বাংলায় ‘ইম্পসিবল মিস্ট্রি স্টোরি’ খুব বেশি লেখা হয়নি। এই সংকলনের কাহিনিগুলি উজ্জ্বল ব্যতিক্রম। এখানে বন্ধ ঘরের ভেতরে খুনের গল্প আছে একাধিক। আছে পুলিশের ঘেরাটোপের মধ্যে থেকে অপরাধীর উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা, প্রহরায় ঘেরা ঘরের মধ্যে বিস্ফোরণের রহস্য, এমনকী মৃত মানুষের ফিরে আসার অসম্ভব দৃশ্য অবধি। যতক্ষণ না রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার উমাশঙ্কর চৌবে অর্থাৎ চৌবেসাহেব মাথা খাটিয়ে প্রতিটি ঘটনার আড়ালের বাস্তব সব শয়তানি ধরে ফেলছেন, ততক্ষণ অবধি পাঠকের মনে হতে বাধ্য যে, তিনি বুঝি কোনো অলৌকিক গল্পই পড়ছেন। আরো একটা কথা। চৌবেসাহেবের কোনো গল্পের প্লটই অনর্থক জটিল নয়। একগাদা চরিত্রের ভিড়ও নেই। তাই রুদ্ধশ্বাস রোমাঞ্চকর যেমন, তেমনই এগিয়ে চলে ঝরঝর গতিতে।
গল্প
খেলার নাম খুন আঁকাবাঁকা শেষ লেখা ভবানী ভ্যানিশ ছক্কা পুট তেরো নম্বর ছোরা রুপোর কাঠি ঠান্ডা মাথায় খুন হাতের মুঠোয় মৃত্যু খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না
উপন্যাস
সেই হাত জ্যান্ত সেগুনবন অন্ধকার মৃত্যু আসে পায়ে পায়ে
তাঁর জন্ম এবং বড় হওয়া হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরাজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর উপাধি অর্জনের পরে তিনি রাজ্য সরকারের অধীনে আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। দীর্ঘ দুই-দশকের লেখক-জীবনে তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং কিশোর-সাহিত্য, উভয় ধারাতেই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য তিনি যখন গল্প-উপন্যাস লেখেন, তখন ঘটনার বিবরণের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দেন মানব-মনের আলোছায়াকে তুলে আনার বিষয়ে। লেখকের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের কাছাকাছি। তাঁর বহু কাহিনি রেডিও-স্টোরি হিসেবে সামাজিক মাধ্যমে সমাদর পেয়েছে। সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার এবং নান্দনিক সাহিত্য সম্মান।
আজকাল প্রকাশনীর মতি গতি বুঝিনা। বইটিতে ৯ টা গল্প আর ৩ টি উপন্যাসিকা আছে। তার মধ্যে ৬ টি গল্প ও ১ টা উপন্যাসিকা নিয়ে ইতোমধ্যে দ্য ক্যাফে টেবল থেকে 'খেলার নাম খুন' নামে একটা বই প্রকাশিত হয়েছে। আরেকটা উপন্যাসিকা কিশোর ভারতী থেকে পড়েছিলাম। অর্থাৎ নতুন গল্প বলতে সামান্যই। নতুন গল্পগুলো নিয়ে একটা ছোট বই প্রকাশ করলে ক্ষতি কোথায়? এটা তো আর সমগ্র ১, ২......না। এর পর আর দুটো গল্প আর একটা উপন্যাস নিয়ে তার সাথে এই বই যোগ করে আরো বড় একটা প্রকাশ করবে এটাই সম্ভবত এদের প্লান। মানে শুধু পাঠক মারা কলবল। যাইহোক, 'সেগুনবন অন্ধকার' ভালো লাগেনি। নতুন গল্পগুলোও ঠিক জম্পেশ না। কিন্তু শেষ উপন্যাসিকা 'মৃত্যু আসে পায়ে পায়ে' ভালো লেগেছে। ফলে প্রিয় চৌবে সাহেবের জন্য ৪*।
