সেন্ট্রাল অ্যাভিনিউ দিয়ে হেঁটে যান বিদ্যাসাগর, বেথুন সাহেব, নজরুল, ডিরোজিওর মতো ব্যক্তিত্বরা। সেই সময়ের কলকাতা শহরের স্মৃতিচিহ্নগুলো এখন যেন থেকেও নেই। এর কোনোটা হেরিটেজ তকমা পেয়েছে কোনোটা আবার পায়নি। এরকমই কিছু ঠিকানার সন্ধানে বেরিয়েছে দুই বন্ধু টিনা আর অলীক। কখনো ওরা খুঁজে দেখেছে সুকিয়া স্ট্রিটে বেথুন স্কুলের প্রথম ঠিকানা। সল্টলেকের বিখ্যাত লালবাড়ি যেখান থেকে স্থানীয়ভাবে শুরু হয়েছিল গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ, সেই বাড়ির এখন কী অবস্থা? ছকভাঙা দুর্গাপ্রতিমা বানিয়েছিলেন মৃৎশিল্পী গোপেশ্বর পাল। তাঁর স্টুডিয়ো ঠিক কোথায়? মল্লিক বাজারের ভিড়ে লুকিয়ে থাকা একসময়ের গর্বের গ্যাসচুল্লি অথবা তালতলার নজরুলের ‘বিদ্রোহী’ কবিতা লেখার বাড়ি, বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন স্কুলে বিদ্যাসাগরের ঘড়ির কথা কতজন জানেন? ইন্ডিয়ান মিরর স্ট্রিটে অভিনেত্রী নার্গিসের ছোটোবেলার বাড়ির উঠোনে এখন মোটর পার্টসের দোকান। মানিকতলার কবরস্থানে অবহেলায় পড়ে থাকা রবীন্দ্রনাথের চিকিৎসকের সমাধি অথবা দমদমের পিয়ার্স সাহেবের স্মৃতিস্তম্ভ। সবই কি এই নগরায়ণের সঙ্গে মুছে যেতে বসেছে? বিবর্ণ, বিস্মৃতপ্রায় শহরের এই সব ঐতিহ্যকে নিয়েই
❛হাজার বছর ধরে পৃথিবীর পথে হেঁটে চলেছে কত না গৌরব, অতীত। আজ সেসব স্মৃতি। নগরায়নের জোরে কত ঐতিহ্য বিলীন হয়ে গেছে তার কি হিসেব আছে? এই পিচঢালা পথেই এককালে বিচরণ করেছিল রাজা, জমিদার আর বিখ্যাত সব মানুষেরা। তাদের পদ ধুলি মিলিয়ে গেছে। তেমনি বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে কত গৌরবময় দিন!❜ কলকাতা এক জাদুর শহর। পুরোনো আর আধুনিকতার এক জম্পেশ মিশেল কলকাতা। শত শত বছরের পুরোনো দালান আবার একদিকে আধুনিক বহুতল। কোনো বহুতল আবার উঠেছে পুরোনোকে দুমড়ে। এত পুরোনো বাড়ি আর অতীতের মাঝে কত ইতিহাস যে লুকিয়ে আছে তার শেষ নেই। টিনা ইতিহাসপ্রেমী। কলকাতার অলিগলি ঘুরে সেখানে চাপা যাওয়া ইতিহাসকে জানতে চায়। আফসোস করে, কত গৌরবময় অতীত ছিল তার প্রিয় নগরী কলকাতার! এই যেমন সেদিন বন্ধু অলীককে নিয়ে টিনা বেরিয়ে গেল বেথুন সাহেবের স্কুলের খোঁজে। বেথুন সাহেব কে জানেন তো? বাংলায় নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নেয়ার পথিকৃৎ। বেথুন কলেজিয়েট স্কুল তো আছেই। তবে কেউ কি জানে একদম শুরুতে বেথুন সাহেবের সেই স্কুল কোথায় শুরু হয়েছিল? দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের সেই ❛৫৬ সুকিয়া স্ট্রিট❜ এর বাড়ির উঠোনেই বসেছিল নারীদের