বাংলাদেশ নিয়ে নরওয়েজিয়ান ভাষায় প্রথম ও একমাত্র উপন্যাস ‘নদে’। নরওয়ের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক ও সঙ্গীতজ্ঞ সেতিল বিয়োর্নস্তার এই উপন্যাস অনূদিত হয়েছে নানা ভাষায়। নরওয়েজিয়ান ভাষা থেকে বাংলাভাষায় অনুবাদ করেছেন শিক্ষাবিদ, চলচ্চিত্র গবেষক এবং বিশেষজ্ঞ ড. আনিস পারভেজ। এই উপন্যাসে স্থান পেয়েছে অভিবাসন ইস্যু। বাংলাদেশের এক যুবকের জীবন ঘিরে বাংলাদেশ, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড ও নরওয়েতে আবর্তিত হয় এই উপন্যাসের রুদ্ধশ্বাস কাহিনী।
Ketil Bjørnstad is a Norwegian pianist, composer and author. Initially trained as a classical pianist, Bjørnstad discovered jazz at an early age and has embraced the emergence of "European jazz".
He is an artist on the ECM record label, but has also published some 20 books (predominantly novels) and a number of poetry and essay collections.
অলিগলি ধরে হাঁটলে যে পাড়ায় নিবাস সে পাড়াটা খুব ভাল চেনা যায়। কিন্তু মাঝে মাঝে ছাদে দাঁড়িয়ে দেখলে আমরা এমন কিছুর দেখা পাই যা সচরাচর কাছ থেকে দেখতে পাইনা। ভিনদেশী ভিনভাষী লেখক লিখেছেন বাংলাদেশের পটভূমিকায়, এমন বইয়ের সংখ্যা খুব কম নয়। ঐ দূর থেকে, ওপর থেকে, অপর হয়ে দেখার একটা ব্যাপার ঘটে এই ধরনের বইগুলোয়।
ওপর থেকে দেখায় একটা যে মোহনীয়তা যুক্ত হয় আমাদের দৃষ্টিতে, সেটা যেমন সেখানে থাকে, সমগ্র একটা রূপ ও সেখানে ধরা পড়ে, সঙ্গে যুক্ত হয় অস্পষ্টতার দোষ; ঐ মোহনীয়তা, ঐ সমগ্রতাকে যা অনেক সময়ই ভিত্তিহীন প্রতিপন্ন করে। অপর হয়ে দেখার যে সহজ নৈর্ব্যক্তিকতা তা থেকে এই রচনাগুলি প্রায়শ বঞ্চিত, কারণ হয়তোবা একধরনের ভদ্রতা, এক ধরনের ভীতি, কিংবা আপন বীক্ষণের ভিত্তিটিকে খুব নড়বড়ে দেখতে পাওয়া। অবশ্য আমরা ভিনদেশিদের কমপ্লিমেন্টে খুশি হতে শিখে গেছি বহুদিন হলো, তাই এইসব রচনায় আমাদের খুশি করা সহজ।
আমার একটা অতি প্রিয় বইয়ের ব্যাপারেও এইসব অভিযোগ তোলা যেতে পারে। রচয়িতা নরওয়েজিয়ান লেখক সেতিল বিয়োর্নস্তা, অনুবাদক আনিস পারভেজ, বইটির নাম 'নদে' বাংলায় যার সহজ মানে 'দয়া'।
লেখক কথা বলেছেন মিঠু বড়ুয়ার জবানে যে নরওয়ের একটা জেলে বসে লিখছে কথাগুলো। ইয়াসমিন হত্যা আর ধর্ষণের প্রতিবাদী মিছিল আমরা কিছুটা দেখতে পাই মিঠু বড়ুয়ার ফ্ল্যাশব্যাকে। ঐ মিছিল থেকেই হারিয়ে যায় বইটির কেন্দ্রীয় চরিত্র মিঠু বড়ুয়ার বোন। এরপরই মিঠু বড়ুয়ার বোনের খোঁজে ছুটে চলা, ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম সেখান থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সেখানে আবার আমরা দেখি শান্তিবাহিনী আর সেনাবাহিনীতে লড়াই হচ্ছে। ঐ লড়াইতেই আহত মিঠু বড়ুয়ার সাথে পরিচয় হচ্ছে এক নরওয়েজিয়ান যাজকের। তারপর নরওয়ে যাত্রা, সেখান থেকে আবার থাইল্যান্ড এরমাঝে মা ও সেখানে উপস্থিত- মিঠুর বোন কে খুঁজতে খুঁজতে, মা ছেলের আবার দেখা।
