কয়েক মাস আগেই বুঝি, পড়তে নিয়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদের "মৃন্ময়ী"। প্রথম দুই প্যারা পড়ে এত বিরক্ত লাগল যে পারলে মনে হচ্ছিল ছুড়ে ফেলে দিই বইটা। নায়িকার নাম মৃন্ময়ী আর তার বাবার আছে একটা গার্মেন্টস এর ফ্যাক্টরি, সেটার নামও মৃন্ময়ী। নায়িকা ভাবছে তার নাম লেখা থাকে শার্টের কলারে, একজন পুরুষ ঘেমে থাকলে তার নামটাও ঘেমে যায়, সাথে বুঝি সেও ঐ পুরুষের ঘামে জড়িয়ে যায়। এটা কোনো কথা হল?? এত কল্পনা মানুষে করে!!! এইটা ভেবেই বইটা পড়া বাদ দিই।
হুমায়ূন আহমেদের খুব কম বইই আছে যা আমার পড়া নেই। এবং খুব কম বইই আছে যা আমি এসএসসির পরে পড়ি। সুতরাং হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস এবং উপন্যাসের নায়ক নায়িকার সাথে আমার যে সম্পর্ক তা মূলত আবেগের। আমার এখনো হাসানের কথা মনে পড়লে তিতলির উপর রাগ লাগে, আনিসের কথা মনে পড়লে তার দুষ্টুমিতে পাক্কা বাচ্চা দুটোর কথা মনে করে হেসে উঠি, বাকের ভাইয়ের কথা মনে পড়লে, এখনো বলি,সে আমার কেউ না, হুমায়ূনের কথা মনে পড়লে মন্টু চলে আসে, আমি বিষণন হয়ে পড়ি। আমার হুমায়ূন আহমেদ আবেগ জুড়ে আছে। কিন্তু যখনই আমি এই আবেগকে পাশে সরিয়ে রাখি তখনই আমি হুমায়ূন আহমেদের ব্যবসায়িক মনোবৃত্তির দেখা পাই। দেখি তিনি বছর বছর কেমন জঞ্জাল প্রসব করেছিলেন উপন্যাসের নামে। আর পাঠকও কেমন হাড়হাভাতের মতন তাই গিলেছে। আমি সেসব দেখে হুমায়ূন আহমেদকে ক্ষমা করতে পারি না। কারণ তিনি পাঠক সৃষ্টির নামে কতকগুলো অপাঠক তৈরি করে গেছেন আমাদের পড়ুয়া সমাজে, যারা তার এবং তার মতন লেখা লেখক ছাড়া আর কারো লেখা পড়েও দেখে না।
যাই হোক, অনেকদিন পর হুমায়ূন আহমেদের একটা সুন্দর উপন্যাস পড়লাম। হুমায়ূন আহমেদের না পড়া বইগুলো পড়তে গেলেও আমার মনে হয় এই জিনিস আমি পড়েছি। কেন এমন মনে হয়?? কারণ হুমায়ূন আহমেদের সব উপন্যাস এবং উপন্যাসের প্রায় সব চরিত্র একই ছাচে গড়া। ঘুরে ফিরে সেই একই লোক আসে। হয়তো একটু পরিবর্তিত হয়ে, কাহিনীও প্রায় একই থাকে। যেমন এই দিনের শেষে বইটার কথাই ধরা যাক। ছেলেটি বেকার, মামার বাসায় আসে চাকরির খোঁজে, মামার আবার তিন মেয়ে। বড় দুইজনই তাকে পছন্দ করে, অথচ ছেলেটিকে পছন্দ করার মতন কিছুই নাই। একরকম লাগল না?? তবুও উপন্যাসটিকে ভালো লাগার কি কারণ??
কারণ এইখানে লেখক বেশ সাবলীলভাবে কিছু উপস্থাপন করেন যা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের সাথে মিলে যায়, আমরা তাকে অনুভব করতে পারি। যেমন জহিরের সাথে এক মেয়ের বিয়ে ঠিক হওয়ার পর তা ভেংে যায়, জহির কল্পনা করে একদিন সেই মেয়ের সাথে দেখা করতে যাবে, এই এই কথা বলবে। আবার আসমানী নামের যে মেয়েটির সাথে জহিরের বিয়ে ঠিক হয় সেই মেয়েটি কেন জহিরকে কেবলই চকলেট কালারের শার্ট কিনে দিতে চায়?? কারণ তার মনের মাঝে আছে পূর্বের স্বামীর একটিমাত্র স্মৃতি, আর তা হল এই চকলেট কালারের শার্ট। এইভাবে হুমায়ূন আহমেদ আমাদের আবেগাক্রান্ত করে তোলেন। বাস্তবের আমরাই হয়ে উঠি তার উপন্যাসের চরিত্র। তাই আমাদের হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস ভালো লাগে।
উপন্যাসটা খুব ভালো লেগেছে। উপন্যাসের নাম দেয়া হয়েছে দিনের শেষে। জগদীশ গুপ্তের একটা গল্প আছে, নাম দিবসের শেষে। সেখানে এক নিষ্ঠুর নিয়তির শিকার হয় গল্পের চরিত্ররা, এই উপন্যাসেও তাই। এবং গল্পে প্রথমেই বলা হয় যে তারা নিয়তির হাতে বাধা, এই উপন্যাস পাঠের প্রথমেই আমরাও কল্পনা করে নিই যে হয়তো এইই হবে,আর উপন্যাস শেষে তাইই হয়। খানিকটা কি প্রভাবিত?? হতেও পারে। কে জানে??
উপন্যাসের শেষ লাইন জীবনানন্দ দাশের কবিতার লাইনের গদ্যরূপ। অথচ ভাবখানা এমন যেন লেখকই লিখেছেন। আর বুঝলাম না, উপন্যাসের প্রথমে গুলবদন বেগমের যে কবিতা দেয়া আছে সেটা তো বাদশাহ নামদার বইতে বাদশাহ হুমায়ূনের নামে চালানো। লেখক কি তখন জানতেন না, এটা বাদশাহ হুনায়ূনের লেখা??