রক্তগোলাপ’কে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে জাদুবাস্তব পথিকৃতপ্রতিম সৃষ্টি বলা চলে। ১৯৬৩ সালে সৈয়দ হক লিখেছিলেন তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘রক্তগােলাপ’ । ১৯৬৪ সালে মাওলা ব্রাদার্স থেকে প্রথম প্রকাশিত হয় ‘রক্তগােলাপ' বইটি। প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁর গল্পখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে বিদোৎসাহী মহলে।
জাদুবাস্তব ধারার এই গল্প গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের One Hundred Years of Solitude (১৯৬৭) এর তিন বছর আগে প্রকাশিত। এই গল্পটি 'Blood Roses' শিরোনামে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন দ্বিতীয় সৈয়দ-হক।
রক্তগোলাপ একখান ছোট্ট উপন্যাস। খুব ই ছোট্ট। এক নিমিষেই শেষ হয়ে যাবার মতন উপাখ্যান। কাহিনীর সূত্রপাত ঝড়ো বৃষ্টির মধ্যে জাদুকর নাজিম শাহের সাইনবোর্ড উড়ে যাওয়ার মাধ্যমে। জাদুকর নাজিম শাহ ছিঁচকাদুনে মানুষ। পান হতে চুন খসতেই একলা বসে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকেন। এই ছিঁচকাদুনে স্বভাবের বদৌলতেই তার দলের অন্যতম অন্যতম আকর্ষণ ছুরি খেলায় তার নিজের ই মেয়ে চম্পা অংশগ্রহণ করে বসে। শুরুতে ছুরি খেলায় কোন মানুষ অংশগ্রহণ করতে চাইত না। তাই জাদু হিসাবে সেই খেলা দর্শকের নিকট তেমন আকর্ষণ ধরে রাখতে পারত না। বাবার অপমানের কান্না থামাতেই চম্পা খেলাটা শুরু করে এবং এইটিই অন্যতম আকর্ষণ এই দলের জাদুখেলা গুলোর মধ্যে।
কিন্তু ঘটনার মোড় ঘুরে যায় যখন ফিরদৌসি অর্থাৎ আল্লারাখার আগমন ঘটে। খুব ই অনাড়ম্বর বেশের আল্লারাখা দলের এবং আমাদের গল্পের মূল হোতা হয়ে উঠে। যেদিন তার আগমন ঘটে সেদিন প্রচন্ড বৃষ্টিতে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। গ্রামের মানুষ দাবি করে জাদুকর নাজিম শাহের জাদুর কারসাজি তা। তাই তারা ক্ষতিপূরণ চায় ও ইট পাটকেল ছুড়তে থাকে মঞ্চ উদ্দেশ্য করে। তখন ই ত্রাণকর্তা রূপে আবির্ভাব ঘটে আল্লারাখার। সে ৭৮৬ ফুলের বন্যা বসিয়ে দেয় তার নিজস্ব জাদুর খেলা দেখিয়ে। যা দেখে উপস্থিত দর্শক অভিভূত হয়ে যায়। নাজিম শাহের তহবিল মুদ্রার ঝনঝনানি তে পূর্ণ হয়ে যায়। কেননা, আল্লারাখার গোলাপ ফুলের খেলার আকর্ষণেই মানুষ আসতে থাকে দলে দলে। সৈয়দ শামসুল হক সাহেব ৭৮৬ টি গোলাপের রেফারেন্স কেন টানছেন আমি জানি না তবে গ্রামে গঞ্জে "বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম" এর গাণিতিক সংকেত রূপে ৭৮৬ এর ব্যবহার দেখা যায়। আল্লারাখার খেলায় দলের আয় বৃদ্ধি পেলেও দলের অন্যান্য সদস্যের হিংসাত্মক মনোভাব ও বৃদ্ধি পায়। অনেক চড়াই উৎরাই এর পর অবশেষে পরিণতি পায় গল্প।
