আমাদের চারপাশের জগৎ সত্য না মায়া, এ বহুযুগের দার্শনিক তর্ক। এই প্রশ্ন মাথায় রেখে আমাদের নায়ক, লুবলু একদিন বেরিয়ে পড়ে তার বন্ধু কিমের সঙ্গে। সঙ্গী জুটে যায় লুবলুর বহুদিন আগের এক পুরোনো আলাপী। পথে যেতে যেতে পরিচয় হয় এক সংগীতজ্ঞর সঙ্গে। তারপর নানা ঘটনার ঘনঘটা। নানা অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে জগৎ ও বস্তুবাদের নানা জিজ্ঞাসার মূলে পৌঁছে যায় লুবলু আর পাঠক। এই মূল প্রশ্নের সঙ্গে নানাদিক থেকে এসে মেশে ম্যাজিক রিয়েলিজম, বৌদ্ধদর্শন, নীতিবিদ্যা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও আরও অনেক বিষয়। গভীর দার্শনিক প্রশ্নের সঙ্গতে চলতে থাকে ঝকঝকে রঙিন ইলাস্ট্রেশন।
“একদল মানুষ গুহার ভেতর বন্দি, তারা শুধু সামনের দেয়ালে আগুনের আলোয় তৈরি হওয়া ছায়াগুলোই দেখে। তারা মনে করে ওই ছায়াগুলোই আসল। কিন্তু একজন যখন বাইরে গিয়ে সূর্য দেখে আসে তখন সে বোঝে ছায়াগুলোই ছিল মিথ্যা বা মায়া।”
প্লেটোর এই অতি প্রাচীন ভাবনাটা আজও রিলিভেন্ট। আমরা সিম্যুলেশন কিনা জানি না তবে জগৎটা যা দেখি তা নিঃসন্দেহে আপেক্ষিক। ‘পারসেপচুয়াল ফিল্টার’ হিসেবে আমাদের ব্রেইন আমাদের ঠিক ততটুকুই দেখাচ্ছে যা তার প্রয়োজনীয় মনে হচ্ছে। আমরা ঠিক সম্পূর্ণ বাস্তবের মুখোমুখি হচ্ছি না; আবার তার উপর আমাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি!
সেখানে লুবলু ভাবছে আসলে যা দেখছি তা কি স্বপ্ন, নাকি কোনো দানবের সম্মোহেনী চাদর, না কি আমারা অন্ধকার স্পেসে আছি আর যা কিছু দেখছি তা সম্পূর্ণ মস্তিষ্কপ্রসূত?
‘জগৎ সত্যি না মিথ্যা’ এই ভাবনাটা হয়তো আমাদের সুপ্রতিষ্ঠিত সভ্যতার চেয়েও প্রবীণ। অতি প্রাচীন এই ভাবনাটা আমাদের বেশিরভাগের কাছে কোনো গুরুত্ব রাখে না হয়তো। আজকের যুগে এই প্রশ্নটি ধর্মের পাতা থেকে উঠে এসে ল্যাবরেটরিতে ঢুকেছে। ‘দ্য ম্যাট্রিক্স’ দেখে অনেকেরই এই ভাবনাই সুড়সুড়ি লাগলেও গতিশীল কর্মব্যস্ত জীবনে তার ভ্যালু কতটুকু?
তবুও সমগোত্রীয় আরেকটা প্রশ্ন ‘আমি কে?’ শূন্যবাদ যার তার উত্তর দেয় “আমি’ বলে কিছু নেই। এটি কেবল স্মৃতি, অনুভূতি আর শরীরের এক সাময়িক যোগফল।” একইসাথে জগতের অস্তিত্ব প্রশ্নে বৌদ্ধ দর্শনের এই শাখাটি বলছে “আমরা যাকে ‘বাস্তব’ ভাবছি, তা আসলে মুহূর্তের সমষ্টি মাত্র।”
উত্তরগুলো শুনতে কিছুটা স্বস্তিদায়ক। তবে এই সব প্রশ্নগুলো কাউকে অনবরত অস্বস্তি না দিলে এই স্বস্তি তার জীবনে মূল্যহীন। জগৎ মিথ্যা হোক, মায়া হোক, পর্দা হোক, সিম্যুলেশন, ইলিউশন-ডেলিউশন যাই হোক আমাদের রুটিন পাল্টায় না।
সে যাই হোক এসকল প্রশ্নগুলোই লুবলুকে খুব খোঁচাচ্ছে।
যিশুর সমসাময়িক বিদ্রোহী দার্শনিক গোষ্ঠী নষ্টিকরা আমাদের জগৎকে ঈশ্বরের সৃষ্টি নয় বরং শয়তানের দেখানো বিভ্রম বলে ভেবেছে। আবার আধুনিক বিশ্বে এই নিয়ে সবচেয়ে প্রভাবশালী ফিলোসফার ইমানুয়েল কান্ট অবশ্য জগৎকে আমাদের মস্তিষ্ক আর দৃষ্টিভঙ্গির ভিতর সীমাবদ্ধ করে ফেলেছেন।
মূলত লুবলুর প্রশ্নের ভিতর এই দুই দর্শনের দ্বন্দ্বই সবচেয়ে বেশি উঠৈ এসেছে। আরও বিভিন্ন ফিলোসফি একত্রিত হয়েছে যা ‘লুবলুর পৃথিবীর’ গল্পহীন ছোট্ট এক যাত্রাকে আরও আকর্ষণীয় করেছে।
কমিকস হিসেবে অভিনব নিঃসন্দেহে, সঙ্গে অঙ্কনের প্রশংসা বার বার করার মতো; বার বার খুঁটিনাটি খুটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার এবং ভাববার মতো। তবে আরেকটু গভীরে ডুব দেওয়ার মতো রসদ তেমন ছিল না যেটা প্রত্যাশা ছিল। লেখকের কাছ থেকে আরও ভালো মৌলিক কিছু পাওয়ার প্রত্যাশা রাখি ভবিষ্যতে।
বাংলা কমিক্সে এতো দৃষ্টিনন্দন ও গভীরতাসম্পন্ন অলংকরণ দেখিনি আগে (স্বীকার করে নেওয়া ভালো যে কমিক্স অল্পই পড়া হয়।) লেখক তার চরিত্রদের মাধ্যমে আমাদের অস্তিত্ব আর প্রত্যক্ষণ নিয়ে বিভিন্ন দার্শনিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। লেখা ও আঁকার যুগলবন্দীতে "লুবলুর পৃথিবী" পাঠ হয়ে উঠেছে এক অনন্যসাধারণ অভিজ্ঞতা।