প্রথম পাঠদান। টিনা আর অলীক আসল সেই সুকিয়া স্ট্রিটের বাড়ির খোঁজে অলিগলি ঘুরেছে। কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ আর প্রোমোটারের গুণে হারিয়ে গেছে সেই অজানা হেরিটেজ। নারীদের শিক্ষা শুরুর সেই আবেগময় স্থান আজ আর কি পাওয়া যায়? ৩/৪ সি তালতলা লেনের এক বাড়িতে রাত জেগে কবি নজরুল লিখেছিলেন তার বিখ্যাত সেই কবিতা ❛বি দ্রো হী❜। এর ইতিহাস মুগ্ধ করার মতো। কী করে বিজলী পত্রিকায় ছাপা হলো সে কালজয়ী কবিতা? জানেন কি নজরুল এক রাতে সে কবিতাটা লিখেছিল পেন্সিল দিয়ে! টিনা খুঁজে বেড়ায় সে বাড়ি। কোথায় সেই ইতিহাসে জায়গা করে নেয়া ক্ষণের আবাস? আজ সেখানে কারা বাস করে? যে বাড়িতে বসে নজরুল টিমটিমে আলোয় লিখেছিলেন, ❛বল বীর- চির-উন্নত মম শির!❜ সে বাড়ি কেন হেরিটেজ হিসেবে জায়গা পায়না? মল্লিকবাজারের কাছেই ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়েছিল এক গ্যাসচুল্লী। তখনকার আমলে এমন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তৈরি চুল্লী তাও এই উপমহাদেশে ভাবাই যায় না! এই গ্যাসচুল্লীলতেই দাহ হয়েছিলেন জগদীশচন্দ্র বসু। কলকাতার ইতিহাসের আরেক পাঠ পেলো টিনা। এক কালের অবাক করা চুল্লী আজ পড়ে আছে অযত্নে, অবহেলায়। চুরি যাচ্ছে এর যন্ত্রাংশ। বাকি জায়গা জবরদখল হয়েছে কিংবা উঠছে বহুতল। অথচ কলকাতার হাওরা ব্রিজ কিংবা অন্যান্য নির্দশন থেকে কোনো অংশে কম ইতিহাস বহন করেনা এই চুল্লী। আগামী প্রজন্ম কী করে জানবে শত শত বছর আগের বাংলার ইতিহাস? টিনা গেছে সমীরদার সাথে পুরোনো আমলের ঘড়ি কিনতে। সেখানে সব অবাক করা পুরোনো ঘড়ি। যেগুলোর ইতিহাস কালের গর্ভে মিলে গেছে। আপনি জানেন কেন গ্রান্ডফাদার ক্লকের এই নামকরণ? ইতিহাসটা আপনাকে পুলকিত করবে। তো যাক, সেখানেই টিনা সন্ধান পায় ঈশ্বরচন্দ্রের মেট্রোপলিটন স্কুলে ব্যবহার করা ঘড়ি। যা তার অফিস ঘরে লাগানো ছিল। যাতে প্রতিদিন দম দিতেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর। চল্লিশ বছর অচল থাকার পর ফের চালু হলো সেই ঘড়ি। কলকাতার নিউ টাউন হাজার বছর আগে কী ছিল? ভাবলেই কেমন মনে হয় না! সময়ের চাকা পিছে চলে যাচ্ছে আর আমি ভাবছি কী ছিল হাজার বছর আগে এখানে? প্রবীণদের কাছ থেকে জানা গেল এখানে বয়ে গেছিল বিদ্যাধরী নদী। এখানে হয়তো ছিল কোনো জনপদ। আজ যা কালের গর্ভে ঢিবির রূপ নিয়েছে। সেখানে প্রায়ই পাওয়া যায় নানা ঐতিহাসিক জিনিস। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ চেষ্টা চালাচ্ছে এর খনন করতে। কে জানে কোন সহস্র পুরান ইতিহাস চাপা পড়ে আছে! দমদমের পিয়ার্স সাহেবের সেই উঁচু স্মৃতিস্তম্ভ আজ স্কুলের নতুন কারুকার্যে দেখা যায় না। অথচ একটা সময় ছিল সেই স্তম্ভ যশোহর রোড থেকে দেখা যেত। টিনার বান্ধবী দিপার সাথে কথা প্রসঙ্গে পিয়ার্স সাহেবের সেই সৌধের ইতিহাস জানে তারা। কিন্তু আজকালের কজনই বা সেই ব্রিটিশ আমলের দারুণ কারুকার্য করা এই সৌধের আসল ইতিহাস জানেন? বিদ্যাসাগরের জন্মশতবর্ষে সেই ১৯২০ সালে ❛উল্টাডাঙ্গা লাইব্রেরি❜ চালু হয়েছিল। সেটা একসময় হয়ে ওঠে বিপ্ল বীদের আস্তানা। এরপর কত চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আর পরিমার্জনের মধ্য দিয়ে আজও কোনোভাবে দাঁড়িয়ে আছে এই পাঠাগার তার ইতিহাস জানলে কখনো বেশ দারুণ লাগে। আবার হতাশা জাগে। সামনের প্রজন্ম এগিয়ে নিয়ে যাবে এই ইতিহাসকে নাকি একসময় দোর বন্ধ হয়ে যাবে এর? টিনার চিন্তা শেষ হয় না। শেষ হয় বাড়ি ফেরার পথ। ❛বো মা র মাঠ❜ নামটা শুনলেই কেমন আগ্রহ জাগে না? টিনার তো নামটা শুনেই কৌতূহল হয়েছে। রাকেশকে নিয়ে ছুটেছে এই মাঠের নামকরণের ইতিহাস জানতে। শত বছর পেরিয়ে আজ আর কেউ জানে না এই মাঠের নামের পিছে ব লি দান আছে ১৪ জন বিল্পবীর। যাদের ইতিহাস মনে রাখার কথা দিয়েও ভুলে গেছে। আজকের সল্টলেক আর পূর্বের লবণ হ্রদ এবং এরসাথে জড়িত গান্ধীর লবণ সত্যাগ্রহ আ ন্দোলনের ইতিহাস খুঁজতে এসে টিনা ভারাক্রান্ত হয়ে যায়। কলকাতায় এই আ ন্দোলন করা লক্ষ্মীকান্ত প্রামাণিক জমিদারের ইতিহাস এবং তার বর্তমান প্রজন্মের কথা জেনে দুঃখ পাওয়া ছাড়া কিছুই করার নেই। সংরক্ষণের অভাব, হেরিটেজ তকমা না পাওয়া আর ক্রমাগত প্রোমোটারের প্রস্তাব ফিরিয়ে কেমন ভঙ্গুর হয়ে দাড়িয়ে আছে লাল ইটের তৈরি বিশাল সেই বাড়ি। ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম শুনেছেন? রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র এদের অ স্ত্রোপচার করা চিকিৎসক ছিলেন তিনি। সার্জারিতে যিনি ছিলেন ব্রিটিশ আমলে এক কথা। সেই ব্যক্তির সমাধি অবহেলায় আর আগাছা ধুলোয় পড়ে আছে মানিকতলার এক সেমিট্রিতে। হেরিটেজ হলেও যত্নের অভাব চারদিকে দৃশ্যমান। তেমনি অরু আর তরু দত্তের সমাধি। যেখানে লেখা হাজার বছরেও কেউ তাদের ভুলবে না। সেখানে শত বছর পেরোতেই কেউ আজ চিনে না কে এই দুই বোন? কী তাদের অবদান? ইতিহাস এভাবেই সবাইকে ভুলিয়ে দেয় নাকি আমরাই ভুলে যাই? ক্ষুদিরামের কথা আমরা জানি। তবে ক্ষুদিরামের সেই সাহসিক কাজের মতোই আরো কয়েক বছর পর একই সাহসিক কাজ করে ফাঁ সির কাষ্ঠে ঝুলেছিলেন গোপীনাথ সাহা। ঘটনা ১৯২৪ সালের। পথ চলতে গিয়ে টিনা গোপীনাথের মূর্তি দেখে থমকে দাঁড়ায়। জেনে নেয় ইতিহাস। আর