এই গ্রন্থে ধরা পড়েছে প্রতারণা ও স্বীকারোক্তির এক আশ্চর্য সংঘাত, আর্তনাদের ভেতর রূপান্তরিত মানুষের সংবেদ; যা সংশয় ও ফলশ্রুতির ভেতরে চিরকালীন জিজ্ঞাসা ফেলে রেখে, পাঠককে অনুসন্ধানী করে তোলে।
Moti Nandi was a sports journalist and worked as a sports editor in Anandabazar Patrika. He was awarded the Lifetime Achievement award (2008) at a glittering ceremony to mark the grand finale of the maiden edition of the Excellence in Journalism Awards.
In his novels, he is noted for his depiction of sporting events and many of his protagonists are sports-persons. His first short story was published in Desh weekly on 1957. His story for Pujabarshiki was in Parichoy Magazine on 1985.
যখন ভাঙাচোরা সাইকেলটা চালাতাম তখন মনে হতো ঘড়ঘড় আওয়াজটা আমি যতটা তীব্রভাবে শুনছি ততটাই আশেপাশের মানুষের কানেও যাচ্ছে। দৈবাৎ কোনো বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লে সবার আগে মনে হতো সবার নজরের কেন্দ্রবিন্দু বুঝি আমি, সবার মস্তিষ্কের ভিতর হয়তো আমার লজ্জাজনক পরিস্থিতিটাই ঘুরপাক খাচ্ছে। একটু বড় হওয়ার পথে বুঝেছি সাইকেলের ওই ঘড়ঘড়ানির খুব মৃদু আওয়াজই আশাপাশে যেতে পারে। আরেকটু বড় হয়ে বুঝেছি আমার পাশের মানুষটা বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়লে আমার মন সেদিকে পুরোপুরি ফোকাস করে না। আমি যেমন পাত্তা দিচ্ছি না, বাকিরাও তেমন গ্রাহ্য করছে না তবে নিজে লজ্জায় পড়লে তা মনে থাকে না। খুব অল্প হলেও এরকম ওভারথিংকিং কমিয়েছি; তবে লোকলজ্জা! ও বস্তু প্রয়োজনের থেকে বেশি হলে ভোগান্তির কূল কিনারা না পেয়ে জীবনটা যতটা সম্ভব আঁটোসাঁটো করার চেষ্টা করাই একমাত্র প্রতিকার মনে হয় ভুক্তভোগীর। লেখকের ‘কম্ফোর্ট জোনের’ বাইরে সাদা খাম এই সাধারণ সমস্যাটিকে গভীর থেকে তুলে ধরেছেন প্রিয়ব্রত ওরফে অতুল চরিত্রে মাধ্যমে। সার্টিফিকেট জাল করে আরেকজনের নাম নিয়ে সরকারী চাকুরীতে যোগ দেয় প্রিয়ব্রত কিন্তু এই অপকর্মের মধ্যস্থতাকারী ফনি পালের আর্থিক অবস্থা পড়ে গেলে প্রিয়ব্রতকে ব্লাকমেইলের টাকার যোগান দিতে হয় সাদা খামে করে প্রতি মাসের এক তারিখে। আজ মধ্যবয়সের বিপত্নীক মানুষটা পরিচয়ের মার্জিনে আবদ্ধ। উপন্যাসের মূল কাহিনী শুরু হয় যখন সেই ব্লাকমেইলার মারা যায় আর একই সময়ে ছোটবেলার এক বন্ধুর ধর্ষিতা মেয়ে যখন তার কাছে আশ্রয় চায় রেপিস্টদের থেকে বাঁচতে। প্রিয়ব্রতের সংকট খুব সহজে লিখে ফেলা গেলেও এর চাপটা কয়েক লাইনে বোঝানো খুব শক্ত। মতি নন্দী কোনো ভাবগম্ভীর আলাপের মধ্যে না গিয়ে যেভাবে কিছু ঘটনার মাধ্যমে এত কমপ্লিকেটেড বিষয়টা নিয়ে লিখেছেন তা সত্যিই অভাবনীয়।
মতি নন্দীকে এতদিন চিনে এসেছি একজন কিশোর ঔপন্যাসিক হিসেবে। তবে তার লেখা কিশোর উপন্যাসগুলো আঙ্গিকে একদম ভিন্ন; কখনও ক্রিকেট, কখনও ফুটবল, কখনও এথলেটিক্স-নানান ধরণের খেলাধুলাকে কেন্দ্রে করে গড়ে ওঠা কাহিনি। কর্মজীবনে ক্রীড়া সাংবাদিক হওয়ার সুবাদে অত্যন্ত সুনিপুণ হাতে তিনি এধরণের সুখপাঠ্য উপন্যাস লিখেছেন।
তবে 'সাদা খাম' এর লেখক মতি নন্দী সম্পূর্ণ ভিন্ন একজন মানুষ। গত ত্রিশ বছরে অকাদেমি সাহিত্য পুরস্কার পাওয়া লেখকদের তালিকা ঘাটতে গিয়ে হঠাত করেই মতি নন্দীর নামের ওপর চোখ আটকে গিয়েছিল। ভাবলাম, ১৯৯১ সালে পুরস্কার পাওয়া বইটা পড়ে দেখা দরকার। বই খুঁজে পাওয়া গেলো এবং কিছুক্ষণের ভেতর আবিষ্কার করলাম, এই বইটা এক৷ নিশ্বাসে না পড়া মানে স্বেচ্ছায় নিজেকে বঞ্চিত করে রাখা।
নাম ভাঁড়িয়ে চাকরি করতে ঢুকেছিল প্রিয়ব্রত। ছাব্বিশ বছর ধরে আত্মীয়, প্রতিবেশী, বন্ধু, সহকর্মী-সবার থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে গড়ে তুলেছিল নিজস্ব একটা জগৎ। ছাব্বিশ বছর ধরে প্রতি মুহূর্তে নিজেকে ভয় পাইয়ে নিজেকে ঘিতে তৈরি-করা খোলসটাকে কঠিন থেকে ক্রমশ করে তুলেছিল কঠিনতর। বাইরের কোন তাপ, আলো , শব্দ, বাতাস সেই আবরণ ভেদ করে প্রিয়ব্রতর জগতে ঢুকতে পারেনি। কাউকে জানতে দেয়নি যে খোলসে মোড়া বেনামী একটি মানুষ সে। কিন্তু হঠাৎই একদিন বাল্যবন্ধুর মেয়ে ও ধর্ষণের শিকার নিরুপমা প্রিয়ব্রতর সেই কঠিন খোলসে চিড় ধরিয়ে তৈরি করল এমন এক ফাটল, যে-ফাটল দিয়ে প্রবেশ করল প্রিয়ব্রতর নিয়তি। নিজের ভেতরে জেগে-ওঠা চাপের প্রচণ্ডতায় ভেঙে পড়ল তার খোলস। বাইরের মানুষটিকে ঠেলে বের করে দিল সেই চাপ। আপসহীন, ধারালো ও বাস্তববাদী লেখক মতি নন্দীর ‘সাদা খাম’ সিরিয়াস বাংলা সাহিত্যে নতুনতর এক সংযোজন।
প্রতিক্রিয়া আলোচনা করার মতো শব্দ আমার জানা নেই। শুধু একটা কথা বলব, ছোট্ট এই উপন্যাস মাথার ভেতর ঘুণপোকার মতো একটা যন্ত্রণার অনুভূতি দিয়ে গেলো। পরাজিত, শৃঙ্ক্ষলিত মানুষের মনের গহীনে জমে থাকা হাহাকার; শত বর্ষের পুরনো আদি অকৃত্রিম লজ্জা- এই নিয়ে বেঁচে থাকে মানুষ?
