Jump to ratings and reviews
Rate this book

কার্পাসমহল

Rate this book
তিরু ওরফে সবে কৈশোর পেরোনো তিরুতমা চাকমা বাঁধভাসি পাহাড়ের অথই তলানিতে যে রাতভর বেপরোয়া ঘুরে বেড়াত তা হতে পারে এক বিচিত্র স্বপ্নঘোর। স্বপ্নঘোরাচ্ছন্ন তার জলবিহার যদি হয় রূঢ় বাস্তবকে অস্বীকার, তা হলে পাহাড়ের আদি বিদ্রোহী বলতে কি সে-ই? দীর্ঘদিন পর হেঁয়ালির মতো প্রশ্নটা যার মাথায় দুলে ওঠে, সে বিন্তি ওরফে বিনীতা চাকমা, যে পার্বত্য অঞ্চলের টালমাটাল বর্তমান ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের আলো-আঁধারিতে হাঁটবে বলে পথ খোঁজে-জলের তলানিতে নয়, রুক্ষ-খর ডাঙায়।

বিন্তির পথ খোঁজা তার একার নয়, বহুজনকে একসঙ্গে শামিল করতে নানা দুর্বিপাকের মধ্যেও তার পথচলা। কাজটা দুরূহ হলেও তার মন বলে অসম্ভব নয়। আর এসবের মধ্যে তার স্বপ্নে অলীক ইশারার মতো চকমকি ঠোকে কালপ্রবাহে হারিয়ে যাওয়া অনিন্দ্যসুন্দর এক পাহাড়ি জনপদ-কার্পাসমহল।

কিন্তু স্বপ্নে নয়, অতীতে নয়, তার হেঁটে চলা কঠিন বর্তমানে।

310 pages, Hardcover

First published October 22, 2025

3 people are currently reading
83 people want to read

About the author

Wasi Ahmed

27 books22 followers
ওয়াসি আহমেদের জন্ম ১৯৫৪ সালে, সিলেট শহরের নাইওরপুলে। স্কুলের পাঠ বৃহত্তর সিলেটের নানা জায়গায়। পরবর্তী শিক্ষাজীবন ঢাকা কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। কবিতা দিয়ে লেখালেখির শুরু। ছাত্রাবস্থায় প্রকাশিত কবিতা সংকলন ‘শবযাত্রী স্বজন’। কথাসাহিত্যে, বিশেষত গল্পে, মনোনিবেশ আশির দশকে। প্রথম গল্প সংকলন ‘ছায়াদণ্ডি ও অন্যান্য’ প্রকাশিত হয় ১৯৯২ সালে। পুস্তকাকারে প্রথম উপন্যাস ‘মেঘপাহাড়’ প্রকাশ পায় ২০০০ সালে। সরকারি চাকরিজীবী হিসেবে কূটনীতিকের দায়িত্ব পালনসহ কাজ করেছেন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নানা অঙ্গনে। লেখালেখির স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন বাংলা একাডেমি পুরস্কারসহ দেশের প্রায় সব প্রধান সাহিত্য পুরস্কার।

Ratings & Reviews

What do you think?
Rate this book

Friends & Following

Create a free account to discover what your friends think of this book!

Community Reviews

5 stars
4 (30%)
4 stars
5 (38%)
3 stars
2 (15%)
2 stars
2 (15%)
1 star
0 (0%)
Displaying 1 - 11 of 11 reviews
Profile Image for Harun Ahmed.
1,698 reviews460 followers
December 30, 2025
"পাহাড়ের বিদীর্ণ আত্মার রুদ্ধ মহাকাব্য।"

পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে আমাদের আগ্রহ প্রচুর। তবে সেটা শুধুই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের কারণে। ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের সাজেকে বেড়াতে যেতেই হবে, নীলগিরিতে যেতেই হবে। ব্যস! সেখানকার আদিবাসী মানুষদের সংগ্রাম আর শোষিত হওয়ার ইতিহাস আমরা জানি না, জানার ইচ্ছাও নেই। ওয়াসি আহমেদ তাঁর দায়বোধ থেকে লিখেছেন "কার্পাসমহল।" দুই সময়রেখা ধরে এগিয়েছে গল্প। এক গল্পের কেন্দ্রে আছেন তিরু চাকমা, আরেক গল্পে বিন্তি ওরফে বিনীতা চাকমা। লেখক তার স্বভাবসুলভ ঠাণ্ডা ও নিচুস্বরে গল্প বলার কায়দা বজায় রেখেছেন, দূর থেকে পর্যবেক্ষণ করেছেন যথাসাধ্য, নিজে অনধিকার প্রবেশ করেননি গল্পে।

একটা বিখ্যাত চাকমা প্রবাদ হচ্ছে "লরানা মরানা সমান।" এর ভাবার্থ " কাউকে তার জন্মভিটা থেকে জোর করে তাড়ানো আর তাকে মেরে ফেলার মধ্যে পার্থক্য নেই।" কাপ্তাই বাঁধ তৈরির সময় আনুমানিক এক লক্ষ মানুষের ভিটেমাটি পানির নিচে তলিয়ে যায়। ঘরহারা মানুষের ৭০% ছিলেন চাকমা। তাদের শুধু ঘরবাড়িই হারাতে হয়নি; অনেককেই হারাতে হয়েছে স্বজন, বাধ্য হয়ে সপরিবারে ভারতে পালিয়ে গেছেন অনেকে, পথিমধ্যে ক্ষুধা আর রোগে ভুগে মৃত্যুর ঘটনাও বিরল নয়। যেহেতু ইতিহাসের এই কালো অধ্যায় আর  পরবর্তী দীর্ঘ সংগ্রাম সম্বন্ধে সিংহভাগ পাঠক অজ্ঞ, তাই লেখককে কথোপকথনের মাধ্যমে তথ্য জানাতে হয়েছে বারংবার।এতে উপন্যাসের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত হয়েছে । তিরুতমা চাকমা তার অতীতচারী জলবিহারের স্বপ্ন (অথবা স্বপ্নের চেয়েও অধিক বাস্তবতা) নিয়ে প্রাণ দিয়েছেন  লেখায়। উপসংহার স্বভাবতই উন্মুক্ত। যেহেতু ইতিহাস চলমান, যেহেতু এখনো সমাপ্তি ঘটেনি লড়াইয়ের, যেহেতু এখনো তিরু বা বিন্তি কারো স্বপ্নই পূরণ হয়নি। ওয়াসি আহমেদের কাছে আমার প্রত্যাশার অন্ত নেই। মনে হয়, তিনি আরো গভীরে যেতে পারতেন ঘটনার। কিন্তু যা আছে, সেটাও আমাদের জন্য গুরুত্ববহ।
Profile Image for Arifur Rahman Nayeem.
210 reviews108 followers
October 30, 2025
এত সুলিখিত, এত সুখপাঠ্য! পার্বত্য অঞ্চল নিয়ে ওয়াসি আহমেদ লিখেছেন, একে পাঠকের সৌভাগ্য ছাড়া আর কী বলি! বিষয়বস্তু মারাত্মক জটিল, তবু ওয়াসি আহমেদ কত সাবলীল। ‘কার্পাসমহল’ অবশ্যপাঠ্য এক উপন্যাস।
Profile Image for Arupratan.
238 reviews394 followers
November 27, 2025
দুনিয়ার একটা মোক্ষম নিয়ম— ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। উত্তমর্ণ সুযোগ পেলেই অধমর্ণের অধিকারে হস্তক্ষেপ করে। এই নিয়মের অন্যথা নেই। তা সে আমাদের সারে জাহাঁ সে আচ্ছা ভারতবর্ষই হোক, কিংবা সকল দেশের রানি বাংলাদেশ। একান্তচারী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী দেখলেই আমাদের জমিদারি মেজাজ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। কখনও আমরা তাদের যুগযুগান্তের বাসভূমি জঙ্গল থেকে উৎখাত করি (কারণ সেই জঙ্গলে খনিজ পদার্থ পাওয়া যায়), অথবা তাদের বিস্তীর্ণ জনপদকে বিনা দ্বিধায় সদ্যনির্মিত বাঁধের জলে ডুবিয়ে দিই (জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্দেশ্যে)। বাস্তুহারা, কর্মহারা, শিকড়হারা— সেই লাখো লাখো জনতার ভবিতব্য নিয়ে গণতান্ত্রিক প্রজাতান্ত্রিক হেনতান্ত্রিক তেনতান্ত্রিক রাষ্ট্রশক্তি ডাংগুলি খেলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। যে-মুজিবুর রহমান নিজে উর্দুভাষী পাঠান হতে নারাজ ছিলেন, তিনি চাকমাদের উপদেশ দিয়েছিলেন: "তোমরা বাঙালি হয়ে যাও"। আমরা নিজেরাও ইন্টেলেকচুয়াল আলোচনায় সবিশেষ মত্ত হই: ঠিক কোন্ বিশেষণটি তাদের জন্য পলিটিক্যালি কারেক্ট হবে? আদিবাসী? উপজাতি? জনগোষ্ঠী? জনজাতি?

