"প্রসারে চাই প্রচার" তত্ত্বে সম্ভবত ইমতিয়ার শামীম বিশ্বাস রাখেন না। নতুবা যে বইটি ২০০০ সালে প্রকাশিত হয়েছে তা নিয়ে গুডরিডসে আর বইয়ের গ্রুপগুলোতে এক দশক বাদে আলোচনা না হলে পাঠক তো জানতেই পারত না সাংবাদিক ইমতিয়ার শামীম কী অপূর্বতম এক উপন্যাস লিখেছেন।
১১৯ পাতার বইটি মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক অধ্যায়কে এত গভীরভাবে স্পর্শ করে গিয়েছে যে, বারবার পড়তে ইচ্ছে হয়। কিন্তু সেই ইচ্ছেকে চাপা দিতে হয় খুব সজ্ঞানে কারণ বাংলাদেশের রাজনীতির যে তমসাচ্ছন্ন পথ আমরা পেরিয়ে এসেছি কিংবা প্রতিনিয়ত পেরুতে সংগ্রাম করে যাচ্ছি তাকে আরো একবার অতিক্রম করবার চ্যালেঞ্জ সামনে এনে দেন ইমতিয়ার শামীম।
" অনেক রাতে আমাদের জানালা দিয়ে জ্যোৎস্নার আলো এসে মণীষার মুখের ওপরে অধরা মায়ার জাল বুনতে থাকে।" - ঠিক প্রথম লাইনেই পাঠককে মোটামুটি বেঁধে ফেলার ব্যবস্থা করবেন লেখক।উপন্যাসটির কথক তথাগত। তার ছেলেবেলা থেকে কাহিনী এগিয়ে যায়। প্রেক্ষাপট সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ।কিশোর তথাগত নির্ভার শান্তিময় ভঙিতে ঘুমাচ্ছে। কিন্তু সেই ঘুম হঠাৎ ভেঙে গেলে সে আবিষ্কার করে,
" তারপরই অস্পষ্ট বুটের আওয়াজ শুনে ঠিক -ঠিক বুঝে নেই রক্ষীর দল এসেছে বাবার খোঁজে।"
কেন তথাগতের বাবার খুঁজতে আসছে রক্ষীবাহিনী? তার বাবাও তো মুক্তিযোদ্ধা। কেনই বা তথাগতের বাবার সন্ধানে রাত বাহিনী আসে, যারা,
" বোঝানোর চেষ্টা করে শ্রেণীবিপ্লব শুরু হয়ে গেছে, এবার তবে শ্রেণীশত্রু খতম করার পালা। যাকে মারা হবে সে হলো শ্রেণীশত্রু।"
কারণ তথাগতের বাবা আর আট-দশটা সাধারণ মানুষের মতোই যারা নিজের পরিশ্রমে পরিবার নিয়ে সুখে-শান্তিতে বাঁচতে চান। এরাই আবার রাত বাহিনীর কাছে শত্রু। এই রাত বাহিনীর পরিচয়,
" রাত বাহিনীর কেউ তাদের বোকা বুড়োর গল্প বলে। বলে চিনের চেয়ারম্যানের কথা। "
ইমতিয়ার শামীম সরাসরি নকশাল কথাটি উল্লেখ করেননি, সর্বহারাদের নাম নেননি। অথচ ওপরের বর্ণনা পড়লে বুঝতে বাকি থাকে না কাদের কথা বলতে চাইছেন পাঠককে।
কিশোর তথাগত এবার আরো ভালো করে পরিচিত হয় রক্ষীবাহিনীর সাথে। তার স্মৃতিচারণ,
" জেনে গেছি রক্ষী বাহিনীর জামার হাতায় তর্জনি তোলা কাটা আজি আঁকা থাকে, বড় চুল মোটেই পছন্দ করে না তারা।অবশ্য তারা কি পছন্দ করে তাও বোঝা যায় না ভাল করে।"
