মহাভারত নামত ভরতবংশের ইতিহাস হলেও, প্রকৃতপক্ষে সত্যবতী-দ্বৈপায়নের বংশের ইতিহাস। এই গ্রন্থে ধর্ম ব'লেও কিছু নেই, অধর্ম ব'লেও কিছু নেই। যা আছে তা কেবল সুবিধাবাদীর সুবিধাভোগ। বিদুর-যুধিষ্ঠিরের মতো ধার্মিকেরা, ঈশ্বরের প্রতিভূ ভেল্কীদক্ষ কৃষ্ণরা আজও বহুসংখ্যায় আমাদের চারপাশে বিরাজমান। দুর্যোধন স্বভাবতই কিছুটা সংযত এবং সহিষ্ণু চরিত্রের মানুষ, প্রচারের মহিমায় তার উল্টো কথাই সকলে বিশ্বাস ক'রে এসেছেন। কুরুক্ষেত্রের 'ধর্মযুদ্ধ' যে কতদূর অধর্মের যূপকাষ্ঠে বলি হ'তে পারে, তা ভাবলেও স্তম্ভিত হ'তে হয়। যে ভারতবর্ষে আজও জাতিভেদ প্রবল, উচ্চবর্ণ নিম্নবর্ণের বিভেদ গাত্রবর্ণে প্রতিফলিত, সেখানে ক্ষত্রিয়কুলের এই কাহিনীতে দেখি কৃষ্ণবর্ণের আধিপত্য সর্বত্র, শুদ্ধ শোণিতের চূড়ান্ত পতন এবং বিলুপ্তি।
Protiva Bose (also spelled Pratibha Basu; Bangla: প্রতিভা বসু) was one of the most prolific and widely read Bengali writers of novels, short stories, and essays. She has written 200 books, all of which have been commercially successful. Several of her novels have been made into successful movies. She was known as Ranu Shome before she married the famous Bengali writer, Buddhadeva Bose.
She was born in Bikrampur, a village near Dhaka. She was awarded 'Bhubonmohini' gold medal from the University of Calcutta for her contribution in Bengali language and literature and Ananda Purashkar. Her granddaughter Kankabati Dutta is also a well-known writer in Bengali.
Bose was also famed as an singer of popular songs. The poet Kazi Nazrul Islam, singer Dilip Roy, and Rabindranath Tagore admired her voice and taught her their own songs. She made her first LP at the age of 12 and continued until the 1940s, when she gave up singing and started writing. She was soon a best seller and publishers fought against each other for her books.
She was a great lover of animals and was paralyzed from head to toe in 1972 because of an adverse reaction to an anti rabies shot, which was necessary as she was rescuing stray dogs who had rabies. She died in 2006.