কাপ্তাই হ্রদের নাম শুনেছিলাম ইতস্তত। বাংলাদেশের জনপ্রিয় পর্যটন-গন্তব্য। সেই কাপ্তাই হ্রদের নিচে তলিয়ে যাওয়া জনপদ কিংবা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাস্তুহারা মানুষদের কথা পড়তে গিয়ে আমার নিজের দেশের কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল বারবার। জাতীয়তাবাদের সেই একই অমানবিক মুখোশ। সেনাবাহিনীর সেই একই প্রভুসুলভ আচরণ। সংখ্যাগরিষ্ঠের জাতিসত্তার নিচে চাপা পড়ে যাওয়া প্রান্তিক মানুষদের অবহেলিত আত্মপরিচয়। উপন্যাসটি পড়ার সময় আমার প্রাণপ্রিয় বাংলা ভাষার আধিপত্যকামী রূপটি দেখে মনে পড়ে গেছে বর্তমান ভারতের "হিন্দি-হিন্দু-হিন্দুস্তান" স্লোগানটি। ওয়াসি আহমেদের এই উপন্যাসটি আরেকবার প্রমাণ করেছে, ধর্মপরিচয় হোক, জাতিপরিচয় হোক, কিংবা ভাষাপরিচয়, এসব তো মূলত জন্মসূত্রে পাওয়া আইডেন্টিটি কার্ডের বেশি কিছু নয়। কিন্তু এই আইডেন্টিটি কার্ডকে যখন আমরা পূতপবিত্র একমেবাদ্বিতীয়ম মানতে শুরু করি তখনই হয় মুশকিল। তখনই আমরা মানুষের খোলস ত্যাগ করে শ্বাপদ হতে শুরু করি।

"কার্পাসমহল" একটি পরিশ্রমলব্ধ উপন্যাস। কাপ্তাই হ্রদের নিচে ডুবে থাকা পুরোনো রাঙামাটি জেলার জীবন্ত বর্ণনা কিংবা পার্বত্য জনগোষ্ঠীর দুনিয়াদারির খুঁটিনাটি বৃত্তান্ত পাঠকের সামনে তুলে এনেছেন লেখক। "কার্পাসমহল" একটি সাহসী উপন্যাসও বটে। আখ্যানের সাহসী চরিত্ররা তো আসলে লেখকের নিজের সাহসের প্রতিফলন। বুঝতে পেরেছি যে পাহাড়ের ইস্যুটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সামাজিক প্রেক্ষাপটে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু (ঠিক আমার দেশের মতোই)। কিন্তু লেখক নিজের বক্তব্য প্রকাশে পেছপা হননি। ইদানিংকালে প্রকাশিত পরপর কয়েকটি উপন্যাসের দুর্বল প্লট এবং/অথবা বানোয়াট গদ্যের ক্লান্তিকর কারসাজি আর আঙ্গিকের "শৌখিন নিরীক্ষা" দেখে-দেখে হতোদ্যম হয়ে পড়েছিলাম। ঋজু গদ্যে লেখা এই উপন্যাসের বস্তুনিষ্ঠ পরিবেশন আমার মনের ভেতরের জমে থাকা অনেক কুয়াশা কাটিয়ে দিয়েছে। বেশ কাঠখড় পুড়িয়ে বইটি পড়ার সুযোগ করে দিয়েছে আঞ্জুমান লায়লা নওশিন। তাকে কৃতজ্ঞতা জানাই।
Profile Image for Samiur Rashid Abir.
219 reviews42 followers
November 27, 2025
গুরুত্বপূর্ণ উপন্যাস। কাপ্তাই বাঁধ আর পাহাড় নিয়ে জটিলতা সম্পর্কে আরও জানতে পারলাম। ভুক্তভোগী মানুষগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এরকম লেখার প্রয়োজন ছিল।
Profile Image for Anik Chowdhury.
181 reviews43 followers
February 1, 2026
যে লেকের জলের উপর সাঁতার কেটে বা নৌকা বিহার করে আমার বড় হওয়া সেই লেকের জলে লুকিয়ে আছে হাজার হাজার মানুষের চোখের জল, আবার সেই লেকের জলেই রয়েছে মানুষের প্রাচীন বাস্তুভিটা। এই লেখাটি হয়তো 'কার্পাসমহল' বইয়ের পর্যালোচনা হবে না, কারণ পর্যালোচনার সাথে মিশে যাবে আমার দেখা রাঙ্গামাটি শহর, মানুষজন আর আমার ব্যক্তিগত অনুভূতি। 
ছোটবেলায় মামার বাড়ি গেলে একটা গল্প শুনতাম দাদুর মুখে, ঠিক গল্প বলা যাবে না বরং রাতের বেলার ঘুমানোর আগে ভয় লাগানোর জন্য বলতেন বলেই মনে হয়। উনি বলতেন, লেক থেকে কামান উঠে আসার কথা। যে কামান বহু আগে লেকের জলে চলে গিয়েছিলো নিজে নিজে। সে কামান উঠে এসে জলের নীচে নিয়ে যাবে তোমাকে। সে নিজের মতো চলতে ফিরতে পারে। মানুষজকে জলের নীচে নিয়ে যায় যখন তখন।
তবে বাস্তবে আমরা দুইটা কামানের কথা জানতে পারি ইতিহাস বা 'কার্পাসমহল' বই থেকে যা মুঘলদের পরাজিত করে চাকমা সেনাপতি কালু খাঁ দখল করেছিলেন। একটির নামকরণ করা হয়েছে সেনাপতি কালু খাঁয়ের নামে অন্যটির নামকরণ করা হয়েছে রাজার ভাই ফতে খাঁ এর নামানুসারে। তবে কাপ্তাই বাঁধের ফলে রাজবাড়ি যখন জলমগ্ন হয়ে যাচ্ছিলো তখন এই দুই কামানকে নৌকায় তোলা হয়েছিলো। কিন্তু নৌকায় করে কিছু দূর আনার পর নৌকা জলের তোড় আর কামানের ভারে ডুবুডুবু। তখন বাধ্য হয়ে কালু খাঁ নামের কামানকে জলে ফেলে দেওয়া হয়। আর বর্তমানে ফতে খাঁ নামের কামানটিকে চাকমা রাজার কাচারি ঘরের সামনে দেখতে পাওয়া যায়।
তাহলে দেখা যাচ্ছে শিশুদের ঘুম পাড়ানোর জন্য বা ভয় লাগানোর জন্য আমাদের বড়রা যে কামানের কথা বলতো তার অস্তিত্ব বাস্তবেও বিদ্যমান আর তার অন্তরালে যে দগদগে ক্ষত সেটিও কাপ্তাই বাঁধ। যে বাঁধ মানুষের শান্তি বা ঘুম কেড়ে নিয়েছিলো তারই অতলে হারিয়ে যাওয়া কামান আজও অনেকের মনে ভীতি জাগায়।
তারপর আরেকটু বড় হলাম, উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হলাম। তখন আর মামার বাড়ি বেড়াতে যাওয়া নয় বরং মামার বাড়ি থেকেই পড়াশোনা করি। রাঙ্গামাটি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়া শুরু করেছি। মায়ের কাকা আমাকে আরেকটা গল্প শোনালো। উনিও কোনো একসময় এই স্কুলের ছাত্র ছিলেন। কোনো কোনোদিন উনার কাছে গেলে উনি বলতেন, স্কুলের সামনে যে জলরাশি এখন তুমি দেখো সেখানেই ছিলো আমাদের আদিনিবাস। তিনি স্কুলে আসতাম সেই আদিনিবাস থেকেই। আমার সদ্য কৈশোরে অবতীর্ণ হওয়া মনকে এইসব কথা উন্মাদ করে তোলে। তারপর জানলাম সেই সময়ের কথা যে সময় কার্পাসমহল নামে এক জায়গা ছিলো। আর তা বর্তমানে বহমান লেকের নীচে। তখন জানতে পারি পাহাড়ের মানুষের সেই সময়ের কথা যখন তারা নিজেদের আদামে সুখে বাস করতো। তারপর তাদের কাল হয়ে দাঁড়ানো লেকের স্থির জলের কথা। পুরানো  কার্পাসমহলের অস্ত্বিত্বের কথা জানান দিতে শীতকালের পর পর এবং গরমকালে যখন লেকে জল কম থাকে তখন আজও পুরানো চাকমা রাজবাড়ির সামান্য অংশ লেকের জলের উপর ভেসে ওঠে বলে শোনা যায়। তবে লেকে জল কমলে বর্তমান ডিসি বাংলোর আশেপাশে এবং শহীদ মিনারের পাশ থেকে যে বিশালাকার গাছের মাথা ভেসে উঠে তা তো নিজের চোখে দেখা। তারপরে আর সংশয় থাকে না।