তথাগতের বাবা যখন নিরাপত্তা চাইতে যায়। রক্ষী বাহিনী তার কাছে ১০ হাজার টাকা চায়। দিতে রাজি হন না তিনি।মুক্তিযোদ্ধা পিতার মনে পড়ে মুজিব বাহিনীর সাথে বামপন্থি বাহিনীগুলোর যুদ্ধকালীন তিক্ততার কথা।এরই মাঝে তিনি উল্টো যোগ দেন জাসদে! সেই থেকে হন্যে হয়ে তথাগতের পিতাকে খুঁজতে থাকে রক্ষীরা। যখন তখন হানা দেয় বাড়িতে। রক্ষীর হানাতে তথাগত ভাবে,
" প্রতিদিনই ওরা হানা দেয় কারও না কারও ঘরে, গরু-ছাগল না হলে মোরগ-মুরগি ধরে নি��়ে যায়। আর বিকৃত দেঁতো হাসি ছুঁড়ে প্রতিবারই বলে, অনেকদিন ভালমন্দ খাওয়াদাওয়া হয় না, কিছু মনে কইরবেন না। "
উপন্যাসে দেখতে পাই, কারও মন অবশ্য কিছু মনে করে না।
তথাগতের সাথে এক অদ্ভূততম সম্পর্ক তার বাবার সাথে। বাবা তাকে অনেকটা হিমুর বাবার মতো কিছু বাণী বলে।অবশ্য ইমতিয়ার শামীমের বাণীগুলো নিঃসন্দেহে ভিন্ন।তথাগতের পিতার সাথে সেই সম্পর্ক স্বপ্নে বোনা, এই নিবিড়তম স্মৃতিতে বিভোর তথাগতের মনে হতে থাকে,
" আমি এত তরুণ হতে যাই যে আমাকে কিশোর বলে বিভ্রম হয়,আমি এত কিশোর হয়ে যাই যে আমাকে বালক বলে ভুল হয়, এত বেশি বালক হয়ে যাই যে আমাকে শিশু বলে মনে হতে থাকে। "
কিন্তু এই স্বপ্নাতুর অনুভূতিতে মোহাবিষ্ট হয়ে থাকা হয়না তথাগতের। সে বাস্তবে বাস করে। সেখানে সে দেখে তার নিজের মা মারা গেছে। বাবা এক বিধবা নারীকে বিয়ে করেছেন। তারই কন্যা মণীষা। আরেকটি চমকের নাম মণীষা। সৎ বোন হলেও খানিকটা দুর্গার রূপে আবির্ভাব হয় সে। আর তথাগতের ভূমিকা অপুর। নাহ্। ঠিক ততটা সহজ করে ভাবেননি লেখক। মণীষার সাথে তথাগতের সম্পর্ককে ইমতিয়ার শামীম অন্যভাবে বিবৃত করতে চেয়েছেন। তা পাঠক হিসেবে অস্বস্থিতে ভোগাতে ছাড়েনি আমাকে। তবুও তথাগত আর মণীষা। সমবয়সী দুজনের কিশোরবেলার সম্পর্কে অনির্বচনীয় ভঙিতে উপস্থাপন করেছেন লেখক।
বাবা জাসদে।পলাতক।এক বর্গাজমি ছাড়া আয়ের উৎস নেই। চারিদিকে অস্থিরতা। বাবা ফিরে আসার আগপর্যন্ত রক্ষী বাহিনীর দৌরাত্ম্যকে ভালোই কাছে থেকে দেখেছে তথাগত। রাত বাহিনী আসে তথাগতের পিতার সন্ধানে। তারা বাড়িতে ভাঙচুর করে। তথাগতের বাবার লাইব্রেরির সব বই আগুনে পোড়াবার আগের দৃশ্যকে খুব সুন্দর নাটকীয়তার সাথে ইমতিয়ার শামীম লিখেছেন,
" উ-উ-উ জ্ঞ্যানী হ'য়েছে!
আরেকজনও তা অবলোকন করে এবং আরেকজনকে বলে,
দেখ তো আমাদের পাঠচক্রেরর জন্যি কুনডা কুনডা নিয়ে যাওয়া যায়?
