লোকে বলে হেল হাউস, মানে নরক নিবাস... সোয়াশো বছরের পুরনো এক প্রাচীন বাড়ি। দেখলেই ভয় করে। বলতে গেলে ধরে-বেঁধেই অয়ন আর জিমিকে সেখানে নিয়ে গেল রিয়া। কারণ, ওর অ্যান্টিক-পাগল খালা কিনেছেন বাড়িটা, আর তারপর থেকেই অদ্ভুত সব কাণ্ড ঘটছে সেখানে। শোনা যাচ্ছে ভুতুড়ে শব্দ, রাতদুপুরে জ্যান্ত হয়ে উঠছে ব্রোঞ্জের মূর্তি, বাড়ির চারপাশে ঘুরঘুর করছে রহস্যময় কিছু মানুষ। তদন্তে নেমে দিশেহারা দশা হলো ওদের, পড়তে হলো মারাত্মক বিপদে। কী ঘটছে, কেন ঘটছে, কিছুই বোঝার উপায় নেই। এই জটিল রহস্য কি আদৌ ভেদ করতে পারবে ওরা?
রহস্যের ধরন অতটা নতুন না লাগলেও, সমাধানের প্রক্রিয়াটা দারুণ লেগেছে। ছোট ছোট টুইস্ট, বেশ কিছু চরিত্র কাহিনীটাকে বেগবান করেছে। আর রহস্যের মূল যে চাবিকাঠি, সেটাও আমার খুব ভালো লেগেছে। এটা ডেফিনিটলি ইউনিক একটা ব্যাপার ছিল। ইতিহাস দারুণ আগ্রহের বিষয়। মাদাম মিনার্ভার বিষয়টা যদিও আন্দাজ করতে পেরেছি। তবে সুখপাঠ্য সন্দেহ নেই। পাশাপাশি অয়ন-জিমি-রিয়ার খুনসুটি আর রিয়ার মার্শাল আর্ট গল্পটাকে অন্য মাত্রা দান করেছে। সব মিলিয়ে উপভোগ্য, সন্দেহ নেই।
ধুপধাপ! ধুপধাপ! ধুপধাপ! এই শব্দটা শুনলেই আমার মনে পড়ে যায় নিঝুম মজুমদারের কথা। জুলাই আন্দোলনে যখন ঢাকা ভার্সিটিতে ছাত্রলীগের গুন্ডারা সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের পিটাইতেছিল, তখন নিঝুম মজুমদার ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিছিল - 'ধুপধাপ ধুপধাপ ধুপধাপ'। কিন্তু, নরক নিবাসের সঙ্গে ধুপ ধাপের সম্পর্ক কী? বলতেছি।
অয়ন-জিমির বান্ধবী ভিক্টোরিয়া। ভিক্টোরিয়ার এক এন্টিক পাগলা খালাম্মা দেড়শো বছরের পুরনো ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের একটা বাড়ি খরিদ করেছে। বাড়ির নাম হেল হাউস, অয়নের ভাষায় - 'নরক নিবাস'। তো খালাম্মা হেল হাউসে ওঠার পর থেকেই তার জীবন হেল হয়ে যাওয়া শুরু হয়। দিন নাই, রাত নাই - বাড়ির বিভিন্ন জায়গা থেকে অদ্ভোত আওয়াজ শোনা যায়। ধুপধাপ! ধুপধাপ! ধুপধাপ! নিঝুম মজুমদার ঘপাঘপ! (নিচের লাইনটা অবশ্য শোনা যায় না)
যাই হোক, শুধু ধুপধাপ শব্দই নয়, নরক নিবাসে রাত-বিরেতে রাজা আর্থারের মূর্তিও জীবন্ত হয়ে ঘুরে বেড়ায়! প্রথমে রিয়া একাই 'ধুপধাপ রহস্য' সমাধানের চেষ্টা করে। কিন্তরিক সে পারে না। পরে বাধ্য হয়ে অয়ন-জিমিকে ডেকে নিয়ে আসে। সবাই তখন বুদ্ধি আর শক্তি খাটায়ে রহস্য ভেদ করে। মানে অয়ন বুদ্ধি খাটায়, জিমি শক্তি খাটায়, আর রিয়া ওদের দুইজনরে খাটায়।
