কলকাতায় সিরিয়াল কিলার মানেই স্টোনম্যান। ভারী পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে তেরোটা খুনের পরেও অধরা স্টোনম্যানের মহিমায় কলকাতার সিরিয়াল কিলারের ইতিহাসটাই ধামাচাপা পড়ে। নতুন করে খোদাই-খনন করতেই বেরিয়ে আসে ত্রৈলোক্যতারিণী। কলকাতার প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার। একটা নয়, দুটো নয়, সোনাগাছির উর্বশী রূপজীবী ত্রৈলোক্যতারিণী পর পর পাঁচ তরুণী গণিকাকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। এই গ্রন্থ আঠেরোশো শতাব্দীর কলকাতার সেই ক্রাইম কাহিনি যার পরতে পরতে ঠাঁই খুঁজে নিয়েছে প্রাচীন কলকাতার কুলীন কীর্তিকাহিনি, বেশ্যা কলাকৃতির চর্চাপদ, বাবু কালচারের দিগ্্দর্শন আর দেশ-বিদেশের সিরিয়াল কিলারদের গা-ছমছমে হত্যাকথা। ফিকশনের ছাঁচে নন-ফিকশনের ইনফিউশন।
লন্ডনের কুখ্যাত ‘জ্যাক দ্য রিপার’-এর আতঙ্কেরও বছর আটেক আগে, কলকাতার বুকে ঘটে গিয়েছিল এক নৃশংস ধারাবাহিক হত্যাকাণ্ড। সেই অলক্ষিত রক্তক্ষরণের নেপথ্যে ছিল ত্রৈলোক্যতারিণী, যাকে বলা হয় বাংলার প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার। ইতিহাসের সেই ধুলোচাপা অধ্যায়কেই 'কলকাতার প্রথম সিরিয়াল কিলার’ বইয়ে উপন্যাসের আদলে পাঠকদের সামনে হাজির করেছেন লেখক সুজিত রায়।
শৈশবে কুলীনপ্রথার বলি হয়ে মাত্র তেরো বছর বয়সে এক ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধের সাথে বিয়ে হয়েছিল ত্রৈলোক্যের। অকালবৈধব্যের পর এক প্রেমিকের হাত ধরে শহর কলকাতায় পা রাখলেও কপালে জোটেনি ঘর; ঠাঁই হয়েছিল সোনাগাছির নিষিদ্ধপল্লির অন্ধকার গলিতে। সেই নরককুণ্ডেই বেঁচে থাকার তাগিদে এবং নিছক সোনার গয়নার লোভে সে বেছে নেয় অপরাধের এক ভয়ঙ্কর পথ। একের পর এক রহস্যময় মৃত্যু কলকাতার পুলিশকে ধাঁধায় ফেলে দিয়েছিল। অবশেষে তৎকালীন দিকপাল দারোগা তথা ঔপন্যাসিক প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের এক চতুর মনস্তাত্ত্বিক ফাঁদে ধরা পড়ে ত্রৈলোক্য। ১৮৮৪ সালে অবসান ঘটে এই রক্তমাখা অধ্যায়ের।
অপরাধকাহিনী হলেও এই বইয়ের মূল ভাবনা বেশ সুদূরবিস্তৃত। সমাজের এক প্রান্তিক নারী যখন নিজের চেয়েও অসহায় ও প্রান্তিক নারীদের শিকার বানায়, তখন সেই মনস্তত্ত্ব পাঠককে আলোড়িত করে। লেখক এই সত্য ঘটনাকে ফিকশনের রূপ দিতে গিয়ে উনিশ শতকের কলকাতার এক অদ্ভুত অন্ধকারাচ্ছন্ন রূপ তুলে ধরেছেন। সে আমলের বাবু কালচার ও কুলীনপ্রথার পাশাপাশি তৎকালীন গণিকাদের মানবেতর জীবনযাপন, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বেঁচে থাকার লড়াইয়ের এক বাস্তব দলিল ফুটে উঠেছে এখানে।
