পাতাল নিয়ে ভাবনা কি শুধুই কিংবদন্তির উপজীব্য? নাকি নিষ্প্রাণ, নিরেট পাথর দিয়ে গড়া ধরাতলের নীচে সত্যিই কেউ আছে? কী হবে, যদি সে উঠে আসতে চায় কিছুর, বা কারও সন্ধানে?
জীবন-যুদ্ধে দুমড়ে যাওয়া এক বিষণ্ণ নারী সবকিছু থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজে পেল একটা অডিয়ো চ্যানেলের মধ্যে। কিন্তু সেটা কি সত্যিই মুক্তির সন্ধান দেয়? নাকি কোনো গভীর রহস্য লুকিয়ে আছে এর পেছনে?
দক্ষিণ কলকাতার একটা গেস্ট-হাউস চালু হওয়ার পরেই সেখানে পরপর কয়েকটা রহস্যময় মৃত্যুর ঘটনা ঘটল। প্রবল চাপে সমস্যার দ্রুত সমাধান করার লক্ষ্যে পুলিশ একজন বিদেশি বিশেষজ্ঞকে নিয়োগ করল। কী ঘটল সেই রাতে? যে জগৎ আমাদের দুনিয়ার অংশ হয়েও অধরