”প্র্যাকটিসটা আরও ভাল করে কর। হতাশা আসবে, তাকে জয় করতেও হবে। ইন্ডিয়া টিমে খেললেই কি বড় প্লেয়ার হয়? বড় তখনই হয়, যখন সে নিজে অনুভব করে মনের মধ্যে আলাদা এক ধরনের সুখ, প্রশান্তি। সেখানে হতাশা পৌঁছোয় না। তুই খেলা ছেড়ে দিবি বলছিস, তার মানে তুই বড় খেলোয়াড় হতে পারিসনি।”
শোভাবাজার স্পোর্টিংয়েই প্রথম দু’বছর, তারপর ভবানীপুর, দু’বছর পর এরিয়ানে, সেখানে এক বছর কাটিয়ে যুগের যাত্রীতে চার বছর, মোহনবাগানে এক বছর,আবার যুগের যাত্রীতে দু’বছর, তারপর আবার শোভাবাজারে।
গত পনেরো বছরে কমল দু’বার চাকরি, ছয় বার বাসা এবং ছয় বার ক্লাব বদল করেছে। শোভাবাজার স্পোর্টিং, ভবানীপুর, এরিয়ান, যুগের যাত্রী, মোহনবাগান এবং আবার যুগের যাত্রী হয়ে এখন শোভাবাজারে আছে। এই সময়ে সে দর্জিপাড়া, আহিরিটোলা, শ্যামপুকুর, কুমারটুলি, আবার শ্যামপুকুর হয়ে এখন বাগবাজারে বাসা নিয়েছে। ক্লাবের জন্ম শোভাবাজারে এবং নাম শোভাবাজার স্পোর্টিং হলেও তার কোনও অস্তিত্ব জন্মস্থানে এখন আর নেই, যেমন কমলের জন্ম ফরিদপুরে হলেও, তিন বছর বয়স সেখান থেকে চলে আসার পর আর সে দেশের মুখ দেখেনি। শোভাবাজার স্পোর্টিং এখন ময়দানের তাঁবুতে আর বেলেঘাটায় কেষ্টদার অর্থাৎ কৃষ্ণপ্রসাদ মাইতির বাড়িতেই বিদ্যমান।
স্ত্রী শিখা দশ বছর আগে মারা গেছে, কমলের খেলার জীবনের সঙ্গে মানিয়ে চলতে পারেনি একদিনও। ছেলে অমিতাভ তার মা’র কাছ থেকেই ফুটবলকে ঘৃণা করতে শিখেছে। পলিটিক্সের কথা বলে, তাই নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে তর্ক করে, গান গায়, কবিতা লেখার চেষ্টা করে, কিন্তু ফুটবল সম্পর্কে একদিনও একটি কথা বলেনি। একতলায় দুটি ঘর নিয়ে কমল থাকে। একটিতে সে, অপরটিতে অমিতাভ।
দুটি লোকের এই সংসারের যাবতীয় কাজ ও রান্না করে দিয়ে কালোর মা রাতে চলে যায়। দশ বছর আগে শিখা মারা যাবার পরই সাত বছরের অমিতাভকে তার দিদিমা গৌহাটিতে নিয়ে চলে যান। দু’বছর আগে সে বাবার কাছে ফিরেছে। প্রথমে দু’জনের সম্পর্কটা ছিল স্কুলে ভর্তি হওয়া নতুন দুটি ছেলের মতো। দু’বছরেও কিন্তু ওদের মধ্যে ভাব হয়নি। ওরা কথা কমই বলে, দু’জনে দু’জনকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলে। কেউ কারোর ঘরে পর্যন্ত ঢোকে না।
কমলের বর্তমান ক্লাব শোভাবাজারের অবস্থা খুবই শোচনীয়। ভালো কোনো প্লেয়ার নেই দলে। অথচ দল চালাতে হাতির খোরাক যাচ্ছে। কোচ সরোজ ঠিকঠাক খেলাতে পারছে না নাকি ফিটনেসের অভাব প্লেয়ারদের এটাও একটা প্রশ্ন। কারণ এরা মাঝমাঠে বলের দখল রাখতেই পারছে না। সিনিয়র প্লেয়ার হিসেবে কমল গুহ তবুও চেষ্টা করছে। যদি একজনকেও গড়ে তোলা যায়। সলীলকে নিয়ে বড় আশা। গরীবের ছেলে তবুও খেলায় খুব ঝোঁক। কমল গুহ একসময় রাইট ইন ছিল। পল্টুদা তাকে স্টপার পজিশনে আনে। কিন্তু এখন শোভাবাজার বলা যায় নিয়ম করেই ম্যাচ হারছে। একা কমল কী করবে?