মহাভারত একটি মহাকাব্য। কবে এটা রচনা করা হয়েছিল তা এখন আর সঠিকভাবে জানার উপায় নেই। এমনকি পুরোটা একসাথে রচিতও হয়নি এই মহাকাব্য। সম্ভবত এর কোন কোন অংশ প্রায় আড়াই হাজার বছর পূর্বে রচিত, কোন অংশ আরও আধুনিক সংযোজন কিংবা পরিমার্জন। তবে এখানে সম্ভবত শব্দটা উল্লেখ করতেই হবে কেননা এ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কেউ বলতে পারবেন বলে মনে হয় না। এর ঘটনাবলীর কোন ঐতিহাসিক সত্য আছে কিনা তাও নিশ্চিত নয়, যদি থাকেও তবে তা হয়তো রচনাকালেরও আরও পূর্বের। মূলে যদি কিছু সত্যতা থেকেও থাকে, নানা সময়ে নানা রচয়িতার অবদানে, অলৌকিকতায় পরিপূর্ণ এই মহাকাব্যকে প্রায় পুরোটাই সত্য বলে ধরে নেয়া কতোটা যুক্তিযুক্ত তা আমি ভেবে পাই না, ব্যক্তিগতভাবে আমি একে সাহিত্য ব্যতীত কোন ধর্মীয় গ্রন্থ বলে মেনে নিতেও পারি না। অবশ্য ধর্মগ্রন্থ হিসেবে কেউ যদি একে বিবেচনা করেও থাকেন তাহলেও এর বা অন্য ধর্মগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনা করা যাবেনা এমন কোন কথা নেই বরং এধরনের আলোচনা বা সমালোচনা সবসময়ই স্বাগত।
মহাভারত আমি পড়েছি ছোটবেলায় তবে সেটা কোন সংস্করণ মনে নেই। প্রতিভা বসু কালী সিংহের মহাভারতকে বিশ্লেষণ করে এই বই লিখেছেন, যদিও এর আরও অনেক ভার্সন আছে তা তিনি নিজেও উল্লেখ করেছেন। লেখিকা বিশ্লেষণ করেছেন একে আর্য এবং অনার্যের লড়াই হিসেবে, যেখানে ভীষ্ম, কর্ণ প্রমূখ হলেন বিশুদ্ধ আর্য, দুর্যোধন ও অন্য কৌরবরা মিশ্রিত আর্য, যদিও তাদের মধ্যে আর্য রক্তের ভাগই বেশি। পান্ডবরা মিশ্রিত আর্য যাদের মধ্যে অনার্য রক্তের ভাগই বেশি আর কৃষ্ণ বিশুদ্ধ অনার্য। পান্ডব ও কৌরবদের লড়াই মূলত আর্য অনার্যের লড়াই যেখানে অনার্য অর্থাৎ পান্ডবরা জিতেছে। তবে সে জয় শঠতা, অন্যায় এবং কূটকৌশলের। কৃষ্ণ ঈশ্বরের প্রতিভূ নন বরং ধূর্ত এক শঠ, যুধিষ্ঠির মিথ্যুক ও অপদার্থ, অর্জুন বীর হলেও কৃষ্ণ ও যুধিষ্ঠিরের ক্রীড়ানক মাত্র, ভীম একটি বর্বর বিশেষ, দুর্যোধনই বরং এই বইয়ের প্রকৃত নায়ক এবং বিদুর প্রকৃত খলনায়ক। লেখিকা মহাভারতের অলৌকিক ঘটনাগুলোর লৌকিক ব্যাখ্যা দিয়ে অন্য ঘটনাগুলোকে সত্য বলে ধরে নিয়ে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন।
তবে দুটো অলৌকিক ঘটনা তিনি সত্য বলে ধরে নিয়ে কোন লৌকিক ব্যাখ্যা কেন দিলেন না তা বোধগম্য নয়। কৃষ্ণের বিশ্বরূপ প্রদর্শন আর দুর্যোধনের জলস্তম্ভন। সে যাই হোক, কর্ণ এই মহাকাব্যের একজন ট্রাজিক হিরো সেটা অবশ্য সবাই মানেন। আর দুর্যোধন, দুঃশাসন এরকম নাম কোন বাবা মা রাখবেন না এতো খুবই সত্য। হয় পুরো ঘটনা অসত্য অথবা নামগুলো বিকৃত। তবে লেখিকা গান্ধারীকে সেভাবে গুরুত্ব দিলেন না কেন এবং ভীষ্ম চরিত্রটির আচরণের দুর্বোধ্যতার ব্যাখ্যাও খুব স্পষ্ট করলেন না কেন সেটা আমার কাছে বইয়ের অন্যতম দূর্বলতা বলেই মনে হয়েছে। আবার শুরুর দিকে যাকে মাস্টারমাইন্ড বলেছেন সেই সত্যবতীরই এতো নীরব প্রস্থান