একেবারে প্রথম পৃষ্ঠার শুরুতেই আমরা দেখা পাই এক সহজ সরল যুবকের। নাম তানভীর।ধনী বাবার একমাত্র সন্তান।আপাতদৃষ্টিতে নির্বিরোধী গোবেচারা টাইপের হলেও তার মধ্যকার ছাইচাপা আগুনের অস্তিত্ব আস্তে ধীরে প্রকাশ পায় উপন্যাসের ধারা বিবরণীতে। জেদ করে জীবনের প্রথম লোকাল বাসে উঠতে গিয়ে ছোটখাট এক্সিডেন্ট করে বসে তানভীর।পরিচয় হয় মেডিকেল পড়ুয়া ফারহা নাম্নী এক তরুণীর সঙ্গে।মায়াবতী এই তরুনীকে নিয়েই এগিয়ে যায় গল্প। সুতরাং এটা নিটোল প্রেমের গল্প হতেই পারত।কিন্তু হয়নি। চলমান জীবনের অবধারিত অধ্যায়, রাজনীতিও ঢুকে পড়ে গল্পের পাতায়।সমকালীন রাজনীতি কিভাবে এক তরুণ,তরুনীর জীবনে,তাদের পরিবারে,সর্বোপরি গোটা দেশে প্রভাব ফেলতে পারে,কিভাবে একটি আদর্শ বিপদগামী হতে পারে,কিভাবে একটি আদর্শকে বিপদগামী বলা হতে পারে সেই গল্পই বলা হয়েছে "প্রহর শেষে"য়। বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যতম ঘটনাবহুল একটি বছর ২০১৩।এই বছরের ৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে ৫ই মে পর্যন্ত উত্তাল দিনগুলোই "প্রহর শেষে"র ক্যানভাস,এই ক্যানভাসেই লেখক এঁকেছেন "প্রহর শেষে"।আন্তরিকতা ছিল নিরপেক্ষতার রং ব্যবহারে। সুতরাং এটা হতে পারত রাজনীতির গল্পও।কিন্তু হয়নি। মজার চরিত্র ড্রাইভার শরীফ,পুষ্পকন্যা তারা,মেজাজি জামিল সাহেব কিংবা উচ্ছল কিশোরী তানহা খটমটে রাজনীতিকে বাগে এনে প্রহর শেষেকে আরো রঙ্গিন করে তোলে।
গল্পটা তানভীরের, বিশিষ্ট ধনী ব্যবসায়ী জামাল আহমেদের একমাত্র আদরের সন্তান। ছোটবেলা থেকে বাবা-মায়ের অতিরিক্ত নজরদারি আর আভিজাত্যের খোলসে বন্দী তানভীরের দিন কাটে নিঃসঙ্গ আর অসামাজিকভাবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বাসা, শুধুমাত্র এই চলাফেরায় তার জীবনের এক তৃতীয়াংশ কেটে গিয়েছে। তাই দেশের, সমাজের ইতিহাস আর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিয়েও তেমন কোনো ধারণা নেই তার।
তবে একদিন হুট করে তার মাথায় চাপে লোকাল বাসে করে ঘরে ফেরার খেয়াল। প্রতিদিন দামী গাড়ি, দক্ষ ড্রাইভার দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া-আসা করা ননীর পুতুল তানভীর বাসে উঠেই আক্রান্ত হলো একটা ছোটখাটো দুর্ঘটনায়। তবে সেটি তাকে খোলস ছেড়ে বেড়িয়ে আসতে সাহায্য করে, এই ঘটনায় তার সাথে পরিচয় হয় তন্বী কন্ঠী যুবতী ফারহার। ধীরে ধীরে সেই পরিচয় রূপ নেই বন্ধুত্বে।
তবে দেশের তখন উত্তপ্ত পরিস্থিতি। একদিকে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবীতে শাহবাগে জড়ো হয়েছে দেশের বুদ্ধিজীবী, নবীন প্রগতিশীল ছাত্রসমাজ; সেইসাথে তা ঘিরে জন্ম নেয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। কিন্তু কেন, এমন একটা নৈতিক উদ্দেশ্যে হওয়া আন্দোলনে কিভাবে রাজনীতি ঢুকলো? এর কারণ কি? আন্দোলনটি শুধুমাত্র একটা রাজনৈতিক দলেরই বিপক্ষে, তাহলে তাকে কিভাবে অরাজনৈতিক বলা চলে? আর বাস্তবে দেশবিরোধী, রাজাকার মানে কী শুধুই সেই একটি রাজনৈতিক দল, তাদের মতাদর্শ কিংবা ভিত্তির ধর্মকে লালনপালন করা মানুষেরা?
দেশের এমন পরিস্থিতি দেখে তানভীরের মনেও একই প্রশ্ন জাগে। এইসব বিষয় নিয়ে বেশ ভালো জ্ঞান রাখা জামাল সাহেবের সাথে তার কথা হয়। তাতে সে জানতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু। অন্যদিকে, দেশের পরিস্থিতি দিনদিন আরও বিগড়ে যেতে থাকে। গণজাগরণ মঞ্চের কুশিলবেরা তাদের তথাকথিত দ্বিতীয় মুক্তিযুদ্ধকে বানাতে চাইছে নব্য রেনেসাঁস, যার মাধ্যমে দেশ থেকে ধর্ম নামক জঞ্জাল সাফ করবে তারা। বুদ্ধিজীবী থেকে সুশীল সমাজ, সবাই চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে চরমপন্থার পথেই নেমে পড়েছেন। তাদের দৃষ্টিতে ইসলাম ধর্ম পালন করা, সেই ধর্মের মৌলিক নীতিতে বিশ্বাসী মানুষেরাই মৌলবাদী, চরমপন্থী, জঙ্গি, রাজাকার, দেশদ্রোহী।
এই বিষয়টিকে বুস্ট করবার জন্যে নেমে পড়েছে ক্ষমতায় থাকা সরকারও। মিডিয়া ম্যানিপুলেশন থেকে শুরু করে সামাজিকভাবে সেটাকে জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠা করার জন্য লেগে পড়েছে তারা। কিন্তু তাতে তাদের কী স্বার্থ? ক্ষমতাসীন শোষকের অস্ত্রবাহী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ের যে মুক্তিযুদ্ধ, তার দ্বিতীয় পর্ব চলতে থাকে সেইসব অস্ত্রবাহীদের পাহারায়। (কবে থেকে এতো মানবিক আর নৈতিকতার কান্ডারী হয়ে গেল দেশের পুলিশেরা, যেখানে ১১ বছর পর তরুণ ছাত্রদের এমন নির্মমভাবে হত্যা করতে তাদের হাত কাপে নি?)
নিউটন তো বলেছেনই, প্রত্যেক ক্রিয়ার একটি সমান ও বিপরীতমুখী প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায়, হেফাজতে ইসলামের ছায়াতলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরাও রাস্তায় নেমে এসেছে। লং মার্চের ঘোষণা দেওয়া হয়—৫ই মে, ২০১৩ সালে। উজ্জ্বল ভবিষ্যতের তানভীরের জীবন কিভাবে বদলে যাবে এই ঘটনায়? কোন পক্ষে দাঁড়াবে সে? প্রহর শেষে সূর্য উদিত হয়, রঞ্জিত হয় আকাশ। এইক্ষেত্রে রঞ্জিত হয়েছে রাজপথ, মানুষের রক্তে।
থ্রিলার লেখক আবুল ফাতাহ সম্পর্কে অল্প জানতাম। আগে তিনি অনলাইনে লেখালেখি করতেন বোধহয়। যদিও তার বইগুলো খুব বেশি আলোচনায় আসে না, তবুও সেগুলো মোটামুটি প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু তিনি যে এমন একটা টপিকে সেই ২০১৪ সালেই বই লিখেছেন, তা জানা ছিল না। সত্যি বলতে, এখনো তেমন কোনো আলোচনা নেই বইটিকে ঘিরে। গুডরিডস মারফত জেনেছিলাম এটার ব্যাপারে, তাই দোকানে বইটা দেখে কিনতে দ্বিধা করি নি। এটিই আমার পড়া লেখক আবুল ফাতাহের প্রথম বই।
গল্পটির মূল পটভূমি ২০১৩ সালে শাহবাগে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন এবং এর প্রতিবাদে শাপলা চত্বরে সংঘটিত আন্দোলনে স্বৈরাচারী সরকার কর্তৃক সংঘটিত গণহত্যা। এই ঘটনার মূলে রয়েছে মূলত দুটি পরস্পরবিরোধী মতাদর্শ এবং সেগুলোকে ঘিরে গড়ে ওঠা নোংরা রাজনীতি। মতাদর্শ দুটি হলো ধর্ম এবং ধর্মবিরোধিতা। বস্তুত, এই দুই মতাদর্শের সংঘর্ষ বিশ্বব্যাপী বহু আগে থেকে বর্তমান পর্যন্ত নানা সময়ে ও ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বিদ্যমান ছিল, এবং এখনো রয়েছে। আপনি যে মতাদর্শেই বিশ্বাসী হোন না কেন, আধুনিক বিশ্বে ধর্মকে ঘিরে প্রচলিত সমালোচনার পরিচিত ক্ষেত্রগুলো সবারই জানা—সাম্প্রদায়িকতা, সন্ত্রাসবাদ, মৌলবাদ, চরমপন্থা, উগ্রবাদ, ধর্মের নামে ঘৃণা ছড়ানো, মধ্যযুগীয় বর্বরতা, ভিন্নমতের স্বাধীনতা অস্বীকার, কিংবা ‘ধর্ম আফিম’, এমন অসংখ্য অভিযোগ।
ফলে ধর্মবিরোধী মতাদর্শে বিশ্বাসী মানুষরা সাধারণত সবার আগে নিজেদের অসাম্প্রদায়িক হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করে। আমাদের দেশে তারা নিজেদের জন্য আরও নানা পরিচয় নির্মাণ করেছে— উদারবাদী, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিবাদী, বুদ্ধিজীবী, সুশীল, প্রগতিশীল সমাজ, ইত্যাদি, ইত্যাদি, ইত্যাদি। যাইহোক আমি এই মতাদর্শের সংঘর্ষে ঢুকছি না, গুডরিডসের ফ্রেন্ড লিস্টে আমার সবরধরনেরই মানুষ রয়েছে, কে কী চিন্তা করবে সেটা আমার দেখার বিষয় না।
তবে গণজাগরণ মঞ্চ ছিল মূলত একটি নির্দিষ্ট মতাদর্শকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। ধর্মবিরোধী দর্শন সেখানে ধীরে ধীরে (ইসলাম) ধর্মবিদ্বেষী মতাদর্শে রূপ নেয়, আর যুদ্ধাপরাধীদের শাস্তির দাবিকে আড়াল হিসেবে ব্যবহার করে সেই চিন্তাধারাকে মানুষের মনে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা চলতে থাকে আন্দোলনের পুরো সময়জুড়ে। একই সঙ্গে ক্ষমতাসীন স্বৈরাচারী সরকারের সহায়তায় এই প্রক্রিয়াকে ব্যবহার করে তার রাজনৈতিক ভিত্তি মজবুত করার উদ্যোগও ছিল। আপাতদৃষ্টিতে আন্দোলনটি অসাম্প্রদায়িক বলে উপস্থাপিত হলেও, একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি তাদের দৃষ্টিভঙ্গি, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড ক্রমেই চরম উগ্রতার রূপ নিচ্ছিল। উপরন্তু, এর সঙ্গে রাজনৈতিক অপশক্তির সম্পৃক্ততা যুক্ত হওয়ার পর এই পুরো প্রক্রিয়ার অনৈতিকতা নিয়ে আর কোনো সন্দেহ বাকি থাকে না।
আমি মাঝে মাঝে বিস্মিত হই, নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দাবি করার পরও কীভাবে একটি নির্দিষ্ট ধর্মের প্রতি এত তীব্র ঘৃণা পোষণ করা যায়। সেই ঘৃণার প্রকাশ দেখা যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথাকথিত সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী লেখায়, যেখানে ইসলামকে চরমভাবে অবমাননা করা হয়। এসবের ফলোয়ার লিস্ট ও কমেন্ট বক্সে প্রায়ই প্রতিবেশী দেশের ভিন্ন ধর্মাবলম্বী সাম্প্রদায়িক মানুষদের উপস্থিতি দেখা যায়, যাতে ইসলাম সম্পর্কে আরও কুরুচিপূর্ণ ও বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়ে। তখন মনে প্রশ্ন জাগে, এতে সাম্প্রদায়িকতা আদৌ কোথায় কমছে, আর অসাম্প্রদায়িকতাই বা কোথায়?
অনেকে এটাকে প্রগতি বলে আখ্যায়িত করার চেষ্টা করে, আবার অনেকে বাকস্বাধীনতার দোহাইও দেয়। কিন্তু এই ত্রুটিপূর্ণ ন্যারেটিভকে যখন চালিয়ে দেওয়া হয় একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নামে, যেখানে ইসলাম ধর্ম পালনকারী ও এর মৌলিক বিশ্বাসে বিশ্বাসী মানুষদের দেশদ্রোহী, বিশ্বাসঘাতক কিংবা রাজাকার বানিয়ে দেওয়া হয়, তখন বিষয়টি আরও গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। এমন একমাত্রিক ও আক্রমণাত্মক মতাদর্শ সরকারদলীয় অপশক্তির সহায়তায় শাহবাগ মঞ্চ থেকে ক্রমাগত প্রচার করা হচ্ছিল। এর বিরুদ্ধে অল্প বিস্তর প্রতিবাদের ক্ষেত্রগুলো ক্রমাগত বন্ধ করার এবং সেগুলোকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের চেষ্টাও ব্যাপকভাবে চলেছে। এতে যে প্রকৃত অর্থে বাকস্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হচ্ছিল, সে বিষয়ে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না; কারণ এসব তো ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’-বিরোধী কথাবার্তা।
তাদের সবচেয়ে বড় দ্বিচারিতা প্রকাশ পায়, যখন ৫ মে মতিঝিলে এতোগুলো মানুষকে মেরে ফেলার পরও তাদের এ ব্যাপারে কিছু না এসে যায়। বরং সেই মানুষদের মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক বা রাজাকার হিসেবে ট্যাগ দিয়ে বিষয়টিকে বেমালুম হালকা করার চেষ্টা করা হয়। কেউ কেউ তো করে ঘটনাটিকে সম্পূর্ণ মিথ্যা বলার অপচেষ্টা। একটি নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষদের প্রতি কতই না ঘৃণা তাদের মনে! যখন শাপলা চত্বরে নিহত হয়েছিল সারাদেশ থেকে আসা অসংখ্য নিরীহ মানুষ, তখন তাদের মানবতা কোথায় গেল, কোথায় তাদের উদারতা?
