সাল ২০০৫, বুলগেরিয়ায় অবস্থানরত ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট অর্ঘ্যদীপ অধিকারী হঠাৎই ডিফেক্ট করে বসে। তাকে ধরার আগেই সে গিয়ে ধরা দেয় সিআইএর হাতে, সেখানে অর্ঘ্যদীপ তাদের সঙ্গে আপোসে রাজি হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে ময়দানে নামানো হলো দুর্ধর্ষ ভারতীয় এজেন্ট ওমারকে। কূটনৈতিক পথে অর্ঘ্যদীপকে ফেরানো গেলে ভালো, নইলে বিকল্প পথ মাত্র একটাই—এলিমিনেশন।
এদিকে অর্ঘ্যদীপের হ্যান্ডলারকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য যখন লোক পাঠানো হলো, তখনই ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত ঘটনা। নিজ বাড়িতে সেই হ্যান্ডলার, র-এর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা সুরেশ বাজারিয়া আত্মহত্যা করে বসে। সুরেশ, র-এর গোপন ব্রাঞ্চ ক্ল্যান্ডেস্টাইনের স্বনামধন্য এজেন্ট, যার হাত ধরে তৈরি হয়েছে সংস্থার সেরা অপারেটিভরা। দায়িত্বও তার কাঁধে ছিল পাহাড়সম। অথচ হঠাৎ করে কেন তিনি এমন পথ বেছে নিলেন? নিছক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি সুপরিকল্পিত কোনো ষড়যন্ত্র? সুরেশের সাথে শেষ সময়ে যে সবচেয়ে বেশি যুক্ত ছিল, সিআইএ হাতে পাওয়ার আগে যে ডিফেক্টর অর্ঘ্যদীপের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছে এবং যার সঙ্গে বাংলাদেশের ডিজিএফআইয়ের যোগসূত্রের প্রমাণ মিলেছে, সব ইঙ্গিতই গিয়ে থামছে এক ব্যক্তির কাছে: দিওয়ান চাঁদ মালিক।
মালিক, ১৯৭১ সালে গৃহহীন শরনার্থী হিসেবে ভারতে প্রবেশ করা সেই শিশু, যে ধীরে ধীরে নিজের যোগ্যতা ও মেধার জোরে হয়ে ওঠে র-এর অ্যাভিয়েশন ডিপার্টমেন্টের এক যোগ্য সদস্য। কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে সেই মালিক-ই গাদ্দারি করে বসল কিনা? কিন্তু তার নাগাল পাওয়ার আগেই মালিক গায়েব হয়ে যায়। তাকে খুঁজে বের করার দায়িত্ব দেওয়া হয় অর্জুন পান্ডেকে। অর্জুন পান্ডে, যে একসময় মিলিটারি পুলিশে ম্যানহান্টিং-এর কাজ করতো, পরে সুরেশ বাজারিয়ার হ্যান্ডলিংয়ে র-এর এজেন্ট হিসেবে বহু সফল মিশন সম্পন্ন করেছে। কিন্তু দশ বছর আগে বাংলাদেশে তার একটি ভুলের কারণে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অ্যাসেট হারালে অর্জুনকে পদচ্যুত করা হয়। ধ্বংস হয়ে যায় তার ক্যারিয়ার। এরপর সে কেবল এজেন্টদের কাউন্সেলিং-এর আনঅফিশিয়াল কাজের সুযোগ পায়। দেশের এই দুরবস্থায় দিওয়ান চাঁদ মালিককে খুঁজে বের করার জন্য ক্ল্যান্ডেস্টাইনের ভাইস চিফ মানিক রাও তাকে ফিরিয়ে আনে। অর্জুনকে একপ্রকার বাধ্য করা হয় মিশনটা নিতে। সফল হলে সে তার হারানো ক্যারিয়ার ফিরে পাবে, আর ব্যর্থ হলে তাকে বরণ করতে হবে আরও করুণ পরিণতি।
