- কে প্রথম কাছে এসেছি - মহাসিন্ধুর ও‘পার থেকে : মধ্যপর্ব - লাপিস লাজুলি
এই দুটি রচনার মধ্যে দিয়ে সৌভিক চক্রবর্তী নীরেন ভাদুড়িকে তন্ত্র ও ভয়-সাহিত্যের জগৎ থেকে বার করে পৌঁছে দিলেন ফ্যান্টাসির জগতে। আর শুধু ফ্যান্টাসি নয়, এই কাহিনিগুলিতে সৌভিকের কলম স্পর্শ করে গিয়েছে একাধিক জঁরের ঘাট। স্পাই অ্যাডভেঞ্চার, ক্রাইম থ্রিলার, রহস্য কাহিনি, ভ্রমণ সাহিত্য, ঐতিহাসিক উপন্যাস। আপনি কলকাতায় বসে থেকে দার্জিলিংয়ের পাহাড়তলির হিমেল হাওয়ায় সরসরিয়ে ওঠা পাইনবনের মেজাজ অনুভব করতে পারবেন, সঙ্গে এও জানবেন যে সেই কালচে-সবুজ অন্ধকারের মধ্যে ঘনিয়ে ওঠা অতিলৌকিক রহস্যের মূল আসলে লুকিয়ে আছে মধ্য-ইয়োরোপের লোককথায় আর ইয়োরোপীয় শয়তান উপাসনার মধ্যে। দেবী ইনান্নার দণ্ড উদ্ধার করতে না পারলে যে নরকের দ্বার খুলবে না, তিতাসকে বাঁচানোর পথ যে চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে তা আপনি এত দিনে জেনে গিয়েছেন। কিন্তু সেই দণ্ডকে উদ্ধার করার জন্য আপনার-আমার মতোই বন্ধুত্ব আর প্রেমে পাগল বাঙালি ছেলেমেয়েগুলি যে কী ভাবে শতসহস্র বিপদের মহাসিন্ধু পেরিয়ে সুদূর ইরাকে পৌঁছে গেল সেই কাহিনি সত্যিই মহাকাব্যিক রূপ পেয়েছে সৌভিকের কল্পনা আর কলমে।
রহস্য, রোমাঞ্চ, প্রেম, যুদ্ধ, তন্ত্র, ইতিহাস, বিজ্ঞান, সন্ত্রাস সবকিছু মিলে এক বিশাল পটভূমি মধ্যপর্ব: লাপিস লাজুলি'র। অপালা-সঞ্জয়ের চেয়ে পল্লব-রোশনির শ্বাসরুদ্ধকর পথচলাটাই আমার কাছে বেশি আকর্ষণীয় লেগেছে। সুমেরীয় মিথ, দেবী ইনান্নার দণ্ড, গিলগামেশ ও উতনাপিশতিম এর উপাখ্যান সবকিছু লেখক এমনভাবে গুছিয়ে উপস্থাপন করেছেন আমার কাছে এই প্রথম মিথোলজি জিনিসটা বেশ উপভোগ্য ঠেকলো। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে উঠে এসেছে হালাকু খান, গিয়াসউদ্দিন আল তুসি, বাগদাদ ধ্বংসের শোকাবহ স্মৃতি। আমার মতে হালাকু খানই এই মধ্যপর্বের প্রধান চরিত্র। হালাকু খানের প্রতিশোধ আর আইসিস জিনিসটাকে মিলিয়ে যা হলো তা একদম গাঁজাখুরি কিন্তু আমার কাছে ইন্টারেস্টিং লেগেছে খুব। এক্ষেত্রে লেখকের কল্পনাশক্তির তারিফ করতেই হয়।
