১৫৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাস। লন্ডন শহরে মাত্র তিরিশ হাজার একশ তেত্রিশ (৩০,১৩৩) পাউন্ড চাঁদা তুলে প্রতিষ্ঠিত হলো ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। জন্মের ১৫৮ বছর পর, ১৭৫৭-য় এই বাংলার পলাশীর প্রান্তরে মাত্র কয়েক ঘণ্টার একটা যুদ্ধে জয়লাভ করে পৃথিবীর বৃহত্তম অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যটি গ্রাস করার জন্য হাত বাড়িয়েছিল তারাই।
পলাশী যুদ্ধের পরের প্রায় ২০০ বছরে জবরদখলকৃত সেই সাম্রাজ্য থেকে বিলেতে পাচার হয়ে যায় প্রায় ৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থ-সম্পদ। মানব ইতিহাসের সর্বকালের সর্ববৃহৎ এই লুটপাটের প্রাথমিক সূত্রপাত ঘটেছিল ইংল্যান্ডের সম্রাজ্ঞী প্রথম এলিজাবেথের আমল থেকে। যিনি তাঁর পোষ্য জলদস্যুদের নিজের জাহাজ ধার দিতেন, যাতে করে তারা নির্বিঘ্নে সাগর পাড়ি দিয়ে অভিযান চালাতে পারে; এমনকি রাজকীয় ‘স্যার’ উপাধিও দিয়েছিলেন কোনো কোনো ‘সফল’ জলদস্যুকে। বিনিময়ে লাভও কম ছিল না, কড়ায়-গন্ডায় মহারানি বুঝে নিতেন অর্ধেক লুটের ভাগ।
রানি প্রথম এলিজাবেথের যুগ থেকে পলাশীর যুদ্ধ পর্যন্ত যেসব অভূতপূর্ব ঘটনার যোগফল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে কর্পোরেট শক্তি থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিতে পরিণত করেছিল, ‘রাজকীয় জলদস্যু বণিক সমিতি’ বইয়ে সেই সব অজানা ঘটনারই সাবলীল বিবরণ মিলবে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ইতিহাসের পেছনে লুকিয়ে থাকা এসব ঘটনা মোটেও গল্প নয়-অথচ রোমাঞ্চকাহিনির মতোই জমজমাট, বিস্ময়জাগানিয়া।
ব্রিটিশেরা গর্ব করে বলত তাদের সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো অস্ত যায়না। কিন্তু তাদের এই সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাস যে আদতে গৌরবময় কিছু নয় তা আজ মোটামুটি সবারই জানা। জলদস্যুতার মাধ্যমে তাদের উত্থান এবং ভারতবর্ষে উপনিবেশের মাধ্যমে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডাকাতির গল্প ধারাবাহিকভাবে বর্ণনার চেষ্টা করেছেন লেখক।
ষোড়শ শতক অব্দি পৃথিবীর অধিকাংশ সমুদ্রপথগুলোতে আধিপত্য বিস্তার করত স্প্যানিশ এবং পর্তুগিজ জাহাজগুলো। ব্রিটিশরা এই সমরে পাল্লা দেয়া শুরু করে প্রথম এলিজাবেথের সময় থেকে। তাই বই শুরু হয়েছে তার সিংহাসনে আরোহণের চমকপ্রদ বর্ণনা দিয়ে। প্রসঙ্গক্রমে কিছুটা পিছিয়ে গিয়ে তার বাবা রাজা অষ্টম হেনরির সমালোচিত বিয়েগুলো নিয়ে বর্ণনা শুরু করেছেন। এরপর ধারাবাহিকভাবে এসেছেন এলিজাবেথের রাণী হওয়ার গল্পে। স্বল্পাকারে বর্ণিত হলেও রাজ পরিবারের এসব অদ্ভুত গল্প বেশ মুখরোচক!