পাহাড়ে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট রং বদলাতে থাকে ঘন ঘন। এই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটকে বাইরে থেকে যত সরল মনে হয় তার অন্তরালের ততই গভীর। চোরাবালির যেমন তল পাওয়া যায় না, তেমনই অনেকটা। 'কার্পাসমহল' বইটি দুই টাইমলাইনকে কেন্দ্র করে এগিয়েছে। প্রথমটি কাপ্তাই বাঁধ হওয়ার আগেকার সময় থেকে বাঁধা পরবর্তী সময় পর্যন্ত। আর দ্বিতীয় টাইমলাইনটি বর্তমান সময়কে কেন্দ্র করে। বিভিন্ন তথ্য এবং তার উপর নির্ভর করে গড়ে ওঠা এই উপন্যাস আপনাকে পার্বত্য জনজীবনের অনেকটা অংশ দেখাবে। প্রথমটি যদি হয় বাঁধ হওয়ার পূর্বের শান্ত, নিরাপদ জীবনের প্রতিচ্ছবি। দ্বিতীয়টি ভিটেমাটি হারানো সেবসব মানুষদের উত্তরসূরিদের বর্তমান অবস্থা। তাদের অধিকার আদায়ের জন্য নিজেদের নিরাপদ জীবন ছেড়ে অনিশ্চিতের পথের যেই যাত্রা বর্তমানে চালু রেখেছে তা বাঁধ হওয়ার পরে তাদের পূর্বপুরুষদের যাত্রারই ফলাফল বলা যায়। ভিটেমাটি হারানো মানুষগুলো যেমন তাদের ন্যায্য জমি পায়নি তেমনই ফিরে পায়নি তাদের তাদের ফেলে আসা আদামকে। তাই 'কার্পাসমহল' উপন্যাসকে আদিবাসীদের অতীত থেকে বর্তমানে যাত্রার এক যাত্রা বলা যেতে পারে।
এই উপন্যাস পড়তে গিয়ে বর্তমানের চেনা জানা জায়গাগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠেছে। উপন্যাসটি লেখাও হয়েছে খুব সাবলীল ভাষায়। ওয়াসি আহমেদ অনেক স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে কাজ করেছেন। যেমন, বরফকল উপন্যাসটি। এই উপন্যাসটিও স্পর্শকাতর একটি বিষয়ের উপর রচিত। উপন্যাসের মধ্যে টুকরোটাকরা তথ্য খুব সুন্দর করে সংযুক্ত করা হয়েছে। আর ওয়াসি আহমেদের লেখা পড়তে ভালো লাগে। 'কার্পাসমহল' বইটি হয়ে উঠতে পারে কার্পাসমহলকে জানার জন্য প্রাথমিক একটি বই হিসাবে।
তবে পার্বত্য চট্টগ্রাম বা কার্পাসমহল নিয়ে যাদের পূর্বের ধারণা নেই তারা চাইলে উপন্যাস শুরু আগে কাপ্তাই বাঁধ, কল্পনা চাকমা, এম এন লারমা, সন্তু লারমা, রাজা ত্রিদিব রায়, রাজা দেবাশীষ রায়, জনসংহতি সমিতি এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তি চুক্তি ইত্যাদি অনলাইনে টুকটাক ঘেঁটে তারপর পড়া শুরু করতে পারেন। তাহলে পড়তে সমস্যা হওয়ার কথা না।
Profile Image for Sakib A. Jami.
349 reviews41 followers
January 6, 2026
দেশভাগ হয়েছে অনেকদিন আগে। এরপর থেকেই আলোচনা শোনা যাচ্ছিল। কাপ্তাই হ্রদে একটি বাঁধ নির্মাণ করা হবে। আলোচনা চলতে চলতে অবশেষে ফলপ্রসূ হয়েছে। দেশভাগ হওয়ার প্রায় দশ বছর পর শুরু হওয়া বাঁধ নির্মাণ শেষ হয়েছে আরো পাঁচ বছর পর। লাভ কী হলো? টারবাইনের ঘূর্ণনে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে, দেশের সর্বত্র পৌঁছে যাবে আলো।

কিন্তু এই আলোর বিপরীতে যে অন্ধকার আছে, সেটা কি আমলে নেওয়া হয়েছিল? বাঁধের কারণে আশেপাশের অনেক নদীনালা, খাল-বিল ফুলে ফেঁপে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পেয়েছে প্রতিনিয়ত। আর তাতে বানভাসি হয়েছে পাহাড়ে বসবাস করা হাজারে হাজার মানুষ। সংখ্যার হিসেবে প্রায় লাখখানেক মানুষ তাদের আশ্রয়স্থল হারিয়েছিল। জমির পর জমি পানির নিচে তলিয়ে হয়েছিল। যারা পাহাড়ের উপর নির্দিষ্ট জমিতে নিজেদের অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত পোক্ত করেছিল; এক মুহূর্তে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিল।

অবশ্য সরকার ক্ষতিপূরণ দেওয়ারচেষ্টা করেছে, পুনর্বাসনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু যে অস্তিত্ব সংকটে পাহাড়িরা পড়েছিল, তার পুরোটা পুনর্বাসনের পরিকল্পনা করে বাস্তবায়নের সঠিক কোনো রূপরেখা ছিল না। কাজেই নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে নতুন যে পথে পা বাড়াতে হয়েছিল অসংখ্য মানুষকে, জীবনের একাংশ তারা হারিয়ে ফেলেছিল তখনই। নতুন করে জীবন সাজানোর আর কিছুই অবশিষ্ট ছিল না।

