ছেলেরা নেমেছে। মেয়েরা নেমেছে। বাচ্চারা নেমেছে। সাইন্সল্যাবের ফুটওভার ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে কলেজড্রেসপরা একটা ছেলে পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে। চারদিকে টিয়ারশেলের ধোঁয়া। ঘিরে ধরে আছে পুলিশ, কিন্তু কেউ পরোয়া করছে না। সারা দেশে ছয়-সাতজনকে মেরে ফেলেছে। কিন্তু সে-সংখ্যা দিয়ে কিছুই বোঝা যায় না। বহুদিন পর মোবাইলে এতক্ষণ ধরে ভিডিও দেখলাম। অনেক ছেলে আমার ফ্রেন্ডলিস্টে। তাদের স্ট্যাটাস পড়লাম। কী আশ্চর্য, কখন ঘটল এসব? এত সাহস কোথায় লুকিয়ে ছিল?
উঠে গেলাম, পানি খেলাম। রাত দুটার মতো বাজে।
সাধারণত আমি বাসায় সিগারেট খাই না, কিন্তু আজকে বারান্দার দরজা আটকে একটা সিগারেট ধরালাম, ধরিয়েই রাত দুটাতেই নীলিমাকে কল দিলাম। দুই-তিন রিং হতেই একটি রিনরিনে কণ্ঠ ভেসে আসলো, হ্যালো?
কন্ঠটিতে কিছুটা উৎকণ্ঠা, আমি সেই উৎকণ্ঠাকে উড়িয়ে দিয়ে বললাম, এমনিই কল দিলাম।
নীলিমা বলল, বাব্বাহ, সাহস হলো তাহলে।
সিগারেটে টান দিয়ে আমি বললাম, লাশ তার খুনিকে দাবড়িয়ে বেড়াচ্ছে সারা দেশময়, আর আমার একটা কল দেওয়ার সাহস হবে না?
খিলখিল করে হাসল নীলিমা। যেন আসমান থেকে লক্ষ লক্ষ ফুল বৃষ্টির মতো ঝরে পড়তে লাগল বিদ্রোহে ভরা এই জমিনে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে লেখা, স্বভাবতই বাড়তি আগ্রহ ছিলো "ক্যাফে রেভুল্যুশন" নিয়ে। সেই আগ্রহ বইয়ের তিন-চতুর্থাংশ পর্যন্ত জিইয়ে ছিলো। কিন্তু উপসংহারে এসে নায়ক হয়ে গেলো "নিনাদ" বা "প্রেম মৃত্যু প্রার্থনা"র নায়কদের ব্যর্থ অনুকারক মাত্র। পূর্বের দুই উপন্যাসের মূল চরিত্রদের তাও কারণ ছিলো বাঁধাহীন - উদাসীন - বেপরোয়া হতে। এখানে নায়ক রাহাত খুবই সাধারণ একজন মানুষ যার কোনো ইচ্ছা ছিলো না আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার। চারপাশের পরিস্থিতি তাকে সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যোগ দিতে বাধ্য করে। পুরো কাহিনির প্রারম্ভ, বিকাশ, ক্রমপরিণতির সঙ্গে উপসংহার সামঞ্জস্যহীন। সামষ্টিক "আমরা" থেকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক "আমি" তে যেয়ে কেন লেখক থামলেন তা বোধগম্য নয়। আন্দোলনের কী হলো, পরে কী হতে যাচ্ছে তার আভাস বা ইঙ্গিত না দিয়ে প্রধান হয়ে উঠলো রাহাতের খামখেয়ালিপনা। দেখা হয়নি, ভালোমতো কথা হয়নি, তাও রাহাত এতোই ক্যারিশম্যাটিক যে, নায়িকা তার বিরহে হাপুস নয়নে কাঁদতে থাকে!এতো সম্মোহনী শক্তি শরৎচন্দ্রের যুগে মানাতো, এখন না।
(এক জায়গায় আছে সারাদেশে ইন্টারনেট সংযোগ নেই বলে সমস্যা হচ্ছে। ঠিক পরের পৃষ্ঠাতেই রাহাতকে একজন বলছে যে তার ক্যাফেকে নিয়ে বহু মানুষ পোস্ট করছে। কীভাবে?)
