বিশিষ্ট লেখক রাজা ভট্টাচার্যের কলমে চার দুর্দান্ত অ্যাডভেঞ্চার কাহিনি—‘তিন এক্কে ৪’। বইটিতে রয়েছে ৪টি উপন্যাসিকা।
- চন্দ্রগুপ্তের গুপ্তধন - প্রাণের প্রহরী - ম্যালোরির সেই ছবি - পূর্ণঘাটির দেবতা
আর্য, অরিত্র, ঋতম—তিন বন্ধু ওরা। তিনজনেই খুব সাধারণ, তবে একটি ব্যাপারে ওরা প্রত্যেকেই অসাধারণ। দূরের ডাক এলে এরা তিনজন সাড়া দিতে জানে। রোমহর্ষক অভিযানে এরা ছুটে যায় অজানার উদ্দেশে, তা সে থাইল্যান্ড বা ইন্দোনেশিয়ার কোনো দ্বীপ হোক কিংবা এভারেস্ট বেস ক্যাম্প। বিপদ নিজেই হাতছানি দিয়ে এদের ডেকে নেয়!
আজকের বাংলা সাহিত্যে বিষয়বৈচিত্র্য বিপুল। কিন্তু একটা ব্যাপার প্রায়ই আক্ষেপে কারণ ঘটায়। সেটি কী? একসময়, বিশেষত আমাদের ছোটোবেলায়, শিশু-কিশোর সাহিত্য এবং তারও মধ্যে বিশেষভাবে অ্যাডভেঞ্চার সাহিত্য পাঠকের মনে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা জুড়ে থাকত। সেই ব্যাপারটা ইদানীং প্রায় দেখাই যায় না। তার অনেক কারণ থাকতে পারে— ছোটোদের মধ্যে বাংলা পড়ার প্রবণতা কমে যাওয়া, বইয়ের জায়গাটা টিভি ও ইন্টারনেটের হাতে চলে যাওয়া... ইত্যাদি-ইত্যাদি। তবে এইসব ব্যাখ্যায় যুক্তি থাকলেও মনটা ভরে না। ঠিক এই জায়গাতেই প্রখ্যাত সাহিত্যিক রাজা ভট্টাচার্যের লেখা আলোচ্য বইটি ভ্যাপসা গুমোটে একঝলক ঠান্ডা, বৃষ্টির গন্ধমাখা বাতাস হয়ে এল। 'জলে জঙ্গলে পাহাড়ে' বইয়ে আমরা যে তিন বন্ধুর দেখা পেয়েছিলাম, সেই আর্য, অরিত্র, আর ঋতমকে তিনি ফিরিয়ে আনলেন। তারই সঙ্গে ফিরে এল প্রকৃতি আর রোমাঞ্চ মেশানো চারখানা অ্যাডভেঞ্চার। নামেই প্রকাশ, মোট চারটি ছোটো উপন্যাস (আদতে উপন্যাসিকা) আছে এতে। তারা হল~ ১. চন্দ্রদ্বীপের গুপ্তধন: অরিত্রর মামাবাড়িতে গিয়ে তার মামা শুভর কাছ থেকে আজকের বড়িশাল, এককালের চন্দ্রদ্বীপের ইতিহাস নিয়ে গল্প শুনছিল তিন বন্ধু। নিতান্তই কৌতূহলের বশে তাদের পুরোনো, পরিত্যক্ত বাড়িটা দেখতে গিয়ে কিন্তু তিন বন্ধু এবং শুভ এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হল। এরপরেই কিছুটা ঝোঁকে আর অনেকটা কৌতূহলে তিন বন্ধু চলল সাগরপাড়ি দিয়ে বহুদূরে, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল অপার ঐশ্বর্যময়ী প্রকৃতি আর এক ভয়ংকর বিপদ। ২. প্রাণের প্রহরী: রাতের বিলম্বিত ফ্লাইটে দিল্লি থেকে কলকাতা ফিরছিল তিন বন্ধু। একরকম হঠাৎ করেই তারা মুখোমুখি হল এক ভয়ংকর বিপদের। সেখান থেকে শুরু হওয়া ঘটনাক্রম তাদের নিয়ে গেল এমন এক দ্বীপে— যেখানে আজও টিকে রয়েছে পৃথিবীর বুক থেকে অবলুপ্ত হয়ে যাওয়া বহু প্রাণী। তারপর কী হল? ৩. ম্যালোরির সেই ছবি: এভারেস্ট নিয়ে তিন বন্ধুর গল্পে উঠে এসেছিল এক পুরোনো রহস্য। ১৯২৪ সালে এভারেস্ট অভিযানে জর্জ ম্যালোরি এবং তাঁর সঙ্গী আরভিনকে নর্থ-ইস্ট রিজ বরাবর উঠতে দেখা গেছিল। তারপর তাঁরা হারিয়ে যান। ম্যালোরির মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায় এর পঁচাত্তর বছর পর; কিন্তু আরভিন আজও নিরুদ্দেশ। প্রশ্ন হল, তাঁরা কি এভারেস্টে উঠতে পেরেছিলেন? এক দুর্ধর্ষ অ্যাডভেঞ্চারের মধ্য দিয়ে তিন বন্ধু এই রহস্যের উত্তর পেয়েছিল এই কাহিনিতে। ৪. পূর্ণঘাটির দেবতা: এক বিচিত্র রহস্যের সমাধান চেয়ে শুভমামার বন্ধু ঋভু (একবার পড়লেই বুঝবেন, কার ছায়া অবলম্বনে তাকে তৈরি করা হয়েছে) তিন বন্ধুর সাহায্য চাইল। সমাধানের জন্য তাদের যেতে হল পাহাড় আর জঙ্গল-ঘেরা এক প্রত্যন্ত এলাকায়— যেখানে একদিকে যেমন আছে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, অন্যদিকে আছে ভয়ংকর বিপদ। তারই মধ্যে, বুদ্ধি ও সাহসকে অবলম্বন করে তিন বন্ধু শুধু রহস্যেরই সমাধান করেনি; ইতিহাসের সহস্রাব্দী-প্রাচীন এক প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজে পেয়েছে তারা। এ-গল্প পড়ে আমার মাথায় শুধু একটাই কথা এসেছিল, "রোজ কত কী ঘটে যাহা-তাহা— এমন কেন সত্যি হয় না, আহা।" যদি আপনার মধ্যের অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় মানুষটি এখনও দশটা-পাঁচটার জেলে পুরোপুরি বন্দি না হয়ে থাকে, বা রিল ও ইন্সটায় ওপারের ভাষায় 'মাথা নষ্ট' না করে ফেলে থাকে, তাহলে এই বইটা পড়ুন। শুধু রহস্য-রোমাঞ্চ নয়; প্রকৃতি ও নিজেদের চারপাশের এই দুনিয়াটাকে ভালোবাসানোর জন্যও এ-বইয়ের তুলনা নেই। শুধু প্রতি গল্পে অন্তত একটা করে অলংকরণও যদি থাকত...