নিষাদ: সোশ্যাল নভেল ডিসগাইজড অ্যাজ ক্রাইম
পিয়া সরকারের কলম থেকে উঠে আসা 'নিষাদ'—এই নামটি শুধু একটি উপন্যাসের শিরোনাম নয়, বরং সমাজের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক অমীমাংসিত প্রশ্নের প্রতীক। মহাভারতের নিষাদরাজের মতো, যিনি সত্যের সন্ধানে নিজেকে বিসর্জন দেন, এই গ্রন্থটিও অপরাধের জটিল জালে জড়িয়ে পড়ে মানুষের মনের অন্ধকারকে উন্মোচিত করে। এস আই দর্শনা বোস সিরিজের তৃতীয় উপন্যাস এটি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে অন্তরীপ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত এই ৩৫০ পৃষ্ঠার বইটি (মূল্য ৪৫০ টাকা) শুধু একটি পুলিশ প্রসিডিউরাল নয়, বরং একটি সামাজিক দর্পণ, যা পড়তে পড়তে আপনার হৃদয়কে নাড়া দেবে এবং মনকে চিন্তায় মগ্ন করে ফেলবে।
গল্পের সূত্র: পুরুলিয়া থেকে কলকাতার অন্ধকার গলিতে
পুরুলিয়ার ধুলোমাখা রাস্তা থেকে শুরু হয়ে কলকাতার গড়িয়াহাটের চকচকে আলোয় পৌঁছে যাওয়া এক তদন্তের যাত্রা। 'নিষাদ' শুরু হয় দু'টি পরপর খুনের রহস্য দিয়ে—একটি কলকাতা পুলিশের এলাকায়, অন্যটি রাজ্য পুলিশের। আপাতভাবে এগুলো সাধারণ অপরাধ মনে হলেও, তদন্তের গভীরে নামতেই উন্মোচিত হয় অবিশ্বাসের জাল, প্রতারণার ছায়া এবং ৩০ বছরের পুরোনো এক অমীমাংসিত কেসের স্মৃতি। চুমকি নামের এক তরুণী গৃহপরিচারিকার খুন থেকে শুরু হয় সব, যার সাথে জড়িয়ে পড়ে তার বয়ফ্রেন্ড সাগর, প্রমোটার মেহতা, এবং এক অজানা ধূর্ত প্রতিপক্ষের ছায়া।
পুলিশের জুরিস্ডিকশনের জটিলতা, ব্ল্যাকমেলিংয়ের চক্র এবং সমাজের নিম্ন-উচ্চ স্তরের মানুষের জড়িত থাকা—এসব মিলিয়ে গল্পটি একটি স্লো-বার্ন থ্রিলারে রূপ নেয়, যেখানে প্রত্যেক পাতায় লুকিয়ে থাকে একটি নতুন টুইস্ট। কিন্তু স্পয়লার এড়িয়ে বলি, এটি শুধু খুনের রহস্য নয়; এটি একটি মানবিক গল্প, যা অপরাধের আড়ালে লুকিয়ে থাকা সমাজের বিকৃত প্রবৃত্তিকে তুলে ধরে। পড়তে পড়তে মনে হয়, কলকাতার ব্যস্ততার মাঝে এমন কতগুলো গল্প চলছে, যা আমরা দেখেও দেখি না।
চরিত্রের জগৎ: সাধারণ মানুষের অসাধারণ যাত্রা
উপন্যাসটির সবচেয়ে মায়াময় দিক হলো চরিত্র গঠন। মূল চরিত্র এস আই দর্শনা বোস—একজন সাধারণ পুলিশ অফিসার, যিনি পুরুলিয়ায় পোস্টেড, কিন্তু কলকাতার তদন্তে জড়িয়ে পড়েন। তাঁর মানসিক টানাপোড়েন, উত্থান-পতন এবং ভিকটিমের প্রতি সহানুভূতি এতটাই বাস্তব যে, তিনি সুপারহিরো নন, বরং আমাদের মতোই একজন মানুষ—যিনি দায়িত্বের ভারে ক্লান্ত হয়েও সত্যের পেছনে ছুটছেন। এবারের গল্পে দর্শনার ব্যক্তিগত জীবন কিছুটা পটভূমিতে সরে গেলেও, তাঁর অনুসন্ধানী মনের তীব্রতা পাঠককে আরও কাছে টেনে নেয়।