এলিজাবেথ রাণী হওয়ার পর যতোটা না নিজ দক্ষতায় নৌশক্তির ক্ষমতা বাড়িয়েছিলেন তার চেয়ে বেশি পেয়েছিলেন ভাগ্যের সুপ্রসন্নতা। বস্তুত তৎকালীন ব্রিটিশ নৌশক্তি এবং অর্থনীতি এতোটাই দুর্বল ছিলো যে তাদের পক্ষে স্প্যানিশ এবং পর্তুগীজদের সঙ্গে লড়াই করে বাণিজ্য করার সামর্থ্য ছিলোনা। তাই শুরুতে তারা বেছে নেয় জলদস্যুতার পথ। এক্ষেত্রে অবশ্য রাণীর প্রচ্ছন্ন সমর্থন ছিলো। এরপরই ফ্রান্সিস ড্রেক, রালফ ফিচ এবং মাদ্রে দে দিয়াসের সাড়া জাগানো ঘটনার কল্যাণে তাদের নৌবাণিজ্যের পথ সুগম হয়। এই ঘটনাগুলো আমার চোখে এই বইয়ের সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক এবং উপভোগ্য অংশ। বিশেষ করে ফ্রান্সিস ড্রেকের দুর্ধর্ষ অভিযানের বর্ণনাগুলো বেশ রোমাঞ্চকর লেগেছে।
বইয়ের শেষ অংশে আছে ব্রিটিশদের ভারতবর্ষে উপনিবেশ স্থাপনের মাধ্যমে লুটপাটের কথা। প্রায় দুশো বছরে ভারতবর্ষের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে ব্রিটিশদের নিজেদের কোষাগার সমৃদ্ধ করার বর্ণনা দিয়েছেন এখানে। তাদের এই লুটপাটকে লেখক আখ্যা দিয়েছেন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ডাকাতি হিসেবে!
হারুন রশীদ “উপনিবেশ চট্টগ্রাম” থেকে শুরু করে এই বই অব্দি একটি অভিন্ন ব্যাপার মেনে চলেছেন। তার সবগুলো বইতেই কোনো না কোনোভাবে ব্রিটিশ উপনিবেশ জড়িত। তার ধারাবাহিক ইতিহাস বর্ণনার চমৎকার গুণ এবং এই বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করার সুবাদে বই প্রকাশের আগেই ভালো কিছু আশা করছিলাম। ঠিক হতাশও হতে হয়নি। পড়ে আনন্দ পেয়েছি। তবে বইতে অনেকগুলো বিষয় থাকায় আমার মনে হয়েছে বইটা কলেবরে আরো বড় হওয়া প্রয়োজন ছিল। কারণ বেশকিছু অংশেই লেখকের তাড়াহুড়ো এবং ক্রমাগত সংক্ষেপিত করার প্রবণতা চোখে পড়েছে। (৩.৫/৫)
নৌবাহিনী একটা ট্র্যাডিশনাল কমিউনিটি। বর্তমান সময়ে প্রচলিত প্রায় প্রতিটা প্র্যাকটিস, রীতি নীতি, কায়দাকানুনের একেকটা ইতিহাস আছে। এক্ষেত্রে পেশাদার রাজকীয় নাবিকদের শিষ্টাচার যেভাবে ইতিহাসে স্থান পেয়ে বর্তমানেও প্রচলিত আছে, একই সাথে জলদস্যুদের নানা কিম্ভূতকিমাকার আদব কেতাও টিকে গেছে কালের বিবর্তনে। এই পেশার সাথে ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা থাকায় এই জলদস্যু বনাম পেশাদার রাজকীয় নাবিক - দুই ভিন্নধর্মী ঘরানার ভূত কিভাবে এক বোতলে বন্দী হলো, এই প্রশ্নটা অনেকদিন ধরেই ছিল। এই বইতে সেটা দূর হলো।
বইটা লেখক শুরু করেছেন ইংরেজ সাম্রাজ্যের শাসকের আখ্যান দিয়ে। পাগলা রাজার পর কিভাবে প্রথম এলিজাবেথ নিয়তির টানে সিংহাসনে উঠলেন, সেই কাহিনী খুবই মজার। এরপর নতুন দেশ আবিষ্কারের সময়ে পর্তুগীজ আর স্প্যানিশ নৌবাহিনী কিভাবে সারা পৃথিবীর নৌপথের দখলে ছিল, সেই ধারণা পেলাম।
