সুবোধ ঘোষ এর ৫১ টি ছোট গল্পের সংকলন ‘গল্পসমগ্র ২’। এ জাতীয় সমগ্র নিয়ে কথা বলতে গেলে কিছুটা বিপাকেই পড়তে হয়; অর্ধশতাধিক গল্পের স্মৃতি সচরাচর মনে খুব বেশী সময় আটকে থাকেনা। সূচীপত্র দেখে গল্পের নাম পড়লে তবেই গল্পের প্লট মনে পড়ে। সপ্তাহ কয়েক পরে নিশ্চয়ই এটুকুও মনে করতে পারবোনা, তখন হয়তো গল্পের শুরুর আর শেষের কয়েক চরণ পড়ে মনে করতে হবে “ও হ্যাঁ, গল্পটা ছিলো এই…”। ব্যক্তিগত ভাবে আমি মনে করি উপন্যাসের চেয়ে ছোটগল্প মনে রাখা বেশী কঠিন। উপন্যাসে চরিত্রগুলোর বারবার উল্লেখ ঘটে তাই তাদের ভোলা যায়না। ছোটগল্পের স্বল্প ব্যাপ্তীতে ঘটনার ঘনঘটায় চরিত্রগুলো মন থেকে হারিয়ে যায় বেশীর ভাগ সময়; আর কাহিনী, সে তো দূর অস্ত! এই বইটিতে সংগৃহীত সুবোধ ঘোষের গল্পগুলোও নিশ্চয় তার খুব ব্যতিক্রম কিছু নয়। কিন্তু তবু মানের দিক থেকে এই গল্পগুলো অনেকটাই ব্যতিক্রম। এক সংকলনে গ্রন্থিত এত বিপুল সংখ্যক দারুণ মানের গল্প বেশ একটু দূর্লভ-ই বটে! এ যেন অনেকটা ভালো সব ছাত্রদের (ছাত্রীদের হতেও দোষ নেই!) নিয়ে বানানো এক ক্লাসরুম। কেউ হয়তো ৯০ পায়, কেউ তার চেয়ে ঢের কম, কিন্তু নূন্যতম ৬০ মার্ক পেয়ে সবাই-ই পাশ করে!
সুবোধ ঘোষের (১৯০৯-১৯৮০) গল্পে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অভিজ্ঞতার প্রতিফলন আছে বেশ স্পষ্টভাবে। তাই তাঁর গল্পের আলোচনায় তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কিছুটা টানাহেঁচড়া করা সম্ভবত প্রাসঙ্গিক-ই! বিচিত্র সব অভিজ্ঞতার জীবন সুবোধ ঘোষের। জীবিকার জন্য টিউশনিকে বেছে নিয়েছিলেন প্রথম জীবনে। এরপর বাস কন্ডাক্টরী করেছেন, ট্রাক চালিয়েছেন, সার্কাস পার্টিতে কাজ করেছেন, এমনকি বোম্বাই মিউনিসিপ্যালিটি তে ঝাড়ুদারিও করেছেন কিছুদিন। পূর্ব আফ্রিকাতে গিয়েছেন মহামারীর টিকাদানের জন্য। এই মানুষই আবার পরবর্তী জীবনে আনন্দবাজার পত্রিকার সিনিয়র অ্যাসিস্ট্যান্ট এডিটর হয়েছেন। শ্রমজীবী সমাজের প্রতিনিধিত্ব করেছেন দীর্ঘদিন এ পেশাগুলোর মধ্য দিয়ে, সে জন্যই হয়তো এই সমাজটি প্রায়শয়ই তাঁর গল্পের মূল উপজীব্য হিসেবে উঠে এসেছে। গল্পগুলো আবর্তিত হয়েছে তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা, স্যাটায়ার, মার খাওয়া মানুষ, কামনা, প্রেমের সফল-ব্যর্থ রূপ ইত্যাদি বিষয় কে কেন্দ্র করে, তবে সবকিছু ছাপিয়ে মানব চরিত্রের কাটাছেঁড়াই মুখ্য হয়ে উঠেছে প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে। চাবুকের বাড়ির অত্যাচার যাঁকে হজম করতে হয়, মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়টি তিনিই সবচেয়ে ভালো অনুভব করতে পারেন। বাস কন্ডাক্টর ঠিক ঠিক জানে কি কি অজুহাতে শার্ট প্যান্ট পরা আপাত ভদ্রবেশী লোকটি দশটা টাকা ভাড়া কম দেবে। ধর্ষিত যিনি হন, তাঁর জীবন উপলব্ধি ধর্ষকের জীবন দর্শনের চেয়ে শতগুণে উন্নত। দুর্বল গাঁথুনির বহুতল ভবনের নড়বড়ে কাঠামো নিচতলা থেকেই ভালো দেখতে পাওয়া যায়, ওপর তলা থেকে নয়। সমাজের চোখে ভীষণ নিচু সব পেশায় কাজ করে মানব চরিত্রের কদর্য দিকগুলো চিনে ফেলবেন সুবোধ ঘোষ, এ আর বিচিত্র কী!