অতীতের এমন এক নির্মম অধ্যায়কে সঙ্গী করেই লেখক ওয়াসি আহমেদ লিখেছেন, কার্পাসমহল। প্রথমে বলা প্রয়োজন কার্পাসমহল আসলে কী? কার্পাসমহল ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রাচীন নাম। কার্পাস মানে তুলা। মুঘল আমলে এই পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে প্রচুর তুলার চাষ হতো। সেই সময় এই অঞ্চলের বাতাসে শুভ্র মেঘের মতো তুলা ভেসে বেড়াত। ব্রিটিশ আমলে এই কার্পাসমহল নাম পরিবর্তন করে পার্বত্য চট্টগ্রাম রাখা হয়। লেখক যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামের অতীতের এক খন্ড ইতিহাস তুলে আনার প্রয়াস করেছেন, তাই কার্পাসমহল নামটা যৌক্তিক ও যথাযথ হিসেবেই মনে হয়েছে।

এই গল্পটা ছুটেছে দুই সময়কালকে কেন্দ্র করে। একদিকে অতীত, একদিকে বর্তমান। আর দুই সময়কালের প্রধান চরিত্র দুই নারী যেন দুই সময়ের প্রতিনিধি। তিরুতমা চাকমা ওরফে তিরু আর বিনীতা চাকমা ওরফে বিন্তি ভিন্ন প্রজন্মের হয়েও পাহাড়কে ধারণ করার এক অনন্য ক্ষমতা নিজেদের মধ্যে দখল করে রেখেছে। তাদের এই লড়াই ভিন্নভাবে পরিলক্ষিত হয়। ভিন্নভাবে পাঠকের মনে ভাবনার সৃষ্টি করে। এ যেন ঘোরলাগা কোনো উপাখ্যান, যেখানে অন্যরকম এক পাহাড়ের গল্প বলা হয়েছে।

এই উপন্যাসের দুটি দিক রয়েছে। আগে অতীত নিয়ে কথা বলি। তিরুর পরিবারকে স্বচ্ছল বলা যায়। দুই ভাই, বাবা-মা ও খালাকে নিয়ে সংসার। চঞ্চল তিরু এহেন কাজ নেই যেটা করে না। এমন এক দস্যিপনার সময়েই তার সাথে দেখা হয় বিশুর। আঘাত পাওয়া চঞ্চল মেয়েকে বাড়িতে পৌঁছে দেয় ছেলেটা। ঘটনাক্রমে তিরুর বাবাকে সাহায্যও করে বিশু। আর মন চুরি করে তিরুর। বিশুকে ছাড়া তিরু কিছুই ভাবতে পারে না।

তিরুর বিশুর প্রতি দূর্বল হওয়ার চেয়েও তখন বড় ঘটনা ঘটে পাহাড়ে। কাপ্তাই হ্রদে বাঁধ বসানো নিয়ে কত গুজব ছড়িয়ে পড়বে। বানের জলে ভেসে যাবে সবকিছু, এ যেন বিশ্বাস হতে চায় না। এত দূর পর্যন্ত পানি আসবে? আরও কত গুজব ডালপালা মেলে আতঙ্ক ছড়ায়। শিশুদের মাথা লাগবে। অমুক পড়ার অমুকের ছেলে নিখোঁজ। নিশ্চয়ই মাথা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সবই গুজব। এই আতঙ্কের সময় একদিন বাস্তব এসে ধরা দেয় যখন সরকারি লোকজন এসে মাপজোক করে। তখন বোঝা যায়, নামমাত্র ক্ষতিপূরণে তাদের নিজেদের ভিটেমাটি ছাড়তে হবে।

নতুন এক লড়াইয়ের শুরু এখান থেকেই। একজন মানুষের কাছে স্বদেশের চেয়ে প্রিয় কিছু নেই। নিজের মাটিতে থাকার স্বস্তি অন্য কিছুতে পাওয়া যায় না। এমন পরিস্থিতি যখন নিজেদের সবকিছু ছেড়ে চলে যেতে হয়; নতুন ঠিকানা, নতুন আশ্রয়ে তখন কতটা মনকে মানানো যায়? কেউ কেউ হয়তো শেষ পর্যন্ত আঁকড়ে ধরে রাখার চেষ্টা করে। এক রোখা মানসিকতায় থেকে শেষ লড়াই করার ইচ্ছা প্রকাশ করে। কিন্তু যখন জীবনের প্রশ্ন, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার প্রশ্ন, তখন আর কি হার মানতে হয়।

এই বইয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আমার কাছে এই অংশটি লেগেছে। অতীতের এই গল্পগুলো। চারিদিকে জল থৈথৈ! নৌকার বহর চলছে অজানার উদ্দেশে। পথে কত বিপদ, কত বাঁধা! রোগশোক, ঝুটঝামেলা! একসাথে বেরিয়েও একজন একজন করে হারিয়ে যাওয়া! কেউ কেউ মৃত্যুর পথে অনন্তকালের যাত্রা করেছে, কেউ বেছে নিয়েছে ভিন্নপথ। নিজেদের আশ্রয়স্থল খোঁজার জন্য নিজেদের বন্ধনও যে আলগা হয়ে যায়। কে যে কোথায় গিয়ে থিতু হয়, কেই বা জানে!

কত মানুষ তো নিজেদের আবাসস্থল হারিয়েছে। তার নির্দিষ্ট একটা অংশের লড়াই, সংগ্রাম, টিকে থাকার প্রচেষ্টা, মনের হাহাকার সবকিছু লেখক এক বিন্দুতে নিয়ে এসেছেন। এগুলো অনেকেরই জানা থাকতে পারে, আবার অজানাও থেকে যায়। গল্পের মধ্যে সেসব পাহাড়ি মানুষদের জীবনের বিষাদময় এক অধ্যায় তুলে এনেছেন লেখক।

এর মাঝে তিরু নামের মেয়েটার বিশুকে খুঁজে ফেরা, কখনো পাগলাটে হয়ে অদ্ভুত আচরণ করা কিংবা জলপরী হয়ে পানিতে ভেসে খুঁজে বেড়ানো তার মাতৃভূমি হয়তো কল্পনার চেয়েও বেশি বাস্তব। দিন শেষে তিরুর কী হলো? তিরুতমা চাকমার জীবনের এই গল্পটা রূপকথার গল্প হয়েই ছড়িয়েছে পাহাড়ে পাহাড়ে।

অতীত থেকে যখন বর্তমানে আসা হয়, তখন গল্পটা ভিন্ন। পাহাড় নিয়ে আমাদের অনেকের অনেক আগ্রহ আছে। পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া অনেকের স্বপ্ন। কত উন্নয়নের কথা জানানো হয়! পাহাড়ের উপর রিসোর্ট, পর্যটকদের ভিড় নিয়ে গদ্য লেখা হয়। কিন্তু এই পাহাড়ের রাজনীতি নিয়ে আমাদের জানার সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও ভাসাভাসা কিছু কথা কানে আসে। কল্পনা চাকমার কথা হয়তো আপনার জানেন। এমন অনেক কিছুই পাহাড়ে হয় বলে পাহাড়িদের অভিযোগ। সেনাবাহিনীর দৌরাত্ম, সেটেলার বাঙালিদের দাপট ভেঙে দেওয়ার জন্য সশস্ত্র লড়াইও পাহাড়ের মানুষ করেছে। তার কতটা যৌক্তিক, কতটা ফলপ্রসূ সেটা প্রশ্ন সাপেক্ষ। আমাদের আলোচ্য বিষয় সেটা না।

লেখক বিতর্ক এড়িয়ে এমন কিছু বিষয় নিয়ে এসেছেন, যা নিয়ে আলোচনা করা যায়। বিন্তি ঢাকায় এসেছিল পড়াশোনা করতে। কিন্তু এখানে এসে নিজেকে জড়িয়ে নিয়েছে ভিন্ন এক কাজে। নিজের জাতির জন্য লড়াইটা শুরু যে করতে হয়। আর এই লড়াইয়ে অনেককেই পাশে পেয়ে যায় বিন্তি। কিন্তু বিন্তি যেভাবে চিন্তা করে, বাকিদের ভাবনার ধারা অন্যরকম।

