দেখা যায় এক গরীব ব্রাহ্মণ কৃষ্ণসুন্দর ও তাঁর পরিবারকে। কৃষ্ণসুন্দর এবং তাঁর বিধবা ভগ্নী ভুবনমণি হয়ে ওঠেন গল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র।
নারাচের সময়কালে কুলি পাচার হচ্ছিল ল্যাটিন আমেরিকার আঁখের ক্ষেতে। পরে মগ্ননারাচের সময়ে সেই একই ব্যাপার ঘটছিল আসামের চা বাগানে। বরং ল্যাটিন আমেরিকার কুলিদের থেকেও আসামের দুর্ভাগা কর্মীদের দুর্ভাগ্য ফুটিয়ে তোলা হয়েছে আরো জোরালো ভাষায়। শুধুমাত্র কাগজে টিপ সই করিয়ে ক্রীতদাসের মত মানুষকে তুলে নিয়ে যাওয়ায় কাহিনী থেমে থাকেনা। ওদিকে কলকাতায় সমাজ সংস্কারে নিজের জীবন অর্পণ করে দেন দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়, সৌরেন্দ্র, গগনচন্দ্রের মত কিছু ভালো মানুষ। তাঁরা লেখালিখি শুরু করেন সহবাস সম্মতি আইনের পক্ষে, নির্ভীক নারী পত্রিকার মাধ্যমে জাগিয়ে তুলতে চেষ্টা করেন নারীর ভেতর লুকিয়ে থাকা প্রতিভার আগুনকে। তারই মাঝে একজন রক্ত মাংসের নির্ভীক নারীর রূপে কঠোর অনুশাসনের বাঁধা তুচ্ছ করে এগিয়ে যান ভারতের প্রথম practicing lady doctor কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়। ডাক্তারি পাশ করার পরেও একজন ভারতীয় নারীকে ডাক্তার হিসেবে মেনে নিতে পারেনি পরাধীন ভারত ও তার শাসকদল। তাই বিলাতি ডিগ্রি নিয়ে ফিরে এসে সুদূর নেপালে রাজার মায়ের চিকিৎসা করে নিজেকে প্রমাণ করে দেশে ফেরেন তিনি। উল্লেখ্য সেই একই সময়ে আনন্দিবাঈ জোশি নামে আরেক মহীয়সী নারী ডাক্তারি পাশ করেছিলেন কিন্তু তাঁর মৃত্যু হয়েছিল কম বয়সে। তাই প্রথম মহিলা ডাক্তার হিসেবে আমরা পেয়েছি কাদম্বিনী দেবীর নাম। কাদম্বিনী দেবীর এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে স্বামী দ্বারকানাথ ও কন্যা বিধুমুখীর অক্লান্ত পরিশ্রম ও ভালবাসা। সমাজের একাংশ মানুষ কেমন তাঁর সমালোচনা করেছেন, তেমনি পরিবারের এই মানুষগুলোর অবদান অবশ্যই স্মীকৃতির ও প্রশংসার যোগ্য।
নারাচ উপন্যাসটি সংগ্রহে আছে বহুদিন ধরে। এর মধ্যে এই বইটির ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হওয়া খুবই গর্বের বিষয়। কিন্তু আমি শুনেছিলাম যে এর একটা দ্বিতীয় ভাগ আসবে তাই মগ্ননারাচ প্রকাশিত হওয়ার পর একসাথে দুটি বই পড়লাম। আমার মনে হয় যে পাঠক এখনও নারাচ পড়েননি, তিনি এই দুটি বই একসাথে কিনে পড়ুন। খুব ভালো লাগবে।