চমৎকার বই। সত্যজিৎ রায় থেকে শুরু করে লুই ক্যারল, এডওয়ার্ড হপার, ভ্যান গঘ, বিটলস এবং আরো অনেককে সূক্ষ্ম ট্রিবিউট দিয়েছেন শিল্পী। অলংকরণের মধ্যে একটা অদ্ভুত eerie ব্যাপার আছে, তা এত নিপুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পারায় শিল্পীর দক্ষতা সত্যিই প্রশংসনীয়। পড়তে পড়তে"Moebius" ( Jean Giraud) মনে পড়ে, বাংলায় এই মুহূর্তে এই বইটি ছাড়া ওই জঁরায় সেভাবে কাজ করছেন, তেমন কেউ জানা নেই, চার্বাক দীপ্তের থেকে সেই আশা রইল ।
লুবলুর পৃথিবী অদ্ভুত। এখানে প্রশ্নেরা ক্রমাগত ভীড় করে। ঠিক কোনটা সত্য আর কোনটা ভ্রম তা নিয়ে অনুসন্ধিৎসা চলতে থাকে। গল্পটা ভালো, তবে মন কেড়ে নেয় রঙিন ইলাস্ট্রেশন। বেশ নজরকাড়া ভঙ্গিতে করা হয়েছে প্রতিটি অধ্যায়ের গল্প। চাইলেই প্রতিটি পাতায় রঙিন মোহনায় ভেসে যাওয়া যায়। তাছাড়া মাঝেমাঝেই মিলে যায় বিভিন্ন শিল্পীদের দেয়া ট্রিবিউট। সব মিলিয়ে পাঠের অভিজ্ঞতা চমৎকার।
কমিক্স বা গ্রাফিক নভেল, যায় বলি, সেই হিসেবে দারুন। কালার কম্বিনেশন থেকে শুরু ছবি গুলো দুর্দান্ত। কিন্তু পড়া শুরু করতেই শেষ হয়ে গেলো, আর কি জানি একটা মিসিং মিসিং লাগছিল। ভাল লেগেছে অনেক।
চমৎকার! খাসা লেখা। আঁকা ভীষন ভালো। কালার গ্রেডিং, ambience সবকিছুই নজরকাড়া। গল্প ফিলোসফি ঘেঁষা। যেসব প্রশ্ন আর বক্তব্য উঠে এসেছে সেগুলোকে পাতি আঁতলামি না। কারণ, দর্শন একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় বিষয়বস্তু। এটাকে নিয়ে এভাবে যে লেখা যায়, সেটা ভাবাটাই চ্যালেঞ্জের। বেশ মজা পেলাম একটা অন্যরকম লেখা পড়ে।
অনেক সুন্দর একটা বাংলা কমিক্স। বাংলায় কমিক্স নতুন করে তেমন ভাবে সেরম শাখা পালা বিস্তার করতে পারেনি। সেই জন্যই এই বইটির জন্য ভীষণ ভাবে উৎসুক ছিলাম। তবে ভালো জিনিস হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেলে একটু খারাপ লাগে বৈকি। আর একটু বড় হলে, আরো মজা লাগতো। ছোটদের জন্য একটু জটিল। কিন্তু বড়বেলায় ছোটবেলার মতোন করে ফিলোসফিকাল মায়া জগতের এই ছোট্টো সফর উল্লেখযোগ্য।
বেদান্ত, বুদ্ধ, রবীন্দ্রনাথ - 'লুবলুর পৃথিবী' বইটি চিরন্তন কিছু দার্শনিক প্রশ্নের উপর আলো ফেলেছে। অস্তিত্ব-অনস্তিত্বের দ্বন্দ্বে ভরা এই জগৎ কি সত্যি নাকি মায়া? সত্যের স্বরূপ কি মানুষ উপলব্ধি করতে পারে কখনো? এই ধরণের কিছু চিন্তাস্রোত বইটি জুড়ে প্রবাহিত। কিন্তু এই জটিল দার্শনিক ভাবনা থাকলেও তার নূন্যতম ভার বইটিতে নেই। লুবলু, কিম, কুনজুম গুলজামাল এবং সিয়াম মাসিকে ঘিরে দৈনন্দিন জীবনের ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে কখনো বাস্তবতাকে পেরিয়ে গিয়ে অপূর্ব দৃশ্যকল্পের বুননে চিন্তাগুলি এসেছে। চার্বাক দীপ্ত নিঃসন্দেহে বাংলা কমিকসের জগতে এই বইটির হাত ধরে বিপ্লবের পথ প্রস্তুত করেছেন।
বরাবরই আমি কমিক্স বই পছন্দ করি। প্রচ্ছদ এবং নাম থেকেই বোঝা যায়, গল্পটি "লুবলু" নামের এক তরুণ বা কিশোরকে কেন্দ্র করে। প্রচ্ছদে তার ঘরের যে অবিন্যস্ত অথচ দারুণ একটা শৈল্পিক পরিবেশ দেখানো হয়েছে—যেখানে বই, গিটার, পুরনো গ্রামোফোন, পিয়ানো, চে গুয়েভারার পোস্টার এবং কম্পিউটারের মনিটরে লেখা "NO INTERNET"—তা আজকের ডিজিটাল যুগের এক অদ্ভুত বাস্তবতাকে ইঙ্গিত করে। ইন্টারনেটহীন এক দুনিয়ায় বা নিজের কল্পনার জগতে লুবলুর অভিযানের এক দারুণ অভিজ্ঞতা ফুটে উঠেছে এই বইয়ে। আপনি যদি চমৎকার আর্টওয়ার্কের সাথে কোনো হালকা চালের অথচ চিন্তার খোরাক জোগানো বাংলা বই পড়তে চান, তবে "লুবলুর পৃথিবী" আপনার সংগ্রহে রাখার মতো একটি বই।