আসলে একপাক্ষিক ঘৃণার চাষ কোনো ক্ষেত্রেই সুফল বয়ে আনে না, এবং সেটি যে করে তাকে অসাম্প্রদায়িকও বলা যায় না। আমি অনলাইনে এমন হিপোক্রিট স্যুডো-ইন্টেলেকচুয়ালদেরকেও দেখেছি, যারা ইসলামকে হিউম্যান রাইটস বিরোধী বলে সমালোচনা করে, কিন্তু মুসলমানদের উপর হওয়া অমানবিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে করে মোরাল ডিলেমা (মহৎ কোনো উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ছোটখাটো খারাপ কাজ করার ব্যাপারটা আরকি) আর নিহিলিজম দিয়ে তা জাস্টিফাই করার চেষ্টা। এরপর তাদের নৈতিকতা বলুন, কিংবা বুদ্ধিভিত্তিক দর্শন, কোনোটার উপরই আর ভরসা রাখা যায় না।
এইজন্য তারা সম্পূর্ণরূপে নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বাআলের মতো একটি স্বৈরাচারী সরকারের ওপর। এই কারণে শাহবাগে আসর জমানো বহু নৈতিকতার কান্ডারী, চেতনার ধারক কবি-সাহিত্যিকরা ২০২৪ সালের জুলাই মাসের হত্যাকাণ্ডের সময়বরাবরের মতো নিশ্চুপ থেকেছে। ধর্মের ‘আফিম’ নয়, বরং চেতনার বড়ি খেয়ে তারা ছিল গভীর ঘুমে। কেউ কেউ নিজেকে অরাজনৈতিক দেখানোর জন্য একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস দেওয়ার সামর্থ্যও দেখায়নি, কিন্তু হাসিনার পতনের পর থেকে গুজব বা ছোটখাটো যে কোনো ইস্যুতেই ছাগলের তিন নম্বর বাচ্চার মতো লাফালাফি করে। এগুলো কি রাজনৈতিক চরমপন্থা বা উগ্রবাদের শামিল নয়?
এমন হিপোক্রেসি ও দ্বিচারিতামূলক পরিস্থিতিতে তাদের প্রিয় শব্দ হলো মৌলবাদ। সহিংসতা বা চরমপন্থার ক্ষেত্রে যেখানে তাদের প্রিয় রাজনৈতিক দল বাআল এবং হেলমেট বাহিনী সবার শীর্ষে, সেখানে ধর্মকে দোষারোপ করার একমাত্র অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় ‘মৌলবাদী’ ট্যাগ। এমনকি প্রতিবেশী দেশের চরম সাম্প্রদায়িক হলুদ সাংবাদিকরাও তাদের সাম্প্রদায়িক মানসিকতাকে ‘ভাল’ বানানোর চেষ্টা করে একমাত্র এই ‘মৌলবাদী’ লেবেল ব্যবহার করে। অর্থাৎ, মৌলবাদের বিরুদ্ধে সমান সাম্প্রদায়িকতা বা উগ্রবাদ, সবই বৈধ বটে। মনে এমন একপাক্ষিক ঘৃণার পাহাড় গড়লে, যেকোনো মতাদর্শের মানুষই এক ধরনের বরাহ শাবক হয়ে যায়।
অনেক বেহুদা কথা বলে ফেললাম। লেখক মূলত ‘প্রহর শেষে’ বইটি লিখেছেন সেই সময়ে ঘটে যাওয়া শাহবাগী এবং আওয়ামীপন্থী মিডিয়ার ম্যানিপুলেশনের বিরুদ্ধে—যেখানে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং শাপলা চত্বরের আন্দোলনকে নেগেটিভভাবে প্রচার করে গণহত্যার ঘটনাকে যায়েজ করার চেষ্টা করা হয়। তবে লেখক চেষ্টা করেছেন জামাতের মিডিয়ার প্রচলিত ধাঁচ থেকে সরে আসতে। তাই প্রধান কাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে একটি গতানুগতিক হুমায়ুন আহমেদ স্টাইলের গল্প।
তানভীর আর তার অল্পকিছু কাছের মানুষদের নিয়েই গল্প এগিয়েছে। গল্পের শুরুর দিকে হুমায়ুন আহমেদের ছাপ পাওয়া যায়। বিশেষ করে তানভীরের পরিবারের সদস্যদের চরিত্রায়নে সেই ছাপ আরও প্রগাঢ়। অন্যদিকে ফারহার সাথে রোমান্টিক সাবপ্লট, পথশিশু তারার সাথে ইমোশনাল সাবপ্লটগুলো গতানুগতিক নাটক আর ফেসবুক গল্পের মতো (আজকালকার গুলার মতো ফালতু না অবশ্য)।
কিন্তু সেগুলো পড়তে খারাপ লাগে নি। কারণ একে তো লেখনী খুবই সাবলীল ও প্রাঞ্জল। আর লেখক ক্লিশে উপাদানগুলোকে সমকালীন রোমান্টিক গল্প হিসেবে মোটামুটি সফলভাবে ব্যবহার করতে পেরেছেন। পাশাপাশি গল্পের মধ্যে শাহবাগে মুক্তিযুদ্ধ আর ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ব্যাপারে হওয়া আওয়ামী প্রোপাগাণ্ডার বিরুদ্ধের বয়ানগুলো ভালোভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছেন লেখক। সেইসাথে ক্লাইম্যাক্স আর এন্ডিংটার জন্যে যেরকম বিল্ডআপের দরকার ছিল, সেটিও লেখক সুন্দরভাবে করেছেন। তবে তানভীরের চরিত্রায়নে কিছুটা দুর্বলতা দেখা গেছে। যেভাবে তাকে অসামাজিক থেকে অত্যন্ত মানবিক বানানো হয়েছে, তা মোটামুটি ভালো ছিল। কিন্তু তার জীবনযাত্রার প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করে ধর্মের প্রতি এত টান চলে আসাটা ঠিক তেমন স্বাভাবিক মনে হয়নি।
শাহবাগ এবং শাপলায় মতাদর্শগত লড়াইয়ে অনেকাংশে রাজনৈতিক প্রভাব জড়িয়ে পড়েছিল, যাতে উভয়পক্ষ-ই সমালোচনার যোগ্য। সমালোচনা করা যায় রাজনৈতিক প্রভাবযুক্ত হেফাজতে ইসলামের কর্মকাণ্ডের, যেখানে উপমহাদেশে ধর্মীয় রাজনীতির পরিস্থিতি বরাবরই খারাপ। সেইসাথে আন্দোলনে আসা সাধারণ মানুষদের বিপদের মুখে ফেলে পালিয়ে পরবর্তীতে তাদের কওমি জননেত্রীর কোলে মুখ লুকানো ভন্ড নেতাদের কথা আর কি বলব! আর উগ্র ধর্মীয় মব তৌহিদি জনতা-র কর্মকাণ্ডকেও সমালোচনার আওতায় আনা জরুরী।
কিন্তু ব্লগে প্রকাশিত আক্রমণাত্মক ও নোংরা সব বক্তব্যকে ‘বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ’ বলে অবিহিত করে সাধারণ মানুষের মধ্যে তা ছড়ানোর অপচেষ্টা করলে, তার পালটা প্রতিক্রিয়া আসতোই। আর ৫ই মে রাতের ক্র্যাকডাউনে সাধারণ মানুষদের নির্বিচারে হত্যা, পাশাপাশি মিডিয়া, বুদ্ধিজীবী ও সাহিত্য সমাজের শাহবাগীদের তা নিয়ে অপপ্রচার, এসব কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। লেখক আবুল ফাতাহ সেই রাতের ঘটনাকে ‘প্রহর শেষে’ বইয়ের ক্লাইম্যাক্সে তুলে ধরেছেন।
