কোন উ সেন? সেই যে বার্মায় রানার কাছে হেরে গিয়ে ক্রোধান্মত্ত এক দোর্দন্ডপ্রতাপ দস্যু শপথ নিয়েছিল - 'মাসুদ রানা। তুমি মস্ত ক্ষতি করলে আমার। বাঁচতে পারবে না তুমি আমার হাত থেকে। প্রস্তুত থেকো, আজ হোক, কাল হোক, দশ বছর পর হোক - প্রতিশোধ নেব আমি।' [রক্তের রঙ -২] - মনে আছে? এতদিন পর সেই প্রতিশোধ নিতে যাচ্ছে দুর্ধর্ষ গুপ্ত-সংগঠন ইউনিয়ন কর্সের সর্বাধিনায়ক কাপু - সেই উ সেন।
মাসুদ রানার বিরুদ্ধে এটা তার ব্যক্তিগত আক্রোশ। পর পর ছয়বার আক্রান্ত হয়ে শেষে মরিয়া হয়ে ঘুরে দাঁড়াল রানা।
কাজী আনোয়ার হোসেন ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জুলাই ঢাকায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরো নাম কাজী শামসুদ্দিন আনোয়ার হোসেন। ডাক নাম 'নবাব'। তাঁর পিতা প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, গণিতবিদ ও সাহিত্যিক কাজী মোতাহার হোসেন, মাতা সাজেদা খাতুন। কাজী আনোয়ার হোসেন সেবা প্রকাশনীর কর্ণধার হিসাবে ষাটের দশকের মধ্যভাগে মাসুদ রানা নামক গুপ্তচর চরিত্রকে সৃষ্টি করেন। এর কিছু আগে কুয়াশা নামক আরেকটি জনপ্রিয় চরিত্র তার হাতেই জন্ম নিয়েছিলো। কাজী আনোয়ার হোসেন ছদ্মনাম হিসেবে বিদ্যুৎ মিত্র নাম ব্যবহার করে থাকেন।
প্যারিস থেকে রোমে ফিরছিল রানা। বিমানবন্দরে যাওয়ার পথেই ওর ওপর ভয়ংকর হামলা হলো। অল্পের জন্য বেঁচে গেল। না, এবারই প্রথম নয়। প্যারিসে আগে আরও চারবার রানাকে হামলা করেছে ফ্রান্সভিত্তিক কুখ্যাত অপরাধী সংগঠন ইউনিয়ন কর্স। কর্সের বর্তমান প্রধান বা কাপু উ সেন। যাকে বার্মাতে উচিত শিক্ষা দিয়েছিল রানা। সেই কাপু উ সেন এবার শিক্ষা দেবে রানাকে।
ঢাকায় ফিরে বিসিআইতে জরুরি সভা বসলো। আলোচ্যসূচি রানার নিরাপত্তা। সবাই প্রস্তাব করলো কাপু উ সেনকে সরিয়ে দিতে সর্বাত্মক হামলা করবে বিসিআই। কিন্তু বেঁকে বসলো রানা। সে একাই খতম করবে কাপু উ সেনকে। একথা শুনে আঁতকে উঠলো সবাই। কারণ খুব স্পষ্ট। কাপুর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্টের চাইতেও কড়া। এমনকি ফ্রান্সের নিরাপত্তাবাহিনীর সবগুলো বড় পদ দখল করে আছে ইউনিয়ন কর্সের সমর্থকেরা। এমন অবস্থায় কাপুকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেওয়ার অর্থ পুরো ফ্রান্স এবং তার মিত্রদেশগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করা। কিন্তু রানার অভিধানে তো পশ্চাদপসারণ নেই। এদিকে রানার পরিকল্পনা জেনে ফেলল উ সেন। মাসুদ রানার বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিল পুরো ফ্রান্সের রাষ্ট্রযন্ত্রকে।
একদিকে ফ্রান্স এবং তার মিত্রদেশগুলির নিরাপত্তাবাহিনী। অন্যদিকে স্রেফ একা মাসুদ রানা। শুরু হলো স্মরণাতীত কালের সেরা এক ম্যান হান্ট!