ভাবে গোপীনাথ সেই আঠারো বছর বয়সেই যে কাজ করতেন সেটা এই যুগে কেউ ভাবতে পারত? হাতের খেলায় কীভাবে একদলা মাটি থেকে অপূর্ব মূর্তি তৈরি হয়! মৃৎশিল্পী গোপেশ্বর ছিলেন তেমনই একজন। আপনার সামনে বসে কথা বলতে বলতে আঙুলে টিপে হুবহু আপনার মূর্তি বানিয়ে উপহার দিয়ে দিতে পারেন! গোপেশ্বরের তৈরি মূর্তি হেরিটেজ হিসেবে ঘোষণা হলেও তার বংশধর এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ কতটুক হচ্ছে? নার্গিস দত্তকে চিনেন? সঞ্জয় দত্তের মাতা তিনি। জানেন তিনি বেড়ে উঠেছিলেন কলকাতার মিরর স্ট্রিটের এক ঘুরানো সিঁড়ি ওয়ালা বাড়িতে? সেখানে ছিলেন তার মা জদ্দনবাই। টিনা আর শঙ্করদা নার্গিসের সেই বাড়িতে কড়া নাড়বে নাকি ভাবছিল। যেখানে এক প্রান্তে আজ তৈরি হয়েছে মোটরপার্টসের দোকান। স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িতে এসেছিলেন সঞ্জয় দত্ত। কিন্তু টিনারা আম আদমি। বর্তমানে যারা বাস করেন তারা কি দেবে ঢুকতে? ইতিহাস নিয়ে তাদের তো মাথাব্যথা নাও থাকতে পারে! ট্রাম, বাস চলে। কলকাতা শহর আলোকিত হয়। কিন্তু ইতিহাসের সেই আলোগুলো ধীরে ধীরে নিভে যায়। মনে রাখার মতো মন আছে খুবই কম মনুষ্যের। পাঠ প্রতিক্রিয়া: ❝কলকাতার অজানা হেরিটেজ❞ কলকাতার অলিগলিতে হারিয়ে যাওয়া, উপে���্ষিত ঐতিহাসিক জায়গা নিয়ে লেখা আর্যভট্ট খানের বই। গল্পের ছলে লেখক ইতিহাস এবং তার খোঁজ খবর করা কলকাতার বিস্মৃত ইতিহাস নিয়ে বইটি সাজিয়েছেন। কলকাতা নিয়ে আমার আগ্রহ অনেক বেশি। বনেদি বাড়ি, পুরোনো গন্ধ মিশে থাকা শহরটায় না গেলেও বইয়ের পাতায় কিংবা টিভিতে যেটুক পেরেছি জেনেছি। বাংলাদেশের পুরান ঢাকাকে আমার কাছে এক টুকরো কলকাতা মনে হয়। সেই পুরোনো দালান, জমিদার কিংবা রাজাদের ইতিহাস, ফেলে রাখা বসত বাড়ি, ভঙ্গুর, আগাছা ধরা বাড়িগুলো যখন দেখি আমার অদ্ভুত অনুভূতি হয়। পুরান ঢাকায় গেলে কিংবা ইতিহাস সম্পর্কিত কোনো জায়গায় গেলে আমার চোখে আপনাই অতীত ভাসে। কল্পনা করি এই রাস্তাতেই এক কালে ব্রিটিশদের পদচারণা ছিল, এখানেই কোথাও মিশে আছে দেশপ্রেমী কারো র ক্ত। কয়দিন আগেই মুক্তাগাছা জমিদার বাড়ি গিয়েছিলাম। বাড়ির ভঙ্গুর দশা, ভেতরে কলমের আঁকাআঁকি, অমুক+তমুক কিংবা বিশাল বাড়ির অনেকটাই স্কুল বা অন্য কাজে ব্যবহার দেখে আমার খুব খারাপ লাগছিল। কত ইতিহাস আমাদের। কিন্তু দখল আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে সেসব হারিয়ে যাচ্ছে। এই বইটা প্রথম দেখেই আগ্রহ হয়েছিল। লেখক কাঠখোট্টা গবেষণামূলক না লিখে কাল্পনিক চরিত্রকে বাস্তবের সাথে মিলিয়ে ইতিহাসের বয়ান করেছেন। কলকাতার