নবাব আলিবর্দি খান তখন বাংলা-বিহার ও উড়িষ্যার ক্ষমতায়। তার শাসনামলে বর্গিদের উৎপাত বেড়ে যায়। ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত বর্গিরা পাঁচ-পাঁচবার হামলা করে বঙ্গদেশে। বর্গিহাঙ্গামার ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা ও আশপাশের অঞ্চলগুলোতে।ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হতে থাকে জনসাধারণ। উগ্র বর্গি সেনাদের ভয়ংকর লুটপাট, নারী ধর্ষণ-বলৎকার আর স্তন কেটে নেওয়া, জুলমু-অত্যাচারে কেঁপে ওঠে পুরো বঙ্গ। ধর্মবর্ণ-নির্বিশেষে মানুষদের গণহত্যা, হাত-পা, নাক-কান কেটে নেওয়ার মতো নির্মম ইতিহাস রচনা করে এ বর্গিসেনারা। মসজিদ, মন্দির-গির্জা সবকিছু গুড়িয়ে দেয়, মিশিয়ে দেয় মাটির সাথে। গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়। বর্গিদের এমন হিংস্রতা আর উগ্রতার ইতিহাস আমরা কজন জানি! কতটুকু জানি, বর্গিদের বর্বরতা ও নির্মমতার উপাখ্যান! কিছুটা অনালোচিতই থেকে গেছে বাংলার ইতিহাসের এ অধ্যায়।
লেখক আমীরুল ইসলাম ফুআদ তার "বর্গি এলো দেশে" বইটিতে সমসাময়িক আকরগ্রন্থ যেমন—সৈয়দ গোলাম হোসেন খান তবাতবায়ির ‘সিয়ার-উল-মতায়াখখিরিন’, কবি গঙ্গারাম দত্তের ‘ঐতিহাসিক চিত্রচম্পুকাব্য’, এবং আধুনিক গবেষকদের কাজ (যেমন যদুনাথ সরকার, স্বপন কুমার ঠাকুর) থেকে তথ্য নিয়ে এই ইতিহাসকে সুবিন্যস্ত করেছেন।
নবাব আলিবর্দি খানের শাসনামল, ১৭৪২ থেকে ১৭৫১ খ্রিস্টাব্দ। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার আকাশ কালো করে নেমে এসেছিল মারাঠা বর্গিদের হিংস্র থাবা। এই বর্গিসেনারা ছিল উগ্র, চরমপন্থী এবং হিংস্র স্বভাবের। তারা দস্যুবৃত্তির কারণে চিরকাল ইতিহাসের পাতায় কুখ্যাত ছিল। লেখক ফুআদ সাহেব দেখিয়েছেন, কীভাবে বর্গিরা বঙ্গে ঢুকে নির্বিচারে লুটপাট, ধর্ষণ-বলাৎকার, হত্যা-প্রতিহত্যায় মেতে ওঠে। তাদের বর্বরতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে, তারা বাড়িঘর জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছারখার করে দিত, মসজিদ, মন্দির-গির্জায় আগুন দিত। তাদের অত্যাচারের সবচেয়ে নির্মম দিকটি ছিল হাত-পা, নাক-কান কেটে নেওয়া, এমনকি মেয়েদের স্তন কেটে নেওয়ার মতো জঘন্য জুলুম-নির্যাতন। বর্গিদের নাম শুনলে ভয়ে প্রাণ থরথর করে কেঁপে উঠত, শিশুরা নাকি মায়ের স্তন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিত।
বইটির পাতায় পাতায় মীর হাবিবের বিশ্বাসঘাতকতা এবং মুর্শিদাবাদে বর্গিদের তাণ্ডবের কথা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। মীর হাবিবের প্ররোচনায় বর্গিরা মুর্শিদাবাদে হামলা চালিয়ে জগৎশেঠ ফতেহ চাঁদের বাড়ি থেকে নগদ তিন লক্ষ রুপি ও অন্যান্য সম্পদ লুট করে। তাদের বর্বরতা এমন ছিল যে, কবি গঙ্গারাম পুঁথিতে লিখেছেন, বর্গিরা গ্রামে ঢুকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে তলোয়ার দিয়ে কাটত। বহু সম্ভ্রান্ত পরিবার এই অত্যাচারের শিকার হয়ে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য হয়।
তবে এই অন্ধকার কাহিনিতে আশার আলো আসে নবাব আলিবর্দি খানের কঠোর সিদ্ধান্তে। তিনি চরম ঝুঁকি নিয়ে ভাস্কর পণ্ডিতকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। ১৭৪৪ সালের ৩১ মার্চ মানকারায় এক সাক্ষাতের ছলনায় ভাস্কর পণ্ডিতকে তার একুশ জন সেনাপতিসহ হত্যা করা হয়। যদিও ভাস্কর পণ্ডিতের মৃত্যু নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে (কেউ বলেন তাঁবুর দড়ি কেটে, কেউ বলেন নবাবের বেরিয়ে যাওয়ার পর), এই হত্যাকাণ্ড বাংলার আকাশে শান্তির পায়রা উড়তে সাহায্য করেছিল। দীর্ঘ প্রায় এক দশক ধরে চলা এই ভয়াবহ যুদ্ধের ইতি ঘটে ১৭৫১ সালের ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে। স্থির হয় যে, বর্গিদের প্রতি বছর চৌথ হিসেবে ১২ লক্ষ রুপি দিতে হবে এবং সুবর্ণরেখা নদী বাংলা ও উড়িষ্যার সীমান্ত নির্ধারিত হবে।
বইটি এই ইতিহাসের এক অনলোচিত অধ্যায়কে পূর্ণতা দিয়েছে এবং বাংলার মানুষের উপর হওয়া বর্বরতার একটি নির্ভুল ও সমৃদ্ধ চিত্র তুলে ধরেছে। এই বইটি বর্গি হামলার বিভীষিকা এবং প্রতিরোধের গল্প বুঝতে পাঠকের জন্য একটি অমূল্য দলিল।
সেরা একটা বই,বাংলা ভাষায় এইবিষয়ে খুব কমই বই আছে,বর্গি রা বাংলার ইতিহাসের সাথে ওতোপ্রোতভাবে জড়িত।নবাব আলিবর্দি খার উপর ভালো দখল গেছে।পড়তে পারেন ভালো বই