"ক্রাইমের ব্যাপারটাও একদম এইরকম। চোখের সামনে যত বেশি ছড়িয়ে থাকে, ততই ধরা কঠিন হয়ে যায়।"
সেই ধরতে পারা কঠিন ধরনের Imposible Crime-এর বেশ কিছু গল্প শুরু হয় এমন কিছু ঘটনা দিয়ে, যেগুলো প্রথমে পড়লে মনে হয় - এ কি অলৌকিক? কড়া পাহারার মধ্যে বি-স্ফো-র-ণ, বন্ধ ঘরে খু-ন, পুলিশের চোখের সামনে থেকে উধাও হয়ে যাওয়া অভিযুক্ত, গুম্ফার বন্ধ করে প্রেত-ইয়েতির হাতে খু-ন, এমনকি মৃ-ত মানুষের ফিরে আসা - সব কেসে সব পাজল মিলিয়েও যখন সমাধান প্রায় অসম্ভব , ঠিক তখনই মঞ্চে আসেন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার উমাশঙ্কর চৌবে। বাংলায় এই ঘরানা খুব কম ব্যবহার হলেও, সৈকত মুখোপাধ্যায়ের লেখার নিপুণতা ও অন্য ধারার রহস্যসন্ধানের কারণে প্রায় সব পাঠকের কাছেই চৌবেসাহেব আজ কম-বেশী পরিচিত।
চৌবেসাহেবের সঙ্গে থাকা বিনায়ক চরিত্রটিও গুরুত্বপূর্ণ। এই দু’জনের সহযোগিতাই বইয়ের ভেতরের আসল তদন্তপ্রক্রিয়াকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। বিনায়ক এভিডেন্স জোগাড়ে দক্ষ, ফরেন্সিক আর নথিপত্রে বিশ্বাসী। চৌবেসাহেবের সবচেয়ে বড় শক্তি deduction। তিনি নিজেও জানেন - ঘটনাস্থলে কে কী দেখল, কে কী শুনল, তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হলো অপরাধীর মাথার ভেতরে ঢুকে পড়া। এই বইয়ের গল্পগুলো তাই ‘whodunit’-র চেয়ে অনেক বেশি করে ‘howdunit’ নিয়ে। অনেক সময় অপরাধী শুরুতেই ধরা পড়ে যায়, তবু গল্পের টান কমে না - কারণ পাঠক জানতে চায়, এই অসম্ভব কাজটা সম্ভব হলো কীভাবে।
এহেন চৌবেসাহেব কিন্তু প্রথম থেকেই একজন পুলিশ অফিসার হওয়ার সিদ্ধান্ত নেননি। পরিস্থিতি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে এবং পরে স্বয়ং বিনায়কও স্বীকার করেছেন যে - "ভগবান আপনাকে তৈরি করেছিলেন গোয়েন্দা হিসেবে, আর কোন কাজে আপনাকে মানাতো না।" সেই উপলব্ধির স্মৃতিচারণ, প্রকৃত অর্থে চৌবেসাহেবের প্রথম রহস্যানুসন্ধানের কথাও বলে বইয়ের সর্বশেষ উপন্যাস 'মৃত্যু আসে পায়ে পায়ে'।
এই impossible crime বা locked room mystery ঘরানাটাই বাংলায় খুব কম ব্যবহৃত, সৈকতবাবু এখানে সেই ঝুঁকিটা নিয়েছেন এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সফল। প্লট অকারণে জটিল নয়, চরিত্রের ভিড় নেই, গল্প এগোয় ঝরঝর করে। ভয় দেখিয়ে বা রক্তারক্তি দেখিয়ে উত্তেজনা তৈরি করে না। টুইস্ট আছে, কিন্তু বাড়াবাড়ি নেই। 'খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না' গল্পটির নামকরণই একটা অসাধারণ টুইস্ট। উত্তরবঙ্গের পাহাড়, জঙ্গল, নিঃসঙ্গতা - সব মিলিয়ে একটা আলাদা আবহ তৈরি হয়, যেটা গল্পের সঙ্গে বেশ মিশে যায়। তাই কিশোর পাঠক থেকে শুরু করে প্রবীণ পাঠক - সবাই নিজের মতো করে উপভোগ করতে পারেন।
