সুখের ঠিকানা আবিষ্কার করা বড় সহজ। তবে দুঃখের ভার বহন করা সহজ নয়। সুখের সঙ্গে দীর্ঘকালীন সহাবস্থান ক্লান্তিকর মনে হতে পারে। কিন্তু দুঃখ বহন করার জন্য সমস্ত জীবনও যেন কম পড়ে যায়। আপাতদৃষ্টিতে সুখী দাম্পত্যে আবদ্ধ অরুণাক্ষ ও সঞ্চারিণী। তাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে হঠাৎ আকস্মিক ঘূর্ণিঝঞ্চার মতো হাজির হয় বিবর্তন। সব উড়ে যায় ঝড়ে।
ওলট-পালটের পর আবার শুরু অরুণাক্ষর লড়াই। তারপর?... অবেলায় ভালোবাসার প্রবেশ-প্রস্থান ক্রমে হয়ে ওঠে এক কষ্টকর অনুভূতি। বোবা হৃদয় নিঃশব্দে বলে ওঠে "সেই তো এলে, ভালোবাসা...!"
"কাম ব্যাক বা নতুন শুরুর কোনও এজ লিমিট কোনও বাউন্ডারি হয় না। মনের জোরটাই আসল।"
বৈবাহিক জীবনের জটিলতা আর ঠিক ভুলের হিসেব পার্থিব জগতে চিরকালীন। সভ্যতার যত বয়স বেড়েছে এই সংক্রান্ত জটিলতা আরও বেড়েছে। সমাজ যত আধুনিক হয়েছে, সম্পর্ক তত মলিন হয়েছে। তবে কখনও কখনও কে ঠিক আর কে ভুল এমন অবান্তর তর্কের গোলোকধাঁধায় আঁটকে গেলে প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয় "মানুষ ভুল? নাকি তার বিয়েটা ভুল মানুষের সঙ্গে হয়েছিল?"
সমাজের চোখে অরুণাক্ষ আর সঞ্চারিণীর বৈবাহিক সম্পর্ক ছিল সুন্দর। বাড়ির লোক স্ত্রী কে মেনে না নেওয়ায় একটি ছোট ফ্ল্যাটে অরুণাক্ষ উঠে এসেছিল স্ত্রীর হাত ধরে। সময়ের নিয়মে তাঁদের ঘর আলো করে আসে দুই কন্যা সন্তান- মৃত্তিকা আর মিহিকা। এঁদের আপাত নিস্তরঙ্গ দাম্পত্যে কালবৈশাখী হয়ে আসে বিবর্তন। সমাজের নিয়ম না মনের টান- অন্তিম জয়ের হাসি কে হাসবে তা নিয়েই মূলত এই উপন্যাস।
উপন্যাসের প্রায় প্রতিটি চরিত্রই নিজস্ব স্বকীয়তায় অনন্য। তবে মিহিকা ওরফে মেহুর সঙ্গে কিছু জায়গায় আমি নিজের মিল খুঁজে পেয়েছি। এক জায়গায় মেহু সম্বন্ধে লেখিকা লিখেছেন, "পাঁচ-সাত মিনিটের জন্য একদম চুপ করে যায় মেহু। তারপর আবার স্বাভাবিক জীবনযাপন করে।...বড় হয়ে যাওয়ার পর জীবনের সাতে-পাঁচে জড়িয়ে মেহু বুঝেছে, ওই পাঁচ-সাত মিনিটের মধ্যে একটা আস্ত জীবনের একগুচ্ছ না পাওয়া লুকিয়ে থাকে। ওই না পাওয়াগুলোকে ঘাঁটাতে নেই। ওদের বেশি প্রশ্রয় দিলেই ওরা মাথায় চড়ে বসে।" আমার সাথেও এমনটা হয়। ঐটুকু সময়ে নিজের ভেতরে যে কি ঝড় চলে তা আর কেউ টের পায়না। আমি পেতে দিই না। কিছু অনুভূতি ব্যক্তিগতই থাক।
উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগে অরুণাক্ষর কাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আমায় ভাবিয়েছে, একটু আগে যদি তাঁর এই পরিবর্তন হত, তবে কি জীবন অন্যরকম হত? তারপরেই মনে হয়েছে, সময়ের আগে বোধ হয় কিছুই হয়না। এ প্রসঙ্গে অপূর্বর একটা কথা আমার খুব ভালো লেগেছে- "কিন্তু একটা কথা কি তুই জানিস ভাই? জীবনে এমন কিছু সময় আসে, যখন শুধু বেঁচে থাকাটাই যথেষ্ট মনে হয়। তারপর দ্যাখ না একটু অপেক্ষা করে, সময় তোর জন্য কী ভেবে রেখেছে! এই মুহূর্তে শত চেষ্টা করলেও তুই এর চেয়ে ভালো থাকতে পারবি না অরুণ। কিন্তু কাল পরিস্থিতি তো বদলেও যেতে পারে। এত তাড়াতাড়ি ভেঙে পড়িস না।"
অনুভূতিদের ওঠাপড়া আর সম্পর্কের জটিলতা নিয়েই এই উপন্যাস। যাঁরা সামাজিক ও প্রেম সংক্রান্ত লেখা পড়তে পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য অবশ্য পাঠ্য।
গল্পের শুরু হয় অরুণাক্ষ ও তার স্ত্রীর সুখী দাম্পত্য জীবনের গল্প দিয়ে। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি বোঝা যায়, সুখের আবরণের নীচে কতটা জটিলতা, অপূর্ণতা আর অপেক্ষা লুকিয়ে আছে। লেখিকা এমন একটা সম্পর্কের গল্প বলেন যেখানে ভালোবাসা এসেছে, কিন্তু সেটা এসেছে নিজের সময়ে, নিজের মতো করে যখন অনেক ক্ষত হয়ে গেছে, অনেক কিছু হারিয়ে গেছে।
বইয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী দিক হলো দুই প্রজন্মের দৃষ্টিভঙ্গি। লেখিকা যেভাবে একই ঘটনাকে বিভিন্ন বয়সের চোখ দিয়ে দেখান তা সত্যি দারুণ লেগেছে। প্রেম যখন অবেলায় আসে, তখন তার আগমন যতটা মধুর, তার প্রস্থান ততটাই কষ্টকর। আর সেই কষ্টের মধ্যেও একটা নিঃশব্দ স্বীকারোক্তি থাকে "সেই তো এলে, ভালোবাসা..."