বিন্তির মধ্য দিয়ে লেখক পাহাড়ের বর্তমান চিত্র দেখানোর চেষ্টা করেছেন। পাহাড়ের সংঘাত, রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ে অনেকেই অনেক চিন্তিত থাকে। নানান দল, সংগঠন গড়ে ওঠে। তার মধ্যে ঠিক কতজন সঠিকভাবে চিন্তাভাবনা করে? লড়াই করতে হবে, প্রতিবাদ করতে হবে, অধিকার আদায় করতে হবে। সেসব প্রথাগত বাণী হয়তো ঠিকই আছে, কিন্তু এর রূপরেখা কি কেউ আদৌ জানায়? নাকি জ্বালাময়ী বক্তৃতা, কল্পনা চাকমার নাম, বা মানবেন্দ্র লারমা বা সন্তু লারমার নাম নিয়েই এই লড়াই চালিয়ে যেতে চায়। কিন্তু লড়াইটা হবে কীভাবে? নিজেদের অধিকার আদায় করা হবে কীভাবে? প্রশ্ন থেকে যায়।

বিন্তি যে কাজটা করতে পারে, লেখালেখি করতে পারে। তার বেশকিছু আলোচিত লেখা উচ্চপদের মসনদ এমনভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তাকে ধরতে পুলিশ-ডিবি সোচ্চার হয়ে উঠেছিল। কিন্তু তবুও মাথা নোয়ায় নাই বিন্তি। বরং পাহাড়ের মতো উঁচু মস্তকে সবসময় উঁচু থেকেছে। কিন্তু পাহাড়ের মানুষেরা যেভাবে অধিকার আদায়ের সোচ্চার তার কতটা তারা পারবে? বর্তমানে শহুরে সুযোগ-সুবিধা পেয়ে নিজেদের শিকড় ভুলে যাচ্ছে অনেকে। নিজেরা যেখানে ভালো থাকছে সেখানে এত কিছু চিন্তা করে কী লাভ? তবুও কেউ কেউ চিন্তা করে, লড়াই চালিয়ে যায়। বিন্তির মতো মানুষজনেরা নিজেদের জীবন সংশয়ে ফেলে। কখন আবার কল্পনা চাকমার মত অবস্থা হয় কে জানে!

ওয়াসি আহমেদের লেখা দুর্দান্ত। এত সুখপাঠ্য! মায়াময়, ঘোর লাগা লেখনী। পড়তে পড়তে কখন যে ডুবে যাওয়া হয়, তার হিসাব থাকে না। ভাষাশৈলী এক কথায় অসাধারণ। শব্দচয়ন যেন সাহিত্যের অনন্য দিক উন্মুক্ত করে। উপমার ব্যবহার পরিমিত, বর্ণনায় জীবন্ত হয়ে ওঠে গল্প। এমন লেখা টানা পড়লেও বিরক্তি আসে না।

এই বইয়ের চরিত্রগুলোকে লেখক সাজিয়েছেন দারুণভাবে। প্রতিটি চরিত্র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নিজেদের ধরে রেখেছিল। শায়লা থেকে শাহরিয়ার, তিরু থেকে বিন্তি, বিশু থেকে বরুণ! সবাই দুর্দান্ত। কাউকে ফেলে দেওয়ার মতো মনে হয়নি। লেখক যাকে গল্পে এনেছে, তাকেই গুরুত্ব দিয়েছেন বেশ। এখানে সিতারা চরিত্রকে অদ্ভুত লেগেছে। যার চাঁচাছোলা কথা বা আচার ব্যবহার ভালো লাগার কারণ নেই। কিন্তু কিছুক্ষেত্রে তার পারিবারিক ঘটনা সহমর্মিতা জাগায়।

গল্পে প্রেম ছিল, তবে প্রেমের মধ্যে যে পরিমিতভাব প্রয়োজন, তাকে লেখক দারুণভাবে উপস্থাপন করেছেন। ভালোবাসা বোঝাটা গুরুত্বপুর্ণ। এই অনুভব বোঝাতে গিয়ে লেখক অতিরঞ্জিত কোনো বর্ণনার আশ্রয় নেয়নি। যতটা আবেগ প্রয়োজন ছিল, ঠিক ততটাই বইয়ের শোভা বাড়িয়েছে। তাছাড়া বই বইতে চাকমা সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য, মিথ, ধর্ম সম্পর্কে লেখক ধারণা দিয়েছে। কিছু শব্দ, ভাষা, গান, কবিতা স্থান দিয়েছেন। যা উপন্যাসের প্লট বিবেচনায় গুরুত্বপুর্ণ ছিল।

লেখক এই বইটি লিখতে বেশ পরিশ্রম করেছেন। তথ্য উপাত্তের সমন্বয় ঘটিয়েছেন। এমন এক স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন। অনেক কিছুই হয়তো অনেকের মতের বিরুদ্ধে গেলেও যেতে পারে। আবার কিছু ক্ষেত্রে লেখক নিজের ব্যতিক্রম মনোভাব ব্যক্ত করেছেন। আমার মনে হয়েছে লেখক একপাক্ষিক চিন্তা করেননি। বরং দুইপক্ষের ক্ষেত্রেই যুক্তিতর্কের উপস্থাপন করেছেন। মতের অমিল হলেই তো আলোচনার ক্ষেত্র তৈরি হয়।

উপন্যাসের শেষটা কেমন হয়, তার প্রতি একটা আগ্রহ ছিল। যেহেতু দুই সময়কাল সমান্তরালে চলেছে, এর মেলানো নিয়েও একটা সংশয় ছিল। সমাপ্তি যেভাবে হয়েছে, আমার মনে হয়েছে ঠিকই আছে। একটা জীবনের অধ্যায় শেষে আরেকটি গল্পের জন্য প্রতীক্ষা। যেহেতু ইতিহাসের সময়কাল লেখক তুলে এনেছেন, এমন ঘটনাবলী নিয়ে লিখেছেন; যার আসলে শেষ নেই। সমাপ্তি হবে কি না জানা নেই। তাই সমাপ্তির মধ্যে উন্মুক্ত ভাব রেখেছেন। তবে একটা অভিযোগ — লেখক একবার বর্তমান আবার অতীতের বর্ণনা করেছেন, কিন্তু কোনো শিরোনাম দেননি। ফলে প্রথম দিকে ধরতে অসুবিধা হচ্ছিল। পরে যদিও মানিয়ে নিয়েছিলাম।

একটি বড় প্রকাশনী তাদের কাজের মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কার করে। এই বইয়ের প্রোডাকশন কোয়ালিটি অন্যতম সেরা। বাঁধাই, থেকে শুরু করে প্রচ্ছদ, কাগজের মান সবকিছুই দারুণ। যদিও প্রতিটি পৃষ্ঠার চারিপাশে মার্জিনে ফাঁকা জায়গায় পরিমাণ বেশি। নাহলে পৃষ্ঠা সংখ্যা আরো কম হতে পারত। বইয়ে আমি বানান ভুল দেখিনি ব��লেই চলে। সম্পাদনা খুবই দারুণ হয়েছে। প্রুফ রিডিংও যথাযথ। এই কারণে এই ধরনের এলিট প্রকাশনীর বই পড়তে গিয়ে একপ্রকার স্বস্তি পাওয়া যায়। তাদের কাজের মানই অন্যরকম।

পরিশেষে, পাহাড় এক অনিশ্চয়তার গল্প বলে। যে গল্পের শুরু হয়েছিল আরও আগে। ভেসে গিয়েছিল কত মানুষের স্বপ্ন। সেখান থেকে কেউ কেউ ঘুরে দাঁড়িয়েছে, কেউ আবার হারিয়েছে বিস্মৃতির অতলে। কিন্তু পাহাড় টিকে রয়েছে কতকিছুর সাক্ষী হয়ে। কত হাঙ্গামা, রক্তের রঙে, ভেসে যাওয়া জীবন! সুদূর পাহাড় থেকে সমতলে, এর আঁচ যখন লাগে তখন মসনদে নড়ে চড়ে বসে হবে। কল্পনা চাকমা থেকে বিন্তি, সত্যমিথ্যার বিভেদে কত রং-মশালের আলোড়ন সৃষ্টি হয়! এর শেষটা হবে কোথায়?