এই সংকলন তো শেষ হলো, আশা করবো চৌবেসাহেবের আবার ফিরে আসার, আরও কিছু অসম্ভবকে যুক্তির জালে ধরে সমাধান করার। কারণ তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি চাকরি থেকে অবসর নিলেও, মাথার ভেতরের গোয়েন্দাটা কোনোদিন অবসর নেন না।
উমাশঙ্কর চৌবে - একজন রিটায়ার্ড পুলিশ অফিসার। চাকরি শেষে সস্ত্রীক দোতলা বাড়িতে বাস করেন। বিনায়ক বসু আলিপুরদুয়ারার ওসি। তিনি বিভিন্ন কেইসে আঁটকে গেলে উমাশঙ্কর চৌবের শরণাপন্ন হন।
জটিল কেইসের সমাধানে উমাশঙ্কর চৌবে বেশ দক্ষ। বলা হয়ে থাকে যে, অন্যরা যেখানে আটকে যায়, চৌবে মহাশয় সেখান থেকেই আরম্ভ করেন।
সবগুলো কাহিনি বেশ ভালো লেগেছে। বিশেষ করে শেষ কাহিনিটাকে বইয়ের সবচেয়ে সেরা বলে মনে হয়েছে।
নয়টি গল্প ও তিনটি উপন্যাস নিয়ে এই সংকলন গল্পগুলো হচ্ছে -- খেলার নাম খুন আঁকাবাঁকা শেষ লেখা ভবানী ভ্যানিশ ছক্কা ফুট তেরো নম্বর ছোরা রুপোর কাঠি ঠান্ডা মাথায় খুন হাতের মুঠোয় মৃত্যু খাচ্ছে কিন্তু গিলছেনা
উপন্যাস তিনটি হল
সেই হাত জ্যান্ত সেগুন বন অন্ধকার মৃত্যু আসে পায়ে পায়ে
উমাশঙ্কর চৌবে সাহেবকে প্রথম শুনেছি মিরচি বাংলাতে খেলার নাম খুন গল্পটা শোনা সেখান থেকেই ,উমাশঙ্কর চৌবের সম্পর্কে একটা দারুন কৌতূহল জন্মায়। কৌতূহলের প্রধান কারণ বলতে গেলে হত্যার রহস্য সমাধানের যে প্রক্রিয়া অসম্ভব তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা আর সামনে পড়ে থাকা সমাধান গুলোকে আমরা যেগুলো ইগনোর করে থাকি সেই গুলোকে জড়ো করে এনে রহস্য সমাধান করা। এই বইটিতেও বারে বারে সেই ঘটনাগুলোই ঘটেছে সেভাবেই অসম্ভব তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা দিয়ে সল্ভ করেছেন একের পর এক মার্ডার মিস্ট্রি, একের পর এক রহস্যের জাল গুটি এনেছেন চৌবে সাহেব । আর গোয়েন্দা গল্পের যে দিকটির লেখক বারবার উন্মোচন করেছেন সেটি হল বড় বড় জিনিসের মাঝে হারিয়ে যাওয়া ছোট্টখাটো জিনিসগুলো আমরা অনেক সময় ইগনোর করে যাই অথবা ছোটখাটো জিনিস খুঁজতে গিয়ে আমরা অনেক সময় চোখের সামনে পড়ে থাকা আস্ত জিনিসটাকেই আমরা দেখিনা। বারবার চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছেন অলৌকিক ভৌতিক এই সমস্ত ব্যাপার মানুষের কল্পনা প্রসূত। যাইহোক এই বইয়ের গল্পগুলির মধ্যে আমার সবথেকে ভালো যে কয়েকটি গল্প লিখেছে সেগুলো প্রথমটি 'ছক্কা পুট' 'রুপোর কাঠি' 'ঠান্ডা মাথায় খুন' 'হাতের মুঠোয় মৃত্যু' 'খাচ্ছে কিন্তু গিলছে না'। এগুলি ছাড়া বাকি গল্পগুলিও যথেষ্ট ভালো তবে এই রহস্যগুলি আমার মস্তিষ্কে যথেষ্ট চিন্তার খোরাক জুগিয়েছে ।