আদৌ কি বেঁচে থাকে, নাকি গ্লানির ভারে ক্ষত বিক্ষত হয়ে টিকে থাকে কাকতাড়ুয়ার মতো?
মতি নন্দী বাবুর লেখা যতবারই পড়ি, অবাক হই। কী করে পারেন আমাদের মতো ছাপোষা মানুষদের মনের এত সূক্ষ্ণ ব্যবচ্ছেদ করতে! একটা সাদা খামের আড়ালে লুকিয়ে থাকে বছরের পর বছর জমে থাকা ভয়, আবার সেই সাদা খামেই মেলে পরিত্রাণ। সাদা খাম ভয়ের গল্প, আবার সেই ভয়কে জয়ের গল্পও। মাঝখান দিয়ে একজন দ্বিখণ্ডিত প্রিয়নাথ বা অতুলবাবুর দৈনন্দিন যাপিত জীবনের কাহিনী। আরেকবার পাঁচ তারা না দিয়ে পারলাম না।
কত অল্প কথায় কত গভীর একটা গল্প বলা যায়, তা শেখার জন্য মতি নন্দী-র লেখা অবশ্যপাঠ্য। অনেকেই ভাবেন, ক্রীড়া-সাহিত্য, অর্থাৎ খেলা ও খেলোয়াড়কে কেন্দ্রে রেখে লেখা সাহিত্য রচনাতেই ছিল মতি নন্দী-র উৎকর্ষ। সেই ধারণাটা যে ভুল, তা বোঝার জন্য লেখকের ছোটোগল্প, এবং এই উপন্যাসটি পড়াই যথেষ্ট। বিশেষ করে এই উপন্যাসটি যদি এখনও না পড়ে থাকেন, তবে সেই ত্রুটি সংশোধনে অবিলম্বে তৎপর হোন। কী আছে এই আকাদেমি পুরস্কার বিজেতা লেখায়? আছে অকল্পনীয় মিতকথনে একটি মানুষের অস্তিত্বের সংকট, এবং তার আশেপাশে সমাজ ও সময়ের দুরন্ত ঘূর্ণির পাক লাগার অনুপম বিবরণ। বহু যুগ আগে শারদীয়ার পাতায় পড়া এই লেখাটা আমি ভুলতে পারিনি, এবং আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই লেখাটা পড়লে আপনিও এর হাত থেকে কখনও, কোনোদিন মুক্তি পাবেন না। আসুন, ঢুকে পড়া যাক এই অদ্বিতীয় সাদা খামে।
মাসের শেষে নিয়ম কষে ঠকঠকিয়ে পিঠ বাঁচিয়ে ফনী পালের ফনাখানা আচমকাই কর্কটের কবলে সবলভাবে সমূলে হারিয়ে ফেলার যে সফলতার অনুভূতি তা ছাব্বিশ বছরের চাকুরে জীবনে প্রিয়ব্রত কে দেয়নি ছেলের সাফল্য , ঘরভর্তি স্বাচ্ছন্দ্যের সব চিহ্ন কিংবা ঝঞ্ঝাট মুক্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি।
এককালীন পাঁচ হাজার এরপর মাসান্তে তিনশো পরবর্তী তে বেড়ে পাঁচশো, পাড়ার প্রিয়ব্রত থেকে অফিসপাড়ায় অতুলের এই ভোলবদলের মুচলেকা অক্লেশে অক্লান্তে বিনা বাক্যব্যয়ে গুনতে হয়েছে পঁচিশটি বছর কিন্তু বলতে পারেনি পরিজন পরিচিত কাউকে; লাভের গুড় তো পিঁপড়ে খাবেই! কিন্তু ঐ গুড়ের মহিমায় গুনে গুনে কতবার দংশনে মনে যে বিষ ঘা রয়ে গেছে তা ঐ প্রিয়ব্রতের প্রীতমুখের স্মিত হাসি দেখে অবশ্য বোঝার উপায় নেই।
দুর্বল ভীতু প্রান বাঁচাবার তাগিদে খরতাপে পুড়ে ঝড়ে জলে ভিজে ,বানের পানিতে ভেসে যাবার উপক্রমেও কি ভীষণভাবে লুকিয়ে চুরিয়ে নিংড়ে নিঃশেষে সন্দেহে বাঁচার ভনিতা করে যেতে হয়েছে রোজ তাকে!
যে জীবনে নেই বৈচিত্র্য,নেই সাহস,নেই সঞ্চিত স্নেহ উজাড় করে দেওয়ার মতো সুযোগ, লাঞ্চিত ও বঞ্চিত নীরু ;যাকে দেখে স্পর্শ করে অনুভবেও তপ্ত হবার সমস্ত তন্ত্রমন্ত্র রপ্ত না থাকার পরেও কিসের টানে বারংবার ই বিপদমুখে ভয়ের বিষে বিনাশ হবার বিপন্নতা নয়টা পাঁচটে অপরের নাম ভাঙিয়ে চাকুরে প্রিয়ব্রতকে ছুঁয়ে যায়?
মতি নন্দীর এই এফোঁড়ওফোঁড় করে দেওয়া মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের সাথে যুঝে যাওয়ার শক্তি সাধ্য ছাব্বিশ বছরের ঐ এক সাদা খামেই কি শেষের শুরু?