বই এর প্রোডাকশন কোয়ালিটি দারুন। আঁকা দুর্দান্ত। প্যানেল ফ্লো ন্যাচারাল। কিন্তু গল্পটি ঠিক জমলো না। দ্যা ম্যাট্রিক্স এর দুধে যেন লিটার লিটার জল মেশানো হয়েছে। দক্ষিণ কলকাত্তাইয়া হিপস্টার-মার্কা সারফেস লেভেল এর সেমি-আঁতেল ফিলোজোফি পড়তে পড়তে হতাশা ছাড়া আর কিছুই বোধ হচ্ছিল না। প্রকাশকদের বলব, ভালো লেখকদের দিয়ে কমিক্স উপযোগী মৌলিক গল্প লেখান, তারপর এরকম ট্যালেন্টেড আঁকিয়েদের হাতে ধরিয়ে দিন- কমিকসের বাজার কিন্তু পোটেন্ট।
চার্বাক দীপ্তের নাম শুনলে বাঙালি পাঠকের মনে যে স্বস্তি আসে, এবার সেই স্বস্তি মুগ্ধতায় পরিণত হয়েছে তার নতুন গ্রাফিক নভেল 'লুবলুর পৃথিবী'-তে। এই বই কেবল একটি গ্রাফিক নভেল নয়, এটি এক অনন্য অভিজ্ঞতা, যা পাঠককে তার চারপাশের জগতের সত্যতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সবার আগে আসি বইটির অসাধারণ চিত্রায়ণ প্রসঙ্গে। বাংলা কমিকসের জগতে এমন বিশ্বমানের গ্রাফিক্স সত্যিই বিরল। প্রতিটি ফ্রেম, প্রতিটি প্যানেল এমন সূক্ষ্ম ও নিখুঁতভাবে আঁকা হয়েছে যে চোখ ফেরানো দায়। প্রতিটি চরিত্রের আবেগ, প্রতিটি দৃশ্যের আবহ এতো সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে মনে হয় যেন কোনো হলিউড স্টুডিওর কাজ দেখছি। চার্বাকের রঙের ব্যবহার জাদুকরী, যা কাহিনীর প্রতিটি মুহূর্তকে জীবন্ত করে তোলে। তবে 'লুবলুর পৃথিবী'-র আসল জাদু লুকিয়ে আছে তার অভিনব গল্পে। গল্পের নায়ক লুবলু তার বন্ধু কিমকে নিয়ে এমন এক যাত্রা শুরু করে, যা পাঠককে নিয়ে যায় দার্শনিক জিজ্ঞাসার এক গভীর সমুদ্রে। আমাদের চারপাশের জগৎটা কি কেবলই মায়া, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো সত্য—এই প্রশ্নকে কেন্দ্র করে কাহিনীর নানা বাঁক ঘুরতে থাকে। ম্যাজিক রিয়েলিজম, বৌদ্ধ দর্শন, নীতিবিদ্যা এবং ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মতো জটিল বিষয়গুলো অত্যন্ত সাবলীলভাবে মিশে গেছে এই গল্পে। গল্পের গভীর দার্শনিকতা পাঠককে চমকে দেবে, কিন্তু তার থেকেও বেশি মুগ্ধ করবে চার্বাকের গল্প বলার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি গভীর তত্ত্বকে সহজ-সরল ভাষার মাধ্যমে পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। লুবলুর যাত্রা শুধু তার নিজের নয়, বরং পাঠকেরও এক আত্ম-আবিষ্কারের যাত্রা। যদি আপনি বাংলা কমিকসের জগতে এক নতুন দিগন্ত দেখতে চান, যদি আপনি এমন একটি গল্প পড়তে চান যা আপনাকে ভাবাবে এবং একই সাথে ভিজ্যুয়াল সৌন্দর্যে মুগ্ধ করবে, তাহলে 'লুবলুর পৃথিবী' আপনার জন্য অবশ্যপাঠ্য। চার্বাক দীপ্ত প্রমাণ করেছেন যে বাংলা গ্রাফিক নভেল আন্তর্জাতিক মানের হতে পারে, এবং তিনি নিঃসন্দেহে সেই পথপ্রদর্শক। এই বইটি কেবল একটি কমিকস নয়, এটি বাংলা শিল্পের এক নতুন ইতিহাস।
গ্রাফিক নভেল হিসেবে লুবলুর পৃথিবী পড়তে গিয়ে প্রথমেই যেটা মনে হয়, তা হলো এটি কেবল একটি গল্প নয়; বরং একধরনের চিন্তার ভ্রমণ। লুবলু নামের ছেলেটিকে কেন্দ্র করে চারপাশের সাধারণ ঘটনাগুলোকে এমনভাবে দেখানো হয়েছে যে পড়তে পড়তে মনে হয়, আমরা যেটাকে বাস্তব বলে ধরে নিই সেটাই হয়তো পুরো সত্য নয়।
লুবলু খুব বড় কোনো নায়ক নয়, কিন্তু তার প্রশ্ন করার ভঙ্গিটা আলাদা। মানুষের দেখা, বোঝা আর বিশ্বাস, এই তিনটির মাঝের ফাঁকগুলোকে সে যেন আলতো করে তুলে ধরে। গল্পে বড় কোনো নাটকীয়তা নেই, বরং ছোট ছোট মুহূর্ত, কথোপকথন আর পর্য���েক্ষণের মধ্যেই লেখক ধীরে ধীরে একটা দার্শনিক ভাবনা তৈরি করেছেন। পড়তে পড়তে মনে হয়, লুবলুর চোখ দিয়ে আমরা নিজের পৃথিবীকেও নতুনভাবে দেখতে শুরু করছি।
এই বইয়ের আরেকটি বড় শক্তি হলো এর চিত্রণ। রঙিন, প্রাণবন্ত আর কখনো কখনো খানিকটা কৌতুকময় এই আঁকাগুলো গল্পের ভাবনাকে আরও সহজ করে তোলে। ফলে জটিল দার্শনিক প্রশ্নও ভারী লাগে না।
তবে গ্রাফিক নভেল হওয়ায় বইটি খুব দ্রুত পড়ে শেষ হয়ে যায়, এটাই হয়তো একমাত্র আক্ষেপ। কিন্তু শেষ করার পরও লুবলুর করা প্রশ্নগুলো মাথার ভেতর ঘুরতে থাকে।
লুবলুর পৃথিবী এমন একটি বই যা পড়া শেষ হলেও চিন্তার জায়গাটা অনেকক্ষণ খোলা রাখে। .