আগেরজন মনযোগ দিয়ে বইয়ের পুট দেখতে থাকে এবং অবশেষে মন্তব্য করে,
সব প্রতিক্রিয়াশীলদের বই। এইসব দিয়ে কুন কাজ হবে না। পোলাপানের মাথা আরে খারাব হয়ে যাবে।"
অতীতের কথা বলতে বলতে ঔপন্যাসিক আমাদের নিয়ে যান তথাগতের বর্তমানে।যেখানে সে মারিয়া শুভান্বিতার সাথে ঘুরছে ঢাকাময়। একটু আধটু গাঁজা টানতে হচ্ছে তথাগতকে। বর্তমানে এসেও ঘোরঘোরালো পরিস্থিতিকে কল্পনা করে তথাগত। যে বর্তমানকে প্রত্যহ নিয়মকরে সবাই টিভিতে দেখি, পত্রিকার পাতায় পাতায় পাই সেই বর্তমানকে।তখন তার মনে হতে থাকে,
" ধর্ষণগাথাই আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ গাথা। "
আবার কৈশোরের স্মৃতিতে চলে যায় তথাগত। যেখানে প্রতি মুহূর্তে তার ভয় যদি রক্ষীরা দেখে ফেলে, যদি রাত বাহিনীর লোকেরা ক্ষেপে যায়। এই ভয় আর আতঙ্কের মাত্রাকে অভাবনীয় পর্যায়ে নিয়ে যায় দারিদ্রতা। গ্রামে নেমে আসে দুর্ভিক্ষ। এইসময় বাজার থেকে দিয়াশলাই উধাও হয়ে যায়। কালো বাজারির বিরুদ্ধে অভিযানে নামে রক্ষীবাহিনী। এক হাটুরু কে দিয়ে ইমতিয়ার শামীম বলালেন,
" চাইল ডাইল যহন মজুত করে তহন কুনু শালার দেখা পাওয়া যায় না। আর এগন নিজেদের সিগারেট খাওয়ার ম্যাচ খুঁজে না পায়া মাতুব্বরি করছে।শালার পক্ষী বাহিনী। "
এহেন বক্তব্যদানকারীর শাস্তির ব্যবস্থা লেখক রক্ষীদের দিয়েই করেন। সবাই বাবা থাকতে তথাগতকে স্নেহ করত, এখন কেউ খবরও নেয় না। বাবার পরিচয়ে নয়। কিশোর তথাগতের মনোজগৎ চাইছে নিজের পরিচয়বোধ তৈরি করতে। কিন্তু তা কি হয়। কারণ তথাগত জেনে গেছে সবাইকে বইতে হয়,
" পূর্বপুরুষের পরিচয়ের বোঝা, যাবতীয় সামাজিক ঋণ, লোকনিন্দা, পারিবারিক অবস্থানের সরল ও বক্ররেখা।"
যে বাবা বইপাগল ছিল, সে কি শুধুই তথাগতকে বইয়ের গল্পই শুনিয়েছে। না। বাবা তাকে শিখিয়েছে, সবকিছু বইতে মেলে না। চারদিকে চোখ খুলে খুঁজতে হয়। হ্যা, অন্ন যোগাতে গিয়েই মাঠে পড়ে থাকতে দেখে তিন-তিনটি হাত-পা বাঁধা মাথাকাঁটা লাশ। আঁতকে উঠে তথাগত আর মণীষা। বৃদ্ধ কৃষক হালিম এসে লাশগুলোকে নিজের ক্ষেত থেকে উঠিয়ে অন্যের ক্ষেতে ফেলে দেন। ন্যূনতম ভয়,আতঙ্ক,প্রশ্নবোধ জাগে না। যেন রোজই দেখেছেন এসব খুনোখুনি।
একসময় শোনে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে খুন করা হয়েছে। বিশ্বাস হতে চায়না তথাগতের। কিছুদিন পর তার বাবা ফিরে আসে।এদিকে দেশের অবস্থা ভয়াবহ। যারা এতদিন ঘাপতি মেরে ছিল তারা হাজির হয় পর্দায়। তথাগতের মৌলভি স্যার বলতে থাকে, " এই জাতীয় পতাকা তো পাল্টে যাবে। " তথাগত লক্ষ্য করে যারা এতদিন বেশ হম্বিতম্বি করত তারা সবাই চুপসে গেছে। সময় এখন মৌলভি স্যারদের অনুকূলে।তিনি এখন জোরসে রীতিনীতি প্রনয়ণ করে চলছেন। ইমতিয়ার শামীমের এই মৌলভি যেন তৎকালীন মুজিবপরবর্তী মৌলবাদী বাংলার প্রতিচ্ছবি।এরই মধ্য জলপাই বাহিনী ক্ষমতা দখল করে। তারা একদিন হাজির হয় তথাগতের বাবার খোঁজে। বাড়িতে বঙ্গবন্ধুর ছবি টাঙানো দেখে অবাক হয়ে জানতে চায়,
" আপনি তো জাসদ করেন। এর ছবি রেখেছেন কেন?