কেন? তাছাড়া বিশেষ বিশেষ শব্দ বা বাক্য থেকে গভীর সিদ্ধান্তে পৌঁছে যাওয়াটাও একটু বাড়াবাড়ি লেগেছে। তাছাড়া আর্যমাত্রই মহান, অনার্যরা খল চরিত্রের এই মনোভাব ও মেনে নেয়ার মতো না। বিদুরকে স্বয়ং ধর্ম আর যুধিষ্ঠিরকে ধর্মপুত্র বলা হয় এই একটি তথ্যের উপরই নিশ্চিত সত্য হিসেবে যুধিষ্ঠির বিদুরের ছেলে মেনে নেয়া যায় কিনা সেটাও একটা ব্যাপার। কৃষ্ণের দোষগুলো শুধু তুলে ধরে তাকে প্রায় বাংলা সিনেমার ভিলেন বানিয়ে দেয়াটাও একটু বাড়াবাড়ি মনে হয়েছে। সর্বোপরি এতো কম তথ্য উপাত্ত নিয়ে একটি কাল্পনিক (সম্ভবত) কাহিনীর প্রকৃত রহস্য উন্মোচন করার চেষ্টা আমার কাছে অর্থহীন বলেই মনে হয়েছে। তবে নতুন এক আঙ্গিকে এই কাহিনীকে দেখার চেষ্টা করেছেন প্রতিভা বসু সেটা অবশ্যই ভাবনার খোরাক যোগায়।
‘মহাভারতের “মরাল” কী সেটা ভেবেও বিচলিত হলাম। ... যা আছে তা কেবল সুবিধাবাদীর সুবিধাভোগ।’ লেখিকার মতে সত্যবতী কুটিলা, কুন্তী স্বৈরিণী, কৃষ্ণ দুর্নীতিপরায়ণ, বিদুর কুচক্রী এবং যুধিষ্ঠির সাম্রাজ্যলোভী - এতটা ভদ্রভাবে তিনি বলেননি যদিও; দুর্যোধন পরম প্রজাবৎসল ও নীতিবান, দুঃশাষন তাঁর সুযোগ্য সহায়ক, কর্ণ সর্বশ্রেষ্ঠ বীর, জরাসন্ধ – শিশুপাল ন্যয়বান, ধার্মিক রাজা; ভীষ্ম ‘সত্যবতী’লোলুপ অবধ্য যোদ্ধা, দ্রোণ সুযোগ্য আচার্য, অশ্বত্থামা উত্তম বীর, ধৃতরাষ্ট্র বিদুরস্নেহে অন্ধ, ব্যাস ঋষি বা ব্রক্ষ্মচারীর নামে কলঙ্ক ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। মোটকথা কুন্তী আর বিদুর মিলে সুপরিকল্পিতভাবে পাণ্ডু আর মাদ্রীকে হত্যা করে পুর্বোক্ত দু’জনের ঔরসে জন্মানো পাহাড়ী বুনো অসভ্য অবৈধ অক্ষত্রিয় পঞ্চপুত্রকে হস্তিনাপুরের সিংহাসনে বসিয়ে উৎকৃষ্ট ক্ষত্রিয় জাতিকে বিনাশ করে অপেক্ষাকৃত শুদ্র এবং নিকৃষ্ট জাত’কে প্রতিষ্ঠা করার এক অধর্মের কথাই ব্যাসদেব তাঁর নিজ গ্রন্থে ‘ধর্ম’ বলে চালিয়ে দিয়েছেন আর এতকাল মানুষ সেটাই বিশ্বাস করে এদের পূজো করছেন। একমাত্র লেখিকাই এই ধোঁকাটা টের পেয়েছেন – সত্য সেলুকাস! আর তাই লেখিকা তাঁর বইতে শকুনি চরিত্র, জয়দ্রথের চরিত্র সম্পর্কে নীরব থেকেছেন; নীরব থেকেছেন অভিমন্যু হত্যা, মদ্ররাজের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা; এড়িয়ে গেছেন পাশা খেলায় কৌরব ও অন্যান্যদের পাশবিকতা’র ব্যাপারে, হাল্কা করে বললেও মূলত যুধিষ্ঠিরকে দায়ী করে কর্তব্য সমাপন করেছেন; নীরব থেকেছেন ধৃতরাষ্ট্রের পুত্রান্ধতা, দুর্যোধনের প্রজাপীড়ন সম্পর্কে; অন্যায়ভাবে বিরাট রাজ্য আক্রমণ ও গো-ধন লুন্ঠন সম্পর্কে; নীরব থেকেছেন পাণ্ডব চরিত্রের স্বকীয়তা, কৃষ্ণের শৌর্যতা সম্পর্কে। বদলে বারবার