লেখকের মতে, তিনি সেই অংশটি তার বাস্তব অভিজ্ঞতার আলোকে লিখেছেন। তাই বোধহয় তার লেখায় সেই ঘটনার ইনটেন্স এবং করুণ টোন, দুটোই তিনি খুব ভালোভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন। আর গল্পের সমাপ্তিটা ছিল বেশ বিষণ্ণ করে দেওয়া। সবমিলিয়ে বইটা শেষ করে আমার খুব ভালো লেগেছে। ২০১৪ সালে এমন সাহসী একটি বই লেখার জন্য লেখকের প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা রইল। এবং সকলের প্রতি অনুরোধ, নিজ মতাদর্শ বা ধর্মের প্রতি এমন অন্ধভাবে আকৃষ্ট হবেন না, যাতে অন্যপক্ষকে নোংরা ভাষায় গালিগালাজ করাকে পুণ্যের বা বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ মনে হতে থাকে, এবং অন্যপক্ষের প্রতি হওয়া অন্যায়কে জাস্টিফাই করা শুরু করে দেন।
📚 বইয়ের নাম : প্রহর শেষে
📚 লেখক : আবুল ফাতাহ
📚 বইয়ের ধরণ : সমকালীন উপন্যাস, রাজনৈতিক, রোমান্টিক
অর্থবিত্ত, প্রাচুর্যে ভরপুর মানুষের কোনো কিছুর অভাব না-ই থাকতে পারে, থাকে কেবল প্রকৃত সঙ্গীর অভাব। যে হতে পারে বন্ধু, পরম মমতাময় কেউ। যার কাছে নিজেকে ভেঙে সবকিছুই খোলসা করে যায়। কিন্তু যার চারিপাশে টাকার আভিজাত্য, তার আশেপাশে কেউ ঘেঁষার সাহস পায় না। যারা ঘেঁষে কিংবা ঘেঁষতে চায়, তারা ওই অর্থের লোভে মৌমাছির মতো ভো ভো করে উড়ে বেড়ায়।
জামাল আহমেদ, আহমেদ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির কর্ণধার। তার একমাত্র সন্তান তানভীর আহমেদ আদরের দুলাল। পাহাড়সম অর্থের চাপে পিষ্ট হতে হতে বন্ধু নামক শব্দ থেকে অনেক দূরে সে। নিজস্ব গাড়ির এসিতে বসে এই সমাজকে দেখা হয় না। সমাজকে অনুভব করা হয় না। সামাজিক এক দেয়াল যেন চারিদিক দিয়ে বিভক্ত করে রাখে। তবুও তানভীর বুঝতে চায়, এই প্রাচুর্যের বাইরের পরিবেশকে। জানতে চায় তার মতন যারা গাড়ি চড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে না, বাসের ওই ভিড়ে কতটা ঘাম ঝরে।
তাই কোনো একদিন ব্যক্তিগত ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে বাসে চড়ার যে যুদ্ধ, সেখানে নিজেকে সঁপে দেয়। কিন্তু অভ্যস্ততা বলে একটা বিষয় থাকে। এভাবে ঝুলে বাসে যাওয়ার অভ্যাস যে তানভীরের নেই। ওদিকে দেশের অবস্থাও টালমাটাল। হরতালের মতো কর্মসূচি চলমান হলেও মানুষজন মানছে কোথায়? অফিস-আদালত চলছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা হচ্ছে, মানুষজন কাজে বের হচ্ছে। তার মধ্যে হরতাল সমর্থিত কিংবা বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনায় ককটেল বিস্ফোরণ। অনভ্যাসের কারণেই হয়তো মাথায় আঘাত পায় তানভীর। এরপর তার বাসে চড়ার সাধ পুরোপুরি মিটে যায়।
একটি ফোনকল আসে তানভীরের ফোন। যাকে মা-বাবা ছাড়া কেউ কল করে না, তার ফোন অপরিচিত নাম্বার থেকে কল আসা চমকই বটে! তাও আবার সেই মানুষটি যদি নারীকণ্ঠী হয়! যেদিন তানভীর বাসে মাথায় আঘাত পেয়েছিল, সেদিন এক মেডিকেল কলেজ ছাত্রী তেমন কিছু আঘাতপ্রাপ্ত মানুষের সেবা করে। সেই তালিকায় তানভীরও ছিল। তানভীরের পরিচয় আর সরলতায় আগ্রহী হয়ে নিজ থেকে যোগাযোগ করে মেয়েটা।
এরপর? দুই বন্ধুহীন মানুষের সরল এক বন্ধুত্বের গল্প গড়ে ওঠে। শুধুই বন্ধুত্ব? না-কি এর বেশি কিছু? পাঠক, বেশি করবেন না। আশাতে দুরাশা বেশি। তাই প্রত্যাশায় লাগাম ধরা জরুরি…. খুব জরুরি।
দেশের পরিস্থিতি ভালো না। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নিয়ে সরগরম দেশের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ মোড় শাহাবাগ। গড়ে ওঠেছে “গণজাগরণ মঞ্চ”। এই গণ জাগরণে মুক্তিযুদ্ধে দেশের সাথে গাদ্দারী করা হায়েনাদের শাস্তির দাবীর রব ওঠে। অত্যন্ত যৌক্তিক আন্দোলন। কিন্তু যেকোনো আন্দোলন বানচাল করে দেওয়ার সবচেয়ে সহজতম উপায় এর মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ ঢুকিয়ে দেওয়া। যুদ্ধাপরাধী কিংবা রাজাকার, সব দলেই সমভাবে বিরাজমান। কিন্তু তারপরও নির্দিষ্ট দলের অপরাধীদেরই কেন শাস্তি দিতে হবে? বাকিরা আড়ালে থাকবে কেন? যারা এই দেশের মানুষের ক্ষতি করেছে, অত্যাচার করেছে, গণহত্যায় নিজেদের হাত লাগিয়েছে; তারা এই স্বাধীন দেশের পতাকা গাড়িতে ঘোরাফেরা করছে। বিষয়টা মেনে নেওয়ার মতো নয়।
তাই সর্বসাধারণের এই আন্দোলন যৌক্তিক। কিন্তু হিতে বিপরীত হয়, যখন জানা যায় এর অন্যতম সমন্বয়ক নাস্তিক। সেই ব্লগার নানান লেখায় ইসলাম ধর্মের কটূক্তি করেছে। মহানবী (স.)কে অবমাননা করেছে। তখন আর বিষয়টা সর্বসাধারণের থাকে না। ইসলাম ধর্মের এই অবমাননা মেনে নেওয়া যায় না। বিপথে পরিচালিত এই আন্দোলন তাই মুহূর্তেই গ্রহণযোগ্যতা হারায়। যে আন্দোলনে তানভীর গিয়েছিল, সাথে ছিল ফারহা; সেই আন্দোলন এখন ধর্মীয় বিদ্বেষের মূল মঞ্চ।
কিন্তু ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা কেন থেমে থাকবে। এই দেশের মাটিতে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হতে পারলে ধর্মীয় বিদ্বেষীদেরও বিচার হবে। লাখ লাখ মুসল্লি যাত্রা করছে মতিঝিল অভিমুখে, শাপলা চত্বর নারায়ে তাকবির ধ্বনিতে মুখরিত। তার সাথে মিশে গিয়েছে তানভীরও।
এই তানভীর, যে কিনা কখনও বাসার বাইরে সময় কাটায় না। যাকে এক বন্দীত্ব দশা দিয়েছিল পরিবার। অসময়ে বাসার বাইরে থাকা নিষেধ। সব উপেক্ষা করে তানভীর বেরিয়ে এসেছে। আল্লাহর ডাক, নবীজীর (স.) সম্মান এখানে প্রধান। তাই তানভীর আজ মুক্ত, বাঁধনহারা। সেও প্রতিবাদ করতে জানে, প্রতিরোধ গড়তে জানে!
কিন্তু জানে না সামনে কী ঘটতে চলেছে! এক নীল-নকশা এঁকে এগিয়ে আসছে শাসকদের হায়না। সামনে অন্ধকার, ঘোর অন্ধকার…..