🔴 পটভূমি : উপন্যাসের প্রেক্ষাপট উনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ শাসিত পরাধীন ভারত এবং আড়কাঠির(দালাল) মাধ্যমে প্রলোভন দেখিয়ে সমাজের প্রান্তিক স্তরের মানুষকে আসামে নিয়ে গিয়ে চা বাগানের কুলিতে পরিণত করার নির্মম ইতিহাস। যেখানে মানুষদেরকে আর মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না তারা শুধু একটা সংখ্যা মাত্র। যাদের কথা অজানায় থেকে যেত যদি না আসামে গিয়ে তাদের দুর্ব্যবস্থার ব্যাপারে কলম ধরতেন ব্রাহ্ম ধর্মের দুই সক্রিয় সদস্য দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী এবং রামকুমার বিদ্যারত্ন। এছাড়াও রয়েছে ভারতবর্ষের শেষ নবাব ওয়াজেদ আলী শাহ এর ১৮৫৬ সালে অযোধ্যা থেকে নির্বাসিত হওয়ার পরে কলকাতার মেটিয়াবুরুজে লখনৌ এর আদলে তার স্বপ্নের ছদ্ম সাম্রাজ্য আনন্দনগরীর প্রতিষ্ঠা। আলিপুর চিড়িয়াখানার জন্ম ১৮৭৬-এ, তার অনেক আগেই নিজস্ব বিশাল চিড়িয়াখানা তৈরি করেন ওয়াজেদ আলি। বর্ণিত হয়েছে নেপাল রাজপ্রাসাদের জাঁকজমকপূর্ণ বিবরণ, যেখানে রাজবাড়ীর মেয়েদের বিচরণ চার দেওয়ালের মধ্যেই সীমিত, জন্মের পর থেকে একমাত্র যাদের কাজ আয়নার সামনে নিজেকে সাজিয়ে তোলা, খোলা আকাশ দেখতে পাওয়া যাদের কাছে ছিল সোনার পাথর বাটির মতো, এমনকি জানলাগুলো পর্যন্ত বন্ধ করে রাখা হতো প্রবল অস্বস্তি হওয়া সত্বেও। মেয়ে মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচতে পারে এমন ধারণা তখনকার দিনে ছিল স্বপ্নের অতীত। প্রতিটা দেশ, সমাজ ব্যতিরেকে মেয়েদের দুরবস্থা বর্ণিত হয়েছে কোথাও ধর্মের নামে, কোথাও সংস্কারের নামে। উপন্যাসে ফুটে উঠেছে আধুনিক বাংলা সমাজের সম্ভবত প্রথম লাভ ম্যারেজ কাপল দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর সমাজ সংস্কার এবং নারী জাতির পুনরুত্থানে একসঙ্গে লড়াইয়ের কাহিনী। সাংসারিক দায়িত্ব সামলে,ডাক্তারি প্র্যাকটিস করে, জাতীয় কংগ্রেসের হয়ে স্বদেশী কাজ করে হাঁপিয়ে ওঠেননি তার স্বামী সব সময় তার ঢাল হয়ে থাকার জন্য।
গল্পে বর্ণিত না থাকলেও পরবর্তীতে তথ্য ঘেঁটে যা জানতে পারলাম - সঞ্জীবনী গুপ্ত সভার সদস্যদের উদ্দীপ্ত করবার জন্য রবীন্দ্রনাথ 'একসূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন' -গান রচনা করেছেন। ১৮৮৭ সালে মাদ্রাজে অনুষ্ঠিত কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে দ্বারকানাথ আসামে কুলিদের প্রতি অকথ্য অত্যাচারের বিস্তারিত বর্ণনা করলেও অবশেষে ১৮৯৬ সালে কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে কুলী সমস্যাকে জাতীয় স্তরের সমস্যার স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কংগ্রেসে দ্বারকানাথ মহিলাদের প্রতিনিধিত্বের দাবি তোলেন। এর ফলস্বরূপ কাদম্বিনী গাঙ্গুলীর নেতৃত্বে ১৮৮৯ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম মহিলারা কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে যোগ দেন।