পূর্ব ভারতের বাসিন্দা লুবলুর মনে পৃথিবী ও আশেপাশের জগৎ সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন। সে দার্শনিকের মতো অস্তিত্ব বা সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন করে। জীবনের কোনো না কোনো সময় আমরাও এমন প্রশ্ন করি বা করেছি। এমন কেন ? এমনটা কি সত্য? এমনটা না হলে কেমন হতো ? অন্যরাও কি এমন টা ভাবছে........ লুবলুর কাছে সন্দেহ হয় আশেপাশের জগৎ কি বিভ্রম ,মায়া না সত্য ,নাকি কারো দেখানো ছবির অংশবিশেষ ? আমরা যেমনটা ভাবছি অন্যেরাও আমাদের সম্পর্কে তাই ভাবে ? লুবলুর ভাবনাচিন্তার মধ্যে এসে পড়ে জাদুবাস্তবতা , বৌদ্ধ দর্শন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ।
চমৎকার একটা কমিকস! জগৎ নিয়ে কিশোর মনের অনুসন্ধান। ছোটবেলার কথা মনে পড়ল। আমিও এমন ভাবতাম। বইয়ে প্লাস্টিক বর্জ্যের প্রতি সচেতনতা বাড়ানো, বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ, ভিন্ন আঙ্গিকে দেখার কৌশল শেখা, কুসংস্কার দূর করা— বেশ ভালোই লাগল।
আচ্ছা আমাকে একটা জিনিস বলুন তো পৃথিবীটা আসলে কি? Does it have its own objective reality or is it a sum total of our overall experiences? কারন তুমি যে রংকে লাল বলে চেনো হয়তো অন্য সভ্যতায় অন্য পরিভাষায় সেটা হয়ে যায় নীল আবার হয়তো অন্য কোন ভাবনায় সেটা হয়ে যেতে পারে সবুজ - কিন্তু আসল সত্যিটা কি আমরা কেউই জানিনা হয়তো বহুবার জানতে চাইও না। Because sometimes people don't want to face certain inconvenient truths - তাই "অজ্ঞতাতেই শান্তি" ইহা বলেই সমাজ চির আরামের শীত ঘুম দেয়।
"সন্ধানে ধান্দায় নবাবে" - এরকমই এক অবস্থায় পড়ে যায় আমাদের এই গল্পের নায়ক লুবলু। সে হয়তো কিছু আতলামির কথা বলে আর মোমো সেবন করে দিন কাটিয়ে দিতে পারত কিন্তু তার মন এইসব প্রশ্ন নিয়ে মগ্ন। আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সেই নানান জায়গায় সন্ধান করে বেড়ায়। যেখানে গাছ হয়তো হয়ে যেতে পারে হাতি, বা হয়তো সেখানে আকাশ Van Goghএর Starry Nightsএর মতো আকা। তা হয়তো সেই পৃথিবীতে অনেক উক্ত লোক ঘুরে বেড়ায় যাকে দেখে কিউবিজমে আঁকা কিছু চরিত্রর কথা মনে পড়ে যেতে পারে। এই পথ চলাটি বড় একাকিত্বের কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে আমাদের গল্পের নায়ক একা নন। তার সঙ্গে আছে আরও তিন জন সঙ্গী যারা তারই মত সত্যের সন্ধান নিজের মতো করে করে চলেছে।
শ্রি চার্বাক দীপ্তর এক গভীর চিন্তা ধারা এই গ্রাফিক নোবেল এর মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যেখানে সময় কাল স্থান পাত্র সবই একটা fluidityর মধ্যে দিয়ে যায় - এই জগতের নিয়ম বড় ছন্নছাড়া আবার হয়তো এরকম ভাবেও বলা যায় এই জগতে নিয়ম ভাঙ্গারই হচ্ছে নিয়ম। ম্যাজিক রিয়ালিজম, অতি বাস্তবতা ও abstractionএ ভরা একটি জগত - যা পড়ার সময় আপনাকে পাঠক হিসেবে বাইরের জগত থেকে একদম ছিন্ন বিছিন্ন করে দেবে। দীপ্ত মহাশয়ের তুলির টান ওর রং এর ব্যবহার আবার এই পাঠককে মন্ত্রমুগ্ধ করে তুলেছে (আর এটা শুধু এই পাঠকের মন্তব্য নয় পৃথিবীর দরবারেও এই চিন্তা ভাবনাটি এই গ্রাফিক নোবেলটি সমাদর পেয়েছে) আর এই মন্ত্রমুগ্ধতার রেশ সে এখনো কাটিয়ে উঠতে পারিনি। বাংলার বুকে বসে এমন সুন্দর কাজ এত দৃষ্টিনন্দন সো গভীর চিন্তাভাবনার প্রতিফলন খুব কম দেখা গেছে। হয়তো এটা শেষ ৯০এর দশকে দেখা গিয়েছিল।
আজকের দিনে যেখানে আমার বয়সী বা আমার থেকে ছোট ছেলেমেয়েরা যারা তথাকথিত Gen Z, তাদেরকে আমি একটাই আবেদন করব একবারটি নিজেদের মোবাইল ফোন থেকে মুখটা তুলুন আর এই পুস্তিকাটি নিজেদের হাতে ধরে দেখুন। সত্যি বলছি আপনাদের। এটা চিরজীবনের সম্বল।।
রেটিং - ৫.৫/৫
পুনশ্চ - সত্যজিৎ রায় (নায়ক - Dream Sequence)ও Eduard Hopperএর (Night Hawks) প্রতি দীপ্ত মশাইএর শ্রদ্ধার্ঘ সত্যি was a cherry 🍒 on top of a cheese cake 🎂)
লুবলুর পৃথিবী হাতে পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পড়িনি, ছোটবেলায় নতুন কমিক্স বই পাওয়ার পর যে উত্তেজনা থাকতো, সেটাই ধরে রাখতে চেয়েছিলাম। প্রথমেই বলতে হয়—বইটির দাম একেবারেই সাধ্যের মধ্যে রাখা হয়েছে। মাত্র ২৯৯ টাকায় এমন একটি বই কীভাবে তৈরি সম্ভব, বুঝে উঠতে পারছি না। গ্রাফিক নভেল এর পোকা হয়েও দামের কারণে অনেক বই কিনতে পারিনা, সেখানে এই বই পাওয়া হাতে চাঁদ পাওয়ার মতন ব্যাপার। এই বইটি আমি অফারে কিনেছি, কিন্তু পুরো দাম দিয়ে কিনতেও একটুও দ্বিধা হতো না। Book Farm কে পাঠকদের কথা ভাবার জন্য অনেক ধন্যবাদ।
এই বই লঞ্চের সময় ট্যাগলাইন ছিল—"এমন কমিক্স বাংলায় আগে পড়েননি", আর সেই দাবি সত্যি, অন্ততঃ আমার তাই মনে হয়েছে। ভিআর, এডভেঞ্চার, স্বপ্ন, সত্য অনুসন্ধান, মোমো থেকে ম্যাজিক—সবই একসাথে জায়গা করে নিয়েছে। কিম, সিয়াম মাসি, গুলজামাল—সব চরিত্রই দারুণ লেগেছে। আশা রাখি ওদের সাথে আবার দেখা হবে। তবে আমার প্রিয় চরিত্র সিয়াম মাসি, হয়তো লুবলুর মতন মোমো আমারও প্রিয় বলেই!