▪️বই : কার্পাসমহল
▪️লেখক : ওয়াসি আহমেদ
▪️প্রকাশনী : কথাপ্রকাশ
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫
Profile Image for Md Abdul Kayem.
190 reviews3 followers
March 3, 2026
রাঙ্গামাটির ঝগড়াবিল আদামে পরিমচান চাকমা ও অরুণার এক ভরাট সংসার। দুই ছেলে রবি ও অভিকে নিয়ে তাদের ভবিষ্যৎ স্বপ্ন। বাবা-মায়ের মতো দেখতে না হলেও একমাত্র মেয়ে তিরুতমাও ছিল বাবার চোখের মণি, যদিও তার গায়ের রঙ ও গড়ন নিয়ে মা অরুণার চিন্তার শেষ ছিল না। তিরুতমার অবশ্য সেদিকে খেয়াল নেই, সারাদিন সারা আদাম জুড়ে সে হৈহল্লা করে ছুটে বেড়াতো। একদিন চঞ্চল তিরুর জীবনে দেখা দেয় বিশু, তিরু অন্ধকারে আঘাত পেলে বিশু তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেয়, সেই থেকে ঘটনাক্রমে বিশু তার বাবার কাজেও সাহায্যে জড়িয়ে পড়ে। বিশু একসময় তিরুর জীবনের এমন এক আশ্রয় হয়ে উঠে, যাকে ছাড়া সে কিছুই ভাবতে পারত না।

পরিমচানের গৃহস্থ পরিবারটি তাদের পৈতৃক ভিটে আর উর্বর জমিতে সুখেই দিন কাটাচ্ছিল। এই শান্ত জীবনে অশান্তির মেঘ হয়ে আসে কাপ্তাই বাঁধের খবর। পরিমচান প্রথমে এসব বিশ্বাস করতে চাননি, কারণ তার কাছে মনে হয়েছে পানির স্রোত আটকে বিদ্যুৎ তৈরি করা অসম্ভব। তবে ধীরে ধীরে যখন দেখা যায় কাপ্তাইয়ে বড় বড় যন্ত্রপাতি বসানো হয়েছে, কয়েকশ বাঙালি মজুর কাজ করতে এসেছে, তখন সংশয় বাড়তে থাকে।

পরিমচানসহ পাহাড়ের মানুষরা ভাবতে শুরু করেন, বাঁধের পানি বাড়লে তাদের ভিটেমাটি, জৌত-জমি সব পানির নিচে তলিয়ে যাবে কি না। যদিও সরকারি লোকজনের কাছ থেকে শোনা যায় যারা জমি হারাবে তারা ক্ষতিপূরণ পাবে। পরিমচানের পুরোনো বর্গাদার সুলেমান ফকিরও এই বাঁধ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বিদ্যুৎ বানাতে গিয়ে হাজার হাজার মানুষকে পথে বসানো কি সরকারের 'মাথা খারাপের' লক্ষণ নয়! পরিমচান মনে মনে প্রার্থনা করেন যেন অন্তত তার ঝগড়াবিল পর্যন্ত পানি না আসে। কিন্তু সবকিছু কী আর মানুষের মনমতো হয়, একটি সাজানো গোছানো পাহাড়ি জনপদে আধুনিক উন্নয়নের নামে যে অনিশ্চয়তা ও বাস্তুচ্যুত হওয়ার আতঙ্ক ঘনিয়ে আসছিল তা একসময় বাস্তব হয়েই ধরা দেয়। বানের জলে সবকিছু ভেসে যায়, ঝগড়াবিলও রক্ষা পায় না। যার সাথে সাথে তিরুও আস্তে আস্তে পাগলাটে হয়ে ওঠে, অদ্ভুত আচরণ শুরু করে সে। পানির ওপর 'জলপরী'র মতো ভেসে সে এক ঘোরের মাঝে তার জন্মভূমি আর বিশুকে খুঁজে বেড়ায়।

বিন্তির শৈশব কেটেছে দাদি তিরুত্তমা চাকমার মুখে শোনা সেই কাপ্তাই বাঁধের বিষাদময় গল্পগুলো শুনে। সেই বাঁধ, যা এক নিমিষেই তলিয়ে দিয়েছিল হাজারো একর জমি আর অসংখ্য মানুষের ঘরবাড়ি। দাদির সেই হারিয়ে যাওয়া জগতের স্মৃতি আর বর্তমানের ব্যস্ত সময়ের মাঝে বিন্তি সবসময় এক অদ্ভুত যোগসূত্র খুঁজে বেড়ায়।

রাঙামাটির চেনা গণ্ডি পেরিয়ে বিন্তি যখন চট্টগ্রাম কলেজে পড়তে এল, তার সামনে এক নতুন জগত উন্মোচিত হলো। সেখানে সে একা এক পাহাড়ী মেয়ে, যাকে ঘিরে বাঙালি সহপাঠীদের মনে ছিল পর্বতপ্রমাণ কৌতূহল আর নানা ভুল ধারণা। কেউ ভাবত পাহাড়ীরা বুঝি সব কাঁচা মাংস খায়, কেউ বা তাদের জীবনযাত্রা নিয়ে অদ্ভুত সব প্রশ্ন করত। বিন্তি প্রথমে নিজেকে গুটিয়ে নিলেও, তার পাশে এসে দাঁড়াল বরুণ। তঞ্চঙ্গ্যা এই যুবকটি ছিল বিন্তির চেয়ে এক ক্লাসের বড়, শান্ত আর ভীষণ বাস্তববাদী। বরুণ তাকে শিখিয়েছিল গুটিয়ে না থেকে বরং সমতলের মানুষের কাছে পাহাড়ের সত্যটা তুলে ধরা দরকার।

​ধীরে ধীরে সময় গড়াল। বরুণের সাহায্যেই বিন্তি পা রাখল ব্যস্ত শহর ঢাকায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ না হলেও সে ইডেন কলেজে ভর্তি হলো। ঢাকায় এসে বিন্তির জীবনের মোড় ঘুরে গেল। সে দেখল, পাহাড়ের অধিকার নিয়ে কাজ করার মতো অনেক মানুষ আর সংগঠন এখানে আছে। সে যুক্ত হলো 'দিগন্ত' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে, যেখানে মৌসুমী হামিদের তত্ত্বাবধানে সে পাহাড়ী অধিকার নিয়ে সোচ্চার হয়ে উঠে।

​ঢাকায় তার জীবনে এক বড় অবলম্বন হয়ে দেখা দেয় শায়লা চৌধুরী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষকের সাথে বিন্তির বয়সের ব্যবধান থাকলেও তাদের সম্পর্ক হয়ে উঠল গভীর বন্ধুত্বের। শায়লা তাকে নতুনভাবে জগত দেখতে শেখালেন। বিন্তির এই যাত্রা শুধু পড়াশোনা বা চাকরির ছিল না, এটি ছিল পাহাড়ের সেই হারিয়ে যাওয়া দাদির স্মৃতি বুকে নিয়ে সমতলে নিজের অস্তিত্ব আর অধিকার প্রতিষ্ঠা করার এক লড়াই। বিন্তি বুঝে নেয়, পাহাড় আর সমতলের মধ্যে যে মানসিক দূরত্ব, তা ঘোচাতে হলে তাকে নিজের পায়েই শক্ত হয়ে দাঁড়াতে হবে। আর তার এই গল্পের সঙ্গী হয় শায়লা, যে খুঁড়ে বের করে আনে সেই বাঁধের জন্য বাঁধবাসি হওয়া পরঙিদের গল্প, বাঁধের পানি আসার আগের পাহাড়ি জীবনের গল্প যার সঙ্গী হয় বন্ধু শাহরিয়ার।