অত্যন্ত দৃষ্টিকটুভাবে বিদুর, যুধিষ্ঠির, কুন্তী, কৃষ্ণকে আক্রমণ করে গেছেন। আবেগের বশে মিথ্যাকে সত্য বলে মনে হলে, তাকে প্রতিষ্ঠা করতে হলে অহেতুক আক্রমণ করা ছাড়া, অত্যন্ত নিন্দনীয়ভাবে কলঙ্ক আরোপ করা ছাড়া মতপ্রতিষ্ঠার অন্য কোন পথ থাকে না। এটা একটা শিশুও বুঝতে পারে, লেখিকা পারেন নি। আর পারেন নি বলেই তিনি শুধুমাত্র কালীপ্রসন্ন সিংহ আর রাজশেখর বসু’র মহাভারত পড়ে যা বোঝার বুঝে নিলেন। সবশেষে বইটা বন্ধ করার সময় ‘প্রাক্কথন’ চোখে পড়ল। উনি লিখছেন, “ঊনত্রিশ বছর আশিতে পৌছেও যখন মহাভারত বিষয়ে একই বিভ্রান্তিতে পীড়িত হতে লাগলো, তখন নিজের মতটুকু লিপিবদ্ধ করাই সংগত মনে করলাম।” বিভ্রান্তি হলে তো এমন বই-ই বের হয়। তাই না? মহাভারতের ঘটনার পাশাপাশি যদি ‘বিদুর নীতি’, ‘শান্তিপর্ব’, শ্রীমদ্ভাগবদগীতা’, কণিক নীতি, দুর্যোধন-যক্ষ সংবাদ ভাল করে স্টাডি করতেন তাহলে চরিত্রগুলো সম্পর্কে আরোও সুষ্পষ্ট ধারণা হত। সেইসাথে এ’কথাও বলতে পারি, যদি উনি আরেকটু গভীরে গিয়ে পড়াশোনা করতেন, তাহলে অনেক সুসঙ্ঘবদ্ধভাবে ওনার মত প্রতিষ্ঠা করতে হয়তোবা পারতেনও, কিম্বা সত্য উপলব্ধি করতে পারতেন। দুটোর পথ বন্ধ করে মাঝখান থেকে এই মহারণ্যের কোন চোরাবালিতে ডুবে গিয়ে যে হাত-পা ছুড়লেন, তা কেষ্টই জানেন।
The writer was too biased towards Kourabs. The book only expressed the view of the writer. I've read Mahabharat in many forms and truly this is not one of the bests.
এই ধাঁচের বই আগেও পড়েছি। লীলেন ভাইয়ের 'অভাজনের মহাভারত' উল্লেখযোগ্য। য��ক্তি-তর্ক সেখানেও উপস্থিত। হাস্যরসের আড়ালে হলেও তা আপনাকে ভাবাবে। এই বই সেখানে যুক্তিকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যে মনে হচ্ছে কুযুক্তি। লেখার ধরণ অতি নিম্নমানের। সবচাইতে বড়ো কথা, মহাভারতের সংক্ষিপ্তসার পড়ে এরকম বই লেখাটা কিঞ্চিত অবমাননাকর। অনেক গুরুত্বপূর্ণ কথা বাদ পরে গেছে তাই। তবে হ্যাঁ, প্রকাশের সময়টা হিসেবে নিলে বেশ সাহসী বই।
মহাভারতের রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ন এর রচনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে লেখা এই বইটি আমাদের কাছে প্রচলিত মহাভারতের প্রায় উল্টো কাহিনি প্রকাশ করে।
পূর্নাঙ্গ মহাভারত আমি পড়িনি। উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছোটদের মহাভারত আর রাজশেখর বসুর মহাভারতের সারানুবাদই পড়েছি। এর আলোকে এই বইটিকে মূল্যায়ন করা সহজ নয় ও আমি করবোও না। সম্পূর্ণ মহাভারত পড়ার পর এই বই নিয়ে একটি আলোচনা করা যাবে।
