মাহবুব তালুকদার নেত্রকোনা জেলার (তৎকালীন মহকুমা) পূর্বধলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কর্মজীবনের সূচনায় ষাটের দশকের প্রারম্ভে তিনি ছিলেন দৈনিক ইত্তেফাক-এর সাংবাদিক। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যুক্ত হন। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধকালে তিনি প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের তথ্য বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৭২ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত বঙ্গভবনের কার্যকালে তিনি চারজন রাষ্ট্রপতির অধীনে সরাসরি দায়িত্ব পালনের সুযোগ পান। তিনি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহকারি প্রেস সচিব ছিলেন। এক সময়ে তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে সরকারি চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পূর্বে তিনি বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় নিয়োজিত ছিলেন। ২০১৭ সালে তিনি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনে নির্বাচন কমিশনার পদে পাঁচ বছরের জন্য নিয়োগ লাভ করেন এবং দায়িত্ব পালন করেন।
মূলত সৃজনশীল লেখক মাহবুব তালুকদার বিগত ৬৫ বছর যাবৎ নিরলসভাবে সাহিত্যচর্চা করছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে আছে উপন্যাস, গল্পগ্রন্থ, কাব্যগ্রন্থ, শিশুসাহিত্য, ছড়ার বই ও ভ্রমণকাহিনি। তিনি ২০১২ সালের বাংলা একাডেমি পুরষ্কার লাভ করেন।
মাহবুব তালুকদারের বঙ্গভবনে পাঁচ বছর একটা গুরুত্বপূর্ণ এবং সুখপাঠ্য বই। সেটা পড়েই লেখকের প্রতি ভরসা জন্মায় আর তাই আমার কলকাতা জীবনটা কেনা। ছোট্ট বই, পড়তে ৩০-৪০ মিনিটের বেশি লাগে না। কিন্তু এই বইটিও একইরকম সুখপাঠ্য। লেখকের কলকাতা থাকাকালীন স্মৃতিচারণে উঠে এসেছেন চেনা-অচেনা অনেক মানুষ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, বেলাল চৌধুরী, মৈত্রেয়ী দেবীদের সাথে সখ্য ছিল, পাশাপাশি অচেনা অর্চনাও সমীহ কেড়ে নেন নিজের ব্যক্তিত্বের দৃঢ়তায়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন কলকাতার একটা ছবি পাওয়া যায় এতে। লেখক অকপটেই স্বীকার করেছেন প্রচণ্ড দেশপ্রেমে আন্দোলিত হয়ে সীমানা পাড়ি দিয়ে, কী কারণে নিজেও জানেন না, ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েন তিনি। যুদ্ধে অংশ না নিয়ে কলকাতা ঘুরে বেড়াতেই ভালো লাগছিল প্রথমদিকে তাঁর। কিন্তু পরবর্তীতে বিবেকের তাড়নাতেই যুদ্ধের কাজে জড়িয়ে পড়েন। কথিকা লেখেন, সৃষ্টিশীল কাজে জড়িয়েও তো যোদ্ধাদের উৎসাহ দেয়া যায়, সেই কাজই করেন তিনি। তাঁর আপন ছোট ভাই মোসাদ্দেক তালুকদার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। লেখকের ঢাকার বাড়ির প্রতিবেশী ছিলেন প্রখ্যাত অভিনেত্রী সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়। পারিবারিক সম্পর্ক ভালো ছিল তাঁদের মধ্যে। ছোট বইটি পড়তে গিয়ে লেখক এক জায়গায় বলছেন, "জীবনের বহু মূল্যবান ঘটনাকে মানুষ অবলীলায় বিস্মৃত হয়ে যায়। আবার অনেক তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয় উজ্জ্বল জ্যোতিষ্কের মতো স্মৃতির আকাশ আলো করে থাকে। স্মৃতির মানদণ্ডে জীবনের বড় বড় ঘটনা নিতান্ত মূল্যহীন।" কথাগুলো একদম সত্যি।