▪️পাঠ প্রতিক্রিয়া :
একটি বইকে আমি সবসময় মনে করি ইতিহাস ধরে রাখার মূল মঞ্চ, সময়কে ধারণ করার মন্ত্র। লেখক যে সময়ের হোক না কেন, তার লেখাতে সেই সময়টা ফুটে ওঠে। লেখার অলিগলিতে তরতাজা হয়ে ওঠে সময়ের কোণে ঘাপটি মেরে থাকা কিছু জানা তবুও অজানা কোনো ঘটনা।
লেখক আবুল ফাতাহ আমার খুবই পছন্দের একজন লেখক। তার কারণ লেখকের লেখার সাবলীলতা। ভাষার কাঠিন্য তিনি পরিহার করেন। সহজ ও দ্রুতগতির লেখায় পড়ে আরাম পাওয়া যায়। একই সাথে গল্পের সাথে জড়িয়ে থাকা চরিত্রের প্রতি এক ধরনের মমতা তৈরি হয়। মনে হয় খুব আপন কেউ একজন।
লেখক আবুল ফাতাহ-এর “প্রহর শেষে” বইটি মূলত আজ থেকে প্রায় এগারো বছর আগের একটি ঘটনাকে উপজীব্য করে লেখা। তবে মূল ঘটনা বইতে সীমিত পরিসরেই আছে। লেখক যে কাজটা বইতে করেছেন, সেই ঘটনার ভিত গড়েছেন বইটিতে। ঠিক কী কারণে সেই ঘটনার সূত্রপাত, তারই আদি থেকে অন্ত বইটিতে তুলে ধরেছেন।
আপাত দৃষ্টিতে এই গল্পটা তানভীরের। তানভীর খুবই অর্থ প্রাচুর্যে বড় হয়েছে। বাসা থেকে ভার্সিটি, ভার্সিটি থেকে বাসা ছাড়া কোথাও যায়নি। বাবা অনেক বড় ব্যবসায়ী। দেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তিদের একজন। ফলে প্রকৃত বন্ধুর অভাব তানভীরের। এটা বড়লোক হওয়ার পরও তানভীরের মধ্যে অহংকার কোনো ধরনের দেখা যায় না। তার পরিবর্তে এক মেয়ে, যে রাস্তায় ফুল বিক্রি করে তাকে বাঁচাতে আপ্রাণ চেষ্টা করে।
তানভীরের বন্ধুহীন জীবনে ফারহার আবির্ভাব খুব চমকপ্রদ ছিল। তাদের একসাথে চলাফেরা, কথা বলার ধরন, খুনসুঁটি বেশ মনে ধরেছে। যদিও এক নিব্বা-নিব্বি প্রেমকাহিনী হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু এক ধরনের সীমানা টেনে দিয়েছিলেন লেখক। অতিরিক্ত কোনো কিছুই লেখক এর মধ্যে আনেননি। একজন যুবক, যে কখনোই কোনো মেয়ের সাথে কথা বলেনি। তার বন্ধুত্বের গল্পটা এখানে গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে।
জামাল আহমেদকে আমার বেশ মনে ধরেছে। টাকা পয়সা বেশি থাকলে অহমিকা গ্রাস করে। তখন মেজাজ লাগাম ছাড়ায়। অকারণে যাকে তাকে বকা দিতে কার্পণ্য করেন না। জামাল আহমেদ এমন চরিত্র হলেও মানবতা বিসর্জন দেননি। তার এই মানবতাবোধ অর্থবিত্তের মধ্যে থেকেও এক ধরনের ভালো লাগা কাজ করেছে। বিশেষ করে সন্তানের প্রতি যে মমত্ববোধ তার দেখানো হয়েছে, এর কাছে সবকিছু নস্যি।
মুক্তিযুদ্ধের কথা এলেই আমাদের দেখানো হয়, রাজাকার মানে দাড়ি, টুপি ও ধর্মীয় এক আদল। দেখানো হয় সংখ্যালঘুদের নির্যাতনের মহাকাব্য। কিন্তু এই ধর্মের খেলায় দেশের জন্য মাদ্রাসার ছাত্ররাও জীবন নিবেদন করেছে। হুজুর সম্প্রদায় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন। মসজিদ, মাদ্রাসার ক্ষতি সাধন হয়েছে। যেখানে দেখানো হয় হুজুরদের সাহায্যে পাকিস্তানিরা সাধারণ মানুষদের মেরেছে, কিন্তু দেখানো হয় না তাঁরাই পাকিস্তানের বর্বর হানাদার বাহিনীকে সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল।
বইটি খুব বেশি আহামরি ধরনের বই এমন না, সাদামাটা এক গল্প যা ইতিহাসকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। এই সাদামাটা তানভীরের গল্পটাই বেশ ভালো লেগেছে। একজনের চোখ দিয়ে এক অনন্য দুয়ার খুলে দিয়েছেন লেখক। যা হয়তো ভাবাবে, অনেক কিছু জানার ইচ্ছে জাগাবে। তবে কিছু তথ্য দেওয়ার ধরন পছন্দ হয়নি। মনে হচ্ছিল ননফিকশন পড়ছি বা লেখক জোর করে তথ্যগুলো জানানোর চেষ্টা করছেন। বিষয়টা আরো প্রানবন্তভাবে উপস্থাপন করা যেত।
কিছু ঘটনা ফিল্মি স্টাইলে লেখক সাজিয়েছেন। যেটা না হলে ভালো হতো। আর তারা মেয়েটার ঘটনা হুট করে হারিয়ে গেল। কেন? সেটা বোধগম্য হলো না। তানভীরের মানবতার দৃষ্টান্ত দেখানোর কারণেই কি মেয়েটার আবির্ভাব?
শেষটা বিষন���নতায় ভরপুর। ভীষণ আক্ষেপের জন্ম নেয়। নিথর হয়ে যায় স্বপ্নগুলো। এমন তো না হলেও পারত। লেখকের সাথে পাঠকের যখন এরূপ বিরোধের জন্ম হয়, তখনই মনে হয় এক যথাযথ সমাপ্তির পথে এগিয়ে যায় গল্প। এখানেই লেখকের সার্থকতা। যেখানে তিনি মনে করেন তিনিই সঠিক। কিন্তু পাঠক মনে করে লেখকের এভাবে পাঠকদের আবেগ নিয়ে খেলা উচিত হয়নি। আবেগকে হারিয়ে গল্পটা এভাবেই জিতে যায় শেষ সময়ে এসে।
▪️বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য :
প্রচ্ছদটা ভালো লেগেছে। সম্পাদনা ও বানানও যথাযথ। দুয়েকটা ছাপার ভুল ছিল। যেটা অবশ্য সব বইতেই থাকে। প্রোডাকশন কোয়ালিটিতে শিরোনাম প্রকাশন ভালো করছে। আশা করব এর ধরা বজায় থাকবে।
▪️পরিশেষে, যখন গণ জোয়ারের মঞ্চ প্রস্তুত হয়, সেখানে ভেসে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। মানুষ তখন খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চায়। বেঁচে থাকতে চায় সবটা উজাড় করে আর যদি স্বৈরশাসক হয়, তাহলে জোয়ারের পথে আরো বান ঠেলে দেয়। যেখানে গায়ের জোরে তলিয়ে যায় সবকিছু। কিন্তু একবার গণজাগরণ তৈরি হলে, তাকে থামিয়ে দেওয়ার সাধ্য কার? একবার, দুইবার, তিনবার…. এরপর?
বিবেক কখনো হারিয়ে যায় না। যারা সত্যিকারের বিবেক সম্পন্ন মানুষ তাঁরা কোটিপতি হলেও তাঁরা এইটুকু বোঝে কোনটা ন্যায় কোনটা অন্যায়। ধনীর দুলাল কোমল স্বভাবের ছেলেটিকে যখন রাস্তায় নামতে দেখা যায় প্রতিবাদে তবে বুঝতে হবে ছেলেটির বিবেক তাঁকে সাহায্য করেছে। সে জেগে উঠেছে প্রতিবাদী হয়ে। কেউ তাঁকে তো প্রলোভন দেয়নি, কেউ পরামর্শ দেয়নি। তবুও রাজপথে আসার টান ছেলেটি কোথায় পেলো?
