ছোটবেলা থেকে আগুনমুখার নাম শুনেছি সকলের মুখে মুখে। একটা ভীতির শিহরণ জাগতো শরীরে-মনে এই নামটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে। আগুনমুখার ভয়ানক মূর্তি ছিল কিংবদন্তীর মতো। আগুনমুখা সাত নদীর মোহনা বা সঙ্গম স্থান। তাই চারদিক কেবল থেকে উত্তাল জলরাশি চোখে পড়তো। প্রবল ঢেউয়ের ওপর প্রতিফলিত সূর্যরশ্ণি জ্বলন্ত আগুনের লেলিহান শিখাকে মনে করিয়ে দিতো। এ জন্যই সম্ভবত এর নাম আগুনমুখা। এপার ওপার করার সময় চারদিকে কিছুই চোখে পড়তো না। শুধু জলরাশি আর জলরাশি। আমার মা, খালা, দাদি এবং গ্রামবাসীর কাছে শুনেছি, এই অঞ্চলের মেয়েরা শাশুড়ি,ননদ এবং স্বামীর অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য এই আগুনমুখায় ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তি পেত। প্রেমিক-প্রেমিকারও বাড়ি তথা সমাজে স্বীকৃতি না পেলে আগুনমুখার কোলেই যুগল আশ্রয় নিত। বড় নৌকায় আগুনমুখা পাড়ি দেওয়ার সময় কত মানুষ যে প্রাণ হারিয়েছে, তার হিসাব কেউ কখনো রাখে নি।
এখন অবশ্য আগুনমুখার চেহারা অনেক বদলে গেছে । কারণ প্রতিনিয়ত পুরনো চর ভাঙছে এবং নতুন চর জেগে উঠেছে। প্রকৃতির এই নির্মম খেলার যারা সাক্ষী তারাই শুধু জানেন আগুনমুখা তাদের জীবনে কী দিয়েছে এবং কী নিয়েছে। এখন লঞ্চে করে আমাদের বাড়ি কাঁটাখালী থেকে গলাচিপায় আসতে-যেতে সময় লাগে চার ঘন্টা ।ওই অঞ্চলে স্কুল হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ,স্বাস্থ্য ক্লিনিক,হাসপাতাল বা সাধারণ মানুষের উপযুক্ত কোনো বাসস্থানের ব্যবস্থা হয়নি। ঝড়, বন্যা, সাইক্লোলনে মানুষ এখনো প্রকৃতির দয়ার ওপর নির্ভরশীল। প্রসূতি ও শিশুমৃত্যুর হার ওখানে সবচেয়ে বেশি। পরিবার পরিকল্পনার কোনো ব্যবস্থা নেই। বিদেশি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকেও ওই অঞ্চল সম্পর্কে কোনো ধারনাই দেয়া হয়নি।
আমার জীবনে আগুনমুখার প্রভাব অন্তহীন। এই অঞ্চলের সমগ্র জনগোষ্ঠী আমার আত্নার আত্নীয়। এদের সুখ-দু:খের কাহিনী আমার জীবনেরসুখ-দু:খের কথা। তাই আমার জীবনকাহিনৗ আগুনমুখার মেয়েরই কাহিনী।
নূরজাহান বোস-এর জন্ম বড় বাইশদিয়া দ্বীপ, বাংলাদেশে। পিতা আবদুর রাজ্জাক, মাতা জোহরা বেগম। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত বাড়ির স্কুলে পড়াশোনা। মায়ের উৎসাহে সমস্ত প্রতিকূলতা জয় করে পটুয়াখালি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন (১৯৫৪)। মার্কসবাদী যুবনেতা ইমাদউল্লাহ-র সঙ্গে বিয়ে ১৯৫৫ সালে। অল্পদিন পরেই স্বামীর অকালমৃত্যু এবং মা হওয়া। ১৯৬২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস নিয়ে বি এ পাশ করেন এবং এম এ-তে ভর্তি হন। মার্কসবাদী নেতা ও অর্থনীতিবিদ স্বদেশ বোসের সঙ্গে বিবাহ, করাচি এবং কেম্ব্রিজ যাত্রা। ১৯৭১-এ ঢাকা ফিরে আসেন। স্বামীর চাকরি-সূত্রে এরপর ওয়াশিংটন যাত্রা। ক্যাথলিক ইউনিভারসিটি অব আমেরিকা থেকে ১৯৮১ সালে সোশ্যাল ওয়ার্ক-এ এম এ। জীবন-সায়াহ্নে মাতৃভূমি বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন। বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজের সঙ্গে বর্তমানে যুক্ত।
গদ্যে খামতি চোখে পড়ে মাঝেমধ্যেই, কথাও কিছুটা অগোছালো। কিন্তু নূরজাহান বোসের মনোবল এতোই অদম্য যে সব ত্রুটি ভুলে যেতে ইচ্ছে করে। পাকিস্তান আমলে, প্রবল পুরুষতান্ত্রিক সমাজে যেভাবে তিনি পড়ালেখা করেছেন, যেভাবে সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তা পিছিয়ে পড়া যে কোনো মানুষের জন্য অনুসরণযোগ্য।