গৌরাঙ্গের মুখের সামনে দিয়ে প্রিয়ব্রত নাগ যখন "সাদা খাম"টা বড় সাহেবের অফিসে দিয়ে আসে তখন Shawshank Redemption এর জেল পালানোর সেই iconic দৃশ্যটাই মনে পড়ে আর মনের মধ্যে থেকে পাথরের মত ভারী কী যেন একটা নেমে যায়।
❝ "নিজেকে ছাই করে মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে...লক্ষ লক্ষ মানুষ তো এইভাবেই রাস্তা ধরে ছাই গাদার দিকে হেঁটে চলেছে..... ❞
গোপন ভয় নিয়ে জীবন কাটানো কী যে ভয়াবহ রকমের কষ্টের,এই পথে যারা গিয়েছেন তারাই বুঝে। অদৃশ্য অথচ ধারালো একটা ফলা খুঁড়ে খুঁড়ে শেষ করে দেয় মানুষ কে। তাও কত প্রিয়ব্রতের মত, আমাদের সমাজের কত মানুষ গোপন ভয় মাথায় নিয়ে বেঁচে আছে। কেউ সেটা গোপনে লালন করে,কেউ পারে না। তবে ভালো হয়,যদি এই গ্লানির পথ মাড়িয়ে আসা যায়,যেটা প্রিয়ব্রত করেছিল।
মতি নন্দী'র নাম অনেক দিন ধরে শুনে আসছি। সবে একটা বই পড়লাম। সৌভাগ্যক্রমে সেটা লেখকের অন্যতম ভালো একটা বই,সাদা খাম। খুবই সুক্ষ্ম একটা বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন ভদ্রলোক। দারুণ। নিখুঁত বর্ণনা,ঘটনার পুরো আবহটাকেই যেন তুলে ধরে।দারুণ। একবার পড়ে রেশ ঠিক কাটছে না,এ বছরের মধ্যে ই রি-রিড করব " সাদা খাম"।
“এক রবিবার দুপুরে গাঢ় ঘুমের পর ছাদে বেরিয়ে এসে শিথিলভাবে পাঁচিলে হাত রেখে দাঁড়িয়ে প্রিয়ব্রত ভাবছিলো। আকাশ থেকে ধীর শান্ত আলো নেমে এসে উঁচুনিচু বাড়িগুলোর শ্যাওলা ধরা, পলেস্তরা খসে পড়া দেয়ালে জমে থাকে। টবের গাছ, ফুল, জানলার ফ্যাকাসে, পর্দা, অ্যান্টেনায় কাক, ভাঙা পাইপের পাশে অশ্বত্থ চারা, তারে ঝোলানো কাপড়, কার্নিশে ঘুমন্ত বেড়াল, সবকিছুর মধ্যে আশ্চর্য এক সমাহিত মন্থর ভাব! সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখতে দেখতে ধাঁধায় পড়ে। তার প্রতিদিনের জীবনকেই তখন অবাস্তব মনে হয়।” অতি সাধারণ একজন মানুষের চোখে ছাদ থেকে দেখা এই দৃশ্যগুলো স্বাভাবিকভাবে অসাধারণ নয় কী? তাহলে প্রিয়ব্রতের জীবন কেনো তার কাছে অবাস্তব মনে হয়? সেটা জানার আগে উপন্যাসের ঘটনা থেকে একবার ঘুরে আসা যাক।
এই উপন্যাসের শুরু প্রিয়ব্রত নাগ নামের একজন সরকারি চাকুরের ঘটনা দিয়ে যে ২৬ বছর ধরে জালি সার্টিফিকেটে চাকরি করে যাচ্ছে অতুল চন্দ্র ঘোষ নামে। জাল সার্টিফিকেট বানিয়ে দেয়া ফণী পাল প্রত্যেক মাসের মাইনের দিনে ঠিক সাড়ে চারটায় আসে তার বখরা নিতে। অফিসের সবাই জানে মাইনের দিনে এই লোকটা আসে একটা সাদা খাম নেবার জন্য। কুড়ি বছর ধরে একই মাপের খাম প্রিয়ব্রত দিচ্ছে আর একই মাপের পকেটওলা পাঞ্জাবিতে ফণী পাল খামগুলো ভরছে। একইভাবে বাঁ হাতের দুটো আঙুল দিয়ে বোতামগুলো লাগিয়ে নিয়েই বলবে, ''এবার এক গ্লাস জল খাওয়াও।'' প্রিয়ব্রত কি ফনীপাল কে এবারও জল খাওয়াবে? আবারো সাদা খাম এগিয়ে দেবে? একটা ধূসর ছায়ার মতো সে ছাব্বিশ বছর এই অফিসে থেকেছে, রিটায়ার করা পর্যন্ত সে মানসম্মান নিয়ে থেকে যেতে চায়। আপাতদৃষ্টিতে নিজের চাকরি বাঁচানোর জন্য প্রিয়ব্রতের সিদ্ধান্ত কি হবে বলা মুশকিল। আমরা বরং প্রিয়ব্রতকে রেখে কাহিনির সাথে আরেকটু সামনে আগাই।
একদিন ফনী পাল তার সময়মতো বখরা নিতে এলো না আর সেদিন প্রিয়ব্রতের জীবনের মোড়টাও ঘুরে গেলো। রোজ অফিস থেকে ফেরার সময় অতুল চরিত্রকে ড্রয়ারে তালা মেরে রেখে যায়, বাসায় ফিরে খোসল বদলে পরিণত হয় প্রিয়ব্রত নাগে। একজন সাধারণ ক্লার্কের জীবনসংগ্রামে বেঁচে থাকার জন্য কত বিচিত্র, নীরব দ্বৈরথ। কিন্তু সেদিন ফেরার পথে তার দেখা হলো ছোটবেলার বন্ধু খুদিকেলো আর তার মেয়ে নিরুপমার সাথে। কথাপ্রসঙ্গে প্রিয়ব্রত জানতে পারে নিরুপমা ৮ মাস আগে রেপড হয়েছে। হঠাৎ বিষয়টা শোনার পর প্রিয়ব্রতের মানসিকতায় পরিবর্তন আসে_ “মুখে চোখে 'রে*পড হয়েছি' বিজ্ঞাপন ঝুলিয়ে কেউ কি বাইরে বেরোয়?”.....এত মেয়ে থাকতে ওকে কেন? পুরুষদের তপ্ত করার মতো কোনো গুণই তো ওর শরীরে নেই!”। অতি সাধারণ একটা মেয়ের গণধর্ষণের ঘটনা মধ্যবয়সী এক কাপুরুষ প্রিয়ব্রতের চরিত্রে দ্বিমুখিতা নিয়ে আসে। এ সেই প্রিয়ব্রত যে নিজেকে ২৬ বছর ধরে কচ্ছপের মতো খোলসে আটকে রেখেছিল বাইরের দুনিয়া থেকে; নিজের একটা শীতল জগৎ বানিয়ে ফেলেছিল যাতে কেউ জানতে না পারে তার বসবাসের ঠিকানা, তার আসল পরিচয়। অন্ধকার খোলসটার সঙ্গে চমৎকার মানিয়ে সেই কচ্ছপ তার নিজস্ব জগতে ঢুলু ঢুলু চোখে কখনো জেগে কখনো বা ঘুমিয়ে কাটাচ্ছিল।