লুবলুর মধ্যে দর্শন আছে, কিন্তু তাকে ভারী করে, জোর করে বোঝানোর কোনো চেষ্টা নেই—এটাই এই বইয়ের অন্যতম গুণ। তাই ছোট থেকে বড়—সব বয়সের পাঠকের কাছেই এটি সহজে পৌঁছাতে পারবে।
ছোটবেলায় ছাদে হাঁটতে হাঁটতে মনে হতো, আমি যেন এক বিশাল টিভির ভেতর দিয়ে হাঁটছি, আর কেউ আমাকে সবসময় দেখছে। লুবলুর পৃথিবী শুরুতেই সেই স্মৃতি ফিরিয়ে আনলো। Charbak Dipta বাবুর অনবদ্য ইলাস্ট্রেশন, সঙ্গে শক্তিশালী কনসেপ্ট, প্রাণবন্ত ও সাবলীল সংলাপ বইটিকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। চরিত্রদের সঙ্গে যেন সরাসরি আলাপ হচ্ছিল।
ছোট-বড় নির্বিশেষে সবাই এই বই উপভোগ করতে পারবে বলেই মনে করি। একেবারে নতুন ধারার এই কাজ উপহার দেওয়ার জন্য এবং বাংলা কমিক্সে এ ধরনের ঘাটতি পূরণ করার জন্য স্রষ্টাদের অনেক ধন্যবাদ। পড়ে ভীষণ আনন্দ পেয়েছি!
আশা করি, আমরা ভবিষ্যতে লুবলুর পৃথিবী-র আনাচকানাচে ঘুরে বেড়ানোর আরও বেশি করে সুযোগ পাবো।
যারা গিটার শেখেন তারা জানেন যে, যখন কোনো ব্যাকিং (Backing) ট্র্যাকে লিকস বাজিয়ে ইম্প্রোভাইজ (Improvise) করতে হয়, তখন শুধু আমাদের কাছে মেজর-মাইনর বা পেন্টাটনিক স্কেলের ৭টা বা ৫টা নোটস থাকে। বাকি আপনি কোন নোটস বাজাবেন বা কোনো ছক ভেঙে অনন্য কোনো নোটস ধার করবেন কি না, সেটা সম্পূর্ণ আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার—পুরো আপনার লিবার্টি।
ঠিক সেই রকম কিছু একটা ফিল হলো চার্বাক দীপ্ত আর বুক ফার্ম থেকে প্রকাশিত "লুবলুর পৃথিবী" পড়ার সময়। আমরা যারা নিহিলিজম (Nihilism)-এ ভুগি, বারবার এই প্রশ্ন মাথায় ঘোরে—সব কিছুর মানে কী? জীবনে কি কোনো মানে আছে? তাদের জন্য এই নভেলটি একদম উপযুক্ত। চার্বাক আমাদের সামনে এই লুবলু চরিত্রটির মাধ্যমে সেই রকম নানান প্রশ্ন তুলে ধরেছেন আর কিছু পারসপেক্টিভ শেয়ার করেছেন, কিন্তু কোনো ডেফিনিট উত্তর দেননি।
বইটির আর্টওয়ার্ক নিয়ে রিভিউ লেখার মতো ক্যাপাবিলিটি আমার আছে বলে মনে হয় না; সেটা না হয় কোনো আর্ট স্কুলের পড়ুয়া বা অঙ্কনশিল্পী দিক। আমি স্পেক্টেটর ভিউ থেকে বলতে পারি, এমন আর্টওয়ার্ক আমি খুব কম দেখেছি। সকাল থেকে ১১-১২ ঘণ্টা অফিস করে, ডেস্কটপ চালিয়ে, ম্যানেজার আর কলিগদের গালমন্দ শুনে যখন চোখ আর মন একটু আরাম চায়, তখন এই আর্টওয়ার্ক সেই মলমের কাজ করে। মনে হয় যেন আমি দীর্ঘদিন কোমায় ছিলাম আর হঠাৎ করে গাছের পাতায় শিশিরবিন্দু দেখছি—ভিতর থেকে একটা আনন্দ ফিল করছি আর মনে হচ্ছে, বাহ! কী সুন্দর লাইফ! আমার কাছে এই আর্টওয়ার্ক অসাধারণ, ভীষণ সুন্দর।
আর কিছু নজরকাড়া দিক: বইটিতে সত্যজিৎ রায়, পি.সি. সরকার, ভ্যান গগ, জন মেয়ারকে রেফারেন্সের মাধ্যমে অনেক ট্রিবিউট (Tribute) দেওয়া হয়েছে। গল্পটা যেন খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গেল, আর একটু বেশি হলে মন্দ হতো না।
চার্বাককে কয়েকটা প্রশ্ন:
১) কেন লুবলু? কেন লাল্টু বা বল্টু নয়? এই নামটার পিছনে ইতিহাস কী? ২) বাঘমামা গাড়ি কেন চালায়? লুবলুর পৃথিবীতে তো সবাই নরমাল, শুধু বাঘমামা কেন সারথি
সত্যি কথা বলতে এই প্রথম কোন বইকে নিয়ে কিছু বলার নেই আমার, কলেজ স্ট্রিটের ছাড়বেলাতে এবার আর যাওয়া হয়নি, তবে এই বইটিকে প্রথম দেখাতেই বেশ পছন্দ হয়েছিল আমার, তখনো জানতাম না বইটির ভেতরে এত মনি মুক্ত আছে, বাজে না বকে কাজের কথা আসা যায়, এই লুবলু হচ্ছে একজন উদাসীন দার্শনিক সে পূর্ব ভারতের একটি ছোট্ট শহরে থাকে, একদিন সে তার বন্ধু কিমের সাথে একটি ম্যাজিক শো দেখার উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয় অন্য শহরে , রাস্তায় যেতে যেতে তার আলাপ হয় এক অদ্ভুত মানুষের সাথে, নিজেকে তিনি সংগীত বিশেষজ্ঞ বলে দাবি করলেও তার সাথে কথা বলার পর বোঝা যায় প্রায় সকল বিষয়ে তার জ্ঞান আছে, এবং বইটির আরেক চরিত্র এবং আমার পুরো বইটির মধ্যে থেকে সবথেকে প্রিয় চরিত্র সিয়াম মাসির সাথে তাদের গন্তব্য পথে দেখা