হঠাৎ করেই খবর এলো পল্টুদা স্ট্রোক করেছেন। একশোটা টাকা নিতে তাকে শেষমেশ রথীনের কাছে তার শেষ ক্লাব যুগের যাত্রীর তাঁবুতেই যেতে হচ্ছে এখন। কমল যুগের যাত্রীর তাঁবুতে শেষ বার পা দিয়েছিল সাত বছর আগে। মোহনবাগান থেকে যাত্রীতে আসার জন্য ট্রান্সফার ফর্মে সে সই করে এক হাজার টাকা আগাম নিয়ে। কথা ছিল পাঁচ হাজার টাকা যাত্রী তাকে দেবে।
বছর শেষে সে মোট পায় চার হাজার টাকা। দিল্লিতে ডুরান্ডে কোয়ার্টার ফাইনালে হেরে আসার পরই সে গুলোদার কাছে বাকি টাকাটা চায়। যুগের যাত্রীর সব থেকে ক্ষমতাশালী গুলোদা অর্থাৎ ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রতাপ ভাদুড়ি। গুলোদা নম্রস্বরে বিনীতে ভঙ্গিতে কথা বলে।
”সে কী, তুই টাকা পাসনি এখনও!” গুলোদার বিস্ময়ে কমল অভিভূত হয়ে যায়।
”ছি ছি, অন্যায়, খুব অন্যায়। আমি এখুনি তপেনকে বলছি।” গুলোদা অ্যাকাউন্ট্যান্ট তপেন রায়কে ডেকে পাঠাল। সে আসতেই ঈষৎ রুষ্টস্বরে বলল, ”একী, কমলের টাকা পাওনা আছে যে? না না, যত শিগগিরি পারো দিয়ে দাও, কমল আমাদের ডিফেন্সের মুল খুঁটি, ওকে কমজোরি করলে যাত্রী শক্ত হয়ে দাঁড়াবে কী করে!” তপেন তিন দিন ঘুরিয়ে টাকা দেয়নি।
আজকে এত সময় পর কমলকে দেখে সবাই বেশ অবাক। কমল গুহ একসময় যুগের যাত্রীর কত ভালো প্লেয়ার ছিলো। কমল পুরনো কথা গায়ে না মেখে ছুটলো টাকা নিয়ে। অবশ্য রথীন তাকে নামিয়ে দিয়েছিল গাড়ি করে। যাবার সময় হুঁশিয়ারি দেয় অফিস থেকে দুপুর তিনটার পর যেন বের না হয় হুটহাট। অফিসের একটা নিয়ম আছে। খেলোয়াড় কোটায় এই ব্যাংকের চাকরিটা কমলকে রথীনই পাইয়ে দিয়েছিল। ব্যাংকের হয়ে অফিস লীগে খেলতে হয় তাকে। কিন্তু শোভাবাজারের ম্যাচ ও বা কীভাবে হেলাফেলা করে কমল! জীবনটাকে বড় অসাড় লাগে কমলের।
প্রতিনিয়ত সবার থেকে কটুক্তি কানে আসে কমল গুহ এবার ফুরিয়ে গেছে। বুড়ো ঘোড়া বাদ দিয়ে শোভাবাজারের উচিত নতুন কম বয়সী ছেলে নিয়ে দল গড়া। ম্যাচ যতগুলো খেলা হয়েছে লীগে এবার সবচেয়ে বেশি অপমানিত হয়েছে কমল যুগের যাত্রীর সাথে ৫-০ তে হেরে। গ্যালারি থেকে দর্শকদের ইট এসেও লেগেছে। হতাশা ঘিরে ধরে কমলকে। নাহ আর নয়। এই স্টপার এবার ফুরিয়ে গেছে। আর সে ডিফেন্স আগলাতে পারে না। তার জন্যই নাকি এত গোল হয়েছে দোষারোপ শুনতে হলো খোদ শোভাবাজারের কিছু প্লেয়ার থেকে।