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের বিখ্যাত 'দারোগার দপ্তর'-এর ৭৮ নম্বর ভুক্তিতে প্রথম এই রোমাঞ্চকর কেসটি লিপিবদ্ধ হয়েছিল। পরবর্তীতে দেবারতি মুখোপাধ্যায়ের 'বাবু ও বারবনিতা' উপন্যাসেও এর বিস্তারিত উল্লেখ মেলে। এমনকি ওটিটি প্ল্যাটফর্মে 'গণশত্রু: বাংলার আতঙ্ক' ওয়েব সিরিজের একটি পর্বেও এই ত্রৈলোক্যতারিণীর চরিত্রটি উঠে এসেছে। তবে ফিকশনের আদলে লেখা সবচেয়ে তথ্যবহুল বই হিসেবে সুজিত রায়ের এই সৃষ্টিকেই বেছে নিতে হবে।
যদিও অতিরিক্ত তথ্যের ভারে গল্পের গতি মাঝে মাঝে কিছুটা শ্লথ হয়েছে। কিছুক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ইতিহাস থেকে সরে গিয়ে অন্য প্রসঙ্গে এত বেশি বিবরণ দেওয়া হয়েছে যে কাহিনীর মূল রহস্যের আবহ কিছুটা খেই হারিয়ে ফেলে। এমনকি ত্রৈলোক্যতারিণীর মানসিক বিবর্তন এবং গল্পের শেষ অংশে এসে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের তদন্ত প্রক্রিয়া বেশ তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে, যা আরও একটু বিস্তারিত দেখানোর সুযোগ ছিল।
এই খামতিটুকু বাদ দিলে, ফিকশনের আদলে একটা সত্য ঘটনাকে নিখুঁতভাবে পুনর্নির্মাণ করতে লেখক যে শ্রম দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। ত্রৈলোক্যতারিণীর এই রূপ শুধু অপরাধের ইতিহাস নয়। তৎকালীন সমাজের বাল্যবিবাহ, কুলীনপ্রথা এবং সামাজিক নিষ্ঠুরতার এক নির্মম প্রতিফলনের এক অনবদ্য দলিল বলা যায় এই কাহিনীকে। সমাজ যাকে অবহেলায় অন্ধকার গলিতে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছিল, সেখান থেকেই জন্ম নিয়েছিল বাংলার প্রথম মহিলা সিরিয়াল কিলার।
The story sometimes gets lost under too much extra information and the main plot fades when unnecessary details keep appearing. But whenever the book returns to its true path, it becomes really powerful. The main storyline is strong and writing a story like this is not easy at all. I finished it in one sitting. The opening beautifully shows the India of that time and Priyonath’s entrance literally gave me goosebumps. It often feels like many great writers shaped their characters from real people of our South Asian subcontinent. (3.5/5)
যতটা এক্সপেকটেশন নিয়ে পড়া শুরু করেছিলাম ততটা পূরণ হয় নি।কিছু জায়গায় অতিরিক্ত ইনফরমেশন দেওয়া হয়েছে বলে মনে হয়েছে আমার।তবে সবকিছু মিলিয়ে একবার পড়া যায়।
সত্যি বলতে আশাহত হয়েছি, অনেক এক্সপেকটেশন ছিল তাই হয়তো। মোটামুটি বইটি মন্দ নয়, তবে আর একটু ঘটনার বর্ণনা দরকার ছিল, তথ্যের পরিমাণ কমানো দরকার ছিলো। এই তথ্য গুলো আহামরি বিশেষ কিছু নয় অনেকেই জানে। তাঁর চেয়ে কালীবাবুর সাথে প্রথম সাক্ষাৎ, খুন গুলোর আরো গা ছম ছম টাইপ বর্ণনা পেলে ভালো হতো, সর্বশেষ বলা যায়, বইটি একটি ঠান্ডা হয়ে যাওয়া বিরিয়ানির মতো
বইয়ের প্রচ্ছদ খুবই ভালো লাগায় কিনে পড়া শুরু করেছিলাম। সাবজেক্টটি খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল; তার ওপর যেহেতু সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেখা, তাই এক্সপেক্টেশন অনেকটাই বেশি ছিল। কিন্তু কাহিনীর গঠন ও বর্ণনার মাঝে তথ্য দেওয়ার অতিরিক্ত প্রচেষ্টা বইটিকে স্লো করে দিয়েছে এবং কিছু অংশে কিছুটা বিরক্তিকরও করে তুলেছে। তথ্যগুলো বইয়ের শেষে আলাদা করে দিলে পড়তে ভালো লাগত এবং গল্পের ফ্লো-ও নষ্ট হতো না।
জ্যাক দ্য রিপারেরও আগে এই উপমহাদেশে একজন সিরিয়াল কিলার ছিল—যে কিনা একদিকে ছিল নারী, তার ওপর নিজে গণিকা হওয়া সত্ত্বেও তার মূল লক্ষ্য ছিল অন্য গণিকারা। সেই সিরিয়াল কিলারের নাম ছিল ত্রৈলোক্যতারিণী। জ্যাক দ্য রিপারেরও ৮ বছর আগে, উনিশ শতকে এই গণিকা নারীটি ব্রিটিশ পুলিশকে এমন ধোঁয়াটে অবস্থায় রেখেছিল যে, তারা বুঝতেই পারেনি এই নারীরা খুন হয়েছেন নাকি আত্মহত্যা করেছেন! অবশ্য সাধারণ সিরিয়াল কিলারদের মানসিক খোরাকের চেয়ে ত্রৈলোক্যতারিণীর চাহিদা ছিল টাকা-পয়সা জোগাড়ের প্রচেষ্টা।
কাহিনীর শুরু আগ্রহ সৃষ্টি করার মতো হলেও অতি দ্রুত গল্পের গতি ও গঠনে দুর্বলতা প্রকাশ পায়। ছোট ত্রৈলোক্যতারিণীর জন্য কষ্ট লাগলেও, তার বড় হয়ে ওঠার যাত্রার ইমোশন বা আবেগটা দুর্বল হয়ে গেছে। বইটিতে ত্রৈলোক্যতারিণীর চেয়ে কালিবাবুর বিভীষিকাই বেশি ফিল হয়েছে। আর সবচেয়ে দুর্বল অংশ লেগেছে ত্রৈলোক্যতারিণীর ধরা পড়ার পর্বটি, বড্ড বেশি তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে। আমার কাছে মনে হয়েছে, এই কাহিনী খুনি ত্রৈলোক্যতারিণী ও দারোগা প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়ের দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করে সাজালে বেশি সুন্দর হতো এবং রোমাঞ্চকর আমেজ আসতো।
এই বইটা আমার কাছে নন-ফিকশনই লাগলো। ফিকশনালভাবে লেখা হয়ে হয়েছে। অনেক কিছু জানা গেছে৷ গণিকাদের দিয়ে তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীদের অবহেলার দিকটা বারবার চলে আসছে। কৌলিণ্য প্রথা, জাতিভেদ কিভাবে মেয়েদের নারী হয়ে উঠার আগেই বিধবা বানিয়ে দিতো এই বিষয়টা নিয়ে তথ্যনির্ভর লেখা আছে। বইয়ের নাম দেখে শুরু থেকেই থ্রিলারের স্বাদ নিতে চাইলে যেকেউ ভুল করবে। গণিকাপল্লি, গণিকাদের অবস্থা, গণিকারা কিভাবে গণিকা হয়?, হিন্দু সমাজের কুসংস্কার ইত্যাদি নিয়ে অনেক বর্ণনা আছে শুরুতে। এই ধারাবাহিকতায় অনেক পরেই হত্যার বিবরণগুলো আসে।