প্রতিভা বসু 'মহাভারত' এর পান্ডব এবং কৌরবদের যুদ্ধকে বিশ্লেষণ করেছেন আর্য এবং অনার্যের লড়াই হিসেবে। মহাভারতে যেখানে পান্ডবদের বীরত্বগাঁথা বর্ণনা করা হয়েছে বলে আমরা জানি সেখানে লেখিকা পান্ডবদের বীরত্বগাঁথা আর জয়কে শঠতা, অন্যায় এবং কূটকৌশলের জয় হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন। পঞ্চপান্ডবদের বাঁচাতে একইরকম দেখতে ৫জন ব্রাহ্মন ছেলেকে তাদের মাসহ পুড়িয়ে মেরে ফেলার ঘটনার বীভৎসতা, গোপনে কারো অন্তঃপুরে প্রবেশ করে অসতর্ক গৃহস্থকে হত্যা করা, আর্যদের সরিয়ে সেখানে অনার্যদের প্রতিষ্ঠা করতে রাজনীতির মারপ্যাঁচ, পঞ্চপান্ডবদের জন্মের ইতিহাস কিংবা কারো নাম আক্ষরিক অর্থেই 'দুর্যোধন', 'দুঃশাসন" কোন বাবা মা যে রাখতে পারেননা বরং সেই নামগুলো যে বিকৃত করে লেখা হয়েছে সে বিষয়গুলো যৌক্তিকভাবেই তুলে ধরেছেন। একইসাথে মহাভারতে উল্লিখিত নানারকম অলৌকিক ঘটনার বাস্তবিক ব্যখ্যা তুলে ধরেছেন যেমন একে একে সাত পুত্রকে মেরে ফেলবার পরে ভীষ্মের জন্মের ইতিহাস ব্যখ্যায়।
অন্যদিকে অনার্যদের খলনায়ক হিসেবে দেখাতে গিয়ে বারংবার 'অবৈধ' সন্তান হিসেবে উল্লেখ করাটাও চোখে পড়ার মত। মানুষের জন্মকে 'অবৈধ' হিসেবে উল্লেখ না করেও লেখিকা তার ব্যখ্যা বিশ্লেষণ তুলে ধরতে পারতেন। দ্রৌপদীর পঞ্চপান্ডবের সাথে বিয়ে, দ্রৌপদীকে যুধিষ্ঠিরের পাশা খেলায় বন্ধক রাখা, হেরে যাওয়ায় দ্রৌপদীকে প্রকাশ্যে রাজসভায় অপমান ইত্যাদি প্রহসন যুক্তির মাধ্যমে ভালভাবে তুলে ধরলেও 'দ্রৌপদীকে প্রকাশ্যে রাজসভায় অপমান'কে দুর্যোধন আর কর্ণের প্রতিশোধ হিসেবে জায়েজ করাকে কোনভাবেই মেনে নেয়া যায়না। পড়তে গিয়ে তাই মাঝে মাঝে লেখিকাকে 'রেসিস্ট' মনে হয়েছে।
ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে আরেকবার মহাভারতের ব্যখ্যা পড়া হল এইটুকুই লাভ।
এটাকে মহাভারতের বিশ্লষণধর্মী লেখা বলা যেতে পারে। মহাভারতের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অনেকগুলো বিশেষ ঘটনাগুলোকে তিনি বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করতে চেয়েছিলেন। সর্বোপরি মাইক্রোস্কোপের নিচে সেই সব চরিত্রের তিনি বড় তথা মহৎ করতে চেয়েছেন যারা মহাভারতে অবহেলিত, দুর্জন ও হঠকারী। লেখিকার দৃষ্টিতে আসল মহানুভব হলেন দুর্যোধন ,কর্ণ প্রমুখ যারা সর্বদা নিগৃহীত হয়ে এসেছেন। অন্যদিকে আমরা যাদের মহৎ ভাবি তাদেরকে কলমের খোঁচায় তিনি দুর্জন বানিয়ে দিলেন।এই তালিকায় বিশেষভাবে বিদুর,বেদব্যাস, যুধিষ্ঠির, শ্রীকৃষ্ণ চোখে পড়ার মতো। সবচেয়ে বেশি রোষানলে পড়েন বিদুর ও যুধিষ্ঠির।যেহেতু বইটি বিশ্লষণধর্মী কাজেই নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে আলোচনা করা উচিত ছিল।এক পক্ষের প্রতি অতিরিক্ত স্নেহ রেখে অন্যপক্ষের শুধু ত্রুটি ধরলেই তাকে কিভাবে গবেষণাধর্মী বই বলা যেতে পারে। সর্বোপরি মহাভারতের মহারণ্যে মূল মহাভারত পড়া না থাকলে পথ হারানোর সম্ভাবনা থাকে।তাই মহাভারত পূর্ব পাঠ আবশ্যক। এছাড়া লেখিকার কিছু যুক্তি মনে প্রশ্নের উদ্রেক করে,তাই আবারও মূলে ফিরতে হবে।
