মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয় শুধু একটি ভ্রমণকাহিনি নয়—এ এক সাহিত্যিক যাত্রা, যেখানে ইতিহাস, পুরাণ, স্থাপত্য আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মিলেমিশে গড়ে উঠেছে এক জীবন্ত মহাকাব্য। লেখক এস এম নিয়াজ মাওলা তাঁর চোখ দিয়ে পাঠককে ঘুরিয়ে এনেছেন প্রাচীন মিশরের মরুভূমি থেকে নীলনদের তীর, পিরামিড থেকে রাজাদের উপত্যকা, আবু সিম্বেল থেকে আলেকজান্দ্রিয়া পর্যন্ত। প্রতিটি স্থান এখানে কেবল ভৌগোলিক অবস্থান নয়, বরং হয়ে উঠেছে মানুষের সভ্যতা, দেবতার বিশ্বাস আর জীবনের চিরন্তন অনুসন্ধানের প্রতীক। এই গ্রন্থে গিজার পিরামিডের পাদদেশে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের নিঃশ্বাস যেমন ধরা পড়েছে, তেমনি সাক্কারার ধাপ-পিরামিড থেকে দাহশুরের রেড ও ব্ল্যাক পিরামিডের স্থাপত্যের বিবর্তনও প্রতিফলিত হয়েছে। আসওয়ান, লুক্সর ও আবু সিম্বেলের দেব-রাজাদের মহিমা, দেইর-এল-মদিনার শিল্পীদের রঙিন সমাধি, সিওয়া মরূদ্যানের রহস্য, আলেকজান্দ্রিয়ার হারানো আলোকস্তম্ভের স্মৃতি এবং কায়রোর ব্যস্ত জীবনের ছন্দ—সবকিছু মিশে গেছে এই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে। ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সাহিত্যের মাধুর্য আর ঐতিহাসিক তথ্যের সমন্বয়ে লেখা এই ভ্রমণকাহিনি পাঠককে নিয়ে যাবে এমন এক যাত্রায়, যেখানে সময় থেমে যায় না—বরং ফিসফিস করে বলে, “এখানেই মিথেরা এখনো শ্বাস নেয়।” এটি সেইসব পাঠকের জন্য, যারা শুধু ভ্রমণ নয়, ইতিহাস ও মানবসভ্যতার গভীর শেকড় ছুঁয়ে দেখতে চান।
মিশর! নামটা শুনলেই মাথায় চলে আসে পিরামিড, নীল নদ, ফারাও, নানান দেব-দেবীর কেচ্ছাকাহিনী। এমন এক দেশ, যেখানে মিথলজিই শেষ কথা। কত রহস্য ছড়িয়ে আছে, কত ইতিহাস, ধর্মীয় ঘটনাবলীর এক রাজ্য এ মিশর! যেখানে একবার পা ফেললে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। যেমন বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছেন, মিথলজি কিং খ্যাত লেখক এস এম নিয়াজ মাওলা। মিথলজির রাজ্যে পা না দিয়েও যিনি বিশাল এক মিথলজির বই লিখে ফেলেছেন। অবশেষে তিনি পা রাখতে যাচ্ছেন সেই দেশে, যাকে তিনি ধারণ করেন। অনুভব করেন।
সময়টা ২০২৫ সালের ঈদুল ফিতরের ঠিক আগ মুহূর্তে মিশরে পা রাখেন লেখক। এরপর থেকে শুরু হয় অসাধারণ যাত্রা। একে একে ফুটতে থাকে মিশরের ইতিহাস। সামনে আসতে থাকা জানা, অজানা কত গল্প! লেখক ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখেছিলেন। পৌঁছে গিয়েছেন তেমন সব জায়গায়, যাকে বইয়ের পাতাতেই বাস্তব মনে হয়। এছাড়া কেবলই কল্পনা। আর লেখকের সাথে সাথে আমরা ছুটেছি গিজা, সাক্কারা কিংবা রাজা রানীদের উপত্যকায়। কখনও আলেকজান্দ্রিয়ায়। সতেরো দিনের এই যাত্রায় একে একে গল্প হবে ইতিহাসের, মিথের, কল্পনার; সর্বোপরি মিশরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের।