বইয়ের মূল চরিত্র রাহাত। এই রাহাত আসলে আপনি আমি আমরাই। ডালে-ভাতে চলে যায় আমাদের দিন। চারপাশ সম্পর্কে কিছুটা নির্লিপ্ততা নিয়ে জীবনকে যাপন করে চলি আমরা। কিন্তু যখন একটা মহা অন্যায় ঘটে তখন আর চুপ থাকা যায় না। রাহাতও ‘২৪ এর জুলাইতে চুপ থাকতে পারেনি। মাঝেমাঝে এমন এক একটা সময় আসে যখন হয় আপনি দাগের এইদিকে দাঁড়াবেন নয়তো ঐদিকে। মাঝখান বলে কোন কথা থাকে না। '২৪ এর জুলাইকে খুব ভালো রকম করে ধরা হয়েছে উপন্যাসটায়। রাখঢাক না করে একদম সোজাসাপটা ভাষায় তুলে ধরা হয়েছে ঘটনাপ্রবাহ। পড়তে পড়তে কতবার যে চোখ ভিজে উঠেছে। জুলাই ট্রমা থেকে কেউই কি বেরুতে পেরেছে। আমরা যারা শুধু নৈতিক সমর্থন দিয়ে দায়িত্ব সেরে ফেলে দর্শক সারিতে বসে দোয়া করছিলাম তারাই পারিনি আর যারা পথে ছিলেন, গায়ে জুলাইয়ের ক্ষত বয়ে বেরাচ্ছেন আর যারা হারিয়েছেন তারা! মুরাদ কিবরিয়া দারুন একটা কাজ করেছে বইটাতে। রাহাত চরিত্রটি ফিকশনাল হলেও সে রাস্তায় নেমে যে লাশগুলো দেখেছে সেগুলো বাস্তব ছিল। এইরকম প্রচুর ভিডিও ফুটেজ আমরা দেখেছি। সেগুলো এই বইতে তুলে আনা হয়েছে রাহাতের চোখ দিয়ে। বইটা সংগ্রহে রাখবার মতো। এসব বইয়ের দরকার আছে। জুলাই নিয়ে আরো লেখালেখি হওয়ারও দরকার আছে।
‘ক্যাফে রেভুল্যুশন’ এর কাহিনি বর্ণিত হয়েছে রাহাত নামের পঁয়ত্রিশ বছরের এক যুবকের জবানিতে। মিলেনিয়াল রাহাতকে উপন্যাসের শুরু থেকেই অরাজনৈতিক, সাধাসিধা একজন মানুষ বলে মনে হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স-মাস্টার্স শেষে কিছুদিন প্রাইভেট জব করে বিসিএস প্রস্তুতিতে সময় দেওয়া রাহাত এখন বেকার। এভাবে তো আর বেকার বসে থাকা যায় না ভেবে রাহাত একটা ক্যাফে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ক্যাফের নাম ঠিক করার সময় ১৯৪২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘ক্যাসাব্লাঙ্কা’ সিনেমার কাহিনি তাকে প্রভাবিত করে। সেই সিনেমায় যুদ্ধ এবং বিপ্লব চলমান অবস্থায় দেখা যায় একটি ক্যাফেতে বিপ্লবীরা আশ্রয় নেয়, যেখানে যুদ্ধের চাপ, রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র, ব্যক্তিগত আবেগ সবই একত্রে জমা হয়। রাহাত ক্যাফের নাম দেয় ‘ক্যাফে রেভুল্যুশন’। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দুই বান্ধবী নাবিলা ও তাপসীর কল্যাণে সবকিছু খুব দ্রুত হয়ে যায়। ঘটনাক্রমে এই ক্যাফেও ক্যাসাব্লাঙ্কা সিনেমার ক্যাফের মতো চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের সিম্বল হয়ে ওঠে। বহু বছর আগে ক্যাম্পাস ছাড়া রাহাতও নিজের অজান্তেই ভেসে যায় আন্দোলনের জোয়ারে। চব্বিশের জুলাইয়ে বাংলাদেশে ঘটে গেছে একাত্তরের স্বাধীনতাযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের সবচেয়ে বড় এবং আলোচিত ঘটনা। জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এমন দিনও যে আসবে