কার্পাসমহল, এমন এক গল্প যে গল্পের দুই প্রান্তে দাড়িয়ে আছে দুটো চরিত্র, একজনের নাম তিরু, তিরুতমা চাকমা আর আরেক প্রান্তে দাড়িয়ে আছে, বিন্তি ওরফে বিনীতা চাকমা। একই পরিবারের এই দুই প্রজন্মের মাঝখানে সময়ের সাক্ষী হয়ে এখনো দাড়িয়ে আছে একটা বাঁধ, কাপ্তাই বাঁধ। যে বাঁধ ঘরে ঘরে আলো বয়ে আনলেও আবার ঠিকই কেড়ে নিয়েছে অনেকের নিজস্ব ভিটেমাটি, করেছে এক আঁধার সংগ্রামের পদযাত্রী, যে পথের গল্পের অনেক অংশই পৌঁছেনি সমতলে। পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ের বাঁকে বাঁকে আজও প্রতিধ্বনি হয় সে গল্পের আর্তনাদের শব্দ।

এই গল্প পড়লেই মনে হবে দুটো সময়ে দাড়িয়ে থাকা দুটো চরিত্র তিরুতমা ও বিন্তিকে ঘিরেই গল্প আবর্তিত হয়েছে পুরোটা জুরে। কিন্তু গল্প পড়তে পড়তেই উপলব্ধি হয় এই গল্পের মূল উপজীব্য কোনো মানুষ নয়, বরং পুরো কার্পাসমহলের পাহাড়ই এই গল্পের আসল বিষয়বস্তু আর সেই বিষয়বস্তুর খলনায়ক হয়ে দেখা দেয় কাপ্তাই বাঁধ। যে বাঁধ বাস্তুচ্যুত করেছিলো বিশাল সংখ্যক জনগোষ্ঠীকে যেখানে পাহাড়ী যেমন ছিলো, ছিলো বাঙালিও।

গল্পের তিরুতমা চাকমা, তার পরিবার বাঁধ হওয়ার আগের সময়ের পাহাড়ের জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে। সেখানে পাহাড়িদের সুন্দর স্নিগ্ধ জীবন যেমন ফুটে উঠেছে আবার ঠিক একই সমান্তরালে তিরুতমা আর বিশুর মধ্যকার এক অদ্ভুত ভালোবাসার টানের গল্পও উঠে এসেছে। সেই সাথে যোগ হয়েছে কাপ্তাই বাঁধের ফলে বাস্তুহারা হওয়া পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর দূর্দশার চালচিত্র। আবার একই সাথে লেখক সেই সময়ে বাঁধ নির্মানের সাথে সাথে বাসস্থান হারানো মানুষদের সাথে হওয়া সরকারের পূনর্বাসনের নামে প্রতারণার বিষয়গুলোও লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। তুলে এনেছেন ভানবাসি হয়ে প্রকৃতির সাথে লড়াই করা পাহাড়ি আর বাঙালিদের সংগ্রামের কথা।

উপন্যাসের আরেকটি প্রধান চরিত্র বিন্তি চাকমা যে আবার ভিন্ন এক সময়ের ভিন্ন এক রোলে উপন্যাসে অবতীর্ণ হয়, যেখানে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অধিকার আদায় ও তাদের সাথে হওয়া নানান অন্যায়কে সমতলসহ সবার নজরে আনার জন্য সচেষ্ট হয়ে উঠা এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠে সে। যার সংগ্রামী জীবনের গল্পের সাথে মিশে যায় বরুণ নামক এক তঞ্চঙ্গ্যা তরুণও, আছে সিতারা, শায়লা চৌধুরী, মৌসুমি হামিদ কিংবা শাহরিয়ার। প্রতিটি চরিত্রই গল্পের স্ব স্ব জায়গায় এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে গল্পকে পূর্ণতা দিয়েছে।

লেখকের গল্প বর্ণনা বেশ প্রশংসা করতে হয়, সহজ সাবলীল, পরিমিত, মেদহীন। প্রতিটি জায়গায় ততটুকুই লিখেছেন যতটুকু লেখা দরকার। পাহাড় নিয়ে লিখতে গিয়ে ভেবেছিলাম রাজনৈতিক আর সহিংসতার নানান ইতিহাসের ভারে গল্প চাপা পড়ে যাবে। কিন্তু পড়তে গিয়ে খেয়াল করি লেখক পাহাড়ের এসব বিষয়গুলো বেশ চমৎকার ভাবে গল্পের সাথে মানানসই করে উপস্থাপন করেছেন। সাথে প্রতিটি চরিত্রদের মাধ্যমে একই বিষয়ের ভিন্ন ভিন্ন যে দৃষ্টিভঙ্গি লেখক উপস্থাপন করেছেন তা সত্যিই আমাকে মুগ্ধ করেছে। সেই সব বিষয়গুলোয় পাহাড়ি আর সমতলের সবার মতামতকেই লেখক গল্পে গল্পে ধরা দিয়েছেন উপন্যাসে। যা অনেক বিষয়ে পাঠকের ধারণা বদলালেও বদলে দিতে পারে।

এই গল্পের পাশাপাশি স্থান পেয়েছি পাহাড়ের রাজনীতি, নানান সংগঠন এবং কী কল্পনা চাকমার কথাও। সমতলের মিলিটারি আর পাহাড়ের মিলিটারির আচরণ, আর পাহাড়ে নানান সব সংঘাত জিয়ে রাখার জন্য ���ুই পক্ষেরই নানান বিষয় আশয় গল্পের ছলে লেখক উপস্থাপন করেছেন, দিয়েছেন বাঙালি পাহাড়ি দুই দিকেরই নানান দৃষ্টিভঙ্গিতে নানান মতামত। আর এই পাহাড়ের রাজনীতি, শোষণের রেশ লেখক রেখে গিয়েছেন গল্পের শেষ প্রান্তেও।

গল্পে এসব ছাড়াও পাহাড়ী জীবন, খাদ্যাভাস, পাহাড়ি মিথসহ প্রেমও স্থান পেয়েছে। সেই প্রেম লেখক খুবই সুন্দর, স্নিগ্ধভাবে উপস্থাপন করেছেন৷ যে প্রেমও পাঠককে মুগ্ধ করবে। এবং কী অনেক জায়গায় পাহাড়ি শব্দের আনাগোনা ছিলো চোখে পড়ার মতো, সাথে নানান ছড়া, স্লোক কিংবা গানের ব্যবহার তো আছেই।

গল্পের সিতারা চরিত্রটা এক সময় বলেছিলো, পাহাড় রঙ বদলায়, ক্ষণে ক্ষণে নতুন নতুন রঙ ধারণ করে সে। বইটির প্রচ্ছদকার সব্যসাচী হাজরা সেই উক্তিরই যেন বাস্তব প্রয়োগ করেছেন প্রচ্ছদে। যেখানে প্রতিটি ধাপে এক একটা গল্প লুকিয়ে আছে, যা জানতে হলে উল্টোতে হবে বইয়ের পাতা। বইটির সম্পাদনার বেশ প্রশংসা করতে হয়, বানান, প্রোডাকশন কোনোকিছুরই কমতি ছিলো না সেখানে, যাকে বলে সবদিক দিয়েই সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে উত্রে গিয়েছে।
Profile Image for Saima  Taher  Shovon.
530 reviews202 followers
December 14, 2025
আরেকটা কথা বলে রাখি। আমি আমার ভালো না লাগা বইগুলো কাউকে না পড়তে উৎসাহ দেইনা। কারণ একেকজনের ইন্টারপ্রেট করার ক্ষমতা, চিন্তাশক্তি একেকরকম৷ তাই নিজে পায়ের পাতা না ভেজালে পানির অবস্থা বুঝবেন না-আমি এই নীতি মানি। ভালো লাগার বইয়ের ব্যাপারে আমি সবসময়ই বলি। ভালো লাগা বই গুলো নিয়ে আমি কথা বলতে ভালোও বাসি।
এবার থেকে খারাপ লাগার গুলোও বলে যাবে। কারণগুলো অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে। তবে তাতে কিছু আসে যাবেনা। বেশিরভাগ নতুন লেখকদের বাংলা বইয়ে আমি কেমন যেনো শূন্যতা অনুভব করি। বই বেশি ভালো লেগেছে, লেখা আমাকে অন্য জগতে নিয়েছে, তেমন শূন্যতা না। কিছুই খুঁজে পেলাম না ধরনের শূন্যতা।