লেখিকার ভাষা খুব সহজ, কিন্তু অনুভূতিতে গভীর। কোনো জোর করে আবেগ ঢোকানো নেই। বিশেষ করে অরুণাক্ষের অভ্যন্তরীণ সংঘাত এবং তার চারপাশের নারী চরিত্রগুলোর মানসিক দ্বন্দ্ব খুব সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
যেটা সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে গেছে, সেটা হলো দুঃখ বহন করার থিমটা। লেখিকা খুব সুন্দর করে দেখিয়েছেন যে, সুখ খুঁজে পাওয়া সহজ, কিন্তু দুঃখকে কাঁধে নিয়ে বেঁচে থাকা কতটা কঠিন। বিশেষ করে বাঙালি মধ্যবিত্ত পরিবারের মানসিকতা, সম্পর্কের ভেতরের অদৃশ্য চাপ, আর প্রজন্মের ব্যবধান- সবকিছু খুব সাবলীলভাবে এসেছে।
যারা এখনো বইটি পড়েননি তারা অবশ্যই বইটি পড়ে দেখবেন। ভীষণ ভালো একটি বই।
সেই তো এলে ভালোবাসা সাথী দাসের সৃষ্টি এক ভিন্ন ধারার প্রেমের কাহিনী। অপ্রেম থেকে প্রেমে উত্তরণের পথ লেখিকা সুনিপুণ ভাবে সৃষ্টি করেছেন তার এই লেখায়। জীবনের ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে মনের গোপন দরজা খুলে ভালোবাসা কে স্বাগত জানানোর সুন্দর এক যাত্রাপথ এই বইটি। প্রথমে মনে হয়েছিল গল্পটা হয়তো সঞ্চারিণীর মাঝপথে মনে হলো বই টা মিড লাইফ ক্রাইসিস ডিল করতে শেখাচ্ছে , সবদিক দিয়ে ভেঙে পড়ার পর উঠে দাঁড়াতে শেখাচ্ছে তারই মাঝে টিনএজ প্রেম এর মিষ্টি খুনশুটি এক দমকা শীতল হাওয়ার মতো মন কে প্রশান্তি দিচ্ছিল। কিন্তু গল্প যত এগোয় সব ইকুয়েশন বদলে যায় ধীরে ধীরে, আপাতভাবে বদল টা সুখকর মনে হলেও দুজনের জীবন পুরো ওলোট পালট হয়ে যায়।
উপন্যাস টা পড়ার বেশ কিছুদিন পর রিভিউ টা লিখতে বসলাম কারণ একটাই মিলির জন্য মন খারাপ, ( যারা পড়েছেন বইটা তারা হয়তো বুঝবেন কেন বলছি) কিন্তু বইটা নিয়ে আরো অনেক কিছু বলা যেতো তাহলে স্পয়লার হয়ে যাবে। আপাতত এটুকুই থাক। গড়পড়তা প্রেমের উপন্যাস পড়ে বোর হয়ে গেলে একবার পড়ে দেখুন এই উপন্যাস।❤️
এই বইটিকে আমি শেষ করেছি জুন মাসে তারপর এতদিন লেগেছে আমার বইটির ব্যাপারে কিছু বলতে কারণ সত্যি কথা বলতে আমি কোন শব্দ খুঁজে পাচ্ছিলাম না বইটিকে বর্ণনা দেওয়ার, সাথী দাসের লেখা যারা পড়েন তারা নিশ্চয়ই জানেন লেখিকা বরাবরই তার কলমে সামাজিকতা তুলে ধরেন, এবার লিখিকা তার কলমে ভালোবাসার এক অন্যরুপ তুলে ধরেছে, লেখিকা কাছের মানুষের জন্য একটা মানুষ কতটা স্বার্থত্যাগ করতে পারে তা দেখিয়েছে আমাদের এবং সবার শেষে বাবা মায়ের জন্য সন্তানরা নিজেদের কিভাবে বিলিয়ে দেয় তা লেখিকা তার স্পষ্ট কলমে তুলে ধরেছেন,তবে আমার একান্তভাবে মনে হয়, বইটির শেষ মিলানন্ত হলে আমি পাঠক হিসাবে খুশি হতাম।