সুবোধ ঘোষের জনপ্রিয়তা বিগত দশকগুলোর চেয়ে বর্তমানে অনেকটাই ক্ষয়িষ্ণু। দুটি মুখ্য কারণ হতে পারে তাঁর ভাষার ব্যবহার ও সময়ের পরিবর্তন। ইংরেজী ভাষার বহুল চর্চার ফাঁদে বাংলাদেশে বর্তমানে শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতে, পড়তে ও লিখতে পারাটা রীতিমত ন্যাক্কারজনক রকম গেঁয়ো একটি বিশেষত্ব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইংরেজী টানে বাংলা ও হিন্দী টানে ইংরেজী বলাটাই বরং অধিক গ্রহণযোগ্য। ইংরেজী মাধ্যম স্কুলে পড়া শিশুটি যতবার বাংলায় একটি সম্পূর্ণ কথোপকথন চালাতে ব্যর্থ হয়, শিশুটির বাবা-মা’র আনন্দ জ্যামিতিক হারে তত বেড়ে যায়। এ আনন্দ আভিজাত্যের সাদা জামায় লেগে থাকা পানের ছোপের মত নোংরা বাঙ্গালী পরিচয়টাকে ইংরেজীর ডিটারজেন্ট দিয়ে মুছে ফেলার আনন্দ। সন্তানের হাতে সুবোধ ঘোষদের মত অলংকারময় ভাষার লেখকদের বাংলা বই এর চেয়ে ইংরেজী বই তুলে দিতেই পিতা-মাতাদের আগ্রহ বেশী (সে ইংরেজী বইও মহান কোন সাহিত্য নয়, যা পড়ে বড় ইংরেজী বিশারদ হয়ে যাবে আদরের সন্তানটি। পৃথিবীটাই বোধহয় এমন। প্রতি পাতায় গড়ে ৪ বার ‘ফাক’ লেখা ও কথায় কথায় ‘প্যান্টি’ নামিয়ে ফেলা নায়িকাদের স্রষ্টা লেখনী প্রতিভার ছিটেফোঁটাহীন হ্যারল্ড রবিন্স তার যৌনতার বন্যায় ভাসানো বইগুলোর ৭৫০ মিলিয়ন কপি বেচেন, আর ফ্রাঞ্জ কাফকা, অ্যালান পো’রা কপর্দকশূন্য অবস্থায় মারা যান)। তুলনামূলক উন্নত অঞ্চল বলেই হয়তো ইংরেজীর এ হাওয়া কলকাতার বাঙ্গালী পরিবার গুলোতে আরো অনেক আগেই বয়ে গেছে। কমে গেছে দু'দেশের বাংলা পাঠক। পঞ্চাশের দশক থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দু'বাংলাতেই ছবি বানাবার সবচেয়ে সহজ ও লাভজনক প্লট হলো জমিদারপুত্র-শ্রমিককন্যা কিংবা গার্মেন্টস মালিকের মেয়ে-চানাচুর ওয়ালার ছেলে ইত্যাদি শ্রেণী-বিভাজন জনিত প্রেম। গত পাঁচ-ছয় দশক ধরে এই একটি প্লট পরিচালক-প্রযোজকদের অন্ন যুগিয়ে আসছে, এবং সম্ভবত আরো দু-এক দশক যুগিয়েও যাবে। ধনী সমাজ যেচে গরীব সমাজের সাথে প্রেম করতে যাবে, ইতিহাস এমন দুরাশা করতে সাহস দেয়না। এমন অলীক প্রেমের গল্প শুধুমাত্র শ্রমিক-মিস্ত্রী-ঠেলাওয়ালা ঘরানার মানুষদের উদ্দেশ্য করেই বানানো। সুবোধ ঘোষের একাধিক গল্পে ‘ধনী-গরীবের প্রেমের জয়’-এ বিষয়টি আসায় গত কয়েক দশকের একইরকম প্রেমের ছবি দেখে চোখ পাকিয়ে ফেলা বর্তমানের পাঠক হয়তো কিছুটা অস্বস্তিতে পড়তে পারেন। হয়তো লেখকের পেশাগত জীবনকেও এ ধরণের গল্প উদ্ভাবনের কারণ হিসেবে দেখতে পারেন!
ছোট জামাকাপড়ে সজ্জিত নায়িকাদের কোমর দোলানো নাচের মুদ্রার অংশ হিসেবে পা তুলে এক পলক অন্তর্বাস প্রদর্শনের মাধ্যমে ধনী গরীবের প্রেমের চর্বিত চর্বণ ক্লিশে হয়ে যাওয়া গল্পগুলোই হিন্দী সিনেমা আকারে যাঁদের কাছে হালাল হয়ে যায়, তাঁদের জ্ঞাতার্থে নিবেদন, ‘ম্যায় প্রেম কি দিওয়ানা হুঁ’ ছবিটি সুবোধ ঘোষের গল্প অবলম্বনেই নির্মিত।