পার্শ্বচরিত্ররা যেন সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রতিনিধি: চুমকি এবং সাগরের মতো নিম্নবিত্ত যুবক-যুবতী, যাদের স্বপ্নগুলো অপরাধের ছায়ায় ম্লান হয়; বিজনের মতো কলকাতা পুলিশের কর্মকর্তা, যিনি ব্যবস্থার জটিলতায় আটকে পড়েন; এবং উচ্চবিত্ত প্রমোটার মেহতার মতো চরিত্র, যারা ক্ষমতার অপব্যবহার করে। কানাই, স্নিগ্ধা, টুম্পা বা সাকিবের মতো সাইড চরিত্রগুলির নিজস্ব আর্ক আছে—যেমন একজন ইউটিউবারের মাধ্যমে সমাজের স্টিগমা বা একজন দরোয়ানের প্রতিবাদের ছায়া। এরা শুধু গল্পের স্তূপ নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন অংশকে প্রতিফলিত করে, যা পড়তে পড়তে আপনাকে নিজের চারপাশের মানুষদের স্মরণ করিয়ে দেয়।
অপরাধের চেয়ে অপরাধীর মন বেশি ভয়াবহ
'নিষাদ' শুধু থ্রিলার নয়, এটি একটি সামাজিক প্রশ্নপত্র। মূল থিম হলো—অপরাধ না অপরাধী, কে বেশি ঘৃণ্য? গল্পের মাধ্যমে উঠে আসে ড্রাগ পেডলিং, পেডোফিলিয়া, নৃশংস যৌন অত্যাচার, ব্ল্যাকমেলিং এবং মানসিক অসুস্থতার উপেক্ষার মতো সমস্যা। এগুলো শুধু ঘটনা হিসেবে নয়, বরং সমাজের অন্ধকার দিকের দর্পণ—যেখানে উচ্চবিত্তের কামনা এবং নিম্নবিত্তের হতাশা মিলে এক বিষাক্ত চক্র তৈরি করে। পুলিশ প্রসিডিউরালের বাস্তবতা—ময়নাতদন্ত থেকে জুরিস্ডিকশনের ঝামেলা—এতটাই গবেষণা-ভিত্তিক যে, মনে হয় লেখিকা নিজেই তদন্তে অংশ নিয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে মনোজ্ঞ অংশ হলো মানবিকতার স্পর্শ: শিশু-নারী শোষণের পেছনে পারিবারিক সম্মানের অন্ধতা বা আইনের ফাঁকফোকর কীভাবে সমাজকে খায়—এসব নিয়ে লেখিকা যেন এক অদৃশ্য আয়না ধরে দিয়েছেন।
ব্যাক্তিগত ভাবে গল্পের বেশ কয়েকটি তাত্ত্বিক স্তর রয়েছে বলে মনে হয় —সামাজিক, মানসিক, ন্যারেটিভ এবং নৈতিক। সেই বিষয়ে কিঞ্চিৎ আলোচনা করলাম।
তাত্ত্বিক থিম: সমাজ, অপরাধ এবং মানব মনের অন্ধকার।
'নিষাদ'-এর কেন্দ্রীয় থিম হলো সমাজের অন্ধকার দিক—যা অপরাধের মাধ্যমে উন্মোচিত হয়। তাত্ত্বিকভাবে, এটি সম্ভবত ফুকোর 'পাওয়ার-নলেজ' ধারণার সাথে যুক্ত। অপরাধ কীভাবে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ফল? উপন্যাসে ড্রাগ পেডলিং, পেডোফিলিয়া, নৃশংস যৌন অত্যাচার এবং ব্ল্যাকমেলিং-এর মতো উপাদানগুলো শুধু প্লট ডিভাইস নয়, বরং সমাজের বিকৃত প্রবৃত্তির প্রতীক। নিম্নবিত্তের স্লাম থেকে উচ্চবিত্তের হাই-রাইজ পর্যন্ত, অপরাধ সব স্তরে ছড়িয়ে আছে, যা দেখায় কীভাবে 'সভ্য' সমাজের অন্ধতা (যেমন পারিবারিক সম্মানের নামে মানসিক অসুস্থতার উপেক্ষা) ভিকটিমদের নীরব করে। এটি সামাজিক থিয়োরির দৃষ্টিকোণ থেকে একটি সমালোচনা: শিক্ষিত অভিজাতের হিপোক্রেসি এবং সিস্টেমের ফাঁকফোকর কীভাবে শিশু-নারী শোষণকে প্রশ্রয় দেয়।
