সাধারণ এক মানুষ ছিল সুজুকি, একেবারে নিয়ম মেনে চলা, শান্ত স্বভাবের। কিন্তু একদিন, তার স্ত্রীর রক্তে লাল হয়ে যায় পৃথিবী, আর সেই মুহূর্তে বদলে যায় তার জীবন। প্রতিশোধের আগুনে দগ্ধ হয়ে, আইন-শৃঙ্খলার পথ ছেড়ে সে পা বাড়ায় এক ভয়ঙ্কর জগতে। স্ত্রী হত্যার সূত্র ধরে সে ঢুকে পড়ে মেইডেন নামের এক অপরাধ চক্রের ছায়ায়, যেখানে ক্ষমতা আর মৃত্যু পাশাপাশি হাঁটে। কিন্তু এই অন্ধকার জগতে সে একা নয়। এখানে শিকারীও আছে, শিকারও আছে। আর শিকারীরা নেহাত সাধারণ কেউ নয়—তারা যেন ছায়ার মধ্যে বাস করা দানব। সিকাডা, ছুরির অসম্ভব দক্ষ এক কারিগর, নীরবে আঘাত হানে, বিদ্যুতের মতো দ্রুত। দ্য পুশার, মৃত্যু তার কাছে নিছক এক খেলা—শুধু সামান্য ধাক্কা, তারপর একেবারে নিশ্চিত পরিণতি। দ্য হোয়েল, যে তার শিকারকে ছুরির ধার নয়, শব্দের ধারেই বিদ্ধ করে। এমনসব শূন্যতার কথা বলে, এমন অন্ধকার ডেকে আনে যে মানুষ নিজেই মৃত্যুর দিকে পা বাড়ায়। সুজুকির সামনে এখন শুধুই রক্ত আর প্রতিশোধের রাস্তা। এই ভয়ঙ্কর খেলায় শেষ পর্যন্ত কে শিকার আর কে শিকারী? টোকিওর অপরাধজগৎ যখন দুলতে থাকে রুদ্ধশ্বাস উত্তেজনায়, তখন সুজুকির হাতে নেমে আসে এক চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মুহূর্ত। এই মৃত্যুর ছায়াঘেরা খেলায়, শেষ হাসিটা কে হাসবে?
স্ত্রীকে নিয়ে জীবনটা ভালোই যাচ্ছিলো স্কুল শিক্ষক সুজুকির। কিন্তু একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা তার সেই শান্তশিষ্ট জীবনটাকে একদম ধ্বংস করে দিলো। গাড়িচাপা দিয়ে খুন করা হলো তার প্রিয়তমা স্ত্রীকে। আর খুনটা করলো টোকিওর এক কুখ্যাত মাফিয়া ডনের বখে যাওয়া ছেলে। প্রতিশোধের নেশায় একরকম উন্মাদ হয়ে গেলো সুজুকি তার স্ত্রীকে হারিয়ে। আর সেই লক্ষ্যে সে যোগ দিলো ফ্রয়লাইন নামের এক ক্রাইম সিন্ডিকেটে। স্বাভাবিকভাবেই অন্ধকার এক জগতে নিজেকে পুরোপুরি জড়িয়ে ফেললো সে। এই জগতের যতো গভীরে সে প্রবেশ করতে লাগলো, ততোই তার সামনে উন্মোচিত হতে থাকলো মানুষের ভেতরকার হিংস্রতা আর কদর্যতা।
অপরাধজগতে সবাই তাকে দ্য হোয়েল নামে চেনে। দশাসই চেহারার ঠান্ডা স্বভাবের এই মানুষটা আদতে চরম ভয়ঙ্কর। হোয়েলের কাজ তার টার্গেটদের আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দেয়া। কাজটা সে ভয়ভীতি দেখিয়ে বা অস্ত্রের মুখে করে না। বরং সে তার শিকারদের চোখে চোখ রেখে তাদের অতীত থেকে টেনে বের করে নিয়ে আসে অপরাধবোধ আর আক্ষেপ। আর তারপরই হোয়েলের চোখের সামনে মানুষগুলো নিজেরাই নিজেদেরকে মৃত্যুর হাতে সঁপে দেয়। মানুষকে অদ্ভুত উপায়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়া এই হোয়েলেরও মাঝেমাঝে নিজের মাথাটা ব্ল্যাকআউটের মতো হয়ে যায়। আর তখন সে তার আশেপাশে মৃত মানুষদের দেখতে পায়, শুনতে পায় তাদের কণ্ঠ!