"সেই উ সেন" বইটি ফ্রেডরিখ ফরসাইথের বিখ্যাত উপন্যাস "দ্য ডে অফ দ্য জ্যাকল"-এর ছায়ায় রচিত। মূল উপন্যাসটি পড়েছি। সেই উ সেন মূল উপন্যাসকে পুরো অনুসরণ করেনি। বরং কাহিনিকে মাসুদ রানার মতো করে সাজানো হয়েছে। যা অত্যন্ত সুখপাঠ্য আ্যডাপশন।
বেশিরভাগ পাঠকের মতে মাসুদ রানার অন্যতম সেরা বই হল "সেই উ সেন"।এবং আমার মতামত একই( যদিও মাত্র ৩টি বই পড়া হয়েছে এখন পর্যন্ত)।মাসুদ রানার এবারের মিশন ইউনিয়ন কর্সের কাপু উ সেন কে হত্যা করা।কাপু উ সেনের নিরাপত্তা ব্যাবস্থাকে বিবেচনা করা হয় পৃথিবির অন্যতম সেরা, সেই হিসেবে এটি একটি অসম্ভব মিশনই বটে।
সেই উ সেন বইটি মূলত ফ্রেডরিখ ফরসাইথের " দি ডে অফ দি জ্যাকেল" বই এর ছায়া অবল্মবনে লেখা, যেটি আমার ৫-৬ আগে পড়া হয়েছিল।তারপর ও আমি প্রথম পার্ট শেষ হওয়ার আগ পযর্ন্ত আমি মিল ধরতে পারিনি,এর মূল কারণ হল বইটিতে যথেষ্ট মৌলিকতা ছিল।আগে থেকে পড়া থাকা সত্তেও বইটি পড়া চালিয়ে গিয়েছি কারণ আমি নিশ্চিত ছিলাম এই বইয়ের শেষটা দি ডে অফ দি জ্যাকেলের মত হচ্ছে না। ফিনিশিংটা ও দারুণ হয়েছে।
থ্রিলার পাঠকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য একটি বই।শুরু থেকে শেষ পযর্ন্ত দারুণ গতিতে গল্প এগিয়েছে। একদিকে দুনিয়া সেরা স্পাই মাসুদ রানা অপর দিকে দুনিয়া সেরা গোয়েন্দা ক্লড র্যাবো এবং শক্তিশালী ইনিয়ন কর্সের ত্রিমুখী লড়াইটা দারুণ জমেছিল।সবমিলিয়ে আমার পড়া অন্যতম সেরা একটি বই।
এক কালের ব্যাপক সাড়া জাগানো রানা'র এই পর্বটি আবার পড়ায় ক্ষতিটা হলো এই যে, এখন মুগ্ধতা কেটে গিয়ে ফাঁকফোকরগুলো চোখে পড়েছে। প্রায় চল্লিশ বছরে গোটা দুনিয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় যে বিপুল, ব্যাপক ও আমূল পরিবর্তন এসেছে তাতে আজকের দুনিয়ায় নকল পরিচয়পত্র যোগাড় করা, সীমান্ত পার হওয়া, নিরাপত্তাবাহিনীকে ফাঁকি দেয়ার রানা'র কায়দাগুলো আর কাজে আসার কথা না। উলটো দিকে চল্লিশ বছরে তথ্য যোগাযোগ প্রযুক্তিতে যে অচিন্ত্যনীয় উন্নতি ঘটেছে তাতে আজকের প্রযুক্তি পেলে রানা'র পক্ষে নিশ্ছিদ্র এক তথ্য যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হতো। সেক্ষেত্রে রূপা, লুইসা বা বিসিআই হেডকোয়ার্টারের সাথে যোগাযোগ রাখার জন্য এত কিছু করতে হতো না।
প্রথম খণ্ডের অষ্টম অধ্যায়ের একটা জায়গা উদ্ধৃত করছি -