মানসিক তাত্ত্বিক স্তরে, উপন্যাসটি ফ্রয়েডিয়ান 'রিপ্রেসড ডিজায়ার'-এর ধারণা অনুসরণ করে বলে মনে হয়েছে । চরিত্রগুলোর মনে লুকিয়ে থাকা পরিত্যক্ত কামনা, কৈশোরের চাপ এবং নৈতিক অস্পষ্টতা—এইসব অপরাধের উৎস। সাধারণ মানুষের মধ্যে লুকিয়ে থাকা নৃশংসতা, যা তারা নিজেরাই উপলব্ধি করে না, এটি একটি সাইকোলজিক্যাল থ্রিলারে রূপ নেয়। দর্শনা বোসের চরিত্র এখানে কেন্দ্রীয়, তাঁর মানসিক চাপ, ভিকটিমের প্রতি সহানুভূতি এবং পেশাগত চ্যালেঞ্জ (যেমন মিসোজিনি এবং ভিকটিম-ব্লেমিং) তাঁকে একটি রিয়ালিস্টিক প্রোটাগোনিস্ট করে তুলেছে ।
দর্শনার মানসিক উত্থান-পতন, ফুকোর 'সাবজেক্টিভিটি' দেখায় —কীভাবে সামাজিক ব্যবস্থা একজন ব্যক্তিকে গঠন করে এবং ভাঙে।
পার্শ্বচরিত্ররা—যেমন প্রমিত (উচ্চবিত্ত), গোবিন্দ নস্কর (নিম্নবিত্ত, সামাজিক স্টিগমা-যুক্ত), ইউটিউবার (সমাজের এক অংশের প্রতিনিধি, প্রতিবাদী) এবং দরোয়ান—সমাজের ডেমোগ্রাফিক রিপ্রেজেন্টেশন করে। এরা শুধু সাসপেক্ট নয়, বরং সমাজের বিভিন্ন স্তরের আর্ক বহন করে, যা সেট থিয়োরির মতো ওভারল্যাপ করে গল্পকে জটিল করেছে। কিছু ক্ষেত্রে স্লো মনে হয় বটে, কিন্তু খুঁটিয়ে দেখলে বেশ ইন্টারেস্টিং।
টু সামারাইজ উপন্যাসের তাত্ত্বিক কাঠামো ট্র্যাডিশনাল ডিটেকটিভ স্টোরির কাঠামোকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করেছে বলে মনে হয়েছে।
লেখনীশৈলী: ধারালো এবং হাস্যরসের ছোঁয়া, সহজ, সাবলীল ভাষায় লেখা, কিন্তু প্রত্যেকটি বাক্যে গবেষণার এবং পরিশ্রমের ছাপ। সংলাপগুলো বুদ্ধিদীপ্ত, মেটাফরগুলো কলকাতার রাস্তার মতো জীবন্ত। হাস্যরসের ছোঁয়া—যেমন পুলিশের অভ্যন্তরীণ কথোপকথন—গম্ভীর থিমের মাঝে স্বস্তির নিশ্বাস দেয়, কোনো আলাদা কমিক চরিত্র ছাড়াই। প্রচ্ছদের সৌন্দর্য এবং প্রিন্ট কোয়ালিটি বইটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। সামগ্রিকভাবে, এটি সামাজিক থিওরি এবং রহস্যকে মিশিয়ে এক অসাধারণ স্বাদ দেয়।
যদি আপনি শুধু রহস্য চান, তাহলে 'নিষাদ' আপনাকে রুদ্ধশ্বাস রাখবে; কিন্তু যদি সমাজের সত্যিকারের ছবি দেখতে চান, তাহলে এটি আপনার হৃদয় ছুঁয়ে যাবে।বইটি পড়ে শেষ করলে মনে হয়, অপরাধের জাল ছিঁড়ে ফেলার জন্য শুধু পুলিশ নয়, আমরা সকলেই দায়ী। কারণ 'নিষাদ' শুধু বই নয়, একটি যাত্রা—সত্যের সন্ধানে।