অর্জুন নিজের সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করে। কিন্তু মালিকের জীবনটা যেন রহস্যময় ধোঁয়াশায় ঢাকা। অর্জুন যতই ট্রেইল ধরে এগোতে চায়, ততবারই গিয়ে ঠেকে কানাগলিতে। অন্যদিকে, মালিকের গোপনীয়তা রক্ষার্থে নেমে পড়েছে এক অদৃশ্য গোষ্ঠী। তারা ট্রেইল মুছে দিতে যেকোনো সীমা অতিক্রম করতে প্রস্তুত। ঝরছে রক্ত, পড়ছে লাশ। অর্জুনের পেছনে লাগানো হলো ভয়ংকর আততায়ীদের। চলছে নানামুখী ষড়যন্ত্র। র, সিআইএ, ডিজিএফআই—একাধিক দেশের গোয়েন্দা সংস্থা কোন স্বার্থে এইসব ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছে, আর সবকিছুর সমাধান ঘটবে কীভাবে? জানতে হলে পড়তে হবে এম. জে. বাবুর সদ্য প্রকাশিত এসপিওনাজ থ্রিলার বই ‘মালিক’।
মালিক, এম. জে. বাবুর লেখা প্রথম এসপিওনাজ থ্রিলার বই। জনরা হিসেবে মালিকের গল্পটা বেশ ভালো। পুরোটা বই জুড়ে কাহিনির এক্সিকিউশনও যথেষ্ট ভালোভাবে করা হয়েছে। লেখকের লেখার হাত ভালো, লেখনী অনেক সাবলীল। আর এসপিওনাজ-স্পাই থ্রিলার জনরার যে বিশেষ টোন, ডিটেইলড বর্ণনার স্টাইল থাকে, সেটা তিনি তার বইয়ে সফলভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। সেইসাথে কাহিনির দৃশ্যপটে আসা কিছু জায়গার বর্ণনা ছিল অনেক প্রাণবন্ত। বইটার প্রথম ১০০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত গল্প একটু খাপছাড়া ভঙ্গিতে এগিয়েছে, তবে এরপর তা ট্র্যাকে ওঠার পর থেকে বেশ ভালো ফ্লো-য়ের সাথেই এগিয়েছে। সেই অংশ থেকে পুরো বই-ই বলা যায় সুখপাঠ্য।
এই বইয়ের একটা ভালো দিক হচ্ছে ডিটেইলিং। গুপ্তচরবৃত্তি, মিলিটারি, ভূ-রাজনৈতিক জগতের নানা দিক এতটা ডিটেইলে আর বিস্তৃতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে, বোঝা যায় এজন্য লেখককে প্রচুর খাটতে হয়েছে। কাল্পনিক বিষয়বস্তু থাকলেও সেগুলো মেলানো হয়েছে চমৎকারভাবে, ঘটনাপ্রবাহও ছিল আকর্ষণীয়। মালিকের রহস্য উদ্ঘাটনে অর্জুনের তদন্তকার্যগুলো উপভোগ্য ছিল অনেক। প্রাথমিক বিল্ডআপের পর থেকে প্রথম ৪০০ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ছিল গল্পের ইনভেস্টিগেশন আর্ক, যেখানে অর্জুনের মালিকের ট্রেইল অনুসরণ করা নিয়ে গল্প এগোয়, কিন্তু প্রতি ধাপে সবকিছু আরও জটিল হতে থাকে। সেখানে লেখক মাকড়শার জালের মতো করে রহস্য বুনেছেন। এরপর শুরু হয় গল্পের ফিউজিটিভ আর্ক, যেখানে ধীরে ধীরে রহস্যের সুতো ছাড়ানো হয়। চরিত্রগুলো অনেকটাই স্টিরিওটিপিক্যাল, তবে গল্পের প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের গঠন মোটামুটি ভালো হয়েছে।
একটা ব্যাপারে লেখকের ইমপ্রুভমেন্ট আমাকে মুগ্ধ করেছে। এর আগে লেখকের ইনসেন্টিয়া' বইয়ের রিভিউতে আমি বলেছিলাম, তিনি ডেসক্রিপটিভ ন্যারেটিভে দুর্বল। সেক্ষেত্রে 'মালিক' যেন তার জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল নিজেকে প্রমাণ করার। এবারে তিনি বেছে নিয়েছেন স্পাই থ্রিলারের মতো এমন এক জনরা যেখানে ডেসক্রিপটিভ বর্ণনা সবচেয়ে বেশি লাগে। আর তিনি সেটা করতে পেরেছেনও যথাযথভাবে। বিশেষ করে গল্পে থাকা তিনটি অ্যাকশন দৃশ্যের বর্ণনা ও এক্সিকিউশন সারপ্রাইজিংলি অনেক ভালো ছিল। সব মিলিয়ে এই জায়গায় লেখকের উন্নতি এক কথায় দারুণ।