“ছোট্ট শহর। উনিশশো চুয়াল্লিশ সালের শীতকালে Hasso Von Manteuffel-এর King Tigar ট্যাঙ্কগুলো গোলা ছুঁড়ে গোটা শহরটাকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু ধ্বংসের একবিন্দু চিহ্ন কোথাও অবশিষ্ট নেই দেখে মনে মনে বেলজিয়ানদের দেশপ্রেম এবং শ্রম-প্রবণতার প্রশংসা না করে পারল না রানা। ধ্বংসস্তূপের উপর নতুন করে গড়ে তুলেছে তারা শহরটাকে। এ ধরনের দৃষ্টান্ত অবশ্য গোটা ইউরোপ এবং এশিয়ার জাপান ও কোরিয়ায়ও ভূরি ভূরি লক্ষ করা যায়। প্রাসঙ্গিকভাবেই নিজের দেশ আর দেশবাসীর কথা মনে পড়ে গেল রানার। নিজের অজান্তেই একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। দেশের বর্তমান হাল দেখে ভবিষ্যতের কথা ভাবতে ভয় হয় ওর। ছোট্ট একটু জায়গা, তাতে গিজগিজ করছে কোটি কোটি মানুষ। খরা, পোকা আর বন্যার ত্রিমুখী আক্রমণে ফসলের দফা সারা। পাব পাব করেও পাওয়া আর হচ্ছে না তেল। সীমিত সম্পদ, তাও লুটেপুটে খাচ্ছে দুর্নীতি নামের রাক্ষসটা। নৈতিকতা এখন পরাজিত সৈনিক, বেশির ভাগ মানুষ তাকে পা দিয়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে। এসবের পরে রয়েছে আন্তর্জাতিক কূটনীতির ষড়যন্ত্র, ইজমের দৌরাত্ম্য, কর্মবিমুখতা, ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। মাছ ধরার জাল পরা, অভুক্ত, হাড্ডিসার কুলবধূ বাসন্তীর ছবিটা চোখের সামনে ভেসে উঠতেই গায়ের রোম দাঁড়িয়ে পড়ল রানার। কপালের পাশে দপ্ দপ্ করছে একটা শিরা।“
নিঃসন্দেহে এই অংশটুকু পুরোই কাজী আনোয়ার হোসেনের মৌলিক রচনা। চল্লিশ বছরে এই ভাবনার যা যা কিছু পাল্টালো -
১. খরা, পোকা আর বন্যার ত্রিমুখী আক্রমণের মধ্যে পোকা পুরোপুরি আয়ত্বে এসেছে, খরা আছে তবে অতোটা জোরালো নয়, বন্যা আছে তবে তাতে খাদ্য নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় না।
২. বাংলাদেশ তেলের উপর ভাসছে - এমন রূপকথার গল্প ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। প্রায়ই নানা পীর-ফকির ও রাজনীতিবিদরা এই ধারনাটাকে এনডোর্স করতো। অবশ্য ভূতত্ত্ববিদ, খনিজবিজ্ঞানী ইত্যাদি সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের কাছ থেকে এমন কথা শোনা যেতো না। সাধারণ মানুষের অধিকাংশ জন তাদের লৌকিক জীবনের অভাবের অলৌকিক সমাধান হিসাবে কথাটা বিশ্বাস করতেন। এখন আর কথাটা শোনা যায় না। আগে যারা এটাকে এনডোর্স করতো তারা এখন এসব কথা ভুলে গেছে।
৩. এখনকার বাংলাদেশে ইজমের দৌরাত্ম্য ঢাকার পুরানা পল্টন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। নতুন আপদের উদ্ভব হয়েছে বটে, তবে পুরনো ইজমগুলো দেউলিয়া হয়ে বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছে।