সুখপাঠ্য। সহজপাঠ্য। তবে মনে হয়েছে নিজের পয়েন্ট মেক করার জন্য সেলেক্টিভ ইনফরমেশন দিয়ে বিভিন্ন পয়েন্ট মেক করতে চেয়েছেন। মানে বিভিন্ন চরিত্রকে বিচার করতে যেয়ে লেখক প্রচলিত শুধু এমন তথ্যগুলোই সামনে এনেছেন যা তার পূর্বনির্ধারিত সিদ্ধান্তকেই সমর্থন করে। আর লেখক সম্ভবত ছোটলোকদের প্রতি বেশ রুষ্ট। বিভিন্ন চরিত্র যেগুলো নানান দোষে দুষ্ট বলে তিনি দেখাচ্ছেন তারা যে ছোটলোক/নিচু জাত/অনার্য সেটা দেখাতেও তিনি ভুলছেন না। আবার যাদেরকে তিনি বলছেন বীর তারা যে ছোটলোক না সেটাও তিনি পয়েন্ট আউট করেন মাঝেমাঝেই। বেশ আইরনিক্যাল বিষয়টা। কারণ সেভাবে দেখলে এক ভীষ্ম ছাড়া কুরুবংশধর হিসেবে যারা যুদ্ধ করেছে তাদের উল্লেখযোগ্য কোন চরিত্রকেই এখানে উচু জাত বলা যায় না, যা নিয়ে এই বইয়ের লেখক নিজেও দ্বিমত করেন না।
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণের অংশে লেখিকা দুর্যোধন আর কর্ণের ব্যবহারের প্রতি যে সাফাই দিয়েছেন, সেটুকুই অবাস্তব মনে হয়েছে। কোনো অবস্থাতেই স্ত্রী-পুরুষ কারো জন্যেই বস্ত্রহরণের মতো অপমান কাম্য নয়। এইটুকু বাদে পুরো বইটিই ভীষণ বাস্তবতা সম্পন্ন। চিন্তার অনেক উপাদানই রয়েছে এটিতে।
পান্ডব,শ্রীকৃষ্ণ এবং দূর্যোধন কে পুরো ১৮০° কোণ থেকে দেখার প্রচেষ্টা। প্রচলিত ধারণা কে এত ক্রুর ভাবে চ্যালেঞ্জ জানানোয় লেখিকা যথেষ্ট সাহস দেখিয়েছেন৷ যদিও তথ্য উপস্থানের কায়দা অনেকটাই নিজের অনুকূলে।
আমি যখন নিজে কাশীদাসী মহাভারত পড়েছিলাম তখন আমারও পদে পদে শ্রীকৃষ্ণের কাপট্য এবং শঠতা চোখে পড়েছে। কিন্তু মজার বিষয় হলো এই যে তাঁর এবং পাণ্ডবদের প্রতিটি অধার্মিকসুলভ কাজকে দ্বৈপায়ন তাঁর ধূর্ততার মাধ্যমে কিছু রূপকথা এবং অদ্ভুতুড়ে গল্প দিয়ে বৈধতা দিয়েছেন। কৌরবদের অধর্মযুদ্ধে পরাজিত করায় কৃষ্ণের যুক্তি ছিল যে অন্যথায় পাণ্ডবরা "দুরাচারী পাপাত্মা" দের বিপক্ষে জিততে পারতেন না এবং এও তিনি বললেন যে যা হওয়ার তা হবেই, পাণ্ডবরা শুধু নিমিত্তমাত্র৷ মহাভারত নামক বইটিতে পদে পদে দ্বৈপায়ন নামক নির্মোহ ঋষি, বিদুর নামক ধর্ম, যুধিষ্ঠির নামক ধর্মপুত্র, কৃষ্ণ নামক ভগবানকে শুধু লোভ আর লালসার জন্যে এতোকিছু করতে দেখা যায়। পুরো মহাকাব্যে কোথাও দুর্যোধনের অন্যায় এবং অধর্ম বলতে আমি শুধু দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণই দেখতে পাই। তাও সেটা সংঘটিত হতো না যদি যুধিষ্ঠির আসলেই ধর্মপুত্র হতেন। তিনি দুর্যোধনের রাজ্যের প্রতি এতোই লোলুপ ছিলেন যে তিনি সম্পত্তি পণ করে পাশা খেলার প্রস্তাব করেন। কারণ তাঁর ধারণা ছিল যে একবার না একবার তো তিনি দুর্যোধনকে হারাবেনই এবং পুরষ্কার হিসেবে পাবেন সমগ্র হস্তিনাপুর। কারণ এক ইন্দ্রপ্রস্থ তো তাঁর পৃথিবীর সর্বেশ্বর হওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল না। বিদুর এবং তাঁর পিতা দ্বৈপায়নের শঠতায় এবং কৃষ্ণের দুর্বুদ্ধিতে "বিদুরপুত্র" যুধিষ্ঠির হলেন অন্যায়যুদ্ধে জয়ী। আর দুর্যোধন তাঁর ক্ষত্রিয়ধর্ম পালন করেও হলেন "পাপাত্মা"।
প্রতিভা বসুর এই বইটি চিন্তার উদ্রেক করায়। তবে অনেক জায়গায় তাঁর নিজেরও দুর্যোধন এবং উচ্চবংশীয় আর্যদের প্রতি পক্ষপাত লক্ষ্য করেছি। তিনি বারংবার যে ভাষায় নিম্নবর্ণ এবং অনার্যদের হেয় প্রতিপন্ন করেছেন সেটা আমার ঠিক পছন্দ হয় নি এবং কিছুক্ষেত্রে আমি তাঁর অর্জুনের প্রতিও একধরনের পক্ষপাত প্রত্যক্ষ করেছি।
বইটির শেষাংশ আমার খুব ভালো লেগেছে। আর তা হলো: "কিন্তু পার্থিব লীলা সাঙ্গ হবার পর যুধিষ্ঠির স্বর্গে গিয়ে দেখলেন দুর্যোধন সেখানে সম্মানের সঙ্গে উপবিষ্ট। তাঁর পরমতম আত্মীয়গণ তখন নরকে। তাঁকেও কিছুকালের জন্য নরকবাস করতে হয়েছিলো। আসলে স্বর্গ কোথায় কেউ জানে না। কোথায় নরক তা-ও কেউ জানে না। স্বর্গ-নরকের ধারণা এবং অস্তিত্ব মানুষের মনেই। মানুষের মনই তার অব্যর্থ বিচারে দুর্যোধনদের শাশ্বত স্বর্গবাসের গরিমাদান করে পাণ্ডবদের নরকদর্শন করিয়েছিলো।"
মোটের ওপর বলতে হয় যে বইটি মহাভারতকে সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে বাধ্য করবে এবং রাজনীতি, রাজ্য এবং ক্ষমতার লোভের নোংরা খেলাটা বিভিন্ন পর্যায়েই বিবমিষার উদ্রেক করবে। বইটি আমার মোটামুটি ভালোই লেগেছে।
মহাভারত নিয়ে অনেক যৌক্তিক প্রশ্ন তুলেছেন প্রতিভা বসু। কখনো কখনো সেটাকে কুন্তি, বিদুর আর যুধিষ্ঠিরের প্রতি চরম বিদ্বেষে গিয়ে ঠেকেছে। কৃষ্ণ’রও যথেচ্ছ সমালোচনা রয়েছে। মহাকাব্য বা মহাগ্রন্থ নিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে সত্যান্বষণের চেষ্টা কম দেখা যায়। সেই চেষ্টায় প্রতিভা বসু সফল। পুরো মহাভারতের মাহাত্ম্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে তাঁর লেখায়।
গজেন মিত্রের 'পাঞ্জজন্য' পড়ার পর 'কৃষ্ণকাহিনী মহাভারত' পড়তে পড়তেই এটা পড়ছিলাম। বই দুটা পরিপূরক হতে পারে। আর মহাভারত পড়ার পর এই দুটা পড়ে দেখা যেতে পারে। চোখের সামনে অন্য দুয়ার খুলে যাবে মহাভারতের।