এরপর আসল কাহিনীতে প্রবেশ। প্রথমে বেনিয়ারা দেখলো, নিজেদের দেশে ব্যবসা করার চেয়ে বাইরের দেশে বাণিজ্য করার রিটার্ন অন ইনভেস্টমেন্ট প্রায় কয়েকশো গুণের মতো বেশি। কিন্তু তারা সাগর পেরিয়ে বিশ্ব অভিযানে যাবার মতো অবস্থাপন্ন ছিল না, থ্যাংকস টু ইংল্যান্ডের বেহাল অর্থনীতি। কূটনামি বুদ্ধি শুরু: পর্তুগীজ আর স্প্যানিশ জাহাজ লুটপাট ওরফে এন্টার দি জলদস্যুবৃত্তি। মহারাণী দেখলেন, লাভ তো ভালোই হচ্ছে, কিন্তু তাই বলে তিনি তো আর দস্যুদের পৃষ্ঠপোষক হতে পারেন না, কি করা? বুদ্ধি: দস্যুদের "প্রাইভটিয়ার" নাম দিয়ে রাজকীয় স্বীকৃতি দেয়া হলো। (মানে জলদস্যুরাই রাজকীয় নাবিকে রূপান্তরিত হলো) অবশ্য রাণীর হস্তে মোটা অংকের লভ্যাংশ ঢোকার পথে সুগম করতেই এই বুদ্ধি। তবে প্রাইভেটিয়ার ফ্রান্সিস ড্রেক, রালফ ফিচ প্রমুখ নাবিকদের কিংবদন্তীতুল্য অভিযানগুলোর ফিরিস্তি পড়তে গিয়ে ভালো লেগেছে খুব। এই অংশের সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছে একটা বিষয় জেনে: উনারা যাঁরা অভিযানে যেতেন, অনেকটা ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিতেন ভবিষ্যতকে।ঝড় আসবে? আসুক, শত্রুপক্ষের হামলা হবে? হোক, নতুন জায়গা আবিষ্কারের মাঝে কিছু জায়গায় যেমন বন্দী করা হয়েছে, অস্ত্র নিয়ে স্থানীয়রা ধেয়ে এসেছে তাঁদের দিকে, আবার কিছু এলাকায় মানুষ তাঁদের দেবতা ভেবে পূজা করেছে - বিস্ময়কর সব ঘটনা!!!
তারপর আমরা দি নটোরিয়াস ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জন্ম ও বেড়ে ওঠা দেখবো। মাত্র পনেরো বছরের বাণিজ্য করার চুক্তি দিয়ে শুরু করে কিভাবে তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত করার পথ সুগম করেছে তার আদ্যোপান্ত জানতে পারলাম। (এই অংশটা আরো বিস্তৃত হবার অবকাশ ছিল মনে করি)। মোগল সাম্রাজ্যের সূর্য্য অস্তাচলে যাবার প্রাক্কালে স্থানীয় দুর্নীতিবাজ বুর্জোয়া গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র আর নিজেদের কূটচালের ফলে ধুরন্ধর এই গোষ্ঠী উপমহাদেশে শক্ত অবস্থান নিতে থাকে। পাশাপাশি অন্যান্য ইউরোপিয়ান পরাশক্তিদের দূরদৃষ্টির অভাব আর ভাগ্যের ডাউনফলও ইংরেজদের অনেক সহায়তা করেছে। এই অংশে ব্যথিত হয়েছি জেনে, আমরা জাতিগতভাবে কতোটা ক্লিনিক্যাল দুর্নীতিবাজ। ইংরেজদের চিঠি আর ঐতিহাসিক দলিলগুলো তাদের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক লাভের (লুটতরাজ) পাশাপাশি আমাদের এই অঞ্চলের ক্ষয়িষ্ণু প্রাচুর্য্য আর মানুষদের শঠতা নগ্নভাবে তুলে ধরেছে।
বইটা শেষ হয়েছে দুইশো বছরে ঠিক কতোটা সম্পদ পাচার হয়েছে তার ফিরিস্তি দিয়ে। কষ্টদায়ক বর্ণনা, তবে ব্যবসায় প্রশাসনের ছাত্র হিসেবে বলতে হয়: "what an idea sir ji"
লেখকের বর্ণনাশৈলী খুবই মনোরম। পড়তে মজা। নন ফিকশন হতে চেয়েও বইটা গল্পের মতোই জমজমাট থেকে গেছে পুরোটা সময়।
বইটা প্রকাশের পরপরই পড়ার অপেক্ষায় ছিলাম। অবশেষে হাতে পাওয়ার সাথে সাথেই এক বসায় শেষ করে ফেললাম!