বিস্মৃত, উপেক্ষিত ১৪ টি অজানা হেরিটেজ নিয়ে লিখেছেন। এর অনেকগুলোই অজানা ছিল। আবার জানা ইতিহাসগুলোর পেছনের ইতিহাসও দেখা গেছে অজানা। যেমন নজরুলের কবিতা লেখার সেই ইতিহাস এবং কিভাবে বিজলীর সম্পাদক চতুরতার সাথে আরেক পত্রিকাকে টপকে নিজের পত্রিকায় ছাপিয়ে দিয়েছিলেন কবিতাটা সে ইতিহাস চমকপ্রদ ছিল। তেমনি নিউ টাউনের মাটির ঢিবির নিচে আসলেই কোনো চেপে যাওয়া সভ্যতা বা জনপদ আছে নাকি সে নিয়ে আগ্রহ জেগেছে। টিনা কাল্পনিক চরিত্র হলেও এ লেখকেরই আরেক সত্তা। যার ইতিহাস নিয়ে আগ্রহ। কলকাতার নামী এই ইতিহাসগুলো অবহেলায় যেভাবে আছে তা দেখে টিনার মতো আমারও দুঃখ হয়। প্রতিটা হেরিটেজ কিংবা না হওয়া তবে হেরিটেজ তকমা প্রাপ্য স্থানগুলোর ইতিহাস আমার বেশ লেগেছে। এগুলো নিয়ে আলাদা লিখতে কিংবা হতাশা প্রকাশ করতে গেলে নির্ঘাত মহাকাব্য হয়ে যাবে। শুধু কলকাতা কেন? আমাদের দেশেও ঐতিহাসিক নিদর্শন কি কম? শুরুতেই মুক্তাগাছার কথা বললাম। আরো কয়েক বছর আগে পুরান ঢাকা নিয়ে একটা ছোটো আর্টিকেল লেখার জন্য ছবি তুলতে গিয়েছিলাম। বেচারাম দেউড়ি, বড়ো কাটরা, ছোটো কাটরা আর বেশ কিছু পুরোনো দালানের ছবি সংগ্রহ করতে গিয়ে আমি হতাশ হয়ে গেছিলাম। বিশাল সেই বড়ো কাটরা, ছোটো কাটরার গেট বা ফটক ছাড়া পুরো জায়গাই দখল হয়ে গেছে। সেখানে সেলুন, আলু পুরির দোকান সহ জমজমাট বাজার। ইতিহাসের ছিঁটেফোঁটাও ছিল না। ছবি তুলতে গিয়ে ভাবছিলাম সেলুনের ছবি তুলবো কী করতে? এই স্থানগুলো আমাদের সোনালী অতীতের নিদর্শন। প্রযুক্তি আর নগরায়নের তোপে আমরা আমাদের শিকড় ছাড়িয়ে কত দূরে যে এসে পড়েছি তার শেষ নেই। আলো ঝলমলে সন্ধ্যায় আজকে হয়তো আমরা আছি, তবে ভবিষ্যতে আমাদের কে মনে রাখবে? ইতিহাসের বাঘা বাঘা ব্যক্তিরাই যদি হারিয়ে যায়! বইটা পড়তে গিয়ে নিজের দেশের হেরিটেজ সাইটগুলোর কথা ভাবছিলাম। এগুলোও হারিয়ে যাচ্ছে বহুতলের নিচে। লেখক হয়তো বইটির আরো খন্ড আনবেন। টিনার ইতিহাস প্রেমের সাথে হয়তো আবার কোনো গলিঘুপচি থেকে জানা যাবে হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস। তখন হয়তো টিনা গাইবে, কলকাতা, তুমিও হেটে দেখো কলকাতা, তুমিও ভেবে দেখো যাবে কি না যাবে আমার সাথে......... প্রচ্ছদ: কথায় বলে, আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী। এই বইটা আমি মূলত এমন আকর্ষণীয় প্রচ্ছদের মায়ায় পড়েই নিয়েছিলাম। খুব ভালো লেগেছে প্রচ্ছদ। ❛ইতিহাস একটা দেশের অতীতের সাক্ষী। অতীত ছাড়া বর্তমান হয় না। তাই উচিত অতীতের এই স্মৃতিগুলোকে শুধু মনের জানালায় আবদ্ধ না রেখে এর সংরক্ষণে মনোযোগী হওয়া। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে জানিয়ে দেয়া - কে আমরা, কী আমাদের শিকড়!❜
