এদো শহর- লণ্ঠনের মৃদু আলো, দীর্ঘ ও কম্পমান ছায়া, অসহ্য অশান্তির রেশ ছড়িয়ে রয়েছে চতুর্দিকে। সেই অন্ধকার ভেদ করে হাঁটেন ইনস্পেকটর হানসিচি। তলোয়ার নয়, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি তাঁর অস্ত্র: ভয় নয়, সত্যই তাঁর পথপ্রদর্শক। মানুষের লোভ, প্রেম, ভয়, গোপন ক্ষত এসবের ভেতরেই তিনি খুঁজে পান অপরাধের আসল মুখ। প্রতিটি রাস্তা, প্রতিটি ছায়া, প্রতিটি নিঃশব্দ মুহূর্ত যেন তাঁকে অদৃশ্য রহস্যের দিকে হাতছানি দিয়ে ডাকে। এই কাহিনিগুলি সেই যাত্রারই অনুরণন, অপরাধের অন্ধকারে ভেসে ওঠা আলোর ক্ষীণ রেখা ও ছায়ার ভিতরে সত্যের আত্মপ্রকাশ। পুরনো জাপানের আবহে মোড়া এক কাব্যিক রহস্যজগৎ, যেখানে প্রতিটি প্রশ্নই এক নতুন দরজা, আর প্রতিটি দরজার ওপারে অপেক্ষা করে আছে একরাশ চমক।
গল্পগুলোর লেখা হয়েছে ১৯১৭-১৯৩৭ সালে, কিন্তু পটভূমি ১৮৪০-১৮৬০ এর এডো [বর্তমান টোকিও] শহরে । এই বইতে মোট ৭টি গল্প আছে। মাঝামাঝি সময়ের সামন্ততান্ত্রিক জাপানের এদো (বর্তমান টোকিও) শহর। মূল চরিত্র ইনস্পেক্টর হানসিচি, যিনি বয়সের ভারে অবসরপ্রাপ্ত। তিনি এক তরুণ কথকের কাছে তাঁর অতীতের সমাধান করা বিভিন্ন জটিল ও রোমাঞ্চকর কেসের স্মৃতিচারণ করেন।
এই বইয়ের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর প্রতিটি রহস্যের বুনন। আপাতদৃষ্টিতে যে ঘটনাগুলোকে ভূত, অশরীরী আত্মা, অভিশাপ বা অলৌকিক কাণ্ড বলে মনে হয়, হানসিচি তাঁর তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে সেগুলোর পেছনের আসল কুচক্রী বা মানবিক অপরাধীকে টেনে বের করেন।
বই: ইনস্পেক্টর হানসিচি ১ লেখক: কিদো ওকামোতো, [ যিনি জাপানি সাহিত্যে প্রথম গোয়েন্দা গল্পের প্রবক্তা।] অনুবাদক: পার্থ দে ও অনির্বাণ ভট্টাচার্য।
The curious case of ইন্সপেক্টর হানসিচি কিদো ওকামোতো পত্রপাঠ প্রকাশনী মম : ৩৫০/-
জাপানের ষোলোশো-আঠারোশো সময়কাল, শক্তিশালী তোকুগাওয়া শাসন, সেইসময়ের রাজধানী এদো- যার পরবর্তী নাম হয় টোকিও।
এদো যুগের গ্যাসলাইট পরিবেশ, সমাজতন্ত্র থেকে আধুনিক রাষ্ট্রে পরিবর্তনশীলতা -- এরকম এক অস্থায়ী, অস্থির সময়ে আবির্ভাব ঘটে গোয়েন্দা হানসিচির।
বইয়ের গল্পগুলো হানসিচির স্মৃতিচারণ। আপাতদৃষ্টিতে গোয়েন্দাগল্প হলেও তখনকার জাপানের সমাজব্যবস্থা, আর্থিক, নৈতিক, লৌকিক, আইনব্যবস্থার স্বরূপ পাওয়া যায়। গল্পগুলো বেশ গতিশীল, কৌতূহল জাগায়। গোয়েন্দা হলেও হানসিচির মানবিকতা আর সহমর্মিতা কিছু গল্পে দেখা যায়। অনুবাদ বেশ ভালো।
জাপানি সাহিত্য অনুবাদ করা সহজ কাজ নয়, তবুও আমার মনে হয়েছে অনুবাদকরা অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে এই কাজটি করেছেন—মূল রচনার আবহ ও মর্মার্থকে যথাযথভাবে ধরে রাখতে পেরেছেন। সবচেয়ে যে বিষয়টি আমাকে মুগ্ধ করেছে, তা হলো রহস্যের ধীরে ধীরে উন্মোচন এবং তার যুক্তিসঙ্গত, তৃপ্তিদায়ক সমাধান। Okamoto Kido জাপানি গোয়েন্দা সাহিত্যের প্রাথমিক যুগের অন্যতম পথিকৃৎ। বিংশ শতকের গোড়ার দিকে তিনি এদো যুগের জাপানের অলিগলি ও জনজীবনকে পটভূমি করে ইন্সপেক্টর হানশিচির গল্পগুলো রচনা করেন—যেখানে রহস্য, ইতিহাস, লোককথা এবং মানবস্বভাবের সূক্ষ্ম জটিলতা একসঙ্গে মিশে গেছে। তাঁর গল্প বলার ভঙ্গিতে এক ধরনের পুরনো দিনের মাধুর্য আছে—পর্যবেক্ষণনির্ভর, সংযত, এবং গভীর আবহে ভরপুর।