মতি নন্দী লেখেন কম। ছোট্ট একটা উপন্যাস কিন্তু তার কথাগুলোর মর্মার্থ অনেক গভীর। সহজ গদ্যে নির্মোহভাবে তিনি একেঁছেন জটিল জীবনের রূপকল্প। জীবনের বেশির ভাগ সময় খেলাধুলা নিয়ে লেখা এই লেখক তার নিজস্ব গন্ডির বাইরে গিয়ে নগর জীবনে মধ্যবিত্ত সমাজের এই করুণ বৃত্তান্ত কিভাবে লিখতে পারলেন? প্রশ্নটার উত্তর তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন। তার প্রথম গল্প “ছাদ” লেখার সময় তিনি ছাদে বসে উত্তর কলকাতাকে দেখতেন। “সাদা খামে” মতি নন্দী নিজেকে ছাড়িয়েছেন, মুগ্ধতা বাড়িয়েছেন শতগুনে। মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবনের অসহায় অবস্থা এমনভাবে ফুটে উঠেছে, আপনার মনে হবে প্রিয়ব্রত চরিত্রের সাথে তার বাসার আশে পাশে হেঁটে বেড়াচ্ছেন, ওই সব ঘটনা নিজেই দেখতে পাচ্ছেন। মধ্যবয়সী বিপত্নীক প্রিয়ব্রত দ্বিতীয়বার কেন বিয়ে করেননি? কারণ খোলসে মোড়া তার চরিত্রের বিপরীত দিকটা সে শুধুমাত্র তার মৃত স্ত্রী মঙ্গলাকে বলতে পারতো।মঙ্গলার মৃত্যুতে সে জীবনের সবচেয়ে দামি জিনিসটা হারিয়েছে। নিজের অতি গোপন কথা সিন্দুকে তুলে রাখার মত কোন মানুষ তার নেই। এত বছর পর প্রিয়ব্রতের মনের পরিবর্তনের কারণ নিরুপমার মধ্যে সে মঙ্গলাকে দেখতে পেয়েছিল। একজন অসহায় নারী নিরুপমা যে ধ*র্ষিতা হয়ে ভিন্ন আরেকটা খোলসে মুড়িয়েছে নিজের জীবনকে।
মতী নন্দীর লেখায় বাড়তি কোনো চাকচিক্য নেই, কৃত্রিমতা এনে কোনো মাধুর্য আঁকা হয়নি। মতী নন্দীর লেখায় আছে সাধারণ মানুষকে অসাধারণভাবে পর্যবেক্ষণ করার অন্তর্নিহিত শক্তি, শহরের মানুষের দুঃখ-কষ্ট আর ছা-পোষা জীবনের জটিলতা তার গদ্যের ধারকে করেছে শক্ত। সাদামাটা কাহিনিতে প্রত্যেকটা চরিত্রের অস্তিত্বের সংকট উপন্যাসে যোগ করেছে ভিন্নমাত্রা। এই উপন্যাস নাগরিক জীবনের প্রতিটা মানুষকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। মতী নন্দী একদিকে আমাদের মত সাধারণ মানুষের সূক্ষ্ম মনোবিশ্লেষণ করেছেন নিপুন দক্ষতায়, অন্যদিকে এক সাদা খামের ভয়ে আত্মমর্যাদা খোয়াতে বসা মানুষের জীবনের গল্প বলেছেন। সাদাখামে লু��িয়ে থাকা কালো ময়লা কাগজ যেনো আমাদের রঙিন দুনিয়া আর তার আড়ালে থাকা সাদা-কালো নাগরিক জীবনের এক প্রতিচ্ছবি। যে জীবন কখনো তার রঙ পাল্টায় না, শুধু মাঝে মাঝে ধূসর হয়ে পড়ে। এই সব ধূসর রঙের গল্প ঢাকা-কলকাতার মতো ব্যস্ত সব শহরের গলিতেই আছে, সব ছাদ থেকেই এই গল্প দেখা যায়। শুধু পার্থক্য হলো সবাই এই গল্পগুলা দেখার চোখ নিয়ে জন্মায় না। প্রিয়ব্রতও তার জীবনের ছাব্বিশ বছর চোখ বন্ধ করে শুধু ছাইগাদার দিকেই হেঁটেছিল। আপনি কত বছর হাঁটতে চান?
মতি নন্দীর এই ছোট্ট উপন্যাসটা আমার কাছে একটা জানালা খুলে দিয়েছে, যেখান দিয়ে আমি প্রিয়ব্রত নাগের জীবনের গোপন কোণগুলো উঁকি দিয়ে দেখেছি। বইটা হাতে নেওয়ার আগে আমি ভেবেছিলাম, হয়তো ক্রীড়া-বিষয়ক কিছু পড়তে যাচ্ছি—কারণ মতি নন্দীকে তো আমরা সেই জন্যই চিনি। কিন্তু এটা পড়ে আমি অবাক হয়েছি, কারণ এখানে ক্রীড়া নেই, আছে একটা মানুষের ভয়ে ভরা জীবনের গভীর চিত্র।
আমার মনে হয়েছে, প্রিয়ব্রতের জীবনটা যেন একটা শামুকের খোলসে বন্দি। তার স্ত্রী মঙ্গলা ছাড়া কেউ জানত না তার এই রহস্য, কিন্তু সে-ও বারো বছর আগে চলে গেছে। এখন তার জীবনে শুধু ছেলে হিতব্রত আর পুরনো বাড়িটা। সে অফিসে যায়, কাজ করে, চুপচাপ বেরিয়ে আসে—যেন কেউ তাকে মনে না রাখে। কিন্তু একদিন ফণী এল না, সাদা খামটা দেওয়া হল না। আর সেই সন্ধ্যায় তার বাল্যবন্ধুর মেয়ে নিরুর সঙ্গে দেখা হল। নিরুর কথা শুনে আমার বুকটা কেঁপে উঠল—আট মাস আগে সে ধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তার যন্ত্রণা আর প্রিয়ব্রতের ভয় যেন একসঙ্গে মিশে গেল আমার চোখে।
বইটা পড়তে গিয়ে আমি বারবার ভেবেছি, একটা গোপন সত্য কীভাবে একজন মানুষের জীবনকে গ্রাস করে ফেলতে পারে। প্রিয়ব্রতের মতো আমিও কি কখনো ভয়ের কাছে হেরে গিয়ে নিজেকে লুকিয়ে ফেলি? নিরুর ঘটনা আর ফণীর অনুপস্থিতি যখন তার জীবনকে নাড়িয়ে দেয়, আমি যেন তার সঙ্গে একসঙ্গে প্রশ্ন তুলেছি—এত ভয় কেন? কীসের জন্য? শেষে তার ভয়কে জয় করার চেষ্টা দেখে আমার মনে আশার আলো জ্বলে উঠেছে।
"সাদা খাম" আমার কাছে একটা সাধারণ গল্প নয়, এটা আমাকে নিজের ভেতরটা দেখতে শিখিয়েছে। মতি নন্দী এত সুন্দরভাবে লিখেছেন যে প্রতিটা পাতায় আমি প্রিয়ব্রতের সঙ্গে শ্বাস নিয়েছি। ছোট হলেও এই বইয়ের গভীরতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। শেষটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, ভয়কে ছুঁড়ে ফেলে বাঁচতে পারলে জীবনটা আবার নতুন রঙে ভরে ওঠে। এই বইটা আমি বারবার পড়তে চাইব, কারণ এটা আমাকে সাহসের কথা মনে করিয়ে দেয়।
মতি নন্দীর এই লেখা মনে দাগ কেটে যাওয়ার মতো। মধ্যবিত্ত জীবনের অন্তর্ঘাত এবং সেই অন্তর্ঘাতের ফাঁপরে পড়ে দূর্বিষহ হয়ে ওঠা একজন মানুষের রোজকার গল্প। এত ছোট বইয়ের মধ্যে প্রিয়ব্রতের মতো চরিত্র অল্প কথায় যেভাবে বিচরণ করেছেন তাতে পাঠকের মনে দাগ কেটে যাওয়া স্বাভাবিক।
সাদা তো শুভ্রতার প্রতীক৷ কিন্তু সাদা খাম? একটি সাদা খামে বন্দি ছাব্বিশ বছরকার কলঙ্ক বয়ে বেড়াতে বেড়াতে ক্লান্তি আর অপরাধবোধে শ্রান্ত জীবন পথের এক পথিকের কাহিনি সাদা খাম৷
বিপত্নীক পিতার পুত্র বড় হয়ে গেছে৷ চাকরি করছে৷ পিতা-পুত্রের মনোজগতে ঘটে গেছে আমূল পরিবর্তন। ছেলের অনাদরের ভয়ে দ্বিতীয়বার দ্বারগ্রহণ করেন নি পিতা৷ পুত্রের বদল কী পিতার কাছে সাদা খামের চেয়েও ভারী?