দ্বিতীয় খন্ডে (আদিপর্বে) হতাশ হওয়ায় এই পর্বে আশা রেখেছিলাম খুব কম। কিন্তু হালাকু খানকে এনে লেখক আমার মতো ক্ষুদ্র পাঠককে জয় করে ফেলেছেন। তাই শেষ পর্বে আশাটা আবার বেড়ে গেল। এই সমগ্রের প্রথম ছোট গল্পটা ভাদুড়ি মশাইয়ের উত্থানের গল্প। মধ্যপর্ব পড়ার পূর্বে এই গল্পটা পড়ারও একটা গুরুত্ব ও প্রয়োজন আছে।
নীরেন ভাদুড়ি সমগ্রের ৩য় খণ্ডে রয়েছে মোটে দুটো গল্প। এরমধ্যে একটা বহুল আকাঙ্ক্ষিত মহাসিন্ধুর ওপার থেকে এর একটা অংশ। সত্যি বলতে, এই গল্পটির শেষ জানার জন্যই বইটা কেনা। কিন্তু লেখক এটাকে এই খণ্ডেও শেষ করেননি। এটা কেবল মধ্যপর্ব।
এক উপন্যাসে কী আসেনি! মিথ, ইতিহাস, ম্যাজিক, ধাঁধাঁ, রোমান্স, রাজনীতি, ধর্ম সবই পুরে দিয়েছেন এক উপন্যাসে! তিতাসকে উদ্ধারের জন্য এবার ইরাক আর সিরিয়াতে যেতে হয় অপালা আর সঞ্জয়কে। এদিকে পল্লব আর রোশনিও অন্য ব্যবস্থায় ইরাক যেতে চায় কিন্তু মাঝপথে জ*ঙ্গিদের কবলে পড়ে।
সাবপ্লট হিসেবে তারিকের কাহিনী এসেছে। অন্য একটা মিথে গিলগামেশের গল্পও চলে এসেছে! হালাকু খাঁ, যিনি বাগদাদ ধ্বংস করেছিলেন, এই উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র। অনেক কিছুর মিশেল থাকলেও গল্পটা আমার মতে ঠিক জমেনি, রসের অভাব রয়েছে। এই মধ্য পর্ব, যেখানে কেবল ইনান্নার দণ্ড খুঁজে বের করতে ব্যায় হয়েছে প্রায় ৩০০ পাতা, সত্যিই এতটা দরকার ছিল কি না তা ভাবার বিষয়।
আর প্রথম নভেলাটার নাম হচ্ছে, কে প্রথম কাছে এসেছি। এটা নীরেন ভাদুড়ির ব্যাকস্টোরি। কী করে তাঁর গুরু রামদাস ঠাকুরের সাথে দেখা হল, সেই গল্পই লেখক ফেঁদেছেন দার্জিলিং এর লেবং উপত্যকার পটভূমিতে। ছোট্ট, সরল প্লট। রামদাস ঠাকুরের মধ্যে যেন কিছুটা রামকৃষ্ণের ছায়া পেলাম। আর নীরেনের মধ্যে বিবেকানন্দের! খারাপ লাগেনি।
সেই ছোট্টবেলার মতন সন্ধ্যেয় শুরু করে একরাতে মাঝরাত অব্দি পড়া শেষ করে বহুদিনের রিডার্স ব্লক কাটালাম। প্রথম গল্পটা ছিমছাম সুন্দর।প্রথম দুখন্ডে খেয়াল করিনি,তবে এবার হাবভাব কথাবার্তা আচরণ সবটায় রামকৃষ্ণ থেকে রামদাস,আর নরেন থেকে নীরেনের ব্যাপারটা ভালোই বুঝা গেলো। আর দ্বিতীয় খন্ড, মানে মহাসিন্ধুর ওপার হতের মধ্যখন্ড লাপিস লাজুলি অনেক ক্ষেত্রেই প্রেডিক্টেবল হলেও প্রথম খন্ড থেকে বহুগুণ ভালো। অনেকগুলো সময় এসেছে,স্থান এসেছে। অমিয় আর মিতুলকে মিস করেছি,আর ভাবছি,রোশনি কি নরকেও তিতাসের বিকল্পই হবে?
নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র ৩ (মহাসিন্ধুর ওপার থেকে) একটি উপন্যাস যা লেখকের কল্পনাশক্তি এবং ইতিহাস, রাজনীতি ও মিথোলজির সংমিশ্রণে সমৃদ্ধ। তবে এর কাঠামো এবং চরিত্রায়নে অনেক অসঙ্গতি লক্ষ্য করা যায়। উপন্যাসে চরিত্রের সংখ্যা অত্যধিক এবং অনেক সময় খাপছাড়া; একই চরিত্র এক মুহূর্তে অন্যকে ভালোবাসে আবার পরের মুহূর্তে তার প্রতি উদাসীন বা প্রতিকূল আচরণ করে, যা পাঠকের জন্য বিভ্রান্তিকর। স্বার্থপর, খামখেয়ালি বা অহংকারী চরিত্রগুলোকে আবেগী ও প্যাশনেট হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, ফলে তাদের বাস্তবসম্মত চরিত্রায়ন অনেকাংশে ক্ষুণ্ণ হয়েছে। লেখক ইচ্ছামতো অলৌকিক ক্ষমতা প্রয়োগ করেছেন, আর্মি, সরকার এবং বিভিন্ন শক্তি ব্যবহার করেছেন, কিন্তু এদের প্রটোকল বা কার্যপ্রণালীর ধারাবাহিকতা রক্ষা করা হয়নি। প্রতি চ্যাপ্টারে দুইবারের বেশি ফ্ল্যাশব্যাক ব্যবহার করা হয়েছে, যা গল্পের প্রবাহে অন্তরায় সৃষ্টি করে। কিছু ঘটনাও হঠাৎ ঘটছে, deus ex machina-র মতো, যা কাহিনীর বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও কমিয়ে দেয়। তারিখ ও সময়ের ব্যবহারেও অনেক ভুল রয়েছে; ইতিহাস এবং ভূগোলের প্রেক্ষাপট অনেক সময় অযৌক্তিকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যা পাঠকের immersion ভেঙে দেয়। সব মিলিয়ে, উপন্যাসটি কল্পনাপ্রবণ হলেও চরিত্রায়ন, কাঠামো ও বাস্তবতার সংমিশ্রণে পাঠককে পুরোপুরি সন্তুষ্ট করতে পারে না। লেখকের নিজস্ব লেখার স্টাইলটির অনুপস্থিতি লক্ষ্য করেছিলাম, সম্ভবত সহলেখকদের ছোঁয়া লেগেছে।
কে প্রথম কাছে এসেছি, এই গল্পটি মোটামুটি ভালোই লেগেছে। তাই স্টারগুলো দেয়া।
📕বই~নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র (তৃতীয় খন্ড) ✍🏻লেখক~সৌভিক চক্রবর্তী 🎨+🖼️প্রচ্ছদ ও অলংকরণ~সোহম সিনহা 🖨️প্রকাশনা~দীপ প্রকাশন 💷মুদ্রিত মূল্য~৫০০/- 📋পৃষ্ঠা~৪৪৬
🔸নীরেন ভাদুড়ির দ্বিতীয় খণ্ডে রয়েছে একটি গল্প একটি সুবৃহৎ উপন্যাস ♠️কে প্রথম কাছে এসেছি⟩» লেবং এ বেশ কয়েকদিন ধরে মানুষ মারা যাচ্ছে।ঘটনাস্থলে সর্বদা দেখা যাচ্ছে একটি বেড়াল জাতীয় প্রাণীকে। মৃত সবাই নাকি কামড় খাওয়ার আগে জঙ্গলে গিয়েছিল।আর কামড় দেওয়ার পরই সেই বেড়াল যেন সাথে সাথে স্রেফ অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল।রয়েছে ফাদারের অপমৃত্যু।আদপেই কি সমস্ত ঘটনা বিচ্ছিন্ন? নাকি একই সুতোয় বাঁধা?নীরেন ও তার গুরু কি পারবেন এই রহস্যভেদ করতে?
