বাসাটার সামনে এসেই থমকে গেলাম। কীভাবে ঢোকা উচিৎ বুঝতে পারছি না। আমার পায়ে বার্মিজ সেন্ডেল। কালো রঙের। বহুল ব্যবহারে চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। তলার খাঁজকাটা অংশটুকু পীচ ঢালা পথের অত্যাচারে টাইলস করা মেঝের মতই মসৃণ। বৃষ্টির দিনে হাঁটতে গেলে সীমান্তের “নো ম্যানস ল্যান্ড“-এ হাঁটার মত অনুভূতি চলে আসে। বুড়ো আঙ্গুলে দেহের সব ভার চাপিয়ে দিয়ে পা টিপে টিপে এগোতে হয়। যেন এক্ষুণি বিএসএফ গুলী শুরু করবে! আমি জহির সাহেবের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে দেখতে পাচ্ছি বাড়িতে ঢোকার দরজার পাশেই একটা জুতোর র্যাক রাখা। আমি পড়ে গেলাম ঝামেলায়। আমার সেন্ডেল ওই র্যাকে শোভা পায় কিনা বুঝতে পারছি না। না পাবারই কথা। এইমুহুর্তে র্যাকে যে জুতোগুলো দেখতে পাচ্ছি, আমার তো ধারণা এগুলো বেঁচেই আমার বার্মিজ সেন্ডেলের একটা ফ্যাক্টরি দেয়া সম্ভব! এদিকে এত ধনী মানুষের বাড়ির বাইরে সেন্ডেল রেখে গেলেও খারাপ দেখায়। শিষ্টাচার বহির্ভূত। তাছাড়া আমার পর কেউ এসে ছাল ওঠা কুকুরের মত সেন্ডেল জোড়া দেখে ভেবে বসতে পারে এগুলো বোধহয় জহির সাহেবই পায়ে দেন! ভদ্রলোক আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন, তাকে এভাবে অপমান করাটা ঠিক হবে না বোধহয়। র্যাকে সেন্ডেল রাখার ক্ষেত্রে আরেকটা ছোট্ট সমস্যাও আছে। বারান্দার মেঝেতে মসৃণ টাইলস লাগানো। অনেক দামী টাইলস, দেখেই বোঝা যায়। এমন সুন্দর টাইলস মাড়িয়ে জুতো রাখার র্যাকের কাছে যেতেও মায়া লাগে। জুতোর র্যাকটা বাইরে রাখা উচিৎ ছিল। তবে আমার বুদ্ধিতে তো আর বড়লোকরা চলেন না। তারা চলেন তাদের বুদ্ধিতে। আরেকটা কাজ অবশ্য করা যায়, এবং আমি সেটাই করলাম। সেন্ডেল পায়ে দিয়েই সোজা ড্রয়িংরুমে ঢুকে পড়লাম। কেন করলাম কাজটা? দেখবেন, মাঝে মধ্যে অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাজ করতে ইচ্ছে করে। উদাহরণ দেয়া যাক। ধরুন, আপনি দশতলা বিল্ডিং এর ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন। একেবারে রেলিং ঘেষে। একবার নীচে উঁকি দিন। কি মনে হচ্ছে না, লাফ দিতে পারলে মন্দ হয় না?! কিংবা ধরা যাক, আপনি বাসে বসে আছেন। আপনার সামনের সিটে যে বসেছে তার মাথায় একটা চকচকে টাক। বিশাল। সিটের উপর দিয়ে শুধু টাকটাই দেখা যাচ্ছে। জানালার কাচে রোদ প্রতিফলিত হয়ে সেই টাকে পড়ছে, সেখান থেকে আবার প্রতিফলিত হয়ে আপনার মুখ আলোকিত হচ্ছে! কি ইচ্ছে করবে না, টাকে মোলায়েম করে হাত বুলিয়ে দিতে?! কিন্তু এরকম করা হয় না কখনও। কারণ এই কাজগুলো করতে প্রচন্ড সাহসের দরকার হয়। সাহসও না ঠিক, দুঃসাহস। এরকম দুঃসাহস সাধারণত মানুষকে দেয়া হয় না। তাহলে পুরো পৃথিবীটা উলট-পালট হয়ে যেত। তৈরি