হত্যাগুলোকে নিছক হত্যা না ভেবে, হত্যাকারী ত্রিলোক্যতারিণী ওদের 'মুক্তি' দেয়া ভাবার বিষয়টা ইন্টারেস্টিং লেগেছে। এই বই প্রচলিত ফিকশনাল থ্রিলারের মতো না দেখে অনেকের ভালো লাগবে না, কিন্তু আমার কাছে ভালোই লেগেছে। তবে অনেক অনেক বেশি তথ্য আর অনেক কবিতা ছিলো যেগুলোর মর্মার্থ সরাসরি বুঝিনি।
শেষ কথা এটাই তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারীদের অবস্থার একটা বাস্তবচিত্র আছে বইটায়। গল্প আকারে লিখা হলেও বইটা ভালো একটা তথ্যনির্ভর দলিল।
সুজিত রায়ের লেখা ‘কলকাতার প্রথম সিরিয়াল কিলার’ বইটি নিয়ে ট্রু ক্রাইম ঘরানার পাঠকদের মধ্যে স্বভাবতই একটা বড় কিউরিওসিটি ছিল, আর সেই এক্সপেক্টেশন বা বড় আশা নিয়েই বইটি পড়া শুরু করেছিলাম। কলকাতার ইতিহাসের এক অন্ধকার ও রোমাঞ্চকর অধ্যায়কে জানার আগ্রহ ছিল প্রবল। কিন্তু পড়ার পর বলতে বাধ্য হচ্ছি, বইটি আমার আশানুরূপ হয়নি। বইটিতে মূল কেস বা সিরিয়াল কিলিংয়ের রোমাঞ্চকর কাহিনীর চেয়ে অতিরিক্ত তথ্য, অপ্রাসঙ্গিক বিবরণ এবং ইতিহাসের এত বেশি কচকচানি যোগ করা হয়েছে যে, মূল প্লটের যে থ্রিল বা টানটান উত্তেজনা থাকার কথা ছিল, তা অনেকটাই হারিয়ে গেছে। একজন পাঠক হিসেবে আমি যেভাবে গল্পটার গভীরে ডুব দিতে চেয়েছিলাম, অতিরিক্ত তথ্যের ভারে সেই রিডিং ফ্লো বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। লেখক গবেষণার পেছনে খাটনি দিলেও, তথ্যের এই আধিক্য বইটির থ্রিলিং আমেজকে অনেকটাই ম্লান করে দিয়েছে। সব মিলিয়ে এক্সপেক্টেশন পুরোপুরি পূরণ না হওয়ায় এবং কাহিনীর খেই হারিয়ে ফেলার কারণে এই বইটিকে আমি ৫-এর মধ্যে ৩ স্টার দিচ্ছি। যারা কেবলই নিখাদ ক্রাইম থ্রিলার বা টানটান রহস্যের খোঁজে বইটি পড়তে যাবেন, তাদের হয়তো কিছুটা হতাশ হতে হবে।
বাংলা ভাষায় গোয়েন্দা /থ্রিলার কাহিনী খুব কম। মানসম্মত আরও কম। কাকাবাবু আর ফেলুদা ভালোলাগার গন্ডি থেকে বের হতে না পারা আমার আপ টু দা মার্ক না হলে কিছুই ভালো লাগে না। অনেকবছর পর একটা বাংলা বই থ্রিলার ঘরনার বই পড়ে এতো ভালো লাগলো
হাতে অফুরন্ত সময় না থাকলে সাজেস্ট করবো না। লেখক অনেক হাবিজাবি তথ্য দিয়ে বই ভরে রেখেছে,বেশ্যাখানার সৃষ্টি নিয়েই সম্ভবত ২০ পৃষ্ঠা লিখে রেখেছে আর বানান ভুলের সংখ্যাটাও অনেক. কাহিনিকে এতো বেশি exaggerate না করলেও পারতেন লেখক