সন্তান যখন বাবার প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে, তখন বাবার বুক গর্ভে ভরে ওঠে। প্রসূন কি তেমন কেউ হতে পারবে? সে অনেক বছর আগে প্রসূনের বাবাও যুগের যাত্রী দলে ফুটবল খেলতেন। ফুটবল ছিল তার ধ্যানজ্ঞান। কিন্তু একটা ইনজুরি, আর ফাইনালের মতো বড়ো মঞ্চে আবেগতাড়িত হয়ে একটি ভুল; যার মাশুলে ক্যারিয়ার শেষ করেই দিতে হলো। ওপেন নেট মিস করা প্রসূনের বাবাকে তাই বিশ্বাসঘাতক ট্যাগ পেতে হলো। বলা হলো, ঘুষ খেয়ে ইচ্ছা করে ম্যাচ হেরেছে প্রসূনের বাবা। এরপর থেকে ফুটবলের নাম শুনতে পারেন না তিনি। যেই খেলা তার জীবনকে ধ্বংস করেছে, ছেলেও সে পথে আগাবে; বাবা হিসেবে চান না তিনি।
কিন্তু বাবার রক্ত বয়ে চলেছে প্রসূনের শিরা, ধমনী জুড়ে। তাই তো খেলাটাই তার ধ্যান জ্ঞান। পড়াশোনা পর্যন্ত তার হলো না। বাসায় অভাব অনটন লেগেই আছে। যে ফুটবল নিয়ে বাবার স্বপ্ন ছিল, তা ভেস্তে যাওয়ার পর আর মাথা তুলে দাঁড়াতে পারেননি। আধ পেটে খেয়ে থাকতে হয়। এমন অবস্থায় প্রসূনের একমাত্র লক্ষ্য ফুটবল খেলা। ফুটবল খেলে না-কি প্রচুর টাকা পাওয়া যায়।
তবে ছিন্নমূল অবস্থান থেকে উপরে ওঠার ধাপ খুব একটা সহজ নয়। ভাগ্যের জোরে যে দলে প্রসূন, নিমাই আর আনোয়ার খেলার সুযোগ পেয়েছে; তাদের লক্ষ্যটা কেবল টিকে থাকা। কোনমতে বেঁচে থাকা। এই দলে খেলে কি আর খেলা শেখা যায়? তাই এক যাত্রা শুরু হয় প্রসূনের। হয়তো কিছু সিদ্ধান্ত ভুল, কিছু আবার ঠিক। লড়াইটা যে নিজের সাথে নিজের। নিজের ক্ষমতার উপর ভরসা করে চ্যালেঞ্জ নিতে না পারলে সামনে এগিয়ে যাওয়া যায় না। লক্ষ্য বহুদূর। ওই যে দূরে গোলপোস্ট দাঁড়িয়ে আছে, বাঁধা দেওয়ার জন্য স্টপার আছে, গোলকিপার আছে; সব বাঁধা পেরিয়ে আলতো ছোঁয়ায় বা পায়ের কারিকুরিতে বলটা যখন জালের ছোঁয়া পেয়ে, পুরো স্টেডিয়াম ভেঙে পড়ে। জীবনটাও এমনই। বাঁধা আসবে, থামিয়ে দেওয়ার জন্য কড়া ট্যাকেল ছুটে আসবে দুই পা লক্ষ্য করে; তাকে কাটিয়েই লক্ষ্য ছুঁতে হয়। তখন গ্যালারির মতো করে শুভাকাঙ্ক্ষীর অভাব হয় না সাবাসি দেওয়ার জন্য। কিন্তু ব্যর্থ হলেই? গালির তুবড়ি ছুটে আসে।
আমি আগাগোড়া একজন স্পোর্টস ফ্রিক। খেলার জন্য কত পাগলামি করেছি তার হিসেব নেই। প্রিয় দলের জন্য রাত জেগেছি, বিজয়ে উন্মাদ হয়ে উল্লাস করেছি, পরাজয়ে নীরবে কেঁদেছি। আমার জন্য তাই এমন একটা বই আবেগের, ভালো লাগার। মতি নন্দী পেশাগত জীবনে স্পোর্টস রিপোর্টার ছিলেন। একজন রিপোর্টার তার লেখার কারিকুরিতে যেভাবে পাঠককে মুগ্ধ করেন, একজন খেলোয়াড় তার পায়ের জাদুতে সেভাবেই মুগ্ধ করেন দর্শকদের। মতি নন্দীর লেখা আমার দারুন লেগেছে। বিশেষ করে খেলার বর্ণনায় যে দৃশ্য তিনি মঞ্চস্থ করেছেন, এক কথায় অসাধারণ। ফুটবল খেলায় যে পজিশনিং থাকে, প্রতিপক্ষের সাথে যেভাবে ট্যাকটিক্যাল ব্যাটেল হয়, এই বর্ণনাগুলো ভালো লেগেছে। ফুটবল বোঝে এমন প্রতিটি পাঠকই বিষয়গুলো উপভোগ করতে পারবে।
এই উপমহাদেশের দেশগুলো আন্তর্জাতিক ফুটবলে খুব বেশি সুবিধা করতে পারে না। কিন্তু উপমহাদেশের প্রতিটি দেশ যেভাবে ফুটবলের ক্রেজ ধরে রাখে, তা অবাক করার মতোই। এক সময় পশ্চিমবঙ্গের দল ইস্টবেঙ্গল, মোহনবাগান, মোহামেডান দলগুলোর খেলা মানেই বাড়তি উত্তেজনা। সমর্থকে সমর্থকে টক্কর। এই নিজের প্রিয় দলকে সমর্থন দিতে গিয়ে হাতাহাতি পর্যায়ে চলে যেত কোনো কোনো মুহূর্ত।
প্রসূনের নিজেকে ফিরে পাওয়ার লড়াই এই বই। শূন্য থেকে এমন ক্লাবে শুরু করা, যেখানে শেখার কিছু নেই। নিজের দক্ষতা দেখানোরও উপায় নেই। কালেভদ্রে যদিও তা দেখানো যায়, তাতে নিজের উন্নতি সম্ভব না। প্রসূন তাই কঠিন সিদ্ধান্ত নেয়। হতে পারে ভুল। তবুও বড় ক্লাবে খেলার স্বপ্ন দেখে যেকোনো ফুটবলার। একটু স্বার্থপর না হলে যে এগিয়ে যাওয়া যায় না। থ্রি মাস্কেটিয়ার্স হয়ে ওঠা নিমাই, প্রসূন, আনোয়ারের বন্ধন ছিন্ন হয়। প্রসূন হয় আলাদা।
খেলার জগতে রাজনীতির অভাব নেই। অনেকভাবেই এমন রাজনীতির ছক কষা যায়। প্রসূন যখন উন্নতির প্রতিটি ধাপ অতিক্রম করছে, প্রতিপক্ষের মনে ভয় ধরানো খেলা খেলছে, তখন তাকে নিয়ে সাবধান হতেই হয়। কেউ আবার এক কাঠি সরেস, নিজের দলের বিপক্ষে যেন ভালো না খেলে তাই টাকা দিয়ে কিনে নিতে চায়। প্রসূন বিক্রি হওয়ার জন্য আসেনি। প্রসূন না থাকলেও কেউ কেউ তো আছে, যে টাকার কাছে নিজের মনুষত্ব বিকিয়ে দেয়। খেলাটা এগারো জনের। একজন বড় মুখ করে বাবার সম্মান রক্ষার্থে জিতবই বললেই জেতা যায় না। তবে খেলা না জিতলেও বাবার প্রতি ছেলের যে তীব্র ভালোবাসা, এর মূল্য অনেক বেশি।
ফুটবল এমন এক খেলা, যাকে একবার বুকের গভীরে জড়িয়ে ধরলে আর ছেড়ে যাওয়া যায় না। হয়তো মনের মধ্যে তীব্র অভিমান ভর করে, কিন্তু ফুটবল মিশে থাকে মানুষের সত্তায়। মতি নন্দীর মারাত্মক সব খেলার বর্ণনায়, আবেগের ফুলঝুরিতে খেলাটাকে নিজস্ব অস্তিত্ব মনে হয়। একজন খেলোয়াড় যখন প্রথম ম্যাচ খেলে, প্রথম গোল করে; তার অনুভূতি এখানে বর্ণিত হয়েছে। রাজনীতির শিকার হয়ে দীর্ঘদিন বসে থাকলে তার মনের মধ্যে কেমন প্রভাব পড়ে সেটাও এখানে উপজীব্য। তখন হুট করে মাঠে নামলেও নার্ভাসনেসে সবকিছু ধোঁয়াশা মনে হয়। দর্শকদের দুয়োধ্বনি সহ্য করার মতো খেলাটাই বা কয়জন খেলতে পারে।
এই বইয়ের যে জিনিসটি ভালো লেগেছে, তিন বন্ধুর সম্পর্ক। চোখের আড়াল হলেই মনের আড়াল নয়। সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা, ছোট ভাইয়ের কাছে বড় ভাই যেন এক নায়ক, আর নীলিমা — যে প্রসূনের হয়তো বন্ধুই। কিংবা বেশি কিছু। ভরসা, বিশ্বাস। তাছাড়া বাবা ও ছেলের নীরব এক বন্ধনের দৃঢ়তা। যেখানে কিছু না বললেও ভালোবাসার কমতি নেই।
যারা ইন ডেপথ গল্প পছন্দ করে, চরিত্রের গভীরতার দিকে বেশি মনোযোগ; এই বই তাদের ভালো লাগবে না। সাদামাটা, খেলার উপরই লেখক তার পূর্ণ মনোযোগ দিয়েছেন। কিশোরদের উপযোগী বই। ফুটবল খেলাকে ধারণ করতে বা বুঝতে অথবা অনুভব করতে এই বইটা দারুণ।
অনেক বছর আগে যেখানে এক প্রজন্মের সবকিছুর শেষ হয়ে গিয়েছিল, সকল স্বপ্ন ধুলিস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল; আরেক প্রজন্ম এখন সেখানে দাঁড়িয়ে আছে নতুন দিনের আশায়। যে ভুলটা অনেক বছর আগে হয়েছিল, যে ভুলের প্রায়শ্চিত্ত গোটা জীবন জুড়ে দিতে হয়েছিল, আজ তার দায় মুক্তির দিন। বাবাকে সকল অপবাদ থেকে মুক্তি দিতে পারবে তো প্রসূন? গ্যালারি জুড়ে অসংখ্য দর্শক থাকলেও আজ এক জনের সামনেই নিজেকে প্রমাণ করতে চায়। ওই সবুজ গালিচায় দাঁড়িয়ে গ্যালারিতে তাই সেই মুখ-ই খুঁজছে।
▪️বই : স্ট্রাইকার
▪️লেখক : মতি নন্দী
▪️ব্যক্তিগত রেটিং : ৪.৫/৫