হয় এবং সে তাদের ম্যাজিক শো পর্যন্ত পৌঁছে দেয় এবং তাদের সাথে বসে পুরো শো দেখেন, হঠাৎ করেই চরিত্রকে আমি আমার পছন্দের কেন বললাম তার কারণ গুলো বলি, এই সিয়াম মাছেই উত্তর ভারতের এক ছোট্ট শহরের বাসিন্দা, তিনি চূড়ান্ত ভাবে ডিপ্রেসড হয়ে পড়েছিলেন, এবং সে সময় লুবলু তাকে নানান ভাবে চিন্তাভাবনা করতে শিখিয়েছিল এবং পরবর্তীকালে সে নিজেই জীবনকে গুছিয়ে নিয়ে নিজের মোমো ভ্যানকে সাথে করে ঘুরে বেড়ান। এক কথা শুনে মনে হবে যে, ব্যাস শুধু কতগুলো মানুষ একটা ম্যাজিক শোতে যাবে সেটা নিয়ে পুরো একটি বই, এমন ভাবনার দরকার নেই এই যাত্রাপথের মধ্যে তাদের কথাবার্তায় বা নিজেদের চিন্তা ভাবনায় এমন অনেক কিছু আছে যা আপনাকে ভাবতে বাধ্য করবে, এবং সবার শেষ পেজে ডোডো পাখির যে যে ছবিটি, এক কথায় অসাধারণ,যেমন বইটির কনসেপ্ট তেমনি শিল্পীর অসাধারণ শিল্প, তবে বইটি হাতে নেওয়ার পরে একটা কথাই মাথায় আসছে আমার এরকম কোয়ালিটির একটি কমিকস বই এত কম দামের কি করে বুকফার্ম দিচ্ছে।
গ্রাফিক নভেল আর কমিক্সের মধ্যে কিন্তু পার্থক্য রয়েছে এবং এই বিষয়ে আমি আগেও আলোচনা করেছি, ভবিষ্যতে আবারও করবো। কিন্তু আপাতত এই লুবলুর পৃথিবী নিয়ে এটাই বলব যে, গোটা বই পাড়াতে যে এটা নিয়ে হাইপ তৈরি হয়েছে, এটা সত্যিই তার যোগ্য। সায়েন্স ফ্যান্টাসী জনরা নিয়ে তৈরি হওয়া এই গ্রাফিক নভেলটি নিজের জনরা নিয়ে যেমন সচেতন, তেমনই আবার এটা যাতে পাঠকদের দুর্বোধ্য না লাগে, সেই বিষয়েও হান্ড্রেড পার্সেন্ট সজাগ। হ্যাঁ, ছোট বাচ্চাদের হাতে এই বই অবশ্যই তুলে দিতে পারেন, তারাও নিজেদের মতন বোঝার বুদ্ধি দিয়ে এই গ্রাফিক নভেলটি এঞ্জয় করবে, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর বিষয় গুলি হয়তো বুঝতে পারবে না। সেই দিক থেকে একজন ম্যাচিওর মানুষ, এই কাহিনীকে বেশি এঞ্জয় করবে বলেই আমার মনে হয়েছে। ৮ থেকে ৮০, সমস্ত বইপ্রেমী মানুষকেই আমি এই বইটি হান্ড্রেড পার্শেন্ট রেকমেন্ড করতে চাই। আপনি যদি বইপ্রেমী হন, আর এটাকে কমিক্স বা বাচ্চাদের বই ভেবে দূরে ঠেলে দেন, তাহলে এক অসাধারণ পাঠ অনুভূতি থেকে বঞ্চিত হবেন, সেই গ্যারান্টি আমি দিলাম। তবে একজন পাঠক হিসেবে চার্বাক বাবুর কাছে অনুরোধ করতে চাই, চাইলে এর সিক্যুয়েল চার্বাক বাবু করতেই পারেন, কিন্তু এই কাহিনী পড়ার পর আপনার থেকে একটা বড় এক্সপেক্টেশন কিন্তু তৈরি হয়ে গেছে, তাই পরবর্তী পার্ট যদি আসে, তাহলে সেটা যেন এর যোগ্য উত্তরসুরি হয়, সেই আশাই রাখলাম আপনার কাছে। তার জন্য যদি একটু দেরি হয় হোক। ভালো জিনিস তৈরি হতে তো সময় লাগবেই। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে এর সাধারণ সিক্যুয়েল না আনারই অনুরোধ রইল।
এটায় আমি ৪ দেব শুধু আঁকার আর রঙের ব্যবহারের জন্যে। মূল কাহিনিতে ২/৫ লেখা আঁকা দুইই চার্বাক দীপ্তর, কোলকাতার কলেজ স্ট্রিটের Book Farm থেকে প্রকাশিত ইন্ডিয়ান রুপিতে বইয়ের দাম ২৯৯। বইয়ের পাতা ও ছাপা অত্যন্ত উন্নত মানের, গ্লসি পেপার। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত অন্য অনেক কমিক্স এর কাহিনি এর থেকে অনেক অনেক বেশি আকর্ষণীয়। ঢাকা কমিক্স-এর লুঙ্গিম্যান সিরিজ যেমন।
লুবলুর এই গ্রাফিক্স নভেলে লুবলুর দার্শনিক চিন্তা যে এই পৃথিবীটা আসলে মায়া, আমাদের মস্তিষ্কের কোন ভাবনা নাকি আসলে অন্য জগতের কোন প্রাণির পরীক্ষা সেই সব পুরানো সাইফাই চিন্তাই উঠে এসেছে, তাই পূরনো বুড়ো পাঠক আমার কাহিনির আইডিয়াতে নতুনত্ব কিছু মনে হয়নি। যদিও নতুন কমবয়সী পাঠকদের এই রকম গ্রাফিক নভেলে এই চিন্তাগুলো আকর্ষণ করবে মনে করি। কিন্তু একইদিকে 'অন্ধের হাতি দেখা' কাহিনির চিত্রায়নের নতুনত্ব খুবই সুন্দর ছিলো। কিছু কিছু বিষয়ের খুঁটিনাটি সমস্যা আছে, যেমন ভারতের পূর্বের কোন শহর থেকে তাজমহলের আগ্রায় যেতে ট্রেনে প্রায় দেড় দিন লাগার কথা, অটো চালক বাঘ কি শুধু লুবলুর কল্পনাতেই? বা ম্যাজিকশো-এর টিকেটটা কখন কাটা হলো...