২০১৭ সালে প্রথমবারের মতো পড়ি 'আগুনমুখার মেয়ে'। তখন নূরজাহান বোসকে চিনতাম না। বইটি নিয়ে অনুভূতি হয়েছিল ভালো-মন্দ মেশানো। তাতে মন্দের ভাগ কিঞ্চিৎ বেশি। আবার, সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিতীয়বারের মতো পড়তে গিয়ে নূরজাহান বোসকে বুঝতে পেরেছি তা দাবি করাও পুরোপুরি সত্য হবে না। তবে এবার কিছুটা গভীরভাবে বরিশালের কাটাখালীর সন্তান নূরজাহান বোসের সংগ্রামকে উপলব্ধি করতে সফল হয়েছি - এটুকু নির্দ্বিধায় বলতে পারি। তাঁর আত্মকথা বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত। শুধু কনটেন্ট বিচার করলে বইটা পুরস্কৃত হওয়ার মতো কি না, তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। কিন্তু নূরজাহান বোসের সংগ্রামী জীবনকে বোঝার চেষ্টা করলে পাঠক হিসেবে ভিন্নরকম অনুভূতি হতে বাধ্য।
মুসলিম লীগ ও আওয়ামী লীগের বিপরীতে একেবারেই ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল একটি সংগঠন হিসেবে গড়ে উঠেছিল যুবলীগ। এই সংগঠনটির সভাপতি ছিলেন ইমাদুল্লাহ। তরুণ ইমাদুল্লাহ কালের গহ্বরে হারিয়ে গেছেন। তাঁকে ইতিহাস মনে রাখেনি। স্মরণ করেনি, অলি আহাদ, শেখ মুজিবসহ তার রাজনৈতিক সহযোদ্ধারা। কিন্তু নূরজাহান বোসের আত্মস্মৃতিতে সূর্যের মতো আলোকিত হয়ে আছেন। তাঁর মৃত্যু ব্যক্তিগত জীবনে নূরজাহান বোসের সবচেয়ে বড়ো আঘাত। আবার, বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রগতিশীল একজন মানুষের শূন্যতা তৈরি করেছিল এই অকালমৃত্যু।
আমাদের সমাজ নারীদের জন্য সহনশীল তা নিশ্চয়ই বাতুলের পক্ষেও বিশ্বাস হবে না। ছয় থেকে সাত দশক আগে একজন নারীর সংগ্রামকে আজকের সময়ে বসে বিচার করা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। কারণ পরিবর্তন বিশেষ হয়েছে এমন মনে হয় না।
অর্থনীতিবিদ স্বদেশ রঞ্জন বোসকে নিয়ে আলোচনা হয় না। তাকে নিয়ে জানার সুযোগ করে দিয়েছেন নূরজাহান বোস।
মোটকথা, 'আগুনমুখার মেয়ে' আত্মজীবনী হিসেবে অত্যন্ত উচ্চমানের নয়। গদ্যশৈলী মাঝারি মানের। আত্মসমালোচনা পাইনি। তা-ও এই আত্মস্মৃতি বাঙালি সমাজের এক নারীর সংগ্রামের কাহিনি। যে সংগ্রাম রূপকার্থে লাখ লাখ নারীর প্রতিনিধিত্ব করে।
যে বই ২০১০/১১ সালে লিস্ট করা হইছিল সেই বই ২০২২ সালে এসে পড়লাম। আসলে জীবন বড় অদ্ভুত। আগুনমুখার মেয়ের জীবনের মতোই অদ্ভুত। নূরজাহান বোসের গল্প বলা ভালো, তবে গদ্যের বাঁধুনি কিছু কম। অবশ্য সাহিত্যিক তো উনি না যে অসাধারণ গদ্য হতে হবে। জীবনের যে সময়ের কথা উনি বলছেন, আসলে পুরো জীবনের কথাই বলেছেন, সেখানে যখন যে সময়ের কথা বলেছেন সব অনুপুঙ্খু মনে হয়েছে। এ বইয়ের সেটাই সবচেয়ে ভালো এবং অবাক করা দিক। কিন্তু মজার ব্যপার হলো জীবন সায়াহ্নে এসেও এ বইয়ে যে আবেগ তিনি প্রকাশ করেছেন, পাঁড় পাঠকের জন্য সেটা কখনো কখনো একটু আতিশয্য মনে হতে পারে। নারীদের নিয়ে তার বক্তব্য সঠিক কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে একচোখা। একদিকই তিনি দেখেছেন। অবশ্য একটা সময়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের মধ্যে নানা ধরনের প্রাকৃত প্রবণতা ছিল একটা সত্যি। সেখানে নূরজাহান কোন বিশ্লেষণে যাননি, আবেগের প্রকাশ করেছেন। আরেকটু তলিয়ে ভাবলে এবং প্রকাশ করলে ভালো লাগত। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ঢাকার বর্ণনা, নিজের জীবনের কথা, ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এই সময়ের প্রামাণ্য বয়ান হিসেবে থাকবে। সেই সঙ্গে বরিশাল, পটুয়াখালীর স্মৃতি এবং সেখানকার মানুষের কথা জানার ক্ষেত্রেও ভালো একটা বই।