বাংলায় গনিতের এমন বই পড়তে পারলে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে হয়!!
বিভিন্ন বইয়ে গনিতের ব্যবহারিক দিকটা নিয়েই শুধু আলোচনা করা হয়।কিন্তু বিশুদ্ধ গনিতের যে সৌন্দর্য তা সেটা তেমন স্থান পায় না।এই বইয়ে বিশুদ্ধ গনিতের সৌন্দর্যকে তুলে ধরা হয়েছে।
যারা বাংলা জানেন এবং গনিত ভালোবাসেন তাদের সবার এই বই পড়া উচিত।অনেক গনিত শিখবেন তা নয়, কিন্তু গনিতের প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে, যা যেকোন মানুষের জন্য অমূল্য সম্পদ।
বাংলায় গণিতের বই যে কম এমনটা না। অনেক লেখকগণই হাতে কলম তুলে নিয়েছেন গুরুত্বপূর্ণ ও দুর্বোধ্য এই বিষয়টিকে শিক্ষার্থী দের হৃদয়ঙ্গম করানোর জন্য। পূর্বেকার (যখন বাংলাদেশে গণিত উৎসব নামে একটা বিষয় প্রচলিত হতে থাকে) মতো এখনো গণিত বিষয়ক রাশিরাশি বই লেখা হচ্ছে।এখন যে বইটা সম্পর্কিত আলোচনা রাখছি সেটাও "গণিত উৎসব" শুরুর বেশ পরে প্রকাশিত হয়।বইটার নাম "প্রাণের মাঝে গণিত বাজেঃজ্যামিতির জন্য ভালোবাসা "। এই বইটা আজ থেকে ১৩ বছর আগে অনুপম প্রকাশনি থেকে প্রকাশিত হয়! বইয়ের লেখক ডাঃ সৌমিত্র চক্রবর্তী। গণিত যে কোনো কাঠখোট্টা বিষয় নয়,বরং এর মাঝেও যে সৌন্দর্য থাকতে পারে তা বোঝানোর ক্ষমতা এই বইটি রাখে।যদিও বইটির কেন্দ্রীয় আলোচনা জ্যামিতি নিয়ে,কিন্ত এতে আস্বাদন করার মতো অনেক কিছুই আছে। আমাদের মাঝে অনেকের ভ্রান্ত একটা ধারণা থাকে যে 'জ্যামিতি জাস্ট কিছু আকা আকি',লেখক এই ধারণার বদ্ধমূলে আঘাত করেছেন। জ্যামিতি তে যে অংকনের তেমন একটা গুরুত্ব নেই বরং প্রমাণ অর্থাৎ যুক্তিই যে এর ভিত্তি তা লেখক দারুনভাবে বর্ণনা করেছেন। বিন্দুর মতো অতি নগণ্য একটা বিষয়কে কিভাবে অতিরঞ্জিত করে এর গুরুত্ব, ভিতরকার যে সৌন্দর্য একজন শিক্ষার্থী কে উপলদ্ধি করানো যায় তা লেখক প্রথম অধ্যায়ে 'বিন্দু মাঝে সিন্ধু খুজি' শিরোনামে বেশ ভালোভাবেই বর্ণনা করেছেন। এছাড়া ইউক্লিডীয় এক্সিওম,পস্টুলেট সম্পর্কিত আলোচনা, কিভাবে এটি সমতল ব্যতীত অন্যভাবে চিন্তা করলে অচল হয়ে পড়ে,এই ধারণা গুলো ২য় পরিচ্ছেদে আলোকপাত করেছেন। স্কুল জীবনে একজন শিক্ষার্থী যতগুলো উপপাদ্য সম্পর্কে জানে তার সবগুলোর সংকলন লেখক ৩য় পরিচ্ছেদে সারিবদ্ধ করেছেন।সারাজীবন আমরা বিভিন্ন জ্যামিতিক চিত্রের ক্ষেত্রফল ও আয়তন নির্ণয়ের সূত্র মুখস্থ করে আসি কিন্তু কেন সূত্রগুলো এরকমই তা কতজনই বা জানি! বিভিন্ন আকৃতির বস্তুর ক্ষেত্রফল ও আয়তন কিভাবে বুঝে বুঝে একটার সাথে আরেকটাকে রিলেট করা যায়, তা লেখক চতুর্থ পরিচ্ছেদে দারুণ মুনশিয়ানায় বর্ণনা করেছেন। এর পরের অধ্যায়টা গণিতের সবচেয়ে দরকারি বিষয় ক্যালকুলাস সম্পর্কিত। এ নিয়ে লেখক বেশ কয়েক পাতা লিখেছেন।ক্যালকুলাস সম্পর্কে যে একেবারেই জানে না সে এই অধ্যায়টি যদি ভালোভাবে খুটিয়ে খুটিয়ে পড়ে তবে আশাকরি সে মোটামুটি একটা আইডিয়া পেয়ে যাবে।পরের অধ্যায়ে লেখক কলম তুলেছেন কণিক সম্বন্ধে। কণিকের সংগা,কিভাবে একটা কোণককে বিভিন্ন কোণে কেটে প্রস্থচ্ছেদের ক্ষেত্রফল নিলে বিভিন্ন কণিক পাওয়া যায় তার বর্ণনাসহ চুলচেরা বিশ্লেষণ করেছেন এই বেলায়। পিথাগোরাসের উপপাদ্য কোথা থেকে এলো,কিভাবে এটা সম্বন্ধে মানুষ প্রথম জানল, এর ব্যবহার এসব নিয়ে বেশ খানিকটাই লেখেন সপ্তম পরিচ্ছেদে। এর পরের অধ্যায় টা একটা মারদাঙ্গা বিষয় টপোলজি নিয়ে। কিভাবে কনিগসবার্গের সেই সপ্তসেতু সমস্যা থেকে টপোলজির জন্ম হলো,তা নিয়ে লেখক এই অধ্যায়টায় অনেকখানি বলেছেন।এই অধ্যায়টাতে লেখক মেনিফোল্ড সম্পর্কিত আলোচনা রেখেছেন,যেটা আমার ব্যক্তিগতভাবে অনেক ভাল লেগেছে। ৯নম্বর অধ্যায় টা ১০৪ পৃষ্ঠার! গণিতের তিনটি বিখ্যাত ধ্রুব, সংখ্যা দের মধ্যে যারা মহারথী সেই π,e,phi নিয়ে লেখকের এই বেলার লেখাটা অনেক ভালো লাগিয়ে ছাড়বে একজন শিক্ষার্থী কে। এই অধ্যায়টার নাম টাও বেশ সাহিত্যিক 'তারা তিনজন'।এর পরের দশম অধ্যায়টার নাম লেখক রেখেছেন Mission Impossible. জ্যামিতির কিছু সমস্যা আছে যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে অসম্ভব মনে হলেও যে এগুলো সমাধানযোগ্য,সেই বিষয়গুলো নিয়ে বেশ ভালোই আলোচনা দিয়ে লেখক বইটার ইতি টানেন। আশা রাখি মাধ্যমিকে পড়ুয়া সকলের বিশেষ করে ৯-১০ম পড়ুয়াদের বইটা বেশ উপভোগ্য হবে। আর দেরি না করে বইটা সংগ্রহ করে ফেলুন। শেষ করব চমক হাসান ভাইয়ার বইটা নিয়ে অনুভূতির কথা দিয়ে। "প্রাণের মাঝে গণিত বাজে।আমার মনে হয় এটা বাংলায় লেখা সবচেয়ে সুন্দর গণিত বই।"