সিকাডা। ছোটখাটো গড়নের এই তরুণকে হঠাৎ করে কেউ দেখলে আর দ্বিতীয়বার তার দিকে তাকাবে না। অথচ বিশেষত্বহীন চেহারার এই সিকাডাই একজন ভয়ঙ্কর খুনি। ছুরির জাদুকর বলা যেতে পারে তাকে। নিজের শিকারদের ছুরিকাঘাত করে নৃশংসভাবে খুন করে সে। ইওয়ানিশি নামে এক লোকের হয়ে কাজ করে সিকাডা। কিন্তু তার ভেতরেও ইদানীং স্থান করে নিয়েছে অদ্ভুত এক অস্তিত্বসংকট। নিজেকে ইওয়ানিশির হাতের পুতুল মনে করে সিকাডা, যা তাকে অস্বস্তির মধ্যে ফেলে দেয় মাঝেমাঝে। সিকাডা কি আসলে স্বাধীন, নাকি তার সুতো ধরা আছে ইওয়ানিশির হাতে?
জাপানের অপরাধজগতে পুশার নামটা আতঙ্কের। নামটা একই সাথে রহস্যেরও বটে। কারণ, পুশারকে কেউ কখনও দেখেনি। কেউ-ই জানে না লোকটার পরিচয়। অথচ নিজের কাজে ভয়াবহ দক্ষ সে। আর নিজের পরিচয় গোপন রাখতেও তার কোন জুড়ি নেই। পুশার তার শিকারদের খুন করে অত্যন্ত ব্যতিক্রমী এক পদ্ধতিতে। চলন্ত গাড়ি বা ট্রেনের সামনে সে নিজের শিকারদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। তারপর গায়েব হয়ে যায়। আর আমাদের এই গল্পটার শুরুও পুশারই করলো। সেটাও করলো দারুণ চমকপ্রদভাবে।
নিজের স্ত্রীকে খুনের প্রতিশোধ নিয়ে বদ্ধপরিকর সুজুকি না চাইতেও জড়িয়ে পড়লো দ্য হোয়েল, সিকাডা আর পুশারদের মতো ভয়ঙ্কর খুনিদের সাথে। হঠাৎ করেই তার সাথে ঘটতে শুরু করলো একের পর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। শেষ পর্যন্ত কি কাঙ্ক্ষিত প্রতিশোধ নিতে পারবে সুজুকি? নাকি তার নিজের জীবন নিয়েই টানাটানি শুরু হয়ে যাবে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর লুকিয়ে আছে 'থ্রি আসাসিন্স'-এর পাতায়।
আমার এই পাঠকজীবনে বেশ অনেকগুলো জাপানিজ থ্রিলার পড়ার সুযোগ হয়েছে। জাপানিজ থ্রিলার আমার বেশ পছন্দের। বিশেষ করে মিস্ট্রি ও ডিটেকটিভ থ্রিলারগুলো একটু বেশিই ভালো লাগে আমার। কিন্তু 'থ্রি আসাসিন্স'-এর মতো ভিন্নধর্মী জাপানিজ থ্রিলার পড়ার সৌভাগ্য আমার এর আগে হয়নি। লেখক কোতারো ইসাকা'র এই উপন্যাসটা মূলত হিটম্যান থ্রিলার ঘরানার। সেই সাথে এটাকে ডার্ক কমেডি থ্রিলারের তকমাও দেয়া যায়। তবে প্রচলিত হিটম্যান থ্রিলার ঘরানার বাইরে গিয়ে কাজ করেছেন তিনি এখানে। কোতারো ইসাকা তাঁর এই উপন্যাসে সম্পূর্ণ আলাদা এক জগৎ সৃষ্টি করেছেন। যে জগতের অধিবাসীদের সবাই নিজেদের আলাদা আলাদা মিশন ও ভিশন নিয়ে কাজ করে চলে। তাদের আচরণগত বৈশিষ্ট্যগুলোও এতোটাই আলাদা যে তাঁর সৃষ্ট এই জগতের সাপেক্ষে সেগুলোকে একদম সত্যি বলে মনে হয়। 'থ্রি আসাসিন্স'-এর জগতটা আমাকে শুরুতেই একদম আটকে ফেলেছিলো কাহিনির সাথে।