♣️মহাসিন্ধুর ওপার থেকে(মধ্য পর্ব)⟩» আদিপর্বের পর মধ্যপর্ব পুরোটাই অনুষ্ঠিত হয় তিতাসকে উদ্ধার করতে। এতে রয়েছে দুই আলাদা সময়ের ঘটনার বর্ণনা। সেগুলো কি একভাবে,একই মাধ্যমে একত্রিত হবে?দেবী ইনান্নার দন্ড কি হাতে আসবে ভাদুরি মশাইয়ের? ♦️বিস্তারিত ভাললাগা:- ১≥লেখক প্রথম, দ্বিতীয় পর্বের পরে অনেকখানি সময় নিয়েছেন তৃতীয় পর্ব আনতে। তার জন্য একটু ক্ষুব্ধ ছিলাম ঠিকই, কিন্তু এটা শেষ করার পরে সমস্ত রাগ গলে জল হয়ে গিয়েছে। ২≥লেখকের এই বইতে অন্তর্ভুক্ত প্রথম গল্প ছাপিয়ে দেয় ❝মহাসিন্ধুর ওপার থেকে❞ মধ্য পর্ব। ৩≥অকাল্ট হরর, প্যারানরমাল ব্যাপার-স্যাপার তো আগের পার্টগুলোতে ছিলই,কিন্তু এবারে তার বাড়তি সংযোজন হল হিস্টরি,মাইথোলজি,ফোক-টেল,সাই-ফাই,স্পাই-থ্রিলার, টেরোরিজম, দেশ ভক্তি সমস্ত কিছু মিলিয়ে মিশিয়ে আয়োজিত হয়েছে,সৃষ্টি হয়েছে এক দুর্দান্ত উপন্যাসের পটভূমি। ৪≥লেখক দুটো আলাদা সময় Randomly পরিচ্ছদ বদলে বদলে উপস্থাপন করেন,প্রথমত এতে অনেকাংশেই দেখা যায়, প্রাচীন সময়ের বর্ণনায় রিসার্চের কিছু অসংগতি থাকে কিংবা লিখতে গিয়ে কিছু অপ্রাসঙ্গিক শব্দ এসে গিয়ে লজিক ঘেঁটে যায়। এক্ষেত্রে সেটা একেবারেই হয়নি। ৫≥লেখক এখানে খলচরিত্রগুলোকে একাধিক নাম দিয়েছেন,সেটা ছদ্মনামের একেবারে চরম পর্যায়! আমার এটা দারুন লেগেছে। ৬≥প্রথমত যখন প্রাচীন ইতিহাস ও উপকথার বিবরণ আসে তখন কিছু না কিছু ত্রুটি থাকে,কিন্তু গল্প বলার কৌশল এখানে এতটাই ভালো যে এখানে ত্রুটি-বিচ্যূতি ধরার অবকাশ পাওয়া যায় না। ৭≥তন্ত্রের সাথে যখন সাইন্স ফিকশন মিশে যায়,তখন সেটার গল্পকে দাঁড় করানো অনেকটাই চাপের হয়।লেখক দাঁড় করিয়ে দিলেও সন্ধিহান থাকতে হয়, পাঠক কিভাবে সেটাকে গ্রহণ করবে।কিন্তু এক্ষেত্রে,সৌভিক বাবু সফল, আমি তাতে সিলমোহর দিলাম। ৮≥সবশেষে,ভাদুড়ি বনাম হুদুদ বেগ লড়াইটা দেখার মতন।বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শয়তানকে তার শয়তানি দেখানোর পর্যাপ্ত অবসর লেখক ফুটিয়ে তুলতে পারেন না। কিছু ল্যাকিং থেকে যায়।কিন্তু এক্ষেত্রে যেন শয়তানকে দিয়ে বেশ ভালোভাবেই শয়তানি করিয়েছেন সৌভিক বাবু।
অদ্ভুত এক মায়াবন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম পড়ার পুরো সময়টুকু। নীরেন ভাদুড়ি সমগ্র (১, ২, ৩) শেষ করলাম যেনো বই নয়, এক দীর্ঘ ও বহুমাত্রিক চলচ্চিত্র দেখলাম। প্রতিটি চরিত্র এতটাই জীবন্ত, এতটাই রক্তমাংসের যে তারা কেবল কাগজে সীমাবদ্ধ থাকেনি—চোখের সামনে হেঁটেছে, কথা বলেছে, দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে, ভেঙেছে, গড়েছে।
বিশেষ করে সমগ্র ৩-এ মিথ, অলৌকিকতা এবং নির্মম বাস্তবতার যে অনবদ্য সংমিশ্রণ, তা বাংলা সাহিত্যে বিরল বলেই মনে হয়েছে। কল্পনা ও ইতিহাসের এমন সুসংহত বিন্যাস পাঠককে একদিকে বিস্মিত করে, অন্যদিকে অস্বস্তিতেও ফেলে—কারণ গল্পের ভেতরের নির্মাণ যেন বাস্তব বিশ্বের প্রতিফলন হয়ে ওঠে।