কিন্তু হঠাৎ করেই যেন আলোর একটা বিন্দু জাগিয়ে দিলো কমলকে। লীগের খেলায় শোভাবাজারের শেষ ম্যাচ আছে যুগের যাত্রীর সাথে। ছেলে অমিতাভ যে জীবনে ফুটবল নিয়ে আগ্ৰহ দেখায়নি আজকে বাবার খেলা দেখতে চায়। সলীল আবার ফিরে এ���েছে। সে শোভাবাজারের বিধ্বস্ত দলের হয়ে চার ম্যাচ খেলে ফেলেছে। কমলের মধ্যে হঠাৎ করেই উদ্দাম ফিরে আসে। নিয়ে নেয় এই স্টপার কঠিন শপথ। জীবনের শেষ ম্যাচ সে খেলবে এবার। এমন করে খেলবে যাতে জীবনে যা হারিয়েছে শেষবেলায় কিছু যাতে পায়। স্টপারের জীবনের শেষ ম্যাচের সাক্ষী হবেন নাকি?
🍨পাঠ প্রতিক্রিয়া 🍨
এই বইটি কিশোর উপন্যাস হলেও আমার বেশ ভালো লাগলো। মতি নন্দীর লেখা আগেও পড়া হয়েছে। ওনার বই থেকে তৈরি হয়েছে সিনেমাও। একজন ক্রিড়া সাংবাদিক হবার সুবাদে তিনি খেলা বিষয়ক বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছেন। সহজ ভাষায় ঝরঝরে লেখা। এবং একটা বিষয় খেয়াল করলাম উনি ওনার খেলা বিষয়ক বইগুলো একটা থিম ধরে লিখেছেন। আজ "স্টপার" পড়ে রীতিমতো অবাক হয়েছি। এই বইটিও থিম অনুযায়ী কিন্তু দারুণ। খেলোয়াড়ি জীবনে যে চড়াই উৎরাই থাকে সেটা তিনি অনুধাবন করতে সাহায্য করেছেন। এবং কিছু কিছু লাইন মোটিভেশনাল লেগেছে। অন্তত স্টপার, যে রুখে দেয় বিপক্ষ দলের রক্ষণভাগ তাকে ভেঙে পড়লে চলে না। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তাকে অবিচল হতে হয়।
কমল গুহ যেন এক অদৃশ্য প্রতীক হিসেবে উঠে এসেছেন জীবনের প্রতিক্ষেত্রে স্টপার হয়ে আমাদের যেভাবে রুখতে হয় প্রতিকূলতা, তেমনি বয়সকে পাশ কাটিয়ে কম বয়সী প্লেয়ারদের টেক্কা দিয়ে কমল গুহ খেলার মাঠেও হয়ে উঠেছেন স্টপার হিসেবে এক দূর্ভেদ্য দেয়াল হিসেবে। এত সহজে ভাঙা যায় না তাকে।
আমি মতি নন্দীর লেখা সবসময়ই পছন্দ করি। খেলা বিষয়ক ছাড়াও ওনার আরো বিখ্যাত বই রয়েছে। চেষ্টা করবো সবগুলোর স্বাদ নেয়ার।
🍨বইয়ের নাম: "স্টপার"
🍨লেখক: মতি নন্দী
🍨প্রকাশনা: আনন্দ পাবলিশার্স
🍨ব্যক্তিগত রেটিং: ৪.৫/৫