বাবা বলে,
এখন আমরা যাই করি না কেন যুদ্ধের সময় তিনি আমাদের সবার নেতা ছিলেন। এমনকি যারা তাঁকে হত্যা করেছে, যিনি এখন সামরিক বাহিনীর প্রধান হয়েছেন তারা সবাই তো তাঁর অধীনে যুদ্ধ করেছি।"
ইমতিয়ার শামীম একজন জাসদ কর্মীর মুখে যতই বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তুল দিন না কেন, তৎকালীন রাজনীতি কিন্তু অন্য সাক্ষ্য দেয়। অবশ্য সচেতন পাঠক উপন্যাস পড়তে বসে, নিশ্চয়ই ইতিহাসের পাঠ নিতে চাইবে না।
তথাগতের জাসদকর্মী বাবাকে নিয়ে যায় জলপাই বাহিনী। আর ফিরিয়ে দেয় মৃতদেহ হিসেবে। বলে পালাতে গিয়ে নিহত। ক্রসফায়ার আরকি! জিয়াউর রহমানের আমলে উইচ হান্টিংয়ের মতো জাসদ খোঁজার কথা পাই উপন্যাসে। আরও পাই সেনাবিদ্রোহে গণফাঁসির আলামত। লেখক তথাগতকে দিয়ে জিয়ার আমলের প্রতি ইঙ্গিত করেন,আগে লাশ পড়ে থাকত ক্ষেতে, রাস্তায়, নালায় আর এখন মেরে সযত্নে কবর দিয়ে পাহাড়া বসানো হয় কিংবা গুম করে আত্মীয়স্বজনের কাছেই নিরীহ গলায় খোঁজ করা হয়!
এদিকে জিয়ার আমলের হ্যাঁ/না ভোটের স্মৃতি তথাগতের মুখে,
" যুবকবয়সী তোজাম্মেল লিডার বনে গেছে এই সুযোগে।দলবল নিয়ে হ্যাঁ মার্কা ব্যালটপেপার সে এত বেশি ফেলে যে ভোটারের সংখ্যার চেয়েও বেশি ভোট পড়ে যাওয়ায় কিছু ভোট আবার গণনার পর গায়েব করতে হয়। "
জিয়ার আমলে ধর্মভিত্তিক দল,পাকিস্তানপন্থী দলগুলোর উত্থানের কথা বারবার স্মরণ করেছেন ইমতিয়ার শামীম।ছাত্র শিবিরের দল হিসেবে উত্থানের চিত্রকে হয়তো খুব গভীরভাবে দেখেছেন ইমতিয়ার শামীম।তাই এই দলটির ধর্মের নামে রাজনীতির বিকিকিনি কিংবা সাধারণ শিক্ষার্থী বা অন্যান্য দলের কর্মীদের ওপর রগকাটা বাহিনীর আক্রমণকে একেবারে বাস্তবতার নিরিখে লিখে গিয়েছেন ইমতিয়ার শামীম।কতটা ঘৃণা করেন এই রগকাটা বাহিনীকে তা লুকাতে চেষ্টা করেন নি। যেমনি মনোভাব লুকিয়ে রাখেন নি তথাগত যখন এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে যায়, তখন তাকে দিয়ে বলিয়েছেন,
" এক দফা এক দাবি / এরশাদ তুই কবে যাবি।"
কোনো সুস্থলোক সেনাশাসনকে সমর্থন করতে পারে না। সেই জলপাই বাহিনীর খপ্পরে পড়ে বাংলাদেশের অবস্থা কি হয়েছিল তা জানাতে পাঠককে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সাথে, জিয়ার শাসনামলের সাথে। একইসাথে বারবার ইমতিয়ার শামীম জানাতে চেয়েছেন জলপাই বাহিনীর আসল মনোভাব কেমন ছিল।কীভাবে পত্তন ঘটলো রগকাটা বাহিনীর।
বাবার একটি পিস্তল খুঁজে পেয়েছিল তথাগত। মা আর বোনের পরিণতি ভিন্নদিকে নিয়ে যায় তথাগতকে। তাতে সায় থাকে বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থার।
জনকন্ঠে কর্মরত ইমতিয়ার শামীম উপন্যাস কম,রাজনৈতিক ইতিহাসের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছিলেন। আর পাঠককে নিজের দৃষ্টিকোণ থেকে একেবারে প্রদক্ষিণ করিয়ে এনেছেন বাংলাদেশের সেই বন্ধুর, খানাখন্দ আর শ্বাপদসংকুলে ভরা সেই সময়ের সাথে যেপথে ইমতিয়ার শামীমরা হেঁটে এসেছে।
এই উপন্যাস ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হয়তো লিখেছেন ইমতিয়ার শামীম। লুকছাপা নেই। সাদাকে সাদা,কালোকে কালো বলার সৎসাহস আমরা বেচে দিয়ে, নিজেরা বেঁচে আছি। সেই দলে নন লেখক। নিঃসন্দেহে উপন্যাসের আয়তন বৃহৎ হতে পারতো, কাহিনী শেষ পর্যন্ত সেদিকেই যাচ্ছিল। হঠাৎ নাটকীয় (তবে বাস্তব) সমাপ্তি।