কর্পোরেট ভোগবাদ আপনার দিনগুলো কিনে নেওয়ার আগে সবুজ দেখে নিন। মানুষ স্বপ্ন জমিয়ে ম্যানগ্রোভ, রেইন, তাইগা ও কনিফেরাসের মতো জঙ্গল দেখতে ছুটে বেড়ায়। অথচ মাইতা পুস্করিণীর পাড়ে, বাঁশতলার আলপথে, ঝিলের মাঝে আর পোড়োবাড়ির বাগানে কত্ত হুলোবন, আমাজন, শালবন প্রভৃতি একটু একটু করে ছড়িয়ে ছিটিয়ে অনাদরে পড়ে আছে তার প্রতি ক'জনইবা দৃষ্টিপাত করেন। কেউ বিরাটবৃক্ষের অবলম্বনে জড়িয়ে আর কেউ সরীসৃপের মতো মৃত্তিকার ওপর এঁকেবেঁকে ফণা ছুটিয়েই যাচ্ছে। পাইন, কড়ই, বট এবং অশ্বত্থের যে গুঁড়িতে পাতা হয় না সে উচ্চতাটুকু সবুজ দিয়ে রাঙিয়ে রাখে ওরাই। অম্লজানের সত্তরভাগ চাহিদা মেটায় সামুদ্রিক ক্ষুদ্র উদ্ভিদরাই। সেদিক দিয়ে লতা-গুল্মের ঝোপঝাড়ের অবদানও কম হওয়ার কথা না। বৈঁচি, করমচা, তেলাকুচা, বিষালাঙ্গুলী,বরকুল, বনহাসনুহানা, রাবন লতা, তেলাকুচা, তিতপল্লা— কত্ত কী নাম!
লতা-গুল্মের প্রতি আমাদের নাড়ির টান অতিপ্রাচীন। যেমনটি পুরোনো ভিটেবাড়ির সাথে। গ্রামীণ মানুষরা তা খুব একটা খেয়াল না করলেও যান্ত্রিক জীবনের নাগরিকরা বেশ টের পান। খেলনার দোকান, কাটা-ছেঁড়া এবং উপাচার-অনুষ্ঠানে এসব লতাপাতার সাথে সখ্যতা হয় শিশুকাল থেকেই। থানকুনি বা গিমে শাক খাননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। ছদ্মবিজ্ঞানেও তাদের প্রাসঙ্গিকতা আজও এতটুকু মলিন হয়নি। আয়ুর্বেদিক শব্দের অর্থ জীববিদ্যা। জীবশাস্ত্র। পাতার ছোঁয়া দেহ জুড়ায়। প্রকৃতি যেন চোখের মানসী। দৃষ্টি তাকে ইচ্ছেমতো রূপ দিতে পারে। সবুজ আমাদের বেঁচে থাকার আশ্রয়। চিরবিস্ময়, সঞ্জীবনী এবং স্থৈর্য। এই হলো জানলার পাশের আসন নিয়ে ছাপোষা যাত্রীদের পার্থিব সুখ। অন্তরাত্মা এখানে বারংবার হারায় সহজিয়ার টানে। ঘুমন্ত কবিটার চৈতন্য জাগে।
যেকোনো গাছ, পাখি অথবা ঝাড়কে দেখামাত্রই নাম বলে ফেলতে পারার মাঝে অদ্ভুত একটা আনন্দ নিহিত আছে। আজ সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত বিরাট জনগোষ্ঠী। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কেউ এসব গাছগাছালি নিয়ে আস্ত বই লিখলে লোকে তাকে অস্বাভাবিক ভাবত। সবকিছু ধ্বংসকারীদের দখলে চলে যাওয়ার পর মানুষ সেই নিয়ে লেখাগুলোই খোঁজে হয়রান। ‘বাংলার ঝোপঝাড়’ বইটিতে দু-তিন অনুচ্ছেদে ছোটো ছোটো পদে সেইসব বর্তমান, অর্ধলুপ্ত এবং প্রায় বিলুপ্ত চিরশিশু গাছগুলোর জীবনী ব্যক্ত হয়েছে। চেনার উপায়, কোনদিকে গেলে দেখা যাবে, আকৃতি, সময়কাল, রং আর তাদের গুণাগণ ও ব্যবহার। প্রায় অর্ধশতের আশেপাশে লতা-গুল্মের পরিচিতি বর্ণিত হয়েছে।
“পশ্চিমবঙ্গ জীববৈচিত্র্য পর্ষদ”-এর যত্ন নিয়ে সাজানো কতকগুলো বই ভীষণ কুট্টুস। “বাংলার মাছি ও মশা”, “বাংলার ঘাস ও বাঁশ”, “বাংলার মাছ”, ”বাংলার সাপ”, “বাংলার ভোজ্য ছাতু (মাশরুম)”, “বাংলার মাকড়সা” এবং “গ্রাম বাংলার বন্যজন্তু”— জীববিজ্ঞান এত মধুর চাঁছাছোলা ভাষায় বলা যায়! মোটের ওপর প্রচ্ছদগুলোও সেই লেখার যোগ্য প্রতিমূর্তি।
ছোট্টো মেঠো বইটিতে ডুব দিয়ে একবসায় বাংলার মেঠোপথগুলোতে হেঁটে আসা যায় অনেকটুকুই। সাদাকালো এবং রঙিন ছবিগুলো সবুজের মতোই চোখ জুড়িয়েছে। খটমটে নয় একটুও; তাও উদ্ভিদবিজ্ঞানপ্রেমীরাও হামলে পড়তে পারেন। উপড়ে না ফেলে, নরম কাণ্ড না মুচড়ে ওদের বাঁচিয়ে রাখা খুব জরুরী। ফড়িং, প্রজাপতি, পাখপাখালি ও পোকামাকড়ের আবাসস্থল বলে কথা। পরিবেশের বৈচিত্র্য, মিথস্ক্রিয়া, শক্তিপ্রবাহ ও খাদ্যশৃঙ্খল রক্ষা করার জন্য ভীষণ দরকারী। আধুনিকোত্তর আদিমতা জাগ্রত থাকুক।