ছেলেটি হচ্ছে জামাল আহমেদের, আহমেদ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রির কর্ণধার। তাঁর একমাত্র সন্তান তানভীর আহমেদ আদরের দুলাল। বাবার কোটি টাকার সম্পদ আছে তেমনি আছে প্রভাব প্রতিপত্তি। তানভীর বড় কোমল স্বভাবের। বন্ধুবান্ধব নেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। তবে বাবার অযথা বাড়াবাড়ি শাসন তানভীরের ভালো লাগে না। সে বিনা অনুমতিতে কোথাও যেতে পারে না। ড্রাইভার শরীফ গাড়ি করে সবখানে নিয়ে যায়। তানভীরের নিজেকে খাঁচায় বন্দী লাগে।
তাই কোনো একদিন ব্যক্তিগত ড্রাইভারকে ছুটি দিয়ে তানভীর কৌতুহল বশে বাসে চড়তে গেল। ওর অনেক সহপাঠীরা বাসে যাতায়াত করে। কিন্তু বাসে উঠে আশেপাশে পরিস্থিতি দেখতে পায় যে হরতাল চলছে। বেশ গন্ডগোল চলছে এবং ওদের বাসেও হামলা হয়। তানভীর আহত হয়ে অজ্ঞান হয়ে যায় তখন জ্ঞান ফিরে সহপাঠীদের মুখে এক মেয়ের কথা জানতে পারে। মেয়েটা ওকে শুশ্রূষা করে সুস্থ করে তুলেছে।
তানভীরের ফোনে হঠাৎ করেই একদিন কল আসে এক কিন্নরকন্ঠী মেয়ের। কিন্তু তানভীর তাঁকে চেনে না। পরে অবশ্য কথায় কথায় পরিচয় হলো যে এই মেয়েটা সেই মেয়ে যে তানভীরকে বাসে সাহায্য করেছিল। মেয়েটির নাম ফারহা। ডাক্তারী পড়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজে। কিন্তু এই মেয়েটা তানভীরকে কেন ফোন করেছে? তানভীরের নাম্বার পেলো কোথায় সে?
ফারহার সাথে তানভীরের এরপর দেখা হয় কথাও হয় কিন্তু ফারহা প্রতিবার বয়ফ্রেন্ডের প্রসঙ্গ এনে তানভীরকে কিছুটা দূরে সরিয়ে রাখতে চাইছে। তানভীর সেটা জেনেছে ফারহার বোন তানহার থেকে যে ওর কোনো বয়ফ্রেন্ড নেই। এদের সম্পর্কের সমীকরণ আস্তে আস্তে কতটা আলোর মুখ দেখবে এটা জানা তো যাবেই
কিন্তু দেশের পরিস্থিতি ভালো না। সবখানে কেমন হর তাল, গোল যোগ। যুদ্ধা পরাধীদের বিচার নিয়ে সরগরম দেশের অন্যতম গুরুত্বপুর্ণ মোড় শাহাবাগ। গড়ে ওঠেছে “গণজাগরণ মঞ্চ”। অবশ্যই এটা সমর্থনযোগ্য আন্দোলন। দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা এটা সাধারণ বিষয় নয়।কিন্তু যেকোনো আন্দোলন বানচাল করে দেওয়ার সবচেয়ে সহজতম উপায় এর মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শ ঢুকিয়ে দেওয়া। যেন নির্দিষ্ট এক পক্ষকেই শুধু যুদ্ধা পরাধী বলে বিবেচনা করা হচ্ছে।
হিতে বিপরীত হয়, যখন জানা যায় এই আন্দোলনে আছে কিছু না স্তিক ব্লগার। সেই ব্লগার নানান লেখায় ইসলাম ধর্মের কটূক্তি করেছে। মহানবী (স.)কে অবমাননা করেছে। তখন আর বিষয়টা শুধু যুদ্ধা পরাধীদের বিচার হিসেবে থাকে না। ইসলাম ধর্মের এই অবমাননা মেনে নেওয়া যায় না। বিপথে পরিচালিত এই আন্দোলন তাই মুহূর্তেই গ্রহণযোগ্যতা হারায়।
একজন অতিশয় বৃদ্ধের ডাকে ঝাঁকে ঝাঁকে মুসলমান বেরিয়ে আসে যেন ঘর ছেড়ে। তাঁদের দাবি ওইসব না স্তিক ব্লগারদের বিচার চায় তাঁরা। এই আন্দোলন ইসলামের জন্য। যে আহ্বান উপেক্ষা করতে পারেনি তানভীরের মতো যুবকও। বাবার আদরের দুলাল যে অঢেল সম্পদে ভরপুর। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সে মতিঝিল শাপলা চত্বরে হাজির হয়।
কিন্তু শেষমেশ কী হবে? মতিঝিল শাপলা চত্বরে লাখো মুসল্লির ঢল, চারিদিকে জিকিরের কলরব। সব কী আসলেই ঠিকঠাক থাকবে? সময় বড়ই অদ্ভুত, কখনো কি হয় শেষটা জানা যায় না। অপেক্ষা করতে হবে আরো।
💡 পাঠ প্রতিক্রিয়া 💡
লেখক আবুল ফাতাহের লেখা এই প্রথম পড়লাম।লেখকের লেখা খুবই সাবলীল। ভাষার কাঠিন্য নেই এবং তাই বোধহয় রাজনৈতিক উপন্যাস হলেও বইটি পছন্দ হয়েছে। সহজ ও দ্রুতগতির লেখায় তিনি তানভীরকে যেভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তুলে ধরেছেন তাতে তানভীর অবশ্যই মনে থাকবে। সব চরিত্র কাল্পনিক কী না জানি না তবে কিছু চরিত্র বাস্তবে মিশে জীবন্ত হয়ে যায় যেন।
লেখক আবুল ফাতাহ-এর “প্রহর শেষে” বইটি মূলত আজ থেকে প্রায় এগারো বছর আগের একটি ঘটনাকে উপজীব্য করে লেখা। লেখক মোটামুটি তাঁর লেখায় সংক্ষিপ্তভাবে চেষ্টা করেছেন তানভীরের মাধ্যমে ঘটনার কিছুটা আঁচ দিয়েছেন। অবাক হয়েছিলাম ভূমিকায় যে লেখক এই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন নিজেই।
একটা অজানা অধ্যায় আলোকপাত হয়েছে যেখানে সবসময় রাজাকার মানেই টুপি দাঁড়ি পাঞ্জাবি পরা ব্যক্তি। এবং অনেক বইতে এভাবেই বর্ণনা হয়েছে। কিন্তু এই বইয়ে জানা যায় মুক্তি যুদ্ধে এইসব ধর্মপ্রাণ মুসলমান, হুজুরেরা কতটা অবদান রেখেছে। তাঁরা দেশের কল্যাণে পাকিস্তানীদের সঙ্গে সাহায্য করেনি। বহু মাদ্রাসা ছাত্র যুদ্ধে অংশ নেয়।
বইটি খুব বেশি আহামরি ধরনের বই এমন না, সাদামাটা এক গল্প যা ইতিহাসকে ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। এই সাদামাটা তানভীরের গল্পটাই বেশ ভালো লেগেছে। কিছু কিছু বইয়ের শেষে মাঝে মাঝে মনে হয় আহা! এমন কেনো হলো। যদি শেষটা বদলে দেয়া যেত। সবমিলিয়ে বেশ ভালো ছিলো বইটি।