অবশ্য মা বোন দুজনকেই সেখানে পাওয়া যাবে ভেবেই মিঠু বড়ুয়া এসেছিল সেখানে, যেহেতু মা ছেলে একসঙ্গে থাকা কালে কথা ছিল মেয়েটিকে খুঁজতে থাইল্যান্ড যাবার। কারণ তারা শুনেছিল বাংলাদেশি মেয়েদের ওদেশে পাচার করা হয়। নরওয়ে যাবার আগে মিঠু ওর মাকে যেভাবে হারিয়ে ফেলে সেটা বেশ কৌতূহলোদ্দীপক, বোনকে খুঁজতে যাবার সময়টায় ট্রেনের এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে লাফ দিতে ইচ্ছা করছিল মিঠুর, সে ইচ্ছাপূরণ করে এবং ভূপাতিত হয়। ট্রেন মা কে নিয়ে চলে গেল, মিঠু আশ্রয় পেল এক আওয়ামীলীগ নেতার বাড়িতে, নেতার আচরণ রীতিমত ইয়োরোপিয়ান।
সে যাই হোক থাইল্যান্ডে মা ছেলের যৌথ জীবন-যুদ্ধ একসময় মিঠুর একার সংগ্রামে পরিণত হয়, মায়ের মৃত্যুতে। মিঠুর শেষমেশ এমন জীবন বেছে নিতে হয় সেটা কিন্তু আমরা খুব কম লোক জানলেও থাইল্যান্ডে তো বাস্তব অবশ্যই, চট্টগ্রামেও বাস্তব বলে আলোকিত চট্টগ্রামেও পড়েছি।
কিন্তু মিঠুর জন্য সেটা স্বাভাবিক ছিল এমন মনে হয় না । অবশ্য কেউ চাইলে বলতেই পারে- মানুষ তো অনেক সময়ই স্বভাব বিরুদ্ধ কাজ করে।
তবে মনে হয় কাহিনীর প্রয়োজন বলে যে একটা জিনিসের অস্তিত্ব আছে, সেটা এর আগেই একবার মিঠুকে ট্রেনের ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে লেখক সবলে প্রমাণ করেছেন। যেভাবে তিনি একটা দেশকে নিয়ে ফ্যান্টাসির ষোলকলা পূর্ণ করতে বস্তিবাসীদের দিয়ে মিঠু আর মায়ের বিদায় বেলায় গাওয়াতে পেরেছেন রবীন্দ্র-সঙ্গীত।
যাই হোক, সেই স্বভাব বিরুদ্ধ পুরুষ প্রস্টিটিউট হিসেবে কাজ করার সূত্রেই মিঠুর সঙ্গে পরিচয় হয় নরয়েজিয়ান এক মাদক ব্যবসায়ীর তার সূত্রেই নরওয়ে যাবার পর নরয়েজিয়ান পুলিশ আটক করে মিঠুকে।
গল্প হয়তো এটুকু বা এটুকুই নয়, অবশ্য সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণও নয়। কারণ এই গল্পের চাইতেও প্রয়োজনীয় লেখকের কিছু কিছু ভাবনা আর বয়ান এবং অবশ্যই অনুবাদ।
অনুবাদ লেখকের লেখনী ছাড়িয়ে গেছে বা এই ছাড়িয়ে যাবার সপক্ষে আমার অবস্থান -ব্যাপার এমন নয়। বরং আরো অনেকের মতই স্বাভাবিকভাবেই মূলানূগ অনুবাদের পক্ষপাতী, এবং মুলানুগ মানে যে আক্ষরিক নয় সেটা তো সবারই জানা। সৎ এবং প্রয়োজনীয় অনুবাদ তো বোধহয় তাই যা লেখকের বক্তব্যকে এবং লেখাটির নিজস্ব ফ্লো, শৈলী এসব কিছুকেই অক্ষুণ্ণ রাখবার চেষ্টা করে এবং অক্ষুণ্ণ রাখবার চেষ্টা করে যে ভাষায় অনুদিত হচ্ছে তার ধর্মও, আর তাই পড়তে গেলে মোটেই “অনুদিত” মনে হয়না, বরং তা হয়ে ওঠে সে ভাষারই আরেকটি নতুন সৃষ্টি।
আনিস পারভেজের 'নদে' বোধ করি এই সবগুলো গুণ নিয়ে হাজির। উপন্যাসের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মিঠুর যে কণ্ঠস্বর আমরা শুনতে পাই, সে স্বরের উঠা নামা নিশ্চয়ই আছে, তবু তো সেটি একজনেরই স্বর, এবং কথাগুলো বলছে সে একটা নির্দিষ্ট স্থানে বসেই, একটা বিশেষ মানসিক আবহ থেকে। সুতরাং পুরো বয়ানেই আছে তার ছাপ এবং ধারাবাহিকতা এবং লেখক বয়ানের এই সুরেই গেঁথেছেন পুরো উপাখ্যান। পড়তে পড়তে আমরা টের পাই অনুবাদক সুরটি ছুঁয়েছেন, সেটি বাঙময় করেছেন মাতৃভাষায়।
অনুবাদে অনুসরণের পরিশ্রমের পাশাপাশি সৃজনশীলতার আনন্দ ও আছে প্রচুর। যিনি আপন সক্ষমতার গুনে সেই আনন্দটি পান তাঁর অনুবাদে মুগ্ধতা অনিবার্য, আনিস পারভেজের অনুবাদ পাঠের অভিজ্ঞতাটি ও এর ব্যতিক্রম কিছু নয়।