🔴 চরিত্র পরিচয় : প্রধানত ২-৩ টি প্রবাহে সমান্তরালভাবে বয়ে চলা উপন্যাসের অন্যতম জায়গা জুড়ে রয়েছেন ব্রিটিশ ভারতের প্রথম দুইজন স্নাতকের একজন এবং পাশ্চাত্য চিকিৎসা শাস্ত্রে শিক্ষিত দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম মহিলা চিকিৎসক কাদম্বিনী গাঙ্গুলী। গল্পের অন্যতম শক্তিশালী ঐতিহাসিক চরিত্র, যাকে উদ্দেশ্য করে লেখিকা এই উপন্যাস উৎসর্গ করেছেন তিনি বাংলার সমাজসংস্কারমূলক আন্দোলনের অন্যতম মুখ দ্বারকানাথ গাঙ্গুলী। বিবাহের সময় দ্বারকনাথ কাদম্বরী চেয়ে ১৭ বছরের বড় ছিলেন, তিনি ছিলেন বিপত্নীক, তার প্রথমা স্ত্রী ভবসুন্দরী, কন্যা বিধুমুখী ও পুত্র সতীশচন্দ্র। অস্কার জয়ী পরিচালক সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ তথা আবোল তাবোল স্রষ্টা সুকুমার রায়ের পিতা সে উপেন্দ্রকিশোর রায় ছিলেন বিধুমুখীর স্বামী। এছাড়া কাহিনীর প্রয়োজনে স্বল্প পরিসরে এসেছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যুগ নায়ক স্বামী বিবেকানন্দ, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী, রাজা রামমোহন রায়, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, শিবনাথ শাস্ত্রী, রামকুমার বিদ্যারত্ন প্রমুখ জ্যোতিষ্করা। বর্ণিত হয়েছে নেপালের রাজ পরিবারের কাহিনী, ব্রিটিশ কর্তৃক অযোধ্যার নির্বাসিত নবাব ওয়াজেদ আলী শাহের মৃত্যু পরবর্তী তার হারেমের মহিলাদের করুন কাহিনী। যে কোন ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাসের অগ্রগতির জন্য লেখক কে কিছু শৈল্পিক স্বাধীনতার বশবর্তী হতে হয় যার মধ্যে ঐতিহাসিক তথ্যের নির্ভুলতা বজায় রাখা,ঘটনার কালানুক্রমিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করা, লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্লেষণের স্বাধীনতা ইত্যাদি অন্তর্ভুক্ত। ইতিহাসকে শুধুমাত্র তথ্যের ভান্ডার হিসাবে ব্যবহার না করে নিজস্ব শৈলী ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাকে কল্পনার সাহায্যে ঘটনাগুলিকে আরো আকর্ষণীয় ও জীবন্ত করে তুলতে পারেন, তবে অবশ্যই তা ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে ক্ষুন্ন না করে। ফলশ্রুতিতে গল্পে জায়গা করে নিয়েছে ভুবনমনি, সৌরেন্দ্র, মোতি, ছুটকি, পুটিবালা, লম্বোদরি, কানি, শেফালী, যমুনা প্রমূখ।
🔴 পাঠ প্রতিক্রিয়া : ইতিহাসকে ভয় নয় ভালবাসতে শিখিয়েছিল নারাচ উপন্যাস। অনেক বেশি অনুসন্ধিৎসু করে তুলেছিল পরবর্তী খন্ডের (মগ্ন নারাচ) জন্যে। পাঠক কুলের দীর্ঘ প্রত্যাশা কি পূরণ করতে পারল এই খন্ডটি? ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, পূর্ববর্তী উপন্যাস নারাচ রুদ্ধশ্বাসের মধ্যে দিয়ে যে মাত্রায় শেষ হয়েছিল, এই উপন্যাসটি পড়বার মুহূর্তে সেই উত্তেজনা বিন্দুমাত্র অনুভব করলাম না। লেখিকা তার নিজস্ব স্টাইলে আবার ও কিছু ঐতিহাসিক অজানা তথ্য আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন যা সত্যিই প্রশংসনীয়। পরিচিত হলাম সঞ্জীবনী সভার হামচুপামূহাফ নামক এক গোপন সংকেতের সাথে। সঞ্জীবনী সভার নূতন সদস্যদের দীক্ষাদান হত ঋকমন্ত্রে। বিস্তারিত জানলাম নারীশিক্ষা ছাড়াও ভারতীয় কুলী আন্দোলনে দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের অগ্রণী ভূমিকার ব্যাপারে।