এই যাত্রার শুরুতে মিশর সম্পর্কে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। এক দিকে আতিথেয়তার আতিশয্য, অন্যদিকে সুযোগ সন্ধানী ব্যক্তিত্ব! এই যেমন লেখক যখন ওখানে পৌঁছান তখন রমজান মাসের প্রায় শেষ। এখানে সাহরি বা ইফতারের আতিথেয়তার ছোট্ট নিদর্শন যেমন ছিল; আবার সুযোগ বুঝে টিপস নেওয়া কিংবা ট্যাক্সির মাত্রাতিরিক্ত বিল, পর্যটকদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, নিজেদের পণ্য বিক্রয়ের ছলচাতুরি করা মিশর নিয়ে অন্যরকম অনুভূতি দেয়।
লেখকের যাত্রাটা শুরু হয় গিজার পিরামিড থেকে। সেখানে খুফুর গ্রেট পিরামিড, রানীদের পিরামিড, খেফ্রন, মানকাউরের পিরামিডের পাশাপাশি স্ফিংক্স-এর সাক্ষী হোন লেখক। এর একদিকে শ্রমিকদের সমাধিস্থল রয়েছে, যারা এই পিরামিড তৈরিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। আর এই পরিশ্রমের সময়েই নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছে। এছাড়াও সেই ভ্রমণে প্যাপিরাস ও গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান জাদুঘরেও ঘুরে এসেছেন লেখক। জানিয়েছেন আমাদের নানান তথ্য।
এরপর লেখকের যাত্রাটা ছিল সাক্কারার উনাসের পিরামিড, জোসেরের ধাপ পিরামিডসহ মেমফিস, সাক্কারা, দশুহরের নানান পিরামিড। এর পাশাপাশি রামেসিসের বিশাল ভাস্কর্য যেন বিস্ময়ের জন্ম দেয়। আশ্চর্য সব নিদর্শন, ইতিহাসকে একেবারে চোখের সামনে তুলে ধরে। লেখকের ভ্রমণের সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং অংশ আমার লেগেছে নুবিয়ান গ্রাম। এর পেছনে নানান ইতিহাস আছে। এছাড়াও সেই দিন আসওয়ান ভ্রমণে বেশকিছু মন্দিরের দৃশ্য উন্মোচন হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফারাও হাতশেপসুত, সেনুসরেত, টলেমি যুগের সাটেট মন্দির।
যেহেতু লেখক ঈদের ঠিক আগেভাগে মিশর ভ্রমণ করেছেন, সেহেতু অবধারিতভাবেই ঈদের দিন চলে আসে। মিশর মুসলিম দেশ হওয়া সত্ত্বেও যে ঈদের আমেজ বাংলাদেশে দেখা যায়, তার ছিটেফোঁটাও সেখানে লেখক দেখতে পাননি। বরং সাধারণ এক দিনের মতো যাত্রা। যেদিনে লেখক দ্বিতীয় রামেসিস, নেফারতিতি মন্দিরে গিয়েছিলেন।
এছাড়াও লেখক এ যাত্রায় পুরো মিশর চষে ফেলেছেন। এমন কিছু বাদ দেননি যা বাদ দিলে আফসোস থেকে যাবে। রাজাদের সমাধি, রানীদের সমাধিতে ভ্রমণ করেছেন। শুধু পিরামিডই হয়, এর বাইরেও বেশকিছু সমাধি রয়েছে। রাজাদের উপত্যকা, রানীদের উপত্যকা হিসেবে অভিহিত করা হয়। কখনও সমুদ্র ভ্রমণ, কিংবা দীর্ঘ গাড়ি বা বাসের যাত্রা। এর ভিন্নতায় লেখক মিশরকে উপলব্ধি করেছেন নতুন করে। বাংলাদেশের মতো করেই হয়তো সেখানে পর্যটকদের সাথে ছলনার আশ্রয় নেওয়া হয়। কখনও মাত্রাতিরিক্ত দাম নেওয়া, কিংবা যে যাত্রার কথা বলা হয়েছিল তার পুরোটা সম্পন্ন না করা! এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় মধ্য দিয়ে লেখক এ যাত্রা অতিবাহিত করেছেন।