স্ত্রীকে হারিয়ে প্রতিশোধের নেশায় উন্মুখ একজন মানুষের সাধারণ গল্প এটা না। বরং এর চেয়েও আরো বেশি কিছু। 'থ্রি আসাসিন্স'-এর চরিত্রদের মাঝেমাঝেই আমার দার্শনিক বলে মনে হয়েছে। ভাবুন তো, ঠান্ডা মাথার একেকজন খুনি মাঝেমাঝেই নিজেদের জীবনদর্শন নিয়ে আলাপ-আলোচনা করছে। সেই আলাপ-আলোচনার ভেতরে মিশে আছে তীক্ষ্ণ হিউমার। ডার্ক কমেডির এই খেলা আমার চমৎকার লেগেছে। কোতারো ইসাকা'র দ্য হোয়েল, সিকাডা আর পুশার আদতে তিন ভয়ঙ্কর খুনি চরিত্র হলেও এদের কর্মকাণ্ড ও সাইকোলজি আমাকে মাঝেমাঝেই অবাক করেছে, মাঝেমাঝেই হাসির উদ্রেক ঘটিয়েছে। ভালো লেগেছে কেনতারো আর কোজিরো'র সাথে সুজুকির চমৎকার কেমিস্ট্রি। কোতারো ইসাকা 'থ্রি আসাসিন্স'-কে শুধু একটা সাদামাটা থ্রিলার হিসেবে পাঠকের সামনে প্রেজেন্ট করেননি। বরং তিনি তাঁর উপন্যাসের চরিত্রদের মনোজগতে পাঠককে প্রবেশ করারও সুযোগ দিয়েছেন। আর এই ব্যাপারটাই এই উপন্যাসটাকে অসাধারণ করে তুলেছে।
একটা হিটম্যান থ্রিলার হিসেবে 'থ্রি আসাসিন্স'-এ ধুন্ধুমার অ্যাকশন ছিলো না। এর মানে এ-ই না যে কোন অ্যাকশন ছিলো না। ছিলো, তবে সেটা মারমার কাটকাট টাইপ অ্যাকশন সিকোয়েন্স না। লেখকের চমৎকার বর্ণনায় সেই অ্যাকশন সিকোয়েন্সগুলো বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছিলো আমার জন্য। ভালো লেগেছে চরিত্রগুলোর মধ্যকার কথোপকথন। সেই সাথে ভালো লেগেছে তাদের শক্তি আর সীমাবদ্ধতার ব্যাপারগুলোও। আমাকে সবচেয়ে বেশি স্যাটিসফাই করেছে এর শেষটা। কোতারো ইসাকা 'থ্রি আসাসিন্স'-এর যে সমাপ্তি টেনেছেন সেটা এই বইটা পড়ে শেষ করার সন্তুষ্টির সাথে সাথে একরকম মানসিক শান্তির দেখা পাইয়ে দিয়েছে আমাকে৷ দুর্দান্ত উত্তেজনাকর কোন থ্রিলারের বাইরে একটু আলাদা রকম কোন থ্রিলার পড়তে চাইলে 'থ্রি আসাসিন্স' একটা চমৎকার অপশন। এর দ্বিতীয় পর্ব 'বুলেট ট্রেন' ও তৃতীয় পর্ব 'দ্য মেন্টিস'-ও পড়ার ইচ্ছা আছে।
অনিক শাহরিয়ারের অনুবাদ দুর্দান্ত হয়েছে। এমন সহজ ও সাবলীল অনুবাদের কারণে বইটা পড়ায় আরো খানিকটা গতি বেড়েছে আমার। 'থ্রি আসাসিন্স'-এর একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনুবাদের এই সাবলীলতা অক্ষুণ্ণ ছিলো। তাই যারা তাঁর অনুবাদ কেমন হবে এটা নিয়ে ভাবছেন, তাদেরকে নির্ভয়ে অনিক শাহরিয়ারের অনুবাদের ওপর ভরসা করার পরামর্শ দিচ্ছি। এবার আসি সমস্যার ব্যাপারে। টাইপিং মিসটেকের দেখা পেয়েছি বেশ কিছু জায়গায়। বেশ কিছু শব্দ সম্ভবত কনভার্ট করতে গিয়ে বিকৃত হয়ে গেছে। এই একই কারণে বোধহয় অনেক শব্দের শেষে রি-কার চলে এসেছে। বইটার সম্পাদনা একটু ভালো হলে এই ভুলগুলোর মাত্রা কমে আসতো। পরবর্তী এডিশনে এগুলো ঠিকঠাক করে নেয়া হবে আশা করি।
'থ্রি আসাসিন্স'-এর প্রোডাকশন বেশ ভালো হয়েছে। শক্তপোক্ত বাঁধাই আর কাগজের মানও ছিলো বেশ ভালো। তানভীর ইবনে কবিরের করা প্রচ্ছদটা একটু বেশিই সাদামাটা লেগেছে৷ প্রচ্ছদটা আরো দৃষ্টিনন্দন হতে পারতো।
ভিন্নধর্মী একটা জাপানিজ থ্রিলার পড়তে চাইলে ঢুকে পড়তে পারেন দ্য হোয়েল, সিকাডা আর পুশারের জগতে৷ রিকমেন্ড করলাম।