যাই হোক, আঁকা আর ছাপার মানের জন্যেই ৪ এতে। দুই একটা বিষয় অনেক বেশি অন্য আইডিয়া দিয়ে প্রভাবিত, যেমন সত্যজিতের 'নায়ক'-এ উত্তম কুমারের টাকার পাহাড়ে ডুবে যাওয়ার সিন, বা সর্বশেষে Beatles এর বিখ্যাত জেব্রা ক্রসিং পোস্টার।
লুবলুর পৃথিবী একটি ছোট হলেও অত্যন্ত আকর্ষণীয় গ্রাফিক নভেল। গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে লুবলু, পূর্ব ভারতের এক কিশোর, যে জীবনের গভীর দার্শনিক প্রশ্নগুলি নিয়ে ভাবতে ভালোবাসে এবং পৃথিবী ও বাস্তবতার নানা রহস্যের উত্তর খুঁজে বেড়ায়। তার বন্ধু কিমকে সঙ্গে নিয়ে সে একটি ম্যাজিক শো দেখতে বের হয়, আর সেই যাত্রাপথে পরিচয় হয় নানান বর্ণময় ও স্মরণীয় চরিত্রের সঙ্গে।
রঙিন চিত্রণ এবং আপাতদৃষ্টিতে সহজ-সরল কাহিনির আড়ালে বইটি দর্শন, নৈতিকতা, ম্যাজিক্যাল রিয়ালিজম এবং বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে নানা চিন্তার খোরাক জোগায়। গভীর বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করলেও গল্পটি কখনও গম্ভীর বা ভারী হয়ে ওঠে না; বরং কৌতূহল ও বিস্ময়ের আবহ বজায় রাখে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত।
এই গ্রাফিক নভেলের সবচেয়ে বড় শক্তি নিঃসন্দেহে চার্বাক দীপ্তর শিল্পকর্ম। অসাধারণ চিত্রণ, সূক্ষ্ম বিবরণ এবং সৃজনশীল ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনা বইটিকে এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। এখন পর্যন্ত আমার পড়া বাংলা কমিকস ও গ্রাফিক নভেলগুলির মধ্যে বিষয়বস্তু এবং উপস্থাপনার দিক থেকে এটি নিঃসন্দেহে এক ভিন্নধর্মী ও সাহসী প্রয়াস। সেই কারণেই বইটি আলাদা করে প্রশংসার দাবিদার এবং অবশ্যই পড়ে দেখার মতো।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা ভালো, রঙিন চিত্রণ দেখে এটি শিশুদের বই বলে মনে হলেও, লুবলুর পৃথিবী মূলত প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকদের জন্যই বেশি উপভোগ্য। এর দার্শনিক ভাবনা ও অন্তর্নিহিত প্রশ্নগুলি ছোটদের কাছে ততটা আকর্ষণীয় নাও লাগতে পারে|
“লুবলুর পৃথিবী” এক অসাধারণ দার্শনিক কমিকস, যেখানে লেখক খুব অল্প কয়েকটি পৃষ্ঠার মধ্যেই মানবজগতের অস্তিত্ব, মায়া ও বাস্তবতার প্রকৃতি নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছেন। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র লুবলু একজন চিন্তাশীল দার্শনিক, যে বিশ্বাস করে আমরা যা দেখি তা-ই বাস্তব নয়—বরং আমাদের চোখের সামনে কেউ এক ভ্রান্তির পর্দা টেনে দিয়েছে। তার সঙ্গে আছে কিম, কুনজুম গুলজামাল ও সিয়াম মাসি—ভারতের চার প্রান্ত থেকে আসা চারটি স্বতন্ত্র চরিত্র, যাদের কথোপকথনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে গল্পটি দর্শন, বাস্তববাদ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মিশেলে গভীর হয়ে ওঠে। বইটির detailed আর্টওয়ার্ক পুরো অভিজ্ঞতাটিকে আরও সমৃদ্ধ করে তুলেছে; প্রচুর পপ কালচার রেফারেন্স আছে গোটা বই টা জুড়ে । লেখক সরাসরি না বলেও আর্টওয়ার্ক এর মাধ্যমে অনেক কিছু প্রকাশ করেছেন, যা পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে—আমরা কি সত্যিই বাস্তব জগতে বাস করছি, নাকি কেবল মায়ার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি? আমি বইটি এক সিটিং এ শেষ করে ফেলেছি এবং আমি পরবর্তী পার্টের জন্যে মুখিয়ে রয়েছি। বই টি অবশ্যই সংগ্রহে রাখার মত এবং worth The Hype!