তাছাড়া লেখক ভ্রমণ করেছেন সিনাই পর্বত, জাবালে মুসা (যদিও চূড়ায় উঠতে পারেননি), সিওয়া সল্ট লেক, মৃতদের পাহাড়, আমুন রা’র ওরাকল মন্দির ও দ্বিতীয় মন্দির, ক্লিওপেট্রার স্প্রিংয়ের মতো জায়গাগুলো। এতসব ভ্রমণে যেমন আতিথেয়তা পেয়েছেন, তিক্ত স্বাদও পেয়েছেন। লেখকের অভিজ্ঞতা বলতে সাহারা মরুভূমিতে স্যান্ড সার্ফিং, হট স্প্রিং স্নান, সূর্যাস্ত বার্বিকিউ উপভোগ করেছেন। অনেক বাঁধার পর হট এয়ার বেলুনে চড়ে আকাশে উড়েছেন।
সবশেষে বিখ্যাত আলেকজান্দ্রিয়াতে পা রেখেছেন লেখক। মিশরের অন্যান্য শহরের চেয়েও আধুনিক এ শহর যেন অনেক কিছুই বলতে চায়। পুরো আলেকজান্দ্রিয়া ঘুরে লেখক সবশেষে ঘুরেছেন মিশরের রাজধানী কায়রোতে। এরপর দেশে ফেরার পালা।
এতসব যাত্রায় লেখক অনেক কিছুর সাক্ষী হয়েছেন। যেখানে পা রেখেছেন, এক গভীর ইতিহাস উন্মোচিত হয়েছে। লেখক যেন ইতিহাসের পাঠ দিতে বড্ড পরিকর। এতকিছু জানতে পেরে ভালো লেগেছে। যদিও সবটা মাথার মধ্যে ঢুকেছে কি না, সে প্রশ্ন করাই যায়। কেননা এই বইটা পড়তে আমার বেশ প্যারা লেগেছে। লেখকের অন্যান্য লেখার সাথে পরিচয় থাকার কারণে আমি জানি, লেখকের লেখা প্রাণবন্ত হয়। পড়তে আরাম লাগে। কিন্তু এই বইয়ের ক্ষেত্রে সে বিষয়ের অনুপস্থিতি ছিল। বরং সময়ে অসময়ে বিরক্তি লেগেছে, ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে।
তার একটা কারণ হতে পারে লেখকের বর্ণনাতে অতি মাত্রায় আবেগের ব্যবহার ছিল। লেখক যেহেতু মিথলজি নিয়ে গবেষণা করেছেন, বিশাল আকারের বই আছে, সেই মিথলজির প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে তার আবেগতাড়িত হওয়া অমূলক কিছু নয়। কিন্তু যখন তিনি একটি বই লিখছেন, তখন এই আবেগ নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন ছিল। এত বেশি আবেগের কারণে লেখায় বাহুল্য এসেছে, তিনি একাধিক প্রতিকৃতি বা স্থাপনার সামনে দাঁড়িয়ে একইরকম আবেগের বর্ণনা করেছেন।
কোথাও কোথাও বর্ণনা দীর্ঘ মনে হয়েছে। তিনি যেহেতু ভ্রমণ কাহিনি লিখছেন, লেখাটা ভ্রমণের উপর সীমাবদ্ধ রাখলে উপভোগ্য হতো। কিন্তু নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আর আবেগকে মাত্রাতিরিক্ত স্থান দেওয়ার কারণে বইটার আকৃত বর্ধিত হয়েছে। আমার মনে হয়েছে স্বাভাবিকভাবে এই বইটি ৩০০ পৃষ্ঠার মধ্যে রাখা যেত। আমার একটা পর্যায়ে মনে হচ্ছিল, আমি কোনো ভ্রমণ কাহিনি পড়ছি না। লেখকের ব্যক্তিগত ডায়েরি পড়ছি। ফলে ভ্রমণ কাহিনির যে স্বাদ, সেটা অনেকাংশে পাইনি।
লেখকের বাহুল্যের একটা উদাহরণ দিই। বাংলাদেশে অনেক জায়গায় দেখা যায় না, যাত্রী তোলার জন্য ট্যাক্সি, গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর জোর করে যাত্রী তুলে ভাড়া নিয়ে ক্যাঁচাল করে। মিশরেও এমন ঘটনা প্রায়শই ঘটে। এক বিদেশি পর্যটকের সাথে এমন ঘটনা দেখার পর লেখক বাংলাদেশের সাথে এর মিল খুঁজে পেয়েছেন। পাওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এর বর্ণনায় প্রায় এক পৃষ্ঠার বেশি খরচ করা আমার যথাযথ মনে হয়নি। তিনি এখানেও অতিরিক্ত আবেগের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন।
আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে বর্ণনার বাহুল্য কমিয়ে কেবল ইতিহাসের বর্ণনাকে গুরুত্ব দিলে এই বইয়ের যে গুরুত্ব, তা আরও বেশি প্রকাশ পেত। কিন্তু কেন জানি লেখকের সাবলীল বাচনভঙ্গির পুরোটা এই বইতে পেলাম না। তবে এটা সত্য যে মিশরকে এক জীবন্ত উপাখ্যানে লেখক তুলে এনেছেন। এমন এক চিত্র দাঁড় করিয়েছেন, যেন মনে হয়েছে আমিও এই যাত্রার একজন অংশীদার। অনেক কিছুই জানতে পেরেছি। অনেক ইতিহাস এখানে উন্মুক্ত হয়েছে, যা অজানা ছিল।
মিশরের মানুষগুলো নিয়ে মিশ্র অনুভূতি পরিলক্ষিত হয়। কেউ কেউ আতিথেয়তার হাত বাড়িয়ে দিলেও, কারো হাত বাড়ানো থাকে কীভাবে পর্যটকদের ছলন���য় ভুলিয়ে অতিরিক্ত অর্থ বাগিয়ে নেওয়া যায়। বারবারই অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছেন লেখক। অতিরিক্ত টিপস, অতিরিক্ত দামে জিনিসপত্র ক্রয়, ভাড়া সংক্রান্ত জটিলতা, ভ্রমণ সংক্রান্ত বিরক্তকর কিছু ঘটনা, হট এয়ার বেলুন ভ্রমণ নিয়ে এক স্ক্যামে লেখকের অভিজ্ঞতাগুলোকে কিছুতেই সুখকর বলা যায় না।
জ্ঞানকোষ থেকে প্রকাশিত এই বইটির প্রোডাকশন কোয়ালিটি দুর্দান্ত। কাগজ বেশ উন্নতমানের হয়েছে। এত মোটা বইয়ের বাঁধাই নিয়েও সমস্যা নেই। বইয়ের মাঝে মাঝে বেশকিছু ছবি রয়েছে লেখকের ভ্রমণের। এর মধ্য দিয়ে লেখক পাঠকের চোখের সামনে ভ্রমণের আদ্যোপান্ত উপস্থাপন করেছেন। সবচেয়ে ভালো লেগেছে সম্পাদনা। ছাপার ভুল, বানান ভুল ছিল না বললেই চলে। আজকাল এমন নির্ভুল বই খুব একটা দেখা যায় না। প্রচ্ছদও সুন্দর। এমন এক যাত্রার সাথে মানানসই।
মিশরীয় মিথলজি এক অদ্ভুত জগতে; নীলনদ, পিরামিড, ফারাওদের রাজ্যে এই যাত্রাটা উপভোগ্য ছিল। কেবল একটি যদি আবেগের নিয়ন্ত্রণ করা যেত!
▪️বই : মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয় ▪️লেখক : এস এম নিয়াজ মাওলা ▪️প্রকাশনী : জ্ঞানকোষ প্রকাশনী ▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৩.৫/৫
মিশর মানেই রহস্য, মিশর মানেই হাজার বছরের পুরনো সভ্যতার হাতছানি। মিশর নিয়ে কৌতূহল মানুষের চিরন্তন, কিন্তু সেই কৌতূহলকে যখন ইতিহাসের নিপুণ বুনন আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেটি হয়ে ওঠে ‘মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয়’ এর মতো একটি ভ্রমণকাহিনীর বইয়ে। অধিকাংশ ভ্রমণকাহিনী যখন কেবল গিজার পিরামিড আর নীল নদে সীমাবদ্ধ থাকে, তখন 'মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয়' বইটি পাঠককে নিয়ে যায় এক গভীর ও বিস্তারিত ঐতিহাসিক সফরে। যেখানে বর্তমানের মিশরের পাশাপাশি করে ভ্রমণকারী লেখকের সাথে পথ চলেছে মিশরের প্রাচীন ইতিহাস আর মিথলজি কাহিনিগুলো।