পাঁচবোনের একটি পরিবার। পিতা ছোট ব্যবসায়ী৷ সেই গরিব পরিবারের একটি মেয়ে ধর্ষিত হলো৷ বিচার চাইলে আদালতেও ভয়ে যেতে চাইছে না৷ সেই নির্যাতিত মেয়েটিও খুঁজছে একটি 'সাদা খাম', যেখানে লুকিয়ে রাখা যায় নিজের যাতনার, লজ্জার অন্ধকারাচ্ছন্ন স্মৃতিকে৷
সাদাসিধা কাহিনিও অসাধারণ হয়ে উঠতে পারে লেখকের নিপুণতায়। মতি নন্দী তো খ্যাতিমান ক্রীড়া সাংবাদিক। ঝিঁ ঝিঁ পোকার প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ তার পাঠকপ্রিয় উপন্যাসগুলোতেও৷ মতি নন্দীর আউট অফ বক্স হয়ে লেখা 'সাদ খাম' মনোবিশ্লেষণের এক অনুপম নিদর্শন।
প্রিয়বত নাগ ছাপোষা এক সরকারি চাকুরীজীবী। দুনিয়ার সব জুট-ঝামেলা একদিকে আর প্রিয়ব্রতর অফিস একদিকে। ২৬ বছরের জীবনে একদিনের জন্যেও অফিস কামাই করেনি প্রিয়ব্রত। করবেই বা কেন - একটা আতঙ্ক যে সর্বদা গলার কাছে এসে দলা পাকিয়ে আটকে থাকে তার। কারণ যেই প্রিয়ব্রতর গল্প বলছি সেই একই প্রিয়বত অফিসে অতুলদা নামে পরিচিত। নাম ভাঁড়িয়ে এই সরকারি চাকরিটা কপালে জুটেছিল তার। সেটাই আগলে ধরে বেঁচে আছেন।
ছাব্বিশটা বছর সেই আতঙ্কটাই তার একমাত্র সঙ্গী হয়ে রয়ে গেছে। স্ত্রী গত হয়েছে, ছেলেও উপযুক্ত হয়ে উঠেছে; কিন্তু প্রিয়ব্রত সেই একই আতঙ্ককে আগলে ধরে নিজের এক আলাদা জগতে বসবাস করে। আপনজন থেকে শুরু করে দুনিয়ার সবাই প্রিয়ব্রতর সেই জগত সম্পর্কে অজ্ঞাত। ছাব্বিশ বছর ধরে এই জগতটাকে দারুণ যত্নে আগলে রেখেছে প্রিয়ব্রত। ছাব্বিশ বছর ধরে প্রতি মুহূর্তের ভয় আর আতঙ্ক দলা পাকিয়ে প্রিয়ব্রতর শরীরে একটা খোলস গড়ে তুলেছে। দিনকে দিন ভয় আর আতঙ্ক দলা পাকিয়ে সেই খোলসটাকে প্রস্তরখণ্ডে রূপান্তরিত করেছে। বাইরের দুনিয়ার কোনো কিছুই প্রিয়ব্রতর জগতের সেই খোলসটাকে ভেদ করে ঢুকতে পারেনি কখনো। আর কেউ কখনো জানতেও পারেনি নামের অন্তরালের এক বেনামী পরিচয়ের মানুষ সে।
কিন্তু সেই কঠিন খোলসে চিড় ধরলো একদিন। আর এই চিড়টা ধরালো বাল্যকালের এক বন্ধুর মেয়ে - যে কিনা সদ্য গনধর্ষণের শিকার হয়েছে। কেস উঠেছে আদালতে কিন্তু বিপক্ষ দল অনেক শক্তিশালী আর ক্ষমতাবান। বাল্যকালের বন্ধুকে সাহায্য করতে গিয়ে নিজের জগতে চিড় ধরায় প্রিয়ব্রত। সেই চিড় ধীরে ধীরে ফাটলে রূপান্তরিত হতে থাকে। তার জগতে ফাটল গলে বাইরের দুনিয়ার আলো-বাতাসও প্রবেশ করতে শুরু করেছে। এতদিনের ভেতরের দুনিয়ার জমে থাকা চাপ ফাটল গলে বেরিয়ে আসতে চাইছে; প্রকাশ করতে চাইছে নিজেকে অন্যরূপে। অন্যদিকে ছাব্বিশ বছরের নিত্যদিনকার স্বভাব তাকে যেন আটকে রাখতে চাইছে; ফাটলটাকে যেন আবার ভরাট করতে চাইছে। এতদিনের আতঙ্ক আর ভয়টা মুহূর্তেই রূপ নিল এক অন্তর্দ্বন্দ্বে।
মতি নন্দী আদতে একজন ক্রীড়া সাংবাদিক এবং আনন্দবাজার পত্রিকার ক্রীড়া সম্পাদক ছিলেন। তবে সাংবাদিকতাকে ছাপিয়ে তিনি একজন বাস্তববাদী কথাসাহিত্যিক। এছাড়াও তিনি শিশুসাহিত্যিক হিসেবেও দারুণ জনপ্রিয়। আনন্দ পুরষ্কার এবং সাহিত্য আকাদেমি পুরষ্কার রয়েছে তার প্রাপ্তির ���ুলিতে।
সাদা পবিত্রতার রঙ এবং প্রতীক। সেই পবিত্র রঙের আড়ালেই কিন্তু লুকিয়ে থাকে অপবিত্রতা। এই কথাটিই যেন গল্পের নামকরণের সার্থকতা। সাদা খামের পবিত্রতাকে পুঁজি করে এক কলঙ্কিত জীবনের গল্প শুনিয়েছেন মতি নন্দী। সাধারণ একটা খামেও যে একজন মানুষের জীবন আর জগত আটকে থাকতে পারে সেটা মতি নন্দী খুব ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিলেন।
নিজস্ব ঢঙ আর লেখনশৈলীতে সাদামাটা গল্পটাকেও করে তুলেছেন অনন্য সাধারণ। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ব্যাপারগুলোকে এত যত্নের সঙ্গে বর্ণনা করেছেন যে কিছু বিষয়ের বর্ণনা খোঁচা দেয় পাঠককে। অল্প কয়েক কথার গল্পটাকে এত নিখুঁত আর সুন্দরভাবে টেনে নিয়ে বিশালাকারে উপস্থাপন করেছেন; যা সত্যিকার অর্থে অবাক করে। সত্যি কথা বলতে সাদা খাম পড়ে এতটাই চমকেছি যে নিজের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করতে পারছিনা সঠিকভাবে। তবে এই বই পড়ে যে কেউ হতাশ হবে না তা নির্বিঘ্নেই বলতে পারি।
আট মাস আগে তিনটা ছেলে মিলে ধর্ষণ করেছে নিরুকে। তাকে দেখে এখন তা বোঝার উপায় নেই, বুঝতে পারার কথাও নয়। একটা মেয়ে রেপড হয়েছে সে তো আর চোখে মুখে " রেপড হয়েছি" বিজ্ঞাপন ঝুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে না। তবে তার মানসিক যন্ত্রণা টা অসহ্য করমের বাড়িয়ে দিয়েছে সেই ধর্ষণ কারিদের হুমকিতে। যদি তাদের কোর্টে চিহ্নিত করে তবে তাকে তুলে নিয়ে যাবে আর যদি কেসটা মিটিয়ে নেয় তবে তাদের পরিবারকে দুই হাজার টাকা দেবে। কি সুন্দর ধর্ষণের ক্ষতি পূরণ। নিরুর ধর্ষণের এই আট মাস পর এই সত্য টা জানতে পারলো প্রিয়ব্রত। নিরু তার বন্ধুর মেয়ে তাদের বাড়ীর পিছনেই তাদের বাসা। অন্যের সার্টিফিকেট দিয়ে কৌশলে চাকরিটা পেয়েছিল ছাব্বিশ বছর আগে। পঁচিশ বছরের বিবাহিত জীবনে এক ছেলে হিতু এখন চাকরি করে, বেতন পায় আড়াই হাজার টাকা। স্ত্রী মারা গেছেন বারো বছর আগে। স্ত্রী জানতেন এই কৌশলে চাকরি পাবার কথা তিনি নাই এখন শুধু এক জন জানেন যিনি চাকরিটা পাইয়ে দিয়েছিলেন, তিনি ফণী পাল। এই জন্য ফণী পাল কে প্রতিমাসের এক তারিখে একটা সাদা খাম দিয়ে থাকে প্রিয়ব্রত, যাতে থাকে টাকা, মুখ বন্ধ রাখার জন্য।