স্বাধীনতার তেপ্পান্ন বছর পরে, একাত্তরের ঘাতকদের মতো এই দেশের, এই জাতির মানুষই স্বজাতির উপর এভাবে গণ হ ত্যা চালাবে, আবার আহতদের চিকিৎসাও নিতে দিবেনা সরকারি দলের গুন্ডা বাহিনি তা কল্পনাও করিনি কখনো। ক্যাফে রেভুল্যুশন পড়ার সময় গত দেড়বছরেও জুলাই থেকে বের হতে না পারা আমার মনে বারবার উঁকি দিচ্ছিল জুলাইয়ের সময়কার সেই আতঙ্কের, উৎকণ্ঠার, নির্ঘুম রাতের স্মৃতিগুলো। . ক্যাফে রেভুল্যুশন পড়তে গিয়ে মনে পড়ে আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক গল্প ‘রেইনকোট’ এর কথা। রেইনকোটে নুরুল হুদাকে পাকিস্তানি মিলিটারি ধরে নিয়ে গেলে মুক্তিযোদ্ধা শ্যালকের রেইনকোটের ওম তার মধ্যকার দেশপ্রেমকে যেমন পুনরুজ্জীবিত করে, মিলিটারির অত্যাচার যেমন তার কাছে উৎপাত মনে হয়, একই না হলেও কিছুটা তেমনই অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটে ক্যাফে রেভুল্যুশনে। . চব্বিশের জুলাইয়ে লক্ষ করেছিলাম, সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের জন্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ব্যাপারে জেনারেশন এক্স কিংবা মিলেনিয়ালরা কেমন যেন নির্লিপ্ত। আন্দোলন যখন কিছুটা জোড়ালো হচ্ছিল, সরকার হার্ড লাইনে চলে যাচ্ছিল তখনও তারা অনেকটা উদাসীন। তারপর যখন আন্দোলকারীদের বুকের তাজা রক্ত ঝড়তে শুরু করল তখন আফসোসের চিহ্ন দেখলাম তাদের কথাবার্তায়। এর কারণ কী হতে পারে তখন ভেবেছিলাম। এখানে বিভিন্ন কারণই আছে, কিন্তু সবথেকে বড় কারণ গত দেড় বছরের ঘটনাক্রম দেখে খানিকটা উপলব্ধি করতে পারি। ‘ক্যাফে রেভুল্যুশন’ এ মুরাদ কিবরিয়া সেই কারণের কথাও তুলে ধরেছেন। . রাহাত নিজে ২০০৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় সেনাশাসন বিরোধী অগাস্ট আন্দোলনে জড়িত ছিল। হয়েছিল এর জন্য আর্মিদের হাতে গ্রেফতারও। কিন্তু উপন্যাসে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে তার মধ্যে কোনো উত্তেজনা নেই। রাহাতদের জেনারেশনের রাষ্ট্র বিনির্মাণের স্বপ্নের নদীতে হয়তো ২০০৮ সাল পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিক্রমাই চর হিসেবে জমা হয়েছে। সেনাশাসনের বিরুদ্ধে নিজেদের ভোটাধিকারের জন্য লড়াই করে যখন নির্বাচনের পর নির্বাচনে ভোটাধিকার হারাতে হয়, তখন তো স্বপ্নভঙ্গ হবেই। এ থেকে জেনারেশন এক্সের সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যায়, যারা ছিলেন মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী উত্তাল বাংলাদেশের সাক্ষী, নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে সম্মুখ সারিতে অংশগ্রহণকারী। পরিবর্তনের আশা নিয়ে রাস্তায় নেমে প্রায় প্রতিবারই যাদের হতে হয়েছে প্রতারিত, বেহাত হয়েছে আন্দোলন, বিপ্লব। . উপন্যাসে রাহাতের মাধ্যমে মুরাদ কিবরিয়া এড্রেস করেছেন বাংলাদেশের কিছু সামাজিক