বাংলাদেশ আজ স্বাধীন। তবু কেন এখানে সেখানে খুন হচ্ছে অসংখ্য বাঙালী আজও? তবে কি এখনও তৎপর রয়েছে সেই কুখ্যাত আল-বদর, আল-শামস ও রাজাকারের দল? এখনও চলছে ষড়যন্ত্র?
কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
এখনও অনেক মানুষই বইটার'মৌলিকত্ব' এর ব্যাপারে অজ্ঞাত। আসলে আমারও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়েছে, যুদ্ধ পরবর্তী ওই পরিবেশে এত সুন্দর একটা বই লেখা সম্ভব। বইটা ঠিক আর দশটা রানার মত না। এখানে রানার কোনো রিসোর্স নেই, নেই কোনো শক্ত খুঁটি, যেটাআগপর্যন্ত ছিল পিসিআই। নেই পিতৃসম অভিভাবকটিও। বইটাতে, স্বাধীনতা পরবর্তী বলেই হয়তো, দেশপ্রেম আর মানুষের জন্য ভালোবাসা উঠে এসেছে প্রতিক্ষণে। শুধু থ্রিলার না, এটাতে যেন সবই আছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত এক দেশের কথা, চোখের সামনে প্রিয়জনকে খুন হতে দেখার কষ্ট, দেশকে রক্ষার মরিয়া চেষ্টা আছে এই বইয়ে। রানা এখানে সুপারম্যান না। সংগঠিত এক শত্রুর হাতে কখনও সে সত্যিই অসহায়। কিন্তু ওই যে, দেশপ্রেম আর প্রতিশোধের নেশা। তার জোরেই বিসিআইএর এজেন্টরা ছুটেছে শত্রুর পিছনে। দম বন্ধ করা একশন, রুদ্ধশ্বাস এসপিওনাজ, আর কঠিন এক সংকল্পের গল্প এখনও ষড়যন্ত্র।
একাত্তরের ২৫শে মার্চ রাতে যখন অপারেশন সার্চ লাইট শুরু হয়, তার কিছুক্ষণ আগে বাংলাদেশ কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স (তৎকালীন পিসিআই) এর চিফ রাহাত খান নিজেকে সুরক্ষিত করার বদলে একে একে তার ত্রিশজন এজেন্টকে ফোন দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ড হয়ে যেতে বলেন। ত্রিশজনকে ফোন দিতে মিনিমাম ৩০ মিনিট সময় তো লাগেই, যে সময়টা পালিয়ে যাবার জন্যে যথেষ্ট ছিল। কিন্তু তিনি নিজেকে সুরক্ষিত করার বদলে তার অধীনস্থ এজেন্টদের সুরক্ষা নিয়ে চিন্তা করেন। সেদিন রাতে সবশেষে ফোন দেন রানাকে। বলেন আন্ডারগ্রাউন্ড হতে, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে এবং রেহানাকে সিকিউরড করতে। রেহানার ফোনে সমস্যা থাকার কারণে তাকে সাবধান করতে পারেননি রাহাত খান। রানার ফোন রাখার আগেই পাকিস্তানিরা আক্রমন করে তাঁকে।
রাতের আধারে পাকিস্তানি সেনাদের চোখ বাঁচিয়ে রেহানার বাসার পেছনদিকের পাইপ বেয়ে উপরে উঠে রানা। ততক্ষণে পাকিস্তানি সৈন্যরা রেহানাকে গ্যাং রেপ করে তার উপর অকথ্য নির্যাতন চালাচ্ছে। নিজের চোখে রেহানার পরিণতি দেখে রানা। তারপর বসের নিষেধাজ্ঞা সত্বেও যায় তার বাসায়। গিয়ে দেখে পুরো বাসা লণ্ডভণ্ড, কোথাও কেউ নেই।
এরপর যুদ্ধে চলে যায় রানা। আর্মি থেকে মেজর র্যাঙ্ক নিয়ে অবসর নিলেও ওয়ার স্ট্র্যাটেজিক হিশেবে কাজ না করে চলে যায় ফ্রন্টলাইনে। একদম সামনে থেকে যুদ্ধ করে।
দেশ স্বাধীন হবার পর একে একে সবাই ফিরে আসলেও রানার কোনো খোঁজ নেই। রাঙার মা আর মোখলেসও রানার চিন্তায় অস্থীর। দেশ স্বাধীন হওয়ার এক মাস পর ফিরে আসে রানা। এরপর থেকেই মূল ঘটনা শুরু।
আলোচনা করছিলাম মাসুদ রানা সিরিজের 'এখনো ষড়যন্ত্র' বই থেকে। যুদ্ধ পরবর্তী স্বাধীন দেশের তৎকালীন অবস্থা নিয়েই এই বইটি লেখা হয়েছিল। এরমধ্যেও মুক্তিযুদ্ধের কিছু কিছু অংশ চলে এসেছে। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে রাজাকার ও বিদেশী কিছু অপশক্তির বিরুদ্ধে রানার লড়াই নিয়েই এই বই। শুরু করলে একটানা পড়ে ফেলতে হয়। আমি গতকাল সকালে রনি (সাজেদুল হক রনি) ভাইয়ের পোস্ট দেখে পড়া বইটাই আরও একবার পড়লাম। একবারের জন্যেও পুরনো মনে হয়নি।
বইয়ের কাহিনীটা যদিও সিরিজের অন্যান্য বইয়ের তুলনায় খুবই ছোট, কিন্তু পড়তে গেলে বোঝা যায় এড্রেনালিন রাশ কাকে বলে।
বইটা রিপ্রিন্ট হয়নি, সেবার স্টকেও নেই। তবে কারো কাছে পুরনো কপি থেকে থাকলে পড়ে ফেলতে পারেন। এই বইটা এবং এর পরের কয়েকটা বই পড়লে বিসিআই এর সেটাপটা ভালোভাবে বুঝতে পারবেন।
পড়তে পড়তেই মনে হচ্ছিলো এই বইয়ের কাহিনী বিদেশী কোনও বই থেকে ধার করা কাহিনী নয়, নিঃসন্দেহ হবার জন্য সার্চ করে উইকিপিডিয়া থেকে তথ্য বেরুলো মৌলিক রচনা। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত রানার এই বইটি কাজিদা'র হৃদয় নিংড়ানো লেখা।
মুক্তিযুদ্ধের পর বের হওয়া রানার প্রথম বই। এখনো অবাক লাগে যুদ্ধ বিধ্বস্ত একটা দেশে বসে বাস্তব একটা প্লট নিয়ে এত সুন্দর গল্প কিভাবে লিখলেন কাজীদা। বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় এপ্রিল, ১৯৭২ এ।