আজ ছাব্বিশ বছর ধরে এই আত্ম গোপনের খেলায় নিজের অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলেছে, নিরুর যন্ত্রণা এখন নিজের যন্ত্রনার মত মনে হচ্ছে। নিরুকে দেখে যেমন বোঝা যায় না তাকে দেখেও কেউ বুঝতে পারে না কিন্তু ভিতরে ভিতরে পালিয়ে বেড়ানো, সব সময় এক আতঙ্কে থাকা একি অসহ্য এক জীবনে অন্য এক জীবনকে বয়ে বেড়ানো, সব সময় ভয়ে থাকা এই মনে হয় অফিসে তার আসলে পরিচয়টা জেনে ফেললো। সবাই হয়তো জেনে যাবে মাসের এক তারিখে সেই সাদা খামেট রহস্য।
লেখক মতি নন্দীর " সাদা খাম " একটি বিখ্যাত উপন্যাস। অসহ্য এক মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়ানো এক মানুষের গল্প। ছোট বই পৃষ্ঠা অল্প কিন্তু এ কি নিদারুণ এক বিভীষিকা আর অন্ত দহন প্রতিটা পাতাতে।
যারা সামান্য কিছু বিষয়ে প্রচুর টেনশন করেন তাদের বইটা পড়া উচিত। একটা মানুষ কিভাবে ছাব্বিশ বছর ধরে নিজের পরিচয় লুকিয়ে একটা ত্রাসের মধ্যে থেকে এক মানসিক যন্ত্রণা ভোগ করে চলেছে। সাদা একটা খাম কিভাবে জীবনে অতিষ্ঠ করে দিয়েছে আবার সেই সাদা খাম টাই সব কিছু থেকে মুক্তি দিয়ে দিলো।
মোট কথা যে শহরের ধারও মাড়াই না, যে খবরের পাশ থেকে "ওরা আমি না, আমাদের নয়" বলে উঠে যাই তার কথাই মতি নন্দী বলেন। মোট কথা যে ছ্যাঁচড়ামো সহজাত কিন্তু চেপে রাখা, যে তাংড়ানো নখের কোনে কিন্তু মিষ্টিমুখে চুপ তার মানচিত্র আঁকেন মতি নন্দী। সাদা খাম তাই থাকে আমাদের, নির্বাক নিঃস্পন্দ ঘোগে ডাকা সন্ধের মত। কলতলার আগুন আর প্রথম থানায় ঢোকার মত চড়াৎ করে ফেটে যায় গল্প, যে নোংরা লেন ঠেলে তার জন্ম তার গুজগুজফুসফুস ধরে। মনের কোণে ধরে রাখা ধারণার টেবিলে পাঠককে ফেলে ব্যবচ্ছেদ করেন মতি নন্দী, আর তার চরিত্ররা গোল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
কিছু লিখতে গেলে সেটাই স্পয়লার হয়ে যাবে, এমনটাই মনে হচ্ছে। ভয় মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, কীভাবে জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে, কি করে একজন মানুষের ভয় আকারে তার থেকেও বহুগুণে দানবীয় হয়ে উঠতে পারে, 'সাদা খাম' উপন্যাসটি হলো তারই উপস্থাপক একটি অসাধারণ লেখনী।
প্রিয়ব্রতের জীবনে একটি তিক্ত অতীত রয়েছে।সে চায়না তার এ অতীত প্রকাশিত হোক।ছাব্বিশ বছর সে জীবনের সৌখিনতাকে বাদ দিয়ে ভয়ের চাপ সহ্য করে বেঁচে আছে। ছাব্বিশ বছর আগে ফণীপাল নামে জনৈক ব্যক্তি তাকে 'অতুলচন্দ্র ঘোষ' নাম ব্যবহার করিয়ে একটি চাকরি পাইয়ে দেয়।পরিবর্তে ফণীপালকে সাদা খামে কিছু অর্থ দিয়ে যেতে হবে।অফিসের সবাই তাকে এই নামেই চেনে।প্রতিমুহূর্ত সে ভয়ের সাথে লড়াই করে বেঁচে আছে, পাছে লোকে তার আসল পরিচয় জেনে যায়। প্রিয়ব্রতের বাল্যবন্ধু খুদিকেলোর মেয়ে নিরু আটমাস আগে ধর্ষিত হয়।আসামিরা তাকে হুমকি দিয়ে গেছে যাতে সে আদালতে সাক্ষ্য না দেয়।নিরু প্রিয়ব্রতের বাড়িতে আত্মগোপন করতে চায়।কিন্তু প্রিয়ব্রত রাজি হয় না।এ নিয়ে ছেলে তিলুর সাথে তার ঠান্ডা যুদ্ধ চলতে থাকে।এর মধ্যে নিরু নিরুদ্দেশ হয় প্রিয়ব্রতকে দোষী সাব্যস্ত করে। একদিন খবর এলো ফণীপাল মারা গেছে।মুক্তির আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠলো প্রিয়ব্রত। কিন্তু সে আনন্দ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আগেই ফণীপালের ছেলে গৌরাঙ্গ এলো সাদা খাম নিতে।প্রিয়ব্রত কি হার মেনেছিল ভয়ের কাছে, নাকি ছাব্বিশ বছরের ভয় থেকে মুক্ত হতে পেরেছিল?নিরুর বা কি হলো? জানতে বইটি পড়তে পারেন।
ভয়। ভয় কত রকমের হয়? কিসের ভয়? ছোটবেলায় ভাবতাম খালি ভূতে ভয় হয়। একটু বড় হয়ে মানুষ কে ভয় পেতে শুরু করলাম। আর এখন তো এমন কোনো জিনিসের নাম ই করতে পারব না যাতে ভয় নেই। Confrontation এ ভয়, মানুষ হারিয়ে ফেলার ভয়, আর্থিক ভীতি , অসম্মানের ভয় - ঠিক কিসে ভয় নেই সেটা বলাই মুশকিল। এবং এটা খালি আমার নয় প্রতি টা মানুষের জীবন ই এখন ভয়ের উপরেই দাঁড়িয়ে। সেরকমই এক মধ্যবিত্ত ছাপোষা বাঙালি এর ভয় এর গল্প বলে ' সাদা খাম ' । এবং সেই ভয় কেই শেষ পর্যন্ত যেই tragic way তে জয় করা সেটার গল্প।
মতি নন্দী এর সব গল্প ই জয় এর কিন্তু তার যে এমন পরিবেশ নিয়েও লেখা জয়গাথা ও আছে এটা আমি জানতাম না । লেখক এর মুন্সিয়ানা প্রতি পদে পদে ফুটে উঠেছে। প্রতি টা চরিত্রের চরিত্রায়ন অভাবনীয়। গল্প এর যেই টান টান উত্তেজনা সেটা কোনো রহস্য রোমাঞ্চ গল্পকেও হার মানিয়ে দেয়।