কলকাতা—এক শহর, যা কেবল একটি ভূগোল নয়, বরং একটি ইতিহাস। পিচঢালা রাস্তাঘাট, আধুনিক বহুতল আর পাশের গলির জীর্ণ ফাটলে লুকিয়ে আছে এমন সব বিস্মৃত কাহিনি, যা হয়তো কালের গর্ভে হারিয়ে যেত—যদি না কেউ তুলে ধরতেন সেই অলিখিত অধ্যায়গুলোকে। আর্যভট্ট খানের “কলকাতার অজানা হেরিটেজ” বইটি ঠিক সেই দায়িত্বই নিয়েছে।
লেখক এখানে ইতিহাস তুলে ধরেছেন এক অনন্য কৌশলে—এক কল্পিত চরিত্র ‘টিনা’র চোখ দিয়ে। টিনা একজন ইতিহাসপ্রেমী তরুণী, যার ভেতরে লেখকের অনুসন্ধানী সত্তার প্রতিফলন স্পষ্ট। তার পথচলায় আমরা সাক্ষাৎ পাই এমন সব স্থান, ব্যক্তিত্ব ও স্মৃতির, যেগুলোর নাম হয়তো অনেকেই শোনেননি, বা শুনেও গুরুত্ব দেননি।
বেথুন সাহেবের প্রতিষ্ঠিত প্রথম নারী বিদ্যালয়ের প্রকৃত অবস্থান, নজরুলের “বিদ্রোহী” কবিতার জন্মরাত, জগদীশচন্দ্র বসুর দাহ সম্পন্ন হওয়া গ্যাসচুল্লির ইতিহাস, বিদ্যাসাগরের ব্যবহৃত ঘড়ির সন্ধান, নিউ টাউনের নিচে লুকিয়ে থাকা সম্ভাব্য প্রাচীন সভ্যতা, কিংবা নার্গিস দত্তের বেড়ে ওঠা বাড়ির স্মৃতি—সবকিছুই এখানে খণ্ড খণ্ড ইতিহাস নয়, বরং এক বৃহৎ ক্যানভাসের রঙিন অংশ।
বইটির সবচেয়ে প্রশংসনীয় দিক হলো—এটি গবেষণাধর্মী হয়েও একেবারেই কাঠখোট্টা নয়। ইতিহাসের ভার চাপিয়ে না দিয়ে, গল্প বলার ভঙ্গিতে এগিয়েছে প্রতিটি অধ্যায়। পাঠকের সামনে যেন একের পর এক দরজা খুলে যায়—প্রথমে কৌতূহল, পরে বিস্ময়, আর শেষে একধরনের বেদনাময় প্রশ্নচিহ্ন রেখে যায়।
সত্যি বলতে, ইতিহাস শুধু বইয়ের পাতায় নয়, ছড়িয়ে থাকে পথের ধুলোয়, বাড়ির ইটপাথরে, আর প্রজন্মের স্মৃতিতে। সংরক্ষণই শ্রদ্ধার সর্বোচ্চ প্রকাশ।
আর্যভট্ট খানের “কলকাতার অজানা হেরিটেজ” পাঠককে সেই সংরক্ষণের জরুরি প্রয়োজনটি নিঃশব্দে, অথচ গভীরভাবে বুঝিয়ে দেয়। শুধু ইতিহাসপ্রেমী নয়, বরং যেকোনো সচেতন নাগরিকেরও এই বইটি অন্তত একবার পড়া উচিত। নমস্কার!
কলকাতার অজানা হেরিটেজ আর্যভট্ট খান বুক ফার্ম মম: ২৭৫/-
কলকাতার হেরিটেজ নিয়ে আগে ১-২ টো বই পড়েছি। কলকাতা সংলগ্ন আজকের রাজারহাট, নিউটউন, উল্টোডাঙা, সল্টলেকেও যে কত হেরিটেজ এলাকা অরক্ষিত, অবলহেলিত হয়ে পড়ে আছে এই বইটি পড়ে জানলাম। আরো জানার ইচ্ছে রইলো। সেইসব জায়গা আদতে হেরিটেজের তকমা পাইনি, তাই এখন সুউচ্চ ফ্ল্যাটবাড়ি, skyscraper উঠে তার সঠিক জায়গা আজ নিশ্চিহ্ন।
এই বইতে সেইসব হারিয়ে যাওয়া জায়গা, সত্য ঘটনার বিবরণ দেওয়া হয়েছে সামান্য গল্পের ছলে যাতে পড়তে ভালো লাগে।