প্রতিটি গল্পই লেখকের বহুমুখী জীবনপ্রণালী থেকে উঠে আসা অভিজ্ঞতা, ভণিতাবিহীন চিন্তাভাবনার ফসল। অসহায় নিরুপায় মানুষ যেমন তার গল্পের চরিত্র, তেমনি মধ্যবিত্ত কূপমণ্ডুক ভীত নিরাপত্তা-আশ্রয়ী মানুষও লেখকের গল্পের বিষয়। একটি ভিনটেজ অস্টিন গাড়ি, কলকাতার রাত, নিজের দুই মেয়ে, রাতের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েরা লেখার মুন্সিয়ানায় গল্প হয়ে ওঠে (আত্মজা ও একটি…)। হারিয়ে যাওয়া গান, তার অনুসন্ধান, সেসব গান শুনতে শুনতে সেইসময়ে ফিরে যাওয়া, সেই ঘ্রাণ সেই ঘটনা-পরম্পরা, বেদনাবােধ—এই সংকলনে এরকম গল্প ‘ঝিঝােটি দাদরা’, ‘গানের বাগান’—পাঠক স্মৃতিমেদুর হতে বাধ্য। ঘােড়ার মনমেজাজ যেমন গাড়ির জগত এবং একটি বিচিত্র মানুষের গল্প, তেমনি নিজেদের রেললাইন’ এক বঙ্গবাসী প্রবীণ মারােয়ারি দম্পতির আবেগাপ্লুত কাহিনি। স্মৃতি-বিস্মৃতির দোলাচলে আবর্তিত একজন সফল বিজ্ঞানীর গল্প যেমন ‘বিলাসখানি’, আবার ‘বােম্বে রােডের রাধা’ এক ফুটপাথবাসিনীর মর্মান্তিক জীবনযুদ্ধের কাহিনি। সিধু পালের হিমসাগর’ এমন মানুষের গল্প যিনি তিনপুরুষের আমবাগান নিশ্চিহ্ন হতে দেখেও কথার জাদুতে তিনটি প্রাণাধিক আবৃক্ষ নিধন বিলম্বিত করতে চান। প্রতিনিয়ত অপমানিত মানুষ হঠাৎ বড়ো সাফল্যের স্বাদ পায় ‘মৎস্যপুরাণ’ গল্পে। সময় পিছিয়ে যায়, মানুষ তার আইডেনটিটি নিয়ে সন্দিহান হয়ে পড়ে ‘পাগলাঘন্টি’ গল্পে। ‘অপমানের স্বাদ পেতে চান লেখক যাতে পরিপার্শ্বের আসল রূপ খুঁজে পান। ‘বেঁচে থাকার বিশেষ উপায়’ লেখকের আবিষ্কৃত এক বিশেষ উপায়। আবার ‘বাসি পুরুষমানুষ’ এক অসম প্রেমের অন্তিম পরিণতি। মানুষ কতদিন বাঁচতে পারে’ মধ্যবিত্ত নিরাপত্তা বিলাসীর প্রশ্ন যেমন, আবার ‘নদী’ গল্পে লেখক এক আশ্চর্য মানুষের সঙ্গে আশ্চর্য নদীভ্রমণের সঙ্গী। রাজরাজেশ্বর’ বারবার ভেঙ্গে পড়েও হার না মানা স্বপ্নসন্ধানী আরেক আশ্চর্য মানুষের গল্প। ইতিহাসােমিটার’ সফলতম ইতিহাসের অধ্যাপকের এতকালের স্বীকৃতি সত্ত্বেও আত্ম-উন্মােচন, নতুনতম উপলব্ধির গল্প।
শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের জন্ম অবিভক্ত ভারতের খুলনাতে (অধুনা বাংলাদেশ)। খুলনা জিলা স্কুলে তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে তাঁর পরিবার কলকাতায় চলে আসে। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় প্রথম জীবনে আনন্দবাজার পত্রিকায় কর্মরত ছিলেন, ১৯৬১ সালে আনন্দবাজারে যোগ দেওয়ার পর তাঁর ছোটগল্প ‘হাজরা নস্করের যাত্রাসঙ্গী’, ‘ধানকেউটে’ ইত্যাদি প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘বৃহন্নলা’, কিন্তু দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে ‘কুবেরের বিষয় আশয়’ প্রকাশিত হওয়ার পরেই শ্যামলের লেখনী বাংলা পাঠকমহলে সমাদৃত হয়। ব্যক্তিজীবনে বোহেমিয়ান, সুরসিক ও আড্ডাবাজ ছিলেন তিনি। আনন্দবাজার পত্রিকা গোষ্ঠীর অন্যতম কর্তা সন্তোষকুমার ঘোষের সাথে তাঁর মনোমালিন্য হওয়ায় যুগান্তরে যোগ দেন। যুগান্তরের সাহিত্য পত্রিকা অমৃত সম্পাদনা করতেন। ১৯৯০ সালে অবসরের পরে আজকাল পত্রিকা ও সাপ্তাহিক বর্তমানে নিয়মিত লিখেছেন। গ্রামীণ জীবন, চাষবাস, সম্পর্কের জটিলতা ইত্যাদি শ্যামলের রচনার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
১৯৯৩ সালে শ্যামল সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে সম্মানিত হন ‘শাহজাদা দারাশুকো’ উপন্যাসটির জন্যে। এছাড়া তাঁর লেখা দেশ বিদেশের নানা ভাষাতে অনূদিত ও প্রকাশিত হয়েছে।