আমার মনে হয় না আমি এরকম কিছু কোনোদিন ই নতুন লেখক দের গল্পে পাবো এটা সম্ভব নয়। কিন্তু যদি পাই তবে সেটাকেও অবশ্যই এইভাবেই উদযাপন করবো।
মতীনন্দী র লেখা আমার পড়া প্রথম বই, ভিন্ন স্বাদের এই বইটি মাত্র ১২১ পৃষ্ঠায় মানুষের মনের এতো আন্দোলন, এতো সূক্ষ অন্যভূতি এতো সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে, যার তুলনা নেই। জাল সার্টিফিকেট নিয়ে চাকরি পাওয়ার যে খেসারত প্রিয়ব্রত কে ২৬ বছর ধরে দিতে হয়েছে তা যেমন মেনে নিতে কষ্টকর তেমনি স্ত্রী হারা প্রিয়ব্রত একা ছেলেকে মানুষ করে এতো বছর পর যেভাবে যেকারনে আবার নারীর অভাব জীবনে অনুভব করেছেন সেটাও আকস্মিক আর আশ্চর্যের কারণ নেই বলা যায়। Protagonist কে শেষমেষ নৈতিক দ্বন্দ্ব কে কাটিয়ে উঠতে এবং ভয় কে জয় করতে দেখিয়ে লেখক ' পাঠক এবং Protagonist ' উভয়ের প্রতি সুবিচার করেছেন। অসাধারণ Suspense আর টান টান উত্তেজনার মধ্যে এক নিমেষে শেষ করার মতো একটি বই, পড়ে ফেলার অনুরোধ রইলো।
Sports Fiction এর জন্য বিখ্যাত মতি নন্দীর এই উপন্যাস ক্রীড়াজগতের ধারেকাছের কিছু নিয়েও নয়। বরং, জাল সার্টিফিকেট নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে চাকরি করতে থাকা এক পুরুষকে কেন্দ্র করে। অফিসে অতুল আর বাস্তবে প্রিয়ব্রত-এর অস্তিত্বের যে সংকট সেটাই এই উপন্যাসে ফুটে উঠেছে।
'सादा लिफाफा' मूल रूप से बांग्ला में लिखे गये उपन्यास 'सादा खम' का हिन्दी अनुवाद है। मति नंदी जी को अपने इस उपन्यास के लिये 1991 में साहित्य अकेदमी पुरस्कार दिया गया है। उपन्यास का अनुवाद सिद्धेश ने किया है।
उपन्यास मुझे पसंद आया। सादा लिफाफा एक ऐसे व्यक्ति की कहानी है जो कि अपनी एक गलती के चलते जीवन भर घुट घुट कर रहता आया है। आप इस घुटन को महसूस कर सकते हैं। उपन्यास दिखलाता है कि गलतियों को स्वीकार करके उनका दंड भुगतना अक्सर बेहतर होता है। अगर आप यह करते हैं तो आप जीवन में आगे बढ़ जाते हैं नहीं तो आप जिंदगी भर इस घुटन के वातावरण में ही जीने के लिए शापित हो जाते हैं।
उपन्यास के प्रति मेरे विस्तृत विचार आप निम्न लिंक पर जाकर पढ़ सकते हैं: सादा लिफाफा
❛জীবনে নেই কোনো বিনোদন বিশ্রাম সবটুকু ভয় ঘিরে আছে একটি সাদা খাম❜
আমাদের জীবনে রহস্য, গোপনীয়তা একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিটি মানুষের জীবনেই কিছু গোপন কথা থাকে। যেটা কাউকে বলা যায় না। সেই গোপনীয়তার ভার কখনো এতই বেশি হয় যেটা পুরো এক জীবনের ছন্দই পাল্টে ফেলতে পারে।
প্রিয়ব্রত নাগ একজন সরকারি চাকরিজীবী। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে সে পরিচিত ❛অতুলচন্দ্র ঘোষ❜ নামে। ছাব্বিশ বছর আগে ফণী পালের সহায়তায় জাল সার্টিফিকেট আর নাম দিয়ে এই চাকরিটা পেয়েছিল সে। গোপন এই ব্যাপার গোপন রাখতে ফণীকে সে পাঁচ হাজার দিয়েছিল। এরপর ফি মাসেই তাকে সাদা খামে করে একটা নির্দিষ্ট টাকা দিত। মুখ বন্ধ রাখার টাকা! বছর পেরিয়ে সেই টাকা মাস প্রতি পাঁচশতে দাঁড়িয়েছে। প্রত্যেক মাসের শুরুতেই ফণী আসে পাটভাঙ্গা ধুতি পাঞ্জাবি পরে। টাকাটা নিয়ে পাঞ্জাবির পকেটে দুবারের চেষ্টায় রাখে এরপর বলে, ❛এক গ্লাস জল দাও❜। এভাবেই চলছে গত ছাব্বিশ বছর। নিজের মধ্যে একটা ভয়, ধরা পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা এই নিয়ে প্রিয়ব্রত জীবন পার করছিল। একটা মানুষের জীবনে একান্ত গোপন কথা বলার কেউ দরকার। প্রিয়রও ছিল। তার স্ত্রী মঙ্গলা। ফণী বাদে মঙ্গলাই একজন যে চাকরির এই গোপন ব্যাপার জানতো। তবে বছর বারো আগে গত হয়েছে সে। প্রিয়ব্রতের জীবনে এখন আছে তার পুরনো বাড়ি, সাংবাদিক ছেলে হিতব্রত। ঘড়ি ধরে আগে না পিছে না একদম যথাসময়ে উপস্থিত হয় সে অফিসে, কাজ করে ঠিক সময় বেরিয়ে যায়। কেউ যেন তাকে মনে না রাখে ঠিক তেমন ❛লো প্রোফাইল❜ হিসেবেই চলেন তিনি। আশপাশে একটা ভয় ঘিরে থাকে। কেউ কি তাকে সন্দেহ করলো? নিয়মের ব্যাঘাত ঘটিয়ে এক দিন মাসের প্রথমে ফণী এলো না। সাদা খাম দেয়া হলো না। কী হলো ফণীর? সেই সন্ধেতেই অফিস শেষে প্রিয় দেখা পায় তার বাল্যকালের বন্ধু খুদিকেলোর, সঙ্গে তার মেয়ে। পিঠাপিঠি বাড়িতে থেকেও যোগাযোগ নেই প্রায় তিন দশক ধরে! নিজেকে সবার থেকে এতটাই গুটিয়ে রেখেছে প্রিয়। জানতে পারে বন্ধু কন্যার এক নির্মম ঘটনার কথা। মাস আটেক আগে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছিল নিরু। এই ঘটনা জানা এবং এরপরের কতগুলো ব্যাপার প্রিয়ব্রতকে নাড়িয়ে দিলো। নিজের ভয়, শামুকের মতো নিজেকে একটি খোলসে আটকে রাখা সবকিছু যেন কেমন নাড়া খেলো। কেন এই ভয়? কীসের ভয়? অপমানের? প্রিয়ব্রত নিজের ভেতর এক ঝড় অনুভব করে। ভয়হীন বাঁচার স্বাদ সেও চায়। পুত্রের কথা মতে, জীবনটাকে একটু ঝাঁকিয়ে কেন নেয়না সে? বাইরের জগতের সামনে নিজেকে খোলসহীন, ভয়হীন দেখাতে পারবে কি সে?