সৈয়দ শামসুল হক সাহেব নাকি মাত্র একদিনে এই উপন্যাস লিখেন। সুন্দর এই উপন্যাসটি পড়ে বেশ উপভোগ করেছি।
রক্তগোলাপ গল্পটা স্কুলের লাইব্রেরিতে আধা পড়েছিলাম ক্লাস সেভেনে বা এইটে, এরপর কিসের যেন একটা ছুটি শুরু হলো। বইটা আর পড়া হয়নি। কোনোদিন খুজেও পাইনি। নামটাও মনে ছিল না গল্পের, কোনো একটা সংকলনে ছিল আর গল্পটার আধা কাহিনি মনে আছে। আধা কাহিনী সম্বল করে, এখানে সেখানে সার্চ করে, একে ওকে জিজ্ঞাসা করে একদিন পেয়েই গেলাম গল্পটা!! বিছানার তোষকের নিচে কিংবা ঘরের আলমারির নিচে হঠাৎ বা টাকা বা ঝোপঝাড়ের আড়ালে পাওয়া ক্রিকেট বল খুজে পাবার থেকেও বেশি আনন্দ হয়েছিল সেদিন। এই লেখাটা রিভিউ পোস্ট নয়। বইটার সাথে আমার একটা সুন্দর স্মৃতি আছে, সেটা পাঠককে জানাতে চেয়েছি, এইটুকুই।
"বছরের এ সময়ে বৃষ্টি হয় কেউ কখনাে শােনেনি। এ হচ্ছে এমন একটা সময় যা আকাশটা প্রজাপতির পাখার মতাে ফিনফিন করতে থাকে রোদ্দুরে, নীল রঙে; যখন উত্তর থেকে নতুন প্রেমের মতাে গা-শির-শির-করা মিষ্টি বাতাস বয় কী বয় না তা বােঝাও যায় না ; যখন লােকেরা খুব স্ফূর্তির মেজাজে থাকে আর বলাবলি করে সংসারে বেঁচে থাকাটা কিছু মন্দ নয়; আর ছেলেমেয়েরা কাচের জিনিসপত্তর ভাঙলেও যখন মায়ের কিছু বলে না; যখন হাট বসতে থাকে বিকেলের অনেক আগে থেকেই আর ভাঙতে ভাঙতে অনেক রাত্তির হয়ে যায়, কারণ বছরের এ রকম সময়ে অনেক রাত্তিরেও মানুষ একা হয়ে যায় না, ভয় করে না, নদীর খেয়া বন্ধ হয় না। এ রকম দিনে বৃষ্টি হয় বলে কেউ কখনাে শোনেনি।"
এটা যে ১৯৬৩ সালে ঢাকার মাউরেন্ডার রেস্তোরাঁয় একবসাতে লেখা একটা উপন্যাস সেটা ভাবতেই অবাক লাগে খুব।
‘রক্তগোলাপ’ পড়া শেষ করে একটু ধাক্কা খেলাম। প্যাট্রিক সাসকিন্ড’র ‘পারফিউম’ উপন্যাসের কথা মনে পড়ে গেল। সিনেমাটি আমার ভীষণ প্রিয়। জাদুবাস্তবতার আবরণে সূক্ষ্মভাবে মোড়া। রক্তগোলাপ গল্পটাও তেমন। লেখক ক্ষণিকের জন্য গোলাপের পাপড়ির ভেতর ডুবিয়ে দিলো যেন। দ্রুত সালটা মিলিয়ে নিলাম, রক্তগোলাপ এখানে বয়স্ক। পারফিউম রচিত হয়েছে এর বহু পরে। তবে থিমটা এক হলেও কাহিনি পুরোপুরি ভিন্ন। মনে গেঁথে গেল।
রক্তগোলাপ আমাকে হয়তো নাড়া দিয়েছে কিংবা ব্যথিত করেছে অল্প। কিন্তু ‘জনক এবং কালোকফি’? এক বিস্মৃতির সাগরে লেখক মনে হলো চুবিয়ে ধরল মাথাটাকে। দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে দেখলাম। অতীত, বর্তমান... বর্তমান, অতীত। কী নিদারুণ অবহেলা আবার পরমুহূর্তে সুখকে পায়ে ঠেলে দেওয়ার পাগলামি। পাগলাটে। দর্শন আছে, আবেগ আছে, কষ্ট আছে... লুকানো সব স্মৃতিদের ক্লান্তিকর যাত্রা আছে। শেষটা ভুলবার নয়। মনে থাকবে অনেক দিন।