বইটা মূলতঃ ইংরেজদের জলদস্যুতা কেন্দ্রিক ব্যবসা নিয়ে লিখিত। রাণী এলিজাবেথ যে ফ্রান্সিস ড্রেকের মতো জলদস্যুর পৃষ্ঠপোষক ছিলেন তা জেনে রীতিমতো অবাক লাগলো। এলিজাবেথ কেবলই পৃষ্ঠপোষকতা করেই ক্ষান্ত হননি, রীতিমতো "স্যার" উপাধিতে ভূষিত করেছেন!
মধ্যযুগে সমুদ্রে ছিল পর্তুগীজদের জয়জয়কার। ইংরেজরা মূলতঃ রাণী এলিজাবেথের সময় থেকে দস্যুবৃত্তির মাধ্যমে সমুদ্রে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। পরবর্তীতে তারা এক শক্তিশালী সামুদ্রিক বাহিনী হিসেবে আবির্ভূত হয়। গঠন করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। এরই ধারাবাহিকতায় ইংরেজরা মুঘল সম্রাটের দরবারে হাজির হয়। প্রাথমিকভাবে ব্যর্থ হলেও পরবর্তীতে নানান তৎপরতায় ইংরেজরা ভারতে ব্যবসা করবার সনদ হাসিল করে। এভাবে তাদের হাত ধরে পত্তন হয় মাদ্রাজ (অধুনা চেন্নাই), কোলকাতা পরিপূর্ণতা পায় বোম্বাইয়া অর্থাৎ মুম্বাই।
প্রথম থেকেই ইংরেজদের সামুদ্রিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে বাঁধা ছিল পর্তুগীজরা। ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের সফলভাবে মোকাবিলা করে তারা।
একটা সময় বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা দূর করতে গিয়ে আচমকাই শাসনক্ষমতা পেয়ে বসে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।
রাণী এলিজাবেথের চার্টার জারির সময় থেকে শাসনক্ষমতা লাভের যাত্রাটা চমৎকারভাবে বর্ণনা করেছেন লেখক।
‘রাজকীয় জলদস্যু বণিক সমিতি’ নামটির মধ্যেই এক অদ্ভুত বৈপরীত্য। ‘রাজকীয়তা’র আড়ম্বর আর ‘জলদস্যুতা’র রোমাঞ্চ যেন হাত ধরাধরি করে এগিয়েছে। হারুন রশীদ তাঁর স্বভাবসুলভ তীক্ষ্ণ ইতিহাসবোধ ও কাব্যিক গদ্যের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন সেই সময়কে, যখন সাম্রাজ্যবাদ ছিল কেবল রাজদণ্ডের বলেই নয়, বরং জলদস্যুর তলোয়ারের ধারেই প্রতিষ্ঠিত। বইটির শুরুতেই লেখক আমাদের টেনে নেন ১৬শ শতাব্দীর ইউরোপে—রানী এলিজাবেথের সেই ইংল্যান্ডে, যেখানে ‘ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র জন্ম শুধু বাণিজ্যের জন্য নয়, বরং রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত জলদস্যুতার হাতিয়ার হিসেবে। লেখক দেখিয়েছেন কীভাবে সমুদ্রপথের রক্তক্ষয়ী অভিযান একসময় ব্যবসার নামে সভ্যতার পতাকা হাতে নেয়, এবং কীভাবে সেই জলদস্যুরাই হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যের প্রতিনিধি। হারুন রশীদ ইতিহাসকে কেবল নথির ভেতরে রাখেননি, তিনি তাকে গল্পে পরিণত করেছেন। বইয়ের বর্ণনা কখনও দুঃসাহসিক সমুদ্রযাত্রার মতো উত্তেজনাপূর্ণ, কখনও গভীর রাজনৈতিক বিশ্লেষণের মতো চিন্তাশীল। পর্তুগিজদের অপসারণ, ভারতীয় রাজাদের সঙ্গে চুক্তি, আর শেষে উপনিবেশিক লুণ্ঠনের নির্মম চিত্র—সবকিছুই লেখক এক মায়াময় অথচ শীতল সত্যের ভঙ্গিতে উপস্থাপন করেছেন।