উপন্যাস গুলির মধ্যে 'সেই হাত জ্যান্ত' এক কথায় ফাটাফাটি। জ্যাকির দূরে ছিটকে মৃত্যুটা আগের থেকে কিছু টা আন্দাজ করতে পেরেছিলাম কিন্তু লকড রুম মিস্ট্রিটা সত্যিই অপূর্ব ছিল। একটাই কথা শিখেছি অসম্ভব বলে কিছুই নয় , বিশেষ করে এইসব লকড রুম মিস্ট্রিতে সবথেকে যেটা অসম্ভব মনে হয় সেটাই হয়।আর একটা জিনিস অসম্ভব সেটা হচ্ছে অপরাধ নিখু়ঁত হওয়া ,কিছু না কিছু ধরার থাকবেই ,কিন্তু সবাই দেখতে পায়না ,সেই দৃষ্টি নেই সবার,সেই মন নেই সবার ।
'সেগুনবন অন্ধকার ' আগের উপন্যাস এর কাছে যথেষ্ট ফিকে লেগেছে ।
'মৃত্যু আসে পায়ে প��য়ে' এইটা পড়ে খানিক আনন্দ পেয়েছি ,যখন ই পুলিশকে চৌবেসাহেব বিছানা পরীক্ষা করতে বলেছিল তখন থেকেই ওই সমস্যা র সমাধান মাথায় চলে এসেছিল যে কে খুন করেছিল। কিন্তু বাকিটা তো পর পর নতুন নতুন তথ্যের দ্বারা উদ্ঘাটিত হয়েছে তাই আর বেশি কিছু আন্দাজ করতে পারিনি ,তবে খুব ভালোই ছিল উপন্যাস টি ।
এই হল ছিল অভিজ্ঞতা 'চক্রভেদী চৌবেসাহেব' পড়ার । আশায় থাকবো আরো একঝুড়ি রহস্য নিয়ে চৌবেসাহেব আবার আসবেন। 'পত্রভারতী' বেশ দামী কাগজ , সুন্দর কিছু ইলাস্ট্রেশন এ বইটি সাজিয়েছে,তবে কভারটা তেমন ভালো লাগেনি । লেখক ,প্রকাশক সব্বাইকে ধন্যবাদ এমন কিছু রহস্যের জন্য❤️
চক্রবর্তী চৌবে সাহেব সৈকত মুখোপাধ্যায়ের একটি বিশেষ বই কারণ এতে একটি দুর্দান্ত গোয়েন্দা রহস্য থ্রিলারের সমস্ত উপাদান রয়েছে। তিনি একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ পরিদর্শক এবং বিনায়ক বোস তার এলাকার একজন পুলিশ পরিদর্শক যার রহস্য সমাধানের প্রক্রিয়ার জন্য তিনি সাহায্য চান। Every Story is unique BE it Chokka Put Bhabani vanish , Aka baka sesh lekha ,খাছে কিন্টু গিলছে না ,টেরো নম্বর ছোরা, are standout. মৃত্যু আসে পায়ে পায়ে গল্পটিতে উমাশঙ্কর চৌবের পূর্ববর্তী জীবন অত্যন্ত সুন্দরভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে তিনি কীভাবে চাকরির জন্য স্কুলে যান এবং কয়লাক্ষেত্রের অঞ্চলগুলির আক্ষরিক বর্ণনা অসাধারণ ছিল এবং কলেজের শুরু থেকেই চৌবে স্যারের তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, ওষুধের দোকানদারের সাথে তার বন্ধুত্ব এবং শেষের দিকটি আমাদের আবেগপ্রবণ করে তোলে। জীবনকে দুর্দান্তভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং এই গল্পটি অবশ্যই পড়া উচিত এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এটি সেরা। 5/5