পাঠ প্রতিক্রিয়া:
❝সাদা খাম❞ মতি নন্দীর লেখা ছোটো পরিসরের সুন্দর একটি উপন্যাস। লেখকের বই পড়ার ইচ্ছে ছিল অনেক। শুনেছি ফুটবল নিয়ে লেখক বেশিরভাগ লিখেছেন। সে হিসেবে এই উপন্যাসটি তার প্রথাগত লেখার ধরন থেকে বেরিয়ে লেখা নতুন এক সংযোজন।
ভুয়া নাম পরিচয় দিয়ে ছাব্বিশ বছর ধরে চাকরি করে যাওয়া এক মধ্যবয়স্ক লোকের জীবনের ঘটনাকে উপজীব্য করা হয়েছে এই উপন্যাসে। মানুষের মনে যখন ভয় থাকে তখন আশপাশের সবকিছুকে ভয় লাগে, কপালে সন্দেহের ভাঁজ পড়ে, এই বুঝি সবাই সব জেনে গেল এই উৎকণ্ঠা থাকে। প্রিয়ব্রতের জীবনে ছাব্বিশ বছর ধরেই ঘটে আসছে এমন ঘটনা। গোপন কথা যদি বিশ্বস্ত ব্যক্তির কাছে না থাকে তো জীবন প্রতি পদে ভয়ের ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেয়। সেটাই হয়েছে তার। জীবনকে এভাবে গুটিয়ে, খোলসের আবডালে রেখে চলতে হয়েছে প্রিয়কে। কিন্তু কত? একটা গোপন কথা, যা তার এত বছরের চাকরি, সম্মানকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারে এই ভয়ের জন্যই গোটা এক জীবন আপোষ করে চলতে হলো? একটা সাদা খাম, কিছু অর্থ সে রহস্যকে ঢেকে রাখছে এই স্বান্তনা? সাধারণ গল্প কিন্তু এর গভীরতা অনেক। প্রিয়র মনে চলা দ্বন্দ্ব, পালিয়ে কিংবা গুটিয়ে থেকে জীবন পারের মধ্যেই আচানক এক ঘটনা যা তার গোপন এই অস্তিত্বকে একেবারে ঝড়ের মতো নাড়িয়ে দেয়। নিজেকে প্রকাশ করার আকা��্ক্ষা, আবার ভয়তন্ত্রে নিজেকে আটকে ফেলার জটিল এক অবস্থা তার জীবনে ঘটেছে। এই অবস্থায় আসার জন্য যেমন হুট করেই ফণীর অনুপস্থিতি ছিল তেমন ছিল বন্ধু কন্যার সাথে হওয়া অন্যায়। নিরুর কথাগুলো তাকে কেমন অস্থির করে দেয়। আদতেই কি সে তাই? সুন্দর, উপভোগ্য গল্পের গতিতে বইটা পড়তে বেশ ভালো লেগেছে। উপলব্ধি করা গেছে একজন খোলসাবৃত মানুষের জীবনের মোড়। একটা সাদা খাম, কিছু গোপন সত্যি একজন মানুষের জীবনকে থমকে দিতে পারে না। শেষটা সুন্দর। প্রিয়র পরিবর্তন, ভয়কে জয় করার প্রয়াস দারুণভাবে গল্পে উঠে এসেছে।
প্রচ্ছদ, প্রোডাকশন:
ক্রাউন সাইজের বইটির প্রচ্ছদ সুন্দর।
❛নিজের অস্তিত্বই আসল। খোলসের উপরে আমরা যাকে বয়ে বেড়াই সে বোঝাই ভারী করে। ভয়কে জয় করে আপোষহীন জীবনের নামই তো আসল জীবন।❜
অবাক হয়ে গিয়েছিলাম,এ কোন মতি নন্দী! কলাবতী,কোনির পরিচিত মতি নন্দী... যিনি খেলার স্পন্দনে স্বপ্ন জাগান, তাঁর হাত গড়িয়ে এই বই! একটা 'সাদা খাম',যাকে ঘিরেই রহস্যের খাসমহল,ধীরে ধীরে জট ছুটে সহজ সরল সত্য প্রকাশিত হলো যতক্ষণে, ততক্ষণে নন্দী মশাই জীবন বাঁকের নানাদিক উন্মোচন করলেন কি সুন্দর আর সাবলীল ভাষায়, এত সংবেদনশীল দুটো বিষয়,শেষ পাতা অব্দি বইতে ডুবে ছিলাম,লেখকের মুন্সিয়ানার তারিফ করতে হয় বৈকি!
কোনির লেখকের কলম থেকে এমন দুর্দান্ত লেখা বেরোবে, এতে আর আশ্চর্য কী? একটি সাদা খামের ভিতরেই জমে রয়েছে কত বছরের আত্মগ্লানি, ভয় আর দূর্বলতা। সেই খামেই সবকিছুর মুক্তি। আবার খাম ড্রয়ারে ঢোকালেই জেগে ওঠে সাহস, বেঁচে থাকার ইচ্ছে আর ফিরে আসে মেরুদন্ডের জোর। মতি নন্দীর কলমে এই উপন্যাস সামাজিক গল্পপ্রিয় পাঠকদের অবশ্য পাঠ্য হওয়া উচিৎ।
ভয়, একটা গোপন জিনিস জানাজানি হয়ে যাওয়ার ভয়। নিজেকে ঠকানোর কথাটা, অন্যেরা জেনে নেয়ার ভয়। নিজের চারপাশে একটা শক্ত খোলস তৈরি করে ফেলা, বিচ্ছিন্ন করে ফেলা, যাতে কেও না জানতে পারে। যদি জেনে যায়? তাহলে কি হবে? এই ভয়ের বিনিময়ে পাওয়া জীবন টা কি আদও স্বার্থক ছিল? এভাবেও বাচা যায়? কাপুরষ হয়ে? মুখোস টা খুলে যায় যদি? এই একঘেয়েমি জীবন, একই রুটিন, এভাবে আর কত?