হত প্রচন্ড বিশৃঙ্খলা। যেমন ধরা যাক, আপনি আর আপনার স্ত্রী রাতের বেলা ছাদে হাঁটাহাঁটি করছেন। আকাশে গোল একটা চাঁদ। চাঁদের আশেপাশে উজ্জ্বল চন্দ্রবলয়। মোটামুটি রোমান্টিক একটা পরিবেশ। আপনি চন্দ্রবলয়ের দিকে তাকিয়ে চন্দ্রগ্রস্থ হয়ে পড়েছেন। উচ্চস্বরে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করছেন। হঠাৎই লক্ষ্য করলেন আপনার স্ত্রীর কোনও সাড়াশব্দ নেই। খোঁজ নিতেই জানা গেল আপনার স্ত্রী ছাদ থেকে লাফ দিয়েছে। হয়ত চাঁদের অসহ্য সৌন্দর্য কিংবা আপনার কবিতা সহ্য করতে পারেনি! রাস্তায় বেরোলেই দেখা যেত অদ্ভুত সব ঘটনা। কেউ কারও টাকে তবলা বাজাচ্ছে তো আবার কেউ কারো পশ্চাৎদেশে লাথি কষাচ্ছে। অথবা রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া মক্ষীরানী টাইপের কোনো মেয়েকে টুক করে চুমু খেয়ে বসল এক পাংকু ছোকরা। ইচ্ছে হয়েছে, খেয়েছে! তবে এমন কোনও ব্যাপার চালু থাকলে সবচাইতে বিপদে পড়ত এদেশের রাজনীতিবিদরা। রাস্তায় বের হলেই আমজনতার চড়-চাপড় খেয়ে নিশ্চিত হাসপাতালের পথ ধরতে হত। ভয়াবহ পরিস্থিতি! আমিও ঠিক তেমনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে যখন সেন্ডেল বিষয়ক জটিলতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলাম তখন হঠাৎ করেই মনে হল সেন্ডেল পায়ে ঢুকে পড়লে কেমন হয়? একাজেও যথেষ্ট দুঃসাহসের প্রয়োজন আছে, তবে দুঃসাহস দেখাবার একটা সুযোগ আছে বটে। এমন সুযোগ ভবিষ্যতে আসার সম্ভবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। যতদূর বুঝতে পারছি জহির সাহেব আমাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কোনও কাজে ডেকেছেন। আমার মত “অগুরুত্বপূর্ণ" মানুষের ডাক যখন পড়ে তখন ধরে নিতে হয় কারণটা গুরুত্বপূর্ণ।
অভ্র কে নিয়ে পড়া এটা আমার চতুর্থ উপন্যাস। খুব কম সময়ের মধ্যেই অভ্র ক্যারেক্টার টার বিশাল ফ্যান হয়ে গেছি। হয়ত অভ্র এর মাঝে যে কিঞ্চিত হিমু হিমু একটা ভাব আছে তা একটা কারণ হতে পারে। তুলোনাটা চলেই আসে। তবে দুইজনকে দুরকম ভাবে ভালো লাগে। অভ্র এর মানবিক দিক গুলো বিশেষ করে। ছাপার অক্ষরে এটা অভ্র এর প্রথম উপন্যাস। তবে আমার অনুরোধ কেউ শুধু মাত্র এই বইটা পড়ে অভ্রকে বিচার করবেন না। কারণ আমার মতে অভ্র এর সবচেয়ে দূর্বল উপন্যাস এটা। প্লটটা কেমন যেন থ্রিলার থ্রিলার আর সব ঘটনা বেশীই ড্রামাটিক মনে হয়েছে। তবুও শেষ পর্যন্ত লেখকের অসাধারণ লেখনীর কারণে ভালো লেগেছে উপন্যাসটা। আশা করি অভ্র এর আগামী বইগুলো এটিকেও ছাড়িয়ে যাবে। :) লেখককে অভিনন্দন।
বই পড়ার আসল উদ্দেশ্য আমার কাছে মজা পাওয়া আর এই বইটা পড়ে মজা পেয়েছি। হয়ত হিমুর সাথে অনেক কিছুতে মিল আছে আবার অনেক অমিলও আছে। মিল অমিল তুলে রেখে বলছি হিমু পড়ে যেরকম মজা পেতাম অভ্র পড়েও তাই পাচ্ছি। অভ্রকে নিয়ে লেখা এই বই প্রথম পড়েছি। মজা পাওয়াটা এত তীব্র ছিল যে এখন বাকি বই গুলা নিয়ে বসেছি।