অয়ন-জিমি সিরিজ সেবা থেকে প্রথমায় চলে আসার পর, এখন পর্যন্ত এই বইটাই বেস্ট লাগছে। এক শোয়ায় শেষ করার মতো বই। এই হরর হাউস টাইপের মিস্ট্রিগুলা আমার বরাবরই ভালো লাগে। সেই তিন গোয়েন্দা সিরিজের প্রথম বইয়ে টেরর ক্যাসেলের রহস্য থেকে ভালো লাগা শুরু। আগেও অয়ন-জিমি সিরিজে এই টাইপের একাধিক বই বের হইছে, সেইগুলাও যথেষ্ট ভাল ছিল। তবে আমার কাছে 'প্রাসাদবাড়ির রহস্য'র পর 'নরক নিবাস'ই সবচেয়ে বেশি ভাল্লাগছে। কিশোর থ্রিলার হিসেবে রহস্যটা যথেষ্টই জটিল ছিল। চরিত্রের ঘনঘটা ছিল। অয়ন-জিমি সিরিজের নিয়মিত সমস্ত বৈশিষ্ট্য ছিল। যেমন - অয়নের শাণিত বুদ্ধির ঝলকের সাথে ভূতভীতু জিমির চোখের পলকে দু:সাহসী হয়ে ওঠা, জিমি-রিয়ার উপভোগ্য খুনসুটি, রিয়ার কারাতের কারিকুরি - সবই একদম সঠিক মাত্রায় উপস্থিত ছিল। শেষে ফেলুদা স্টাইলে অপরাধীর মুখোশ উন্মোচন ছিল। সব মিলায়ে পারফেক্ট কম্বো।
তবে আমার ধারণা, বাড়ির ধুপধাপ রহস্য সমাধানের জন্য অয়ন-জিমির বদলে হিমুকে নিয়ে আসা হইলে আরও ত্বরিত ফল পাওয়া যাইতো। রাতের বেলা ঘুমানোর সময় হিমু দেখতো যে, মাজেদা খালার সদ্যমৃত স্বামী, অর্থাৎ খালুসাহেব খাটের নিচে সম্পুর্ণ নেংটো হয়ে বসে আছেন, আর একটু পরপর ধুপধাপ শব্দ করতেছেন। খালা তখন স্বীকার যাইতেন যে, তিনি 'ভুল করে' খালুর পিঠে মালিশের ওষুধ দুই চামচ খালুকে খাওয়ায় দিছিলেন। ফলে খালুসাহেব পটল তুলেছেন। খালুসাহেব এখন খালার ওপর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য নেংটো ভূত হয়ে খাটের নিচে বসে ধুপধাপ শব্দ করতেছেন। মামলা ডিসমিস!
যাই হোক, বুড়া বয়সে কিশোর বয়সীদের জন্য লেখা বইটা পড়ে ভাল্লাগছে। পড়ার সময় বয়স বিশ বছর কমে গেছিল। মনে হইতেছিল, আমার বয়স.... থাক! রেটিং: ৪.৫ (৫)
২০১৩/২০১৪ সালে প্রথম আমি কিশোর আলোর মুখ দেখেছি । কিশোর আলোতে ছিলো গল্প,উপন্যাস,কমিকসসহ অনেক কিছু আর এর মধ্যেই আমি প্রথম পেয়েছি ইসমাইল আরমানের লেখা "অয়ন-জিমির" কিশোর উপন্যাস। ধারাবাহিক এই উপন্যাস ছিলো আমাদের সবার ডিটেকটিভ পোকার খোরাক। প্রত্যেকমাসে অপেক্ষা করতাম এই কিশোর আলোর আর এই কিশোর আলো থেকে বই। বই নিয়ে কিছু কথা, চমৎকার এক কিশোর উপন্যাস। আমি এখনও এই উপন্যাসগুলো থেকে উঠতে পারিনি। বই পড়তে পড়তে প্রায় স্কুল জীবনের সময়গুলোর কথা মনে পড়ে। খুব সুবিন্যস্তভাবে উপন্যাসটি সাজানো হয়েছে। পড়ে বোর হবে না বৈকি, ছোট ভাই-বোনদের জন্য চমৎকার উপহার।