লেখকের শব্দচয়ন, বর্ণনার ধাঁচ নিয়ে সম্ভবত বেশিকিছু বলার প্রয়োজন নেই। মুগ্ধতা নিয়ে পড়ে যাওয়া যায়, আবার হারিয়ে যেতে অসুবিধা হয় না।
"সারা হলে তখন পশলার পর পশলা গোলাপের বৃষ্টি হচ্ছে। ফোয়ারা থেকে শীকরের মতো উৎক্ষিপ্ত হচ্ছে গোলাপ, গাঢ় থেকে গাঢ়তর হচ্ছে সুগন্ধ। ভারি হয়ে আসছে বাতাস। এক আশ্চর্য যাদুর সন্ধান পেয়ে লোকের কণ্ঠে মুহুর্মুহু ধ্বনিত হচ্ছে অভিনন্দন। সাতাশ-আটাশ-উনত্রিশ-ত্রিরিশ- শেষ ছোরাটা জহিরের হাত থেকে যখন উড়ে গেল তখন গোলাপ ছাড়া আর কিছুই দেখা গেল না সারা হলে। যেন গোলাপের ঝড় উঠেছে। রাশি রাশি গোলাপ উড়ছে, ছিটকে পড়ছে ডুবিয়ে দিচ্ছে- গোলাপ আর গোলাপ। এমনকি সারা স্টেজেও আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না, শুধু অগণিত গোলাপের রঙ আর সুগন্ধ।
সমুদ্র জলোচ্ছ্বাসের মতো করতালির মধ্যে নেমে এলো পর্দা। দৃশ্য আড়ালে চলে গেল, আর দেখা গেল না, তবু সে করতালি থামল না। থামল না সপ্তমে ওঠা ব্যান্ডপার্টির সুর। থামল না প্রফেসরের অবিশ্রান্ত করাঘাত। চম্পা জানতেও পারল না সাতশ' ছিয়াশিটা গোলাপ ফুরিয়ে গেলেও ফিরদৌসি আজ আবার গোলাপ আনতে পেরেছে..."
এই গল্পের মূল চরিত্র আল্লারাখা বা ফিরদৌসি যেমন গোলাপ ফোটায় জাদু দিয়ে, তেমনই শব্দের জাদু দিয়ে গোলাপ ফোটাতেন সৈয়দ শামসুল হক । তার একটা অনন্য সুন্দর উপন্যাসিকা বা বড়োগল্প এই রক্তগোলাপ। এর ভাষা কাব্যিক কিন্তু সহজ, সাবলীল। গভীর প্রেমের গল্প এটি কিন্তু ভীষণ বাস্তবতারও গল্প। এরকম আরেকটি লেখা বাংলা সাহিত্যে আছে কিনা জানা নেই আমার। বইপোকাদের জন্য বইটিকে আমি জোরালোভাবে সুপারিশ করছি।
বইটি থেকে কিছু অংশ পড়ে শোনালাম আর নীচে দেওয়া ছোট ছোট অংশ থেকে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে ভাষার সৌন্দর্যের। বাংলা ভাষাটা যে কতো মধুর আর যাদুকরী হতে পারে তা বোঝার জন্য সৈয়দ শামসুল হকের লেখা পড়তেই হবে।
“এক অপরিসীম ক্ষুধা, গ্লানি আর করুণার চিত্র, অন্ধকারে নৃত্যপর কংকাল আর উড়ন্ত রৌপ্যমূদ্রা। সে এক নির্মম আগন্তুক, ফিরদৌসি। হাতে তার রক্তগোলাপ”।
“বন্ধুগণ, টাকা দিয়ে কেনা যায় না, সাধনা করে পাওয়া যায় না, সাত আসমান আর দো-জাহানের লাখো কুদরৎ এর এক কুদরৎ রক্তগোলাপ”।
“ সে রাতে বাড়ি ফিরতে ফিরতে লোকেরা বলাবলি করলো - দু'হাজার। অনেকে বলল, কম করে হলেও চার হাজার গোলাপ। তারা বাড়ি পৌঁছুনোর সঙ্গে সঙ্গে সংখ্যা গিয়ে দাঁড়ালো দশ হাজারে। সারা রাত ধরে তাদের মধ্যে এই আলোচনা। গর্বের সঙ্গে প্রত্যেকে দেখাল তাদের বাড়ি নিয়ে আসা একেকটা গোলাপ”।
“স্বপ্ন,বাস্তব, মায়া, বিভ্রম, বস্তু সবকিছুরই একটা সীমারেখা কোথাও না কোথাও আছে।“