🔴 ভিন্ন আঙ্গিক : সাহিত্যিকদের কলম-ই তাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। বহু প্রবাদপ্রতীম লেখক তাদের সৃষ্ট চরিত্রদের মাধ্যমে সুকৌশলে নিজের জীবনের ঘটনা, মনের ভাব ব্যক্ত করেছেন এবং সমালোচকদের সমুচিন জবাব দিয়েছেন, তা সে কালজয়ী উপন্যাস "শেষের কবিতা" হোক বা "আনন্দমঠ" অথবা"শ্রীকান্ত" - এরকম অনেক উদাহরণ চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অধুনা বর্তমানে আনন্দ পুরস্কার জয়ী প্রিয় সাহিত্যিক স্মরণজিৎ চক্রবর্তী "নীল রোলার ও লাল রোলার" উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে সমালোচকদের মন্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে চরিত্রের মাধ্যমে বলিয়েছেন, "আমি মানুষকে কষ্ট দিতে চাই না। আপনারা কখনও যদি দুর্ঘটনাবশত আমার লেখা পড়ে থাকেন, দেখবেন আমি হাসিখুশি, ভালবাসা আর আনন্দময় মিলনাত্মক গল্পই লিখি। সেই গল্প, যেখানে সবাই খুশি থাকে। যেখানে যে যাকে ভালবাসে তাকে অধিকাংশ সময়ই পেয়ে যায়।" পৃষ্ঠা নং ৮৫ ও ১৪২ এর মধ্যে দিয়ে লেখিকা দেবারতি কি তার সমালোচকদেরও এক হাত নিলেন?
এ সিরিজের আগের বইটা পড়ে বেশ ভালো লেগেছিল। তাই নতুন বইয়ের খবরটা জেনে অপেক্ষায় ছিলাম। আগে থেকেই প্রি অর্ডার করা ছিল। মাস খানেক অপেক্ষায় থাকবার পরে বইটা হাতে পাওয়া মাত্র পড়া শুরু করলাম।
আগের বইয়ে কাহিনি যেখানে শেষ, ঠিক তারপর থেকে নতুন কাহিনির সূচনা হয়েছে। মেটিয়াবুরুজের নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ্ র মৃত্যুর পরে পুরো এলাকায় যেন কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। হুট করে কর্মহীন হয়ে পড়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ। কাজের খোঁজে দিশেহারা লোকজনকে ছলেবলে কৌশলে ভুলিয়ে আসামে সদ্য গড়ে উঠা চা বাগানে শ্রমিক হিসেবে নিয়ে গিয়ে অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা এবারের "মগ্ননারাচ" এর মূল উপজীব্য।
মৌলভীবাজার জেলায় একটা চা বাগানের ঘোরাঘুরি করার অভিজ্ঞতা ছিল আমার। বইটি পড়তে গিয়ে বারংবার সে স্মৃতি মনে পড়ছিল। আসামে সে সময়টাতে চা শ্রমিকদের যে মানবেতর জীবনযাপন ছিল, এখনকার অবস্থা সে তুলনায় খুব একটা উন্নত নয়।
প্রথম কথা হচ্ছে নারাচের মত বই এর সিকুয়াল দরকার ছিলো না, আর যদি আনা হয় সেটা নারাচের মত হতে হইত। এই বইটা পড়ে সেই মজাটা পাইনি কেনো জানি না। নারাচ এ যেমন বুদ হয়ে ছিলাম সেখানে এই বইয়ে মাঝে মাঝে বিরক্ত লেগেছে কিছু কিছু সময়।