৪. বাসন্তীর বানোয়াট ছবিটার মূল সত্যটা আজ লোকে জেনে গেছে। তাই এটা আর কোন ইস্যু নয়। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে এই যে, এই জঘন্য কাজটা যারা করেছিল তাদের কোন বিচার বা শাস্তি হয়নি।
রক্তের রং-এ চমৎকার একটা চরিত্র ছিল উ সেন। কিন্তু এখানে একদম পেছনে ছিল সে। তার আবির্ভাব হয়েছেই যেন খুন হওয়ার জন্য। কাহিনীর খাতিরে হয়তো ঠিকাছে। কিন্তু এমন একজন ভিলেনের ক্ষেত্রে বিষয়টা মানা কঠিন। সবচেয়ে ভাল ছিল ক্লড র্যাঁবো আর রানার ইঁদুর-বিড়াল খেলাটা। প্রথম অংশ গেছে প্রস্তুতি নিতে, দ্বিতীয় অংশ এক্সিকিউশন। ওভারঅল, ভালো জিনিস। :)
কয়েকদিন আগে ফেসবুকের একটা কমেন্ট থেকে বইটির সারসংক্ষেপ জেনে আগ্রহী হই। কিন্তু বইটার নাম জোগাড় করতে পারিনি। তখন থেকে বইটি খুঁজে চলেছি। হঠাৎ করেই আজ পেয়ে গেলাম। রানার সঙ্গে দেশ দেশান্তর ঘুরে এসে মনে হচ্ছে, জীবন আসলে বেশ সুন্দর। 🤍
ফ্রেডরিখ ফরসাইথের বিখ্যাত উপন্যাস ডে অব দ্যা জ্যাকেল অবলম্বনে নির্মিত সিরিজ দেখার পর থেকেই মূল উপন্যাস পড়ে ফেলার ইচ্ছে ছিলো। তার আগেই পাওয়া গেলো তার অবলম্বনে লেখা মাসুদ রানার এক বই এর খোঁজ। সঙ্গে সঙ্গেই বই খুজে পড়ার শুরু।
মাসুদ রানার ব্যক্তিগত শত্রুদের তালিকায় 'উ সেন' এর নাম আসবে উপরের দিকে। সেই উ সেন যখন মরণ কামড় দিয়ে যাচ্ছে বারবার, তখন রানাও শেষ কামড় দেবার জন্য বেরিয়ে পড়ে। তারপর অনেক চড়াই-উৎরাই আর বিপদ পেরিয়ে শেষ দাঁত বসানো পর্যন্ত পুরো যাত্রাটাই রোমাঞ্চকর।
রানা সিরিজের অন্যতম সেরা একটি বই। উ সেন অনেক ক্ষতি করেছে রানার, ওর অনেক প্রিয় মানুষদের ছিনিয়ে নিয়ে গেছে ওর কাছ থেকে। এবার রানার প্রতিশোধ নেবার পালা। তবে উ সেন ছিলো নেংটি ইঁদুরের মতো পিঞ্জিরার মধ্যে। রানার পেছনে লেলিয়ে দিয়েছিলো নিজের ইউনিয়ন কর্সের বাহিনীর পাশাপাশি ফ্রান্সের গোয়েন্দা পুলিশ বিভাগকেও। সেই রকম একটা চেজিং স্টোরি। রানার একের পর এক ছদ্মবেশ ধারণ আর পরিচয় পাল্টানো, পুরো ফ্রেঞ্চ পুলিশ বিভাগকে বার বার ঘোল খাওয়ানো ইত্যাদি মিলিয়ে শরীরের লোম বার বার শিউরে উঠছিলো। ইউনিয়ন কর্সের সম্মিলিত শক্তি, কাপু হিসেবে উ সেনের পরাক্রমশালী ক্ষমতা সবকিছু মিলিয়ে বিসিআই-এর সবাই ধরে নিয়েছিলো রানা পারবে না, ও স্রেফ আত্নহত্যা করতে চলেছে। অথচ বারে বারে মন বলেছে, রানা পারবে। ওর কিছুই হবে না। দুনিয়ার কারও সাধ্য নেই ওর কিছু করার।
উ সেন কবির চৌধুরীর থেকে কোন অংশে কম ছিল না। আমার মতে উ সেনকে আরো কিছু গল্প পর্যন্ত নেয়া যেত। বইটা ভালোই লেগেছে। প্রস্তুতি, এক্সিকিউশান, ক্লড-র্যাঁ বো সব মিলিয়ে অসাধারণ।