বইয়ের উৎসর্গপত্রে আমার অত্যন্ত পছন্দের মাঙ্গা লেখক (বলতে গেলে ফ্যাসিনেশন) নাওকি উরাসাওয়াকে রাখা হয়েছে, যা দেখে মনটা ভরে গেছে। 'মালিক' এর গল্পের কিছু উপাদান ও হালকা ভূ-রাজনৈতিক বর্ণনা নাওকির ম্যাগনাম ওপাস মন্সটার-এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। সেই ব্যাপারগুলো মিলে যাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়, তবে আমি নাহয় সেটাকে উরাসাওয়া সেনসেইর প্রতি একধরনের ট্রিবিউট হিসেবেই দেখলাম।
তবে কিছু বিষয় আমার ব্যক্তিগতভাবে ভালো লাগে নি। প্রথমত, একটা স্পাই বা এসপিওনাজ থ্রিলার গল্পের মূলে থাকতে হয় যথাযথ পটভূমি, যার ভিত্তিতেই গুপ্তচরবৃত্তির সংঘর্ষটা ফুটে উঠে। এখানে সেটা থাকলেও, লেখক সেটাকে টুইস্ট বানিয়ে একেবারে শেষের দিকে উপস্থাপন করেছেন। এরআগে পর্যন্ত গল্পটা আসলে কীসের ভিত্তিতে এগোচ্ছে তা স্পষ্টভাবে বোঝা যায় না। তাই গল্পটাকে এসপিওনাজের থেকে স্পাই সম্পর্কিত একটা ক্রাইম–মিস্ট্রি থ্রিলার-ই বেশি মনে হচ্ছিল। আর যেহেতু গ্রাউন্ড ঠিকমতো ক্লিয়ার ছিল না, তাই শেষে গিয়ে সেটার উন্মোচনও ফিকে লেগেছে, আহামরি কিছু মনে হয়নি।
আরেকটা বিষয় হলো, লেখক পুরোটা সময় গল্পটাকে এসপিওনাজ থ্রিলার হিসেবে, স্পাই–থ্রিলার জনরার গতানুগতিক বাণিজ্যিক ফর্মুলাগুলো এড়িয়ে বাস্তবধর্মী বানাবার কথা বলেছেন। কিন্তু শেষ ৫০ পৃষ্ঠার পর থেকে গল্পটা গতানুগতিক কন্সপিরেসি থিওরি, জোর করে চমক দেওয়া টুইস্টের পর টুইস্ট আর পাল্পি সব উপাদানে ভরে ওঠে। সেইসাথে সিক্যুয়েলের ইঙ্গিতবাহী এন্ডিং তো আছেই। কিছু টুইস্ট সত্যিই চমকপ্রদ ছিল, কিন্তু অতিরঞ্জন আর অস্পষ্ট ডেভেলপমেন্টের কারণে সেগুলো বিরক্তিকর ও কিছুক্ষেত্রে অযৌক্তিক মনে হয়েছে। এটা হতাশাজনক। সবসময় গল্পের শেষে গিয়ে কি দুনিয়া উল্টে দেওয়া টুইস্ট দিতেই হবে? একটা ভালো থ্রিলারের মানদণ্ড কি শুধুই এর শেষে আসা টুইস্ট? সব বড় টুইস্ট কি ক্লাইম্যাক্সকে রাশড আর এন্ডিংকে দুর্বল বানিয়ে শুধু কাহিনির একেবারে শেষে গিয়ে উন্মোচন করতে হবে? আমার কাছে শেষ ৫০ পৃষ্ঠার আগে পর্যন্ত কাহিনিটা দুর্দান্ত লাগছিল, কিন্তু এসব অতিরিক্ত উচ্চাকাঙ্ক্ষী জিনিসপাতি শেষমেশ ভালো ইমপ্��েশনটাই নষ্ট করে দিয়েছে। তারপরও বাংলা মৌলিক এসপিওনাজ থ্রিলার জগতে ‘মালিক’-কে আমি বেশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ মনে করি। কারণ বাংলা ভাষায় এই জনরার সুলিখিত ও সুখপাঠ্য মৌলিক বইয়ের সংখ্যা এখনো খুব কম।
📚 বইয়ের নাম : মালিক
📚 লেখক : এম. জে. বাবু
📚 বইয়ের ধরণ : এসপিওনাজ থ্রিলার, সাসপেন্স থ্রিলার, মিস্ট্রি থ্রিলার, কন্সপিরেসি থ্রিলার
📚 ব্যক্তিগত রেটিং : ৪/৫