অভ্র পড়ে ভালোই লেগেছে। বইটির মূল ড্রাফ্ট পড়ার সৌভাগ্য হয়েছিল, ব্যাপারটা বেশ উপভোগ করেছি। কেউ পড়েনি অথচ আমি পড়ে শেষ করেছি, এটা একটা অনন্য অভিজ্ঞতা। :)
লো এক্সপেক্টেশন নিয়ে পড়তে বসেছিলাম।আমার ধারনারও বাইরে ভালো হয়েছে বইটা।ছোট দু একটা ব্যাপার বাদে পুরো বইটা উপভোগ করেছি। লেখক ভবিষ্যতে অনেকদুর যাবেন বোঝাই যাচ্ছে।দুইটা ঘন্টা সুন্দর নির্মল আনন্দে কাটাতে চাইলে বইটা পড়ে দেখতে পারেন
বুক রিভিউ: একজন অভ্র এবং জনৈক পিতা লেখক: আবুল ফাতাহ প্রকাশনী: রোদেলা প্রকাশকাল: অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫
সিরিজের প্রথম প্রকাশিত বই বলে একে সিরিজের প্রথম বা একমাত্র উপন্যাস বলে ভেবে নেওয়ার কোন কারন নেই। অভ্র সিরিজের গল্প-উপন্যাস আরো যেসব আছে সেসব পড়ার সুবাদে মুন্নাভাইয়ের লেখার সাথে আমি খুব ভালোভাবেই পরিচিত।
শুরুটা হয়েছিল "একজন অভ্র" দিয়ে। শুধু বিভ্রান্তিকরই নয়, বরং বিভ্রান্তির জনক- এই চরিত্রটার দুঃসময়, উত্তরণ এবং পরবর্তি ঘটনাপ্রবাহের চাক্ষুষ সাক্ষী আমি; পড়ে পড়ে মানসপটে কল্পনা করে নিয়েছি দৃশ্যগুলো।
অভ্র-কে নিয়ে অনেকেই হিমুয়ানির অভিযোগ তুলেন; লেখক হুমায়ুনকে কাচা গিলে ফেলেছেন বলে মন্তব্য করা হয়। কিন্তু অভ্রকে আমি হিমুর সাথে ঠিক মিলাতে পারিনা। অভ্রের একটা পরিবার আছে, কিন্তু হিমুর কোন পরিবার নেই; হিমুর সাথে অভ্রর সবচেয়ে বড় পার্থক্য যেটা। রুপার সাথে হিমুর সম্পর্কটাকে প্রেম বলে আখ্যায়িত করতে পারেন আপনি, কিন্তু অভ্র আর আফরীনের সম্পর্কের ব্যাখ্যা করবেন কিভাবে? হিমুকে উদ্ভট বলা হলেও কম হয়ে যায়, কিন্তু অভ্র? প্রায় প্রতিটা কাজের পিছনেই কি সুন্দর একটা ব্যাখ্যা দিয়ে যাছছে সে.... তাছাড়া দুজনের চিন্তাভাবনার প্রকৃতি ঠিক কতটুকু মিলে?
চরিত্রের চিন্তাভাবনা আর লিখনী দুটোই সম্পুর্ন লেখকের উপর নির্ভর করে। লেখক আসলে তার সৃস্ট চরিত্রের মাধ্যমে পক্ষান্তরে নিজের চিন্তাভাবনাটাই প্রকাশ করেন। আর লিখনি প্রতিটা লেখকেরই নিজস্বতা।
ভিতরের প্রথম পাতায় বইটার কিছু লাইন হাইলাইট করা হয়েছে:- "সড়কবাতি আর পূর্নচন্দ্রের মিলমিশ আলোয় আমি অপুর্ব রুপবতী এক নারীকে আমার সামনে দাড়িয়ে থাকতে দেখতে পেলাম। খোলা চুলরাশিতে অপার্থিবতার ছোঁয়া। যেন এ জগৎে নয় তার বাড়ি। অন্য কোন জগৎে। আমিও আর এই ভুবনে নেই। অন্য কোনও ভুবনে দাঁড়িয়ে আছি থমকে যাওয়া সময়ে, মায়াবিনী কোন নারীর মায়াঘোরে বাঁধা পড়ে। যে ভুবনে চাঁদের আলো রুপোলি আভা ছড়িয়ে যায় অপার্থিব প্রেয়সীদের গায়ে। ছেঁড়া ছেঁড়া বাতাসে প্রেম খেলা করে...."