🌁লুবলু,একজন উদাসীন দার্শনিক।সে পূর্ব ভারতের এক ছোট শহরে থাকে। অসীম চিন্তনিশক্তি তার। একদিন সে তার বন্ধু কিমের সঙ্গে ম্যাজিক দেখতে বেরোয়।পথে তার আলাপ তার পূর্ব পরিচিত সিয়াম মাসি এবং এক খ্যাপাটে সঙ্গীতজ্ঞের সঙ্গে। 🌬️আচ্ছা আমরা যেটাকে পৃথিবী ভাবি আদৌ কি সেটা পৃথিবী?এই যে গাছপালা, প্রাণী,এগুলোকে আমরা এই নামে না ডেকে অন্য নামে ডাকি না কেন?কোন এক বস্তুকে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলে একেক জন একেক রকম ভাবে দেখি কেন?যদি এমন হতো,আমরা কোন এক জড় বস্তুর মাধ্যমেই আমাদের স্বপ্নের কোন ঠিকানায় পৌঁছে যেতে পারতাম!কেমন হত তাহলে? 🎏❝লুবলুর পৃথিবী❞ আমাদের বেশ কিছু দৃঢ় সত্য কথা আমাদের সামনে তুলে ধরে, আর লুবলু শুধু একজন দার্শনিকই নয়,গভীর ভাবানুরসিক একটি ছেলে। যার কাজ আমাদের এই সমাজ,আমাদের সবার দৃষ্টিভঙ্গিকে একটু ভাবতে শেখানো 🤩।
📗বই~লুবলুর পৃথিবী 🎨প্রচ্ছদ,কাহিনী,চিত্রনাট্য ও ছবি~চার্বাক দীপ্ত 🖨️প্রকাশক~বুকফার্ম 💷মুদ্রিত মূল্য~২৯৯/-
আসলে কোনও কাহিনী নেই, বা হয়তো আছে, সেটা কাহিনীর স্পর্শে বেড়ে ওঠা কিছু চিন্তা ভাবনা, মস্তিষ্কের এক্সারসাইজ। সে ভাবনা গুলোর গভীরতা কি ছুঁয়ে যায় পাঠকের মজ্জাকে? নির্ভর করে পাঠকের ওপরেই।
সোফিস ওয়ার্ল্ড পড়া থাকলে এই বই হয়তো একটু লঘু মনে হতে পারে, কিন্তু পড়তে ভালো লাগে। কারণ খামখেয়ালী চরিত্র, দৃশ্যপট, পেইন্টিং এর সরাসরি প্রয়োগ (অনুপ্রেরণা) এবং এক ধরনের স্বপ্ন জগৎ এর ব্যবহার কাহিনীকে এগিয়ে নিয়ে চলে।
তবে লেখককে পরবর্তীতে সাবধান থাকা প্রয়োজন। লুবলু, কিম, সিয়াম, কুনজুম - এঁরা প্রায়শই স্টিরিওটাইপের আশপাশ দিয়ে হেঁটে যান, যদিও তাদের খামখেয়ালী করে তোলার একটা চেষ্টা রয়েছে। তবে তারা খুবই প্রেডিক্টেবল হয়ে পড়ে অনেক ক্ষেত্রে।
বাংলা ভাষায় এরকম কাজ কম, সেক্ষেত্রে বইটি একবার পড়ে দেখা যেতেই পারে।
ইংরেজিতে একটা কথা আছে “right place right time”, পড়াশোনার খাতিরে এবং খানিকটা নিজের তাগিদেই ইদানিং বিভিন্ন ঘরানার দার��শনিক ম���বাদ নিয়ে পড়াশোনা করছিলাম ঠিক সেরকম সময়েই হাতে এসে গেল চার্বাক দীপ্তের মনমুগ্ধ করা এই কাজ। আর্টওয়ার্ক নিয়ে সত্যি বলতে আমার আলাদা করে কোনও কিছুই বলার নেই, এতটাই ভালো কাজ। ম্যাজিক রিয়েলিজম থেকে শুরু করে বৌদ্ধ দর্শন, ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, মায়াবাদ সাথে সিমুলেশন হাইপোথিসিস দুর্দান্তভাবে খাপ খেয়ে গিয়েছে এই গ্রাফিক নভেলায়। দর্শনের মত তাত্ত্বিক জটিল বিষয়গুলো বেশ সহজ, সরল ও সাবলীল ভঙ্গিতেই ব্যাখ্যা করেছেন লেখক।
অবশেষে পড়লাম। নাহ, পড়ে ফেললাম বলবো না, কারণ এই বই শুধুমাত্র 'ফিনিশ' করার জিনিস নয়, বরং এই বই ভাবায়। জীবন-দর্শনের চিরন্তন কিছু প্রশ্ন - সত্য কি? জগিত কি আর এর অস্তিত্বই কোথায়? কোনটা ম্যাজিক, কোনটা বাস্তব, আর কোনটা 'ভার্চুয়াল' রিয়ালিটি? এরকম সব গভীর প্রশ্ন নিয়েই লুবলুর কাহিনী এগোয়, কিন্তু তা একদমই বোরিং বা ভারী নয় - বরং খুব রঙিন এবং উপভোগ্য এক যাত্রা। চার্বাক দীপ্তর সৃষ্টির সাথে এই প্রথম পরিচয়, আর প্রথম পরিচয়েই মুগ্ধ হলাম! আপনি যদি নিছক বিনোদন নয়, বরং বই পড়ে (অথবা না পড়েও) জীবনদর্শন নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন তবে এই বই আপনার জন্য। লুবলুর পৃথিবীতে আপনাকে স্বাগত...
একটি অসাধারণ চিত্রাঙ্কন সহ গ্রাফিক নভেল। ছাপা ও খুব ভালো। এটিতে বেশ কিছু দার্শনিক প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে, যেমন আমরা যেগুলো দেখছি আমাদের চারপাশে সেগুলি কি বাকি আর কেউ একইরকম ভাবে দেখছে। আমাদের পৃথিবী কি আসলেই আছে না তা এক মায়ার খেলা ইত্যাদি। এত সুন্দর চিত্রাঙ্কন আমি আগে মৌলিক বাংলা কমিক্সে দেখিনি। সেদিক থেকে লেখকের সাধুবাদ প্রাপ্য। আরও অনেক কমিকস ও গ্রাফিক নভেল আগামী দিনে ওনার হাত থেকে দেখতে পাবো আশা রাখি।