ভুক্তভোগীদের তুলে ধরেছেন, ক্ষমতার অপব্যবহারের কথা তুলে ধরেছেন, এই বিষয়গুলো ভালো লেগেছে। কিন্তু লেখনী আমার পছন্দ হয়নি। খাপছাড়া ভাবে এগিয়েছে বলে মনে হয়েছে। এটা কী বর্তমান অতীতের মিল ঠিকঠাক করতে পারেননি বলে? নাকি আমার অনুসরণ করতে কষ্ট হলো বলে?
Profile Image for Ronel Barua.
68 reviews6 followers
November 20, 2025
দুই ভিন্ন সময়, দুই ভিন্ন দেশ ও দুই ভিন্ন চরিত্রের জীবনগাথা পাশাপাশি চলতে চলতে মিলিত হয়েছে একই ফলাফলে। বাঁচতে, বাঁচাতে, টিকে থাকতে সব পরিচিত স্থল, স্মৃতি, শেকড় ফেলে মানুষ কীভাবে নতুন কোনো অচেনা অন্ধকারে ছুটে যায়—লেখক সেই অনিশ্চিত বাস্তবকে অসাধারণ ভঙ্গিতে তুলে ধরেছেন।

সমতলের মানুষ যেখানে বংশানুক্রমে বংশ বৃদ্ধি পায়, সেখানে পাহাড়ের মানুষকে বংশানুক্রমেই তাড়িত হতে হয়েছে, কখনো কাপ্তাই বাঁধের অমানবিক নির্মাণে, কখনো সেটেলারের আক্রমণে, কখনো প্রশাসনিক নিষ্ঠুরতায়, কখনো নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে, আবার কখনো তথাকথিত রঙিন মোড়কের কর্দমাক্ত চুক্তিতে।

লেখক পাহাড়ের দীর্ঘ সংগ্রামকে জীবন্ত করে তুলেছেন—বিন্তির প্রতিবাদের মধ্য দিয়ে, শায়লার ভ্রমণ-অনুভবে, সিতারার অভিমানঘন কথোপকথনে, আর রিপনের সেই হৃদয়বিদারক উচ্চারণে—
‘’আমার পরিবারতো হাজার হাজার পরিবারের মতো কাপ্তাই লেকের ভিকটিম, এই লেকের তলানিতে আমার আদি ভিটামাটি, আর এই লেকের পানিতেই আমি ট্যুরিস্ট নিয়ে ঘুরি, ব্যাচ-পিকনিক করে, গান-বাজনাও এ নিয়ে আমার সমস্যা হয় না। আমাকেতো বাঁচতে হবে।কান্নাকাটি আর কত! কেন বার বার বলতে হবে কাপ্তাই বাঁধ আমাদের অশ্রুজল?’’

তিরুত্তমা চাকমার চরিত্র বিশেষভাবে স্পর্শ করেছে; শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত তার অস্তিত্ব-লড়াই যেন পাহাড়ি জীবনের সার্বজনীন আখ্যান। তবে আমার ব্যক্তিগত প্রত্যাশা ছিল পরিমচানের স্বাবলম্বী যাত্রার পাশাপাশি সেই সময়ে সহায়হীন, দীন-দরিদ্র পাহাড়িদের জীবনবৃত্তান্ত কিছুটা আরও বিস্তৃতভাবে দেখার। বিশেষ করে যখন পরিমচান নৌকা ভাড়া করে দেশ ছাড়েননি, বরং অজানা আরেক পাহাড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন—সেই সময়ের অসহায় মানুষেরা কিভাবে ছিলেন, কোথায় ছিলেন তার আরও স্পষ্ট চিত্র পেলে পূর্ণতা পেত।

সবশেষে, কার্পাসমহল আমাকে নতুন করে ভাবিয়েছে—এই অজানা-অচেনা চিরসবুজ পাহাড়, তাকে ঘিরে নির্মিত রাজনীতি, তার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ, এবং পাহাড়বাসীর অবিরাম অনিশ্চয়তা নিয়ে।
প্রশ্ন জাগে,
এই অনিশ্চয়তার অবসান কি কখনো হবে?
নাকি কল্পনা চাকমার মতো করেই বিন্তিও হারিয়ে যাবে মানুষের সৃষ্ট আরেক নির্মম বাস্তবতার অরণ্যে বা জলের গভীরে—যেখানে ইতিমধ্যেই ডুবে আছে হাজারো মানুষের ভিটে, ঘর, সম্পদ, পরিজন আর বনজ সম্পদ!


২১/১১/২০২৫
Profile Image for Hossain Hanif.
15 reviews1 follower
February 1, 2026
উপন্যাসটা নিয়া আমার বিস্তর সমালোচনা আছে। কেউ আগ্রহী হইলে পাঠকের কাঠগড়া থেকে শুনতে পারেন আমার সমালোচনার জায়গাগুলা।
তথ্য দিয়া সংখ্যা দিয়া আপনি মানুষের সাফারিং বুঝতে পারবেন না। মানুষের দুঃখ বেদনা কতটা অসীম এবং অসহ্য তা ফিকশন আমাদের অল্প অল্প বুঝতে সাহায্য করে। সব সমালোচনা বাদ দিয়া যদি বলতে হয়, ওয়াসি আহমেদ কার্পাসমহল লিইখা যেইটা করছেন, পাহাড়িরাও যে মানুষ, ওরাও যে আমাদের মতই, ওদেরও সুখ দুঃখ আছে, স্বপ্ন আছে, আছে প্রেম ঘৃণা, সেইটা আমাদের উপলব্ধি করতে সাহায্য করছেন। আমরা যেন ওদেরকে মানুষ মনে করি, সেইটা উনি বুঝাইতে পারছেন ভালোভাবে। আমাদের পূর্বপুরুষরা যে ওদের উনমানুষ মনে করে ওদের অনুমতির তোয়াক্কা না করে জঘন্য ভয়ঙ্কর কষ্টে ফেলছিল, তা যেন ভুইলা না যাই। এবং ওদের প্রতি যেন বেরহম না হই। জুলুম না করি। মানুষ হিসাবে সম্মান করি।
বাংলাদেশি সাহিত্যের যাত্রায় কার্পাসমহল পাহাড় নিয়া একটা খুব ভালো উপন্যাস হইলেও এইটা ক্ল্যাসিক হয়া ওঠার সম্ভাবনা খুবই কম। পাহাড়-বিষয়ক নারী-প্রধান একটা উপন্যাস হিসাবেই এর মর্যাদা দিতে চায় পাঠকের কাঠগড়া। এতদিন বাংলাদেশি সাহিত্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম নিয়া যে শূন্যতা ছিল তা অনেকটা পূরণ করবে ওয়াসি আহমেদের কার্পাসমহল।
Profile Image for Parvez Alam.
310 reviews12 followers
February 5, 2026
লেখকের "তলকুঠুরির গান" বইটা পড়ে যে মজা পেয়েছিলাম এইটা পড়ে তেমন ভালো লাগে নাই। লেখাটা গল্প কেমন যে খাপ ছাড়া। বইটা মূলত কাপ্তাই বাঁধ হবার পরে ঐখানে প্লাবন নিয়ে। কিন্তু গল্পের ফ্লো তেমন ভালো লাগে নাই।
Displaying 1 - 11 of 11 reviews

Can't find what you're looking for?

Get help and learn more about the design.