বিশ্বজুড়ে অশান্তি, হানাহানি, ধর্মকে কেন্দ্র করে ক্ষমতার রাজনীতি—এই সমস্ত কিছুর দায় বইয়ে যে প্রাচীন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের পুনর্জীবনের ওপর আরোপ করা হয়েছে, এক মুহূর্তের জন্য সত্যিই মনে হয়েছিল—হয়তো তিনিই দায়ী! লেখকের বর্ণনা ও নির্মাণশৈলী এতটাই প্রভাবশালী যে পাঠক যুক্তি ভুলে আবেগে বিশ্বাস স্থাপন করে ফেলে। তারপরই ধীরে ধীরে বাস্তবতা ফিরে আসে—বোঝা যায়, দায় কোনো একক ব্যক্তির নয়; দায় আমাদের মনস্তত্ত্বের, অন্ধ অনুসরণের, এবং ক্ষমতার লালসার।
ধর্ম—যা মানবকল্যাণের জন্য, তা যখন ব্যবসার উপকরণে পরিণত হয়, তখন তার জন্য পুঁজির প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় কেবল অন্ধ বিশ্বাস এবং প্রশ্নহীন আনুগত্য। নিজেকে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রমাণের প্রতিযোগিতায় অন্যকে অবমাননার যে প্রবণতা, তা-ই হয়তো সংঘাতের মূল উৎস। যতদিন এই মানসিকতা পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত না হবে, ততদিন শান্তি অধরাই থেকে যাবে।
সমগ্রটি কেবল একটি সাহিত্যকর্ম নয়; এটি পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে—ইতিহাস, বিশ্বাস, ক্ষমতা ও মানবচরিত্রের অন্ধকার দিকগুলো নিয়ে। শেষ পৃষ্ঠা উল্টে দেওয়ার পরও এর রেশ দীর্ঘসময় মনে থেকে যায়।
অবশেষে পড়ে শেষ করলাম নীরেন ভাদুড়ী সমগ্র ৩ | অনেক দিন ধরে অপেক্ষা করছিলাম এই বই তা হাতে পাবার , তাই প্রকাশিত হবার আগে pre অর্ডার করে কিনে ফেলি | এবার আসি কেমন লাগলো পরে ? এক কোথায় অসাধারণ | বই টি তে একটি উপন্যাস র একটি নভেলা রয়েছে | " কে প্রথম কাছে এসেছি " এই নভেলা তে নীরেন ভাদুড়ী তার গুরু দেব রামদাস ঠাকুর এর সাক্ষাৎ পান | পড়তে গিয়ে আমার চোখে জল চলে আসে | অনেক তা বিবেকানন্দ র রামকৃষ্ণ দেব এর কথা মনে পরে যায় | একটা জায়গা আছে যেখানে রামদাসঠাকুর নীরেন ক মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন , ওই জায়গা তা খুব এ সুন্দর লেগেছে পরে | যদি ও শেষ তা আমার একটু হলেও প্রেডিক্যাবলে লেগেছে কিন্তু মোট এর উপর খারাপ নয় | এবার আসি দ্বিতীয় উপন্যাস তার কোথায় যেটা মহা সিন্ধুর ওপর থেকে এর দ্বিতীয় পর্ব " লাপিস লাজুলি " , এই খানে লেখক তার চেনা পরিচিত ফর্মুলা থেকে অনেক তাই বেরিয়ে গিয়ে ছেন | ভেতো বাঙালি চরিত্র গুলোর মধ্যে থেকে শঙ্কর ক বার করে এনেছেন, এই উপন্যাস তীর মধ্যে সব কিছু আছে | রহস্য ,রোমাঞ্চ ,প্রেম যুদ্ধ , ইতিহাস , বিজ্ঞান , অ্যাকশন সিকোয়েন্স , টেরোরিজম , সব কিছু | চেনা প্লাটফর্ম থেকে বেরিয়ে চরিত্র গুলো সুপারস্টার হয়ে উঠেছে| দীর্ঘ একটি উপন্যাস , সুতরাং কতটা ভালো না হলে পাঠকে ধরে রাখা স্বভব নয়| কিন্তু এই উপন্যাস সে পরীক্ষায় পাস করে গেছে | তবে লোকনাথ খুব মিস করেছি |