লেখকের এই ভ্রমণ শুরু হয় ২৫শে মার্চ ঢাকা থেকে। রাতের ফ্লাইটে মিশরের উদ্দেশে রওনা দিয়ে ২৬শে মার্চ তিনি সরাসরি পৌঁছে যান পিরামিডের শহর গিজায়। মূলত ২৭শে মার্চ থেকেই শুরু হয় তার মূল অভিযাত্রা। গিজার বিশাল পিরামিড কমপ্লেক্সে তিনি খুফুর গ্রেট পিরামিডের ভেতরে প্রবেশ করেন, দেখেন রানীদের পিরামিড ও মাস্তাবা। স্পিঙ্কস বা শ্রমিকদের সমাধিস্থল দেখার পাশাপাশি তিনি প্যানোরামা ভিউ থেকে পিরামিডের বিশালত্ব উপভোগ করেন। এছাড়াও গ্র্যান্ড ইজিপশিয়ান ও প্যাপিরাস মিউজিয়াম পরিদর্শনের মাধ্যমে মিশরের প্রাচীন শিল্পের সাথে তার পরিচয় ঘটে।
এরপরের গন্তব্য ছিল প্রাচীন রাজধানী মেমফিস, সাক্কারা ও দাহশুর। এখানে তিনি ইতিহাসের প্রথম 'পিরামিড টেক্সট' সম্বলিত উনাসের পিরামিড এবং মানুষের তৈরি প্রথম ধাপ পিরামিড 'জোসের' পরিদর্শন করেন। দাহশুরে গিয়ে তিনি প্রথম সত্যিকারের পিরামিড 'রেড পিরামিড'-এর ভেতরেও প্রবেশ করেন।
তারপর লেখক পাড়ি জমান নীলের দক্ষিণ প্রান্তে আসোয়ানে। সেখানে তিনি অসমাপ্ত ওবেলিস্ক থেকে শুরু করে আসোয়ান মিউজিয়াম ও নীল নদের বুকে অবস্থিত এলিফ্যান্টাইন দ্বীপ ঘুরে দেখেন। আসোয়ানের বিভিন্ন মন্দির এবং নুবিয়ান গ্রাম পরিদর্শনের মাধ্যমে তিনি স্থানীয় সংস্কৃতির ছোঁয়া পান। তিনি সময় অতিবাহিত করেন বিখ্যাত আবু সিম্বেল মন্দিরে, যেখানে দ্বিতীয় রামেসিসের বিশাল ভাস্কর্য ও লেক নাসেরের সৌন্দর্য তাকে মুগ্ধ করে।
এরপর শুরু হয় লেখকের রোমাঞ্চকর নীল ক্রুজ অভিজ্ঞতা। ক্রুজে ভাসতে ভাসতে তিনি ফিলে মন্দির কমপ্লেক্স, কম ওম্বো এবং এডফু মন্দির পরিদর্শন করেন। এরপর তিনি পৌঁছান দেবতাদের নগরী লুক্সরে। এখানে তিনি 'ভ্যালি অফ দ্য কিংস' বা রাজাদের উপত্যকায় প্রবেশ করে তুতানখামুনসহ বেশ কয়েকজন শক্তিশালী ফারাওয়ের সমাধি দেখেন। এছাড়া হট এয়ার বেলুনে চড়ে আকাশ থেকে লুক্সরের সৌন্দর্য দেখা এবং কর্ণাক ও লুক্সর মন্দিরের বিশালতা উপভোগ করা ছিল তার ভ্রমণের অন্যতম সেরা অংশ।
এর পরপরই যাত্রা মোড় নেয় আধ্যাত্মিকতার দিকে, তিনি পা রাখেন সিনাই মরুভূমিতে। সেখানে সিনাই পর্বত এবং ঐতিহাসিক সেন্ট ক্যাথারিন মঠ পরিদর্শন করেন। এরপরের দুই দিন তিনি অতিবাহিত করেন মিশরের এক নির্জন স্বর্গরাজ্য সিওয়া মরুদানে। সাহারা মরুভূমিতে স্যান্ড সার্ফিং, সূর্যাস্ত দেখা, সল্ট লেক এবং প্রাচীন আমুন রা-এর মন্দির পরিদর্শন তার এই রুক্ষ মরুযাত্রাকে রঙিন করে তোলে।
ভ্রমণের শেষ পর্যায়ে সাগর তীরের শহর আলেকজান্দ্রিয়ায় যান। সেখানে ক্যাটাকোম্ব, পম্পেইস পিলার এবং দুর্গ দেখে তিনি পুনরায় কায়রোতে ফিরে আসেন। শেষ দিনগুলোতে কায়রো মিউজিয়াম, আল আজহার মসজিদ এবং খান-খলিলি বাজারের জমজমাট পরিবেশে মিশরের আধুনিক ও প্রাচীন রূপের মিশেল দেখে বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