এতটুকু পড়ে হুমায়ুনের কোন ছাপ দেখতে পেলেন লেখায়? হুমায়ুনের ভাষা কি এতটা স্বাদু ছিল?
অভ্র আর হিমু, হুমায়ুন আহমেদ আর আবুল ফাতাহ'র মধ্যে পার্থক্য নিরুপনের জন্য এই একটা বইই যথেস্ট।
কাহিনিসংক্ষেপ নিয়ে বেশি কিছু বলার সুযোগ নেই; পাছে যদি স্পয়লার হয়ে যায়! বইয়ের প্রথম পাতায় লেখা কাহিনিসংক্ষেপ থেকে তুলে দিলাম:-
.....প্রায় দেড় যুগ আগে হঠাৎ করেই হারিয়ে গেলেন একজন মানুষ। আজ এত বছর পর কোন সে চিঠি পড়ে জনৈক পিতা লাভ করলেন পিতৃত্ব? কাকে খুঁজে পেতে হন্যে হয়ে উঠলেন? এক বাবার কাছে তার না দেখা মেয়েকে ফিরিয়ে দিতে, দেড়যুগ পুরোনো এক রহস্যের তল পেতে এই নগরের পথে নামল অদ্ভুত এক চরিত্র। সে শুধু বিভ্রান্তি তৈরী করে তা-ই নয়, সে নিজেই এক সাক্ষাৎ বিভ্রান্তি। একজন অভ্র। দুরন্ত প্রেম, দুর্জ্ঞেয় রহস্য, আর দুর্বোধ্য এক চরিত্রের উপ্যাখ্যান।
পড়ার পুরোটা সময় আছছন্নের মত অনুভুতি হছছিল আমার। লেখার ভঙ্গিটা চির পরিচিত। এর সাথে গা এলিয়ে দিতে বিন্দুমাত্রও সমস্যা হয়নি। বরং এক ধরনের ছটফটানি কাজ করছিল নিজের মাঝে, বই এত দ্রুত শেষ হয় আসছে কেন!? সত্য কথা বলতে কি বইটা ৯৬ পৃষ্ঠার না হয়ে ৯৬০ পৃষ্ঠার হলেই বেশি উপভোগ করতাম।
শুরু থেকেই টান টান এক রহস্যের আবহ ছিল বইটা জুড়ে, যেটা কিনা শেষ পর্যন্তও অক্ষুন্ন রাখতে পেরেছেন লেখক। আর মাঝখানে বিচিত্র সব অনুভুতি; প্রেম, সন্দেহ, চমক এসব তো ছিল উপরি পাওনা!
তবে পৃষ্ঠাস্বল্পতার কারনেই হয়ত পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারিনি আমি। শেষ পর্যন্তও কি রকম এক অতৃপ্তি কাজ করছিল নিজের মাঝে! রহস্য উৎঘাটন পর্ব শেষ; পরিনতিও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু চরিত্রগুলোর সঙ্গ ছেড়ে বই শেষ করতে কিছুতেই মন চাছছিল না। এই অতৃপ্তি, আরো কিছুক্ষন বইয়ের চরিত্রগুলোর সাথে থাকার ইছছা এ-সব-ই লেখকের কৃতিত্ব বলেই আমার ধারনা।
প্রত্যেক মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছ���লে এক-এক জন অভ্র! যেখানে অভ্র এর কাছে আমার মতে হিমু হচ্ছে একটু উচ্চ মাত্রার পাগলামি! ফেইসবুক থেকে আগেই অভ্র এর সাথে আগেই পরিচিত ছিলাম! আবুল ফাতাহ এর জন্য অনেক শুভকামনা!