ভাল্লাগসে! গল্পটা আর তন্ত্রে মন্ত্রে সীমাবদ্ধ নেই। আদিপর্ব টা ছিল সাইকোলজিকাল আর্বান লেজেন্ড টাইপ। মধ্যপর্বটা হয়ে গেছে এসপিওনাজ ট্রেজার হান্ট, কোড ব্রেকিং, সেই সাথে ফ্যান্টাসি এই ধরনের। গল্পের ক্যানভাস অনেক বড় হয়ে গেছে। শেষ পর্বে ঠিক ঠাক নামাতে পারলে হয়। সবচেয়ে ভাল যেটা সেটা হচ্ছে ঝর ঝরে সাবলীল লেখনি, যার কারণে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনাকে ধরে রাখতে সক্ষম। কয়েকটা চরিত্রের কিছু সাবপ্লট আছে যেগুলোর গল্পের সাথে কোনো কানেকশান নেই। কিন্তু ওগুলোকে আমি অযথা বলবা না কারন ওগুলো ইন্টারেস্টিং। পড়তে ভাল লাগে। এখন অনেক মানুষের গল্পটা ভাল লাগবে না। হাবিজাবি গাজাখুরি বলে উড়িয়ে দিতে পারে। কিন্তু আমার কথা হচ্ছে স্পাইডার ম্যান, সুপারম্যান এগুলো বিদেশি বলে এগুলোকে গাজাখুরি না বলে জাস্ট ফর এন্টারটেইনমেন্ট বলে দেয়া যায় কিন্তু বাংলা ভাষায় এরকম কিছু লেখা হলে সেটা গাজাখুড়ি এইসব বলব সেটা তে আমার সমস্যা আছে। হ্যা বিদেশী জিনিসগুলো হয়ত আপনাকে মজা দিতে পারে কিন্তু এটা মজা দিতে পারেনি সেটা আলাদা কথা। সব জিনিস সবাইকে মজা না-ই দিতে পারে। কিন্তু বিদেশী জিনিস হলে চলে যায় কিন্তু নিজের ভাষায় হলে গাজাখুরি সেটা আপত্তি আছে অনেক।
মজার ব্যাপার হল তন্ত্র মন্ত্রের ব্যাপারটা সেভাবে নেই, যেটুকু থাকার দরকার সেটুকুই আছে আর বেশিরভাগটাই ইতিহাস আর স্পাই থ্রিলার। পড়তে পড়তে মনে হবে অভিক দত্ত আর সৌভিক চক্রবর্তী একসাথে বসে লিখেছে... তবে লেখকের এরকম লেখার হাতও খারাপ না যা দেখলাম... বইতে মহাসিন্ধুর ওপারের মধ্য খন্ড আছে তবে এবার গল্প পড়ে অতটাও মনে হবেনা যে গল্প মাঝখানে লেখা থামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। আর বড় গল্প যেটা সেটা গুরুদেবের সাথে ভাদুড়ীর প্রথম দেখা হওয়ার গল্প... সব মিলিয়ে ভালোই লাগলো কারণ স্পাই থ্রিলার ছিল বলে বোরিং লাগেনি।
প্রথম খন্ড পড়েই উনার লেখার সাথে পরিচয়। টিভি সিরিজটাও দেখা হয়ে গেছে ততোদিনে। এই বইয়ে উপন্যাস টা শেষ করলে ভালো লাগতো হয়তো। একটা সমগ্রের ৩ খন্ড জুড়ে এক উপন্যাস লেখাটা একদম পছন্দ হয়নি। প্রথম খন্ডের পর কোথাও সেই নীরেন ভাদুড়ি কে খুজে পাইনি। আশা থাকবে পরের খন্ডে আশাহত করবেন না।
প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত পাঠককে পড়িয়ে নিতে সক্ষম এই বই, কোথাও ধৈর্যের বাধ ভাঙেনি, কখনও মনে হয়নি কোথাও আর একটু কম রাখা যেত। একদিকে উঠে এসেছে মধ্যপ্রাচ্যের সুবিস্তৃত ইতিহাস অন্যদিকে শ্রী নীরেন ভাদুড়ির অপশক্তির বিরুদ্ধে ধাবমান হয়ে ওঠার চমকপ্রদ বিবরণ। মধ্যপ্রাচ্যের ইনান্না ও আমাদের ঘরের মেয়ে উমার এক অসাধারণ মেলবন্ধন রচিত হয়েছে গল্পের শেষে যা ভক্তিতে পাঠকের চোখে জল আনতে বাধ্য। অবশ্যই পড়ে দেখা উচিত সবার।