আর এই পুরো যাত্রাটার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা পাবেন লেখকের লেখা 'মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয়' বইটিতে। লেখক এখানে তার এই যাত্রার প্রতিদিনকার সম্মুখীন হওয়া নানান অভিজ্ঞতা, চক্ষুশ দেখা নানান ঐতিহাসিক বিষয় সেগুলোর বর্ণনা, মিশরে থাকা কালে তাদের মানুষের সাথে হওয়া নানান অভিজ্ঞতা, খাদ্যভাস ইত্যাদি বিষয় নিয়ে লিখেছেন।
লেখক মিশরীয় মিথলজির উপর ভিত্তি করে বই লিখেছেন যখন তখন তিনি মিশরকে দেখেননি। তাই এবারের এই যাত্রায় ইতিহাসকে মিলিয়ে দেখার এই ভ্রমণে তিনি নিজের মাঝে যে এক আবেগে আপ্লুত অনূভুতি অনুভব করেছেন তা তার লেখাতেই ফুটে উঠেছে। ফলে লেখক তার লেখার অধিকাংশ জুড়েই স্থাপনার বর্ণনা ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে বেশ আবেগময় উপমা সমেত বর্ণনা উপস্থাপন করেছেন। তবে আমার মনে হয়েছে এই দিকটা আরো পরিমিত হলে পুরো বইয়ের উপভোগ্যটা আরো ভালো হতো।
মিশরের কথা ভাবলেই আমাদের সবার চোখের সামনে ভেসে উঠে পিরামিডের চিত্র। কিন্তু বইটি পড়ার পর আপনার এই চিন্তাটা বদলে যাবে। পিরামিড ছাড়াও যে মিশরে দেখার মতো আরো অসংখ্য জিনিস আছে তা উপলব্ধি হবে। বিশেষ করে জাবালে মুসা, আলেকজান্দ্রিয়া শহর, রোম আর গ্রীক স্থাপনার বর্ণনা শুনে ভালো লাগবে। লেখক তার দেখা প্রতিটি বিষয়ের ঐতিহাসিক বর্ণনা, মিথ কিংবা ইতিহাসটুকু সাথে উপস্থাপন করেছেন যা লেখকের বইয়ের সাথে ঐ স্থাপনা ভ্রমণের সাথে সাথে ঐ স্থাপনার গুরুত্ব বুঝতে সুবিধা হবে। এছাড়া কেউ পরবর্তীতে মিশর ভ্রমণের ক্ষেত্রে এই বইটি সহায়ক হবে প্ল্যান সাজাতে, সেই সাথে বইয়ের পিছনে মিশরের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা বা মিউজিয়ামের ফি এর তালিকাও দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সবমিলিয়ে সতেরো দিনের রোলার কোস্টারের মতো মিশরের এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে বেড়ানোর এই ভ্রমণ কাহিনির ব্যক্তিগত ডায়রি পড়ে বেশ ভালোই লেগেছে। বিশেষ করে একজন বর্তমানের ভ্রমনকারীর চোখে মিশরকে দেখে যে মিশর তার পেটে পিরামিড ছাড়াও আরো অসংখ্য বিষয় পেটে নিয়ে আছে তার সম্পর্কে জেনে।
বর্তমান মিশরের সামগ্রিক একটা চিত্রকে জানার জন্য এই বইটা চাইলে পাঠক পড়তে পারেন, বইটি যারা মিশরে ভ্রমণ করতে চায় তাদের জন্যেও বেশ হেল্পফুল হবে। তবে এই বইয়ে টানটান উত্তেজনাকর কিছু পাবেন না বরং আয়েশ করে সময় নিয়ে পড়ার মতোই বই 'মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয়' বইটি।
বইটির ভিতরে লেখকের বর্ণনার পাশাপাশি লেখকের নিজের সাথে নানান স্থাপনার তোলা ছবিও দিয়ে দেওয়া হয়েছে যা আপনার বই পড়ার ক্ষেত্রে স্থাপনাগুলো চিনতে সুবিধা হবে। তবে আমার ব্যক্তিগত ভাবে৷ বইয়ের দাম অনুযায়ী প্রোডাকশনটা ভ��লো লাগেনি। মনে হয়েছে আরো ভালো প্রোডাকশন দেওয়া যেত সাথে এত বড়ো বইয়ের রাউন্ড বাইন্ডিং হলেই ভালো হতো।
বই: মিথেরা যেখানে শ্বাস নেয় লেখক: এস এম নিয়াজ মাওলা প্রচ্ছদ: পরাগ ওয়াহিদ প্রকাশক: জ্ঞানকোষ প্রকাশনী মূল্য: ১১০০৳ পৃষ্ঠা: ৫৪৪