💡 বানান, সম্পাদনা ও অন্যান্য 💡
শিরোনাম প্রকাশনীর প্রোডাকশন কোয়ালিটি সন্তোষজনক। অন্তত নতুন বের হওয়া বইগুলোর ক্ষেত্রে ওনারা চেষ্টা করেছেন প্রোডাকশন কোয়ালিটি উন্নত রাখার। মজার ব্যাপার হলো প্রচ্ছদ কিন্তু লেখকের নিজের করা। এবং আমার কাছে মানানসই লেগেছে।
"জোয়ার এসেছে জলসমুদ্রে"
যে দাবি ন্যায়ের পথে, যে দাবিতে গনজোয়ার ওঠে সে আন্দোলন সেই জনস্রোত থামিয়ে রাখা যায় কী? জাগ্ৰত করে দেয় সেই জনস্রোত তানভীরের মতো মানুষদেরও বিবেক।
❛কিছু স্মৃতি ভুলে থাকা যায় না। হৃদয়ের কোথাও দ গ দ গে ঘায়ের মতো পীড়া দিয়ে যায়। বছর ঘুরে নির্দিষ্ট দিন এলে সেই স্মৃতি যেন নাড়া দিয়ে ওঠে। প্রহর শেষ হওয়ার আগেই কেমন করে শেষ হয়ে গিয়েছিল কতগুলো প্রদীপ।❜
বাবা মায়ের আদর, নিরাপত্তার এক নিশ্ছিদ্র বেষ্টনীতে আবদ্ধ তানভীর। নেই তেমন কোনো বন্ধুবান্ধব। বিশ্ববিদ্যালয়ে গাড়ি হাকিয়ে যায়, ক্লাস শেষে অপেক্ষমান সেই গাড়িতেই আবার বাসার পথ ধরে। বাইরের জগৎ থেকে একেবারেই বিচ্ছিন্ন সে। বাসায় বই পড়ে কাটিয়ে দেয় বাকি সময়। সংযোগ নেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও।
এমন আলাভোলা ছেলে পাওয়া দুষ্কর। তানভীর তাদেরই একজন। কিন্তু রোজকার এই নিয়ম তার ভালো লাগেনা। তাই আজ সে ভাবলো ভিন্ন কিছু করবে। বিদায় দিয়ে দিলো গাড়ি। ইচ্ছে লোকাল বাসে ঠেলে ধাক্কিয়ে ওঠার অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। তবে ঐযে অভিজ্ঞতা নেই আর দিন দুনিয়ার খবরও তেমন রাখে না। তাই জানেনা রাস্তার অবস্থা ভালো না। বাসে উঠতেই বি স্ফো র ণে র শব্দে মূর্ছা যায় তানভীর।
এরপর বাসে সহপাঠীদের সহযোগিতায় জ্ঞান ফেরে তার। আর কথা না বাড়িয়ে বাড়ির পথ ধরে।
এদিকে ড্রাইভার তো ভয়েই শেষ। মালিক জানলে কী হবে? মালিক জামিল আহমেদ ঠিকই জানলেন পুত্রের একা বাড়ি ফেরার ব্যাপার। তবে হম্বিতম্বি করলেন না। পুত্রের সাথে এই উসিলায় অনেকদিন বাদে কথা হলো, ভিন্ন এক আলোচনা। যে আলোচনায় আসলো একাত্তরের যু দ্ধে র সময়ের কথা। তানভীর ব���বার এই দিক সম্পর্কে অজ্ঞাত ছিল। জেনে নিল অজানা অনেক কিছু।
সেই রাতেই অজানা এক নাম্বার থেকে ফোন এলো তার কাছে। রিনরিনে কণ্ঠটাকে চিনতে পারে না সে। পারার কথাও না। বাবা-মা ছাড়া তাকে কেউ ফোন করে না। জানতে পারে মেয়েটি আজকে সে মূর্ছা যাওয়ার পর কিছুটা শশ্রুষা করেছে। কাছের বন্ধুদের থেকে তানভীরের নাম্বার নিয়েই এই মধ্যরাতে ফোন করা।
সময়টা ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি। তানভীর ক্লাস করতে যাওয়ার পথে শাহবাগে দেখে বিশাল মানুষের জটলা। জানতে পারে শাহবাগে হয়েছে গণজাগরণ মঞ্চ। সবাই একত্র হয়েছে যু দ্ধাপরা ধীদের বিচারের দাবিতে।
আচ্ছা যু দ্ধা প রাধী, রা জা কা র মানেই কী একটা বিশেষ গোষ্ঠী? নাটক, সিনেমা, উপন্যাস সবখানে একইভাবে কেন চিত্রিত করা হয় তাদের? এমন প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর কারণ বুঝে না তানভীর। যাই হোক, একদিন সংকোচ কাটিয়ে সেও যোগ দেয় শাহবাগের সেই মঞ্চের আশেপাশে। দেখা হয় রিনরিনে কণ্ঠের মেয়ে ফারহার সাথেও। বেশ লাজুক লাগে নিজেকে। চাপা স্বভাবের এবং সবসময় একা থাকার ফলেই কিনা এই আড়ষ্টতা।
সকলের মিলিত অবস্থানে এসে তানভীরের বেশ লাগে। আন্দোলনের মঞ্চ হলেও বেশ উৎসব একটা ভাব বিরাজ করছে এখানে। তার ভালোই লাগে। ভালো লাগে ফারহার সাথে সময় কাটাতে।
এরমধ্যেই একদিন মঞ্চের আশপাশে ফারহার সাথে থাকাকালীন তার মোবাইলে কল আসে কেউ হাসপাতালে ভর্তি। যেতে হবে। বাবা মা ঠিক আছেন তবে কে?
দিনেই দেখা হওয়া ছোট্ট ফুল বিক্রেতা তারা থেকে সে ফুল কিনেছিল। হাসপাতাল গিয়ে দেখে সেই মেয়েটাই সড়ক দূর্ঘটনায় মৃ ত্যু র সাথে পাঞ্জা লড়ছে। তাকে বাঁচাতে জীবনে কোনোদিন কোনো ঝুঁকি না নেয়া তানভীর দান করলো নিজের র ক্ত।
নতুন এক অভিজ্ঞতা এ।
খু ন হয়ে গেছে গণজাগরণ মঞ্চের অন্যতম সংগঠক ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার। কিন্তু কেন?
তার মৃ ত্যু র পর মঞ্চে তোলপাড় লেগে যায়। তোলপাড় লাগে সামাজিক মাধ্যমেও। কারণ, বেরিয়ে পড়ে তার ব্লগের কিছু লেখা। যা ইসলামের বিরুদ্ধ এবং তাদের খাটো করে নোংরা ভাবে লেখা। ফেটে পড়ে ইসলামী মননের মানুষ এবং সংগঠনগুলো। প্রতিবাদ হয়। ততদিনে গণজাগরণ মঞ্চ তার শোভা হারিয়েছে। উদ্দেশ্য বেহাত হয়ে অন্য দিকে চলে গেছে।
তানভীর ভেবে পায়না কেউ এত নি কৃ ষ্ট লেখা কীভাবে লিখতে পারে। কেন একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এবং বিশ্বাসীদের সবসময় কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়?
ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট একটি সংগঠনের আন্দোলন জোড়ালো হতে থাকে। তানভীর বোঝে তাদের দাবি যৌক্তিক। তবুও বাবা তাকে সেখানে যেতে বারণ করেছেন।
আসছে ৫ ই মে ঐ সংগঠন ন্যায় বিচারের দাবিতে মতিঝিলে লং মার্চ করবে। তানভীরের মন পড়ে আছে সেখানে যাওয়ার। কিন্তু বাবার কড়া নিষেধ।
এরমধ্যেই ফারহার সাথে বন্ধুত্বটা বেশ জমে উঠেছে। একা, নিঃসঙ্গ একটা ছেলের জীবনে ফারহার মতো একটা মেয়ে বসন্তের দোলা নিয়ে হাজির হয়েছে। বেশ কাটছে দিন।
কিন্তু মনে ৫মের চিন্তা। কী করে সেই বিশাল সমাবেশে নিজে জড়াবে ভাবছে।
নির্দিষ্ট দিনে লাখো মানুষ হাজির হয়েছিল সেখানে। তাদের দাবি নিয়ে। কিন্তু ভেতরে পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন। সূর্যের আলো বিদায় নিতেই ধীরে ধীরে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে লাগলো নির্দিষ্ট ঐ এলাকা। শুরু হলো এক তা ন্ড ব। জল কামান, গু লি নিয়ে হাজির বাহিনী। লক্ষ্য কী তাদের? কিছুক্ষণ পরপর কেন গু লি র শব্দ শোনা যাচ্ছে? এই শব্দের সাথে পালা দিয়ে বাড়ছে ❛না রা য়ে তাকবির, আল্লাহু আকবার❜ ধ্বনি। রাতটা বেশ বড়। কেউ ফোন শেষ বিদায় নিচ্ছে, কারো চোখে পানি, কারো চোখে ভয়, অনিশ্চয়তা। প্রহর শেষে ঐ সূর্য আর দেখা হবে? এত জনতার ভিড়ে কি তানভীর আছে? তার ফোন কেন বন্ধ?
বাবা মা, ফারহার ভয় বাড়ে। ওদিকে বাড়ে নিষ্প্রাণ দেহের স্তূপ।
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝প্রহর শেষে❞ আবুল ফাতাহ এর লেখা পলিটিক্যাল উপন্যাস।
তার লেখা যথেষ্ট ভালো এবং বিষয় বাছাইয়ের ক্ষেত্রে লেখকের জুড়ি নেই।
এই উপন্যাসটি ২০১৩ সালের মে মাসে ঘটা হৃদয়বিদারক এবং ভ য়া ব হ এক ঘটনাকে উপজীব্য করে লেখা। দীর্ঘ ৮ বছর অপেক্ষার পর অবশেষে উপন্যাসটি আলোর মুখ দেখেছে (২০১৪ সালেও প্রকাশ হয়েছিল বইটি। প্রথম এডিশনের পর আর নতুন করে মুদ্রিত হয়নি)।
তানভীর নামক সহজ সরল এক তরুণের জীবনে আসা রাজনৈতিক এক প্রেক্ষাপটে নিজেকে বদলে ফেলার বিষণ্ন সুন্দর এক গল্প লেখক শুনিয়েছেন আমাদের।
শুরুটা আমার ভালো লাগছিল না। কেমন আতেল নিব্বা জাতীয় কাহিনি মনে হচ্ছিলো। ক্রমেই গল্প এগিয়ে গেলো আর বিষয়বস্তু বদলে যেতে লাগলো (যখন পড়েছি তখন প্লট না জেনেই পড়া)। আমিও গল্পে (না ইতিহাস!?) বুদ হয়ে যেতে লাগলাম। শুরুতে মনে হয়েছিল এতগুলো পৃষ্ঠা কতক্ষণে শেষ করবো। কিন্তু পড়তে পড়তে কখন যে শেষে এসে গেলাম হুশ নেই।
লেখকের আগের কিছু উপন্যাস পড়েছি বিধায় তার লেখা নিয়ে ধারনা আছে। যথেষ্ঠ সুপাঠ্য এবং দ্রুত গতির বর্ণনা করে থাকেন। লেখায় প্রয়োজনীয় সাসপেন্স এবং আগ্রহ থাকে কী হবে জানার। এখানে যদিও ইতিহাস জানা তবুও ঘটনার মোড় যখন নিয়েছে বেশ অবাক হয়েছি। আমার কাছে মনে হতে থাকা নিব্বা ধাঁচের গল্পটা কখন যে আবেগতাড়িত করে দিলো বুঝতেই পারিনি।
এই বিষয়ে উপন্যাস লেখা বেশ সাহসের ব্যাপার। যেখানে একদলের প্রোপাগান্ডা নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এবং বিশ্বাসকে নীচু করা। সেখানে এমন বিষয়ে গল্প নিয়ে বসা বেশ ঝুঁকির।
আজও, বলা যায় এখন আরও বেশি সেসব মানুষের সংখ্যা বেড়েছে যারা একটা নির্দিষ্ট ধর্মকে কটুক্তি করতে ছাড়ে না। ছাড়ে না নীচু করতে। সব বিষয়ে তারা বাক স্বাধীনতা খোঁজে কিন্তু এদের বেলাতেই তাদের মুখ যেন পঁচা আবর্জনার মতো হয়ে যায়।
উপন্যাসের কাহিনি যখন মঞ্চ থেকে মতিঝিলে চলে গেলো তখন থেকেই কেমন ফাঁকা এক অনুভুতি হচ্ছিলো। আহারে কী ভয়ানক এক বিশাল রাত গেছিলো। কীভাবে ঐ ভয়াল সময়টা উপস্থিত অসহায় মানুষগুলো পার করেছিল! কোথায় হয়েছিল তাদের শেষ গন্তব্য? এসব ভেবেই কষ্ট হচ্ছিলো।
লেখক শেষের দিকে যে দৃশ্যের অবতারণা করেছেন সেটা নিয়ে কিছু বলার সাধ্য নেই আমার। আছে শুধু একরাশ অপারগতা, একরাশ দুঃখ।
সেই বছর থেকে প্রতি বছর মনে করি নির্দিষ্ট এই দিন। আহারে সেদিন যদি সে ক্যু লা ঙ্গা র সমাজ মুখ খুলতো!
উপন্যাসের শেষটা বেদনাদায়ক, কষ্টের নিংড়ানো অনুভূতিতে ছেয়ে গেছে বলার অপেক্ষা রাখে না। নিরাশার পারদ উঁচুতে ছিল। কিন্তু পড়া শেষে এত বছর বাদে এই বিষয়ে কেউ লিখলো এই তৃপ্তি বিরাজ করেছে।
আমার কাছে দারুণ লেগেছে। লেখক যেসব উৎস থেকে তথ্য নিয়েছেন ইতিহাসের সেসব উল্লেখ করেছেন। টুকিটাকি সমস্যা ছাড়া উপভোগ্য এবং সুপাঠ্য উপন্যাস।
❛সত্য চাপা থাকে না। জু লু মকারীর বিচার সৃষ্টিকর্তা করেন। আগে কিংবা পরে। ইতিহাসের চাপা পড়া প্রাণ এবং কথাগুলো মাটি ফুঁড়ে ঠিকই তাদের সত্যতা জানান দেয়।❜
যাদের চোখের সামনে তথাকথিত গণজাগরণ মঞ্চ হয়েছিলো এর পরে শাপলা চত্বর রাতের গণহ্যাতা হয়েছে তাঁদের জন্য এই বই না। আমি অনেক আশা নিয়ে শুরু করেছিলাম কিন্তু তানভীর কে বেশি ফোকাস, কিছু কিছু স্থনে বিরক্ত হয়ে গেছি। ফাত্তা ভাইয়ের সকল বই পড়া অনেক বড় ভক্ত কিন্তু এই বইটা মনে হয় নাই বইটা ফাত্তাহ ভাইয়ের লেখা।
উপন্যাসের ছোট্ট একটা অংশ শাপলা গণহত্যা। আমার মতো কেউ এটাকে শাপলা গণহত্যা নিয়ে লেখা উপন্যাস পড়বেন আশা করে যদি পড়েন তাহলে চরম আশাহত হবেন। রাজনৈতিক উপন্যাস বলা হলেও রাজনীতির চেয়ে রোম্যান্সের পরিমানই বেশি ছিল।