বাস্তবতা, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট। রাহাতের জীবনের অন্যতম সাফল্য সে একবার সোনার হরিণ বিসিএসের ভাইভা পর্যন্ত যেতে পেরেছিল। এক সময় ছেলে ঢাবিতে পড়ে, এই কথা গর্ব করে বলে বেড়ালেও এখন রাহাতের বাবা এই কথা এড়িয়েই যান কিছুটা। ঢাবি থেকে পড়ে ছেলে পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে এসেও বেকার—এর থেকে লজ্জার কিছু আছে? অন্���দিকে ক্যাফের ম্যানেজার, ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ছাত্রী সার্জিল, সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজার কলেজ ছাত্র ইকবালের মাধ্যমে মুরাদ কিবরিয়া মিলেনিয়ালদের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জেনজিকে উপস্থাপন করেছেন, বোঝার চেষ্টা করেছেন। কীভাবে কোনো কিছুকেই তেমন সিরিয়াসলি না নেওয়া, স্ট্রেইট ফরোয়ার্ড, আবেগপ্রবণ, কিছুটা ঠোঁটকাটা ও আত্মনিমগ্ন এই জেনারেশনের মন আন্দোলনে নিহত অচেনা মানুষদের জন্য কাঁদে, ক্ষোভ পুঞ্জিভূত হতে থাকে স্বদেশি ঘাতকদের বিরুদ্ধে তা তুলে ধরেছেন বাস্তবতার মিশেলে তৈরী গল্পের আবহে। এছাড়াও চায়ের দোকানদার, তার ভাই, রিকশাওয়ালা বাবুল মামার মাধ্যমে উপন্যাসে লেখক তুলে ধরেছেন দিন এনে দিন খাওয়া মানুষের জুলাইয়ে অবদান। . মুরাদ কিবরিয়ার লেখার সাথে আমার পূর্ব পরিচয় ছিল না। এই প্রথম কিছু পড়লাম। গদ্যশৈলী সুন্দর, সহজসরল এবং আকর্ষণীয়। তবে কিছুটা হালকা মেজাজ, সার্কাস্টিক ভাব ছিল লেখায়। লেখকের লেখার ধরনই এমন কিনা তা অন্য কোনো লেখা পড়া না থাকায় বলতে পারছি না। পুরো উপন্যাস দারুণ ভাবে একই ফ্লোতে টেনে নিয়ে গেছেন। উপন্যাসের সমাপ্তিতে তৃপ্ত হতে পারিনি অবশ্য। শেষে গিয়ে ছন্দপতন হয়েছে। একদম হঠাৎ করেই যেন সুবিশাল প্রেক্ষাপট সংকুচিত করে ফেলেছেন লেখক। যেন অনেক তাড়াহুড়ো আছে। ব্যাপারটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ লেগেছে। লেখক যে এটা সচেতনভাবেই করেছেন তা বোঝা যায়। এবং এটাই আমাকে অবাক করেছে। জুলাইয়ের প্রেক্ষাপট অনেক বিস্তৃত। এখনো আমরা সেই ইতিহাসের মধ্যেই আছি, এজন্যই লেখক বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণের বাইরে গিয়ে শুধু তখনকার আমাদের মতো সাধারণ মানুষের ‘র’ অনুভূতিটা তুলে ধরতে এভাবে সমাপ্তি টেনেছে কিনা তিনিই ভালো জানেন। . গত দেড় বছরে জুলাই নিয়ে অনেক লেখা বেড়িয়েছে। কিছু গল্প পড়া হলেও কোনো উপন্যাস পড়িনি। ক্যাফে রেভুল্যুশনই প্রথম। সবমিলিয়ে কেমন ছিল ‘ক্যাফে রেভুল্যুশন’ পাঠ অভিজ্ঞতা? হ্যারি পটারের পেনসিভের মতো। হ্যারি পটারে, ম্যাজিক ওয়ান্ড দিয়ে স্মৃতিরূপী রুপালি তরলের ন্যায় জুলাইয়ের স্মৃতি টেনে বের করে মুরাদ কিবরিয়া যেন রেখেছেন ‘ক্যাফে রেভুল্যুশন’ নামক পেনসিভে। পাঠক হিসেবে সেই পেনসিভে মাথা ঢুকিয়ে ফিরে গিয়েছিলাম চব্বিশের জুলাইয়ের সেই অগ্নিগর্ভ সময়ে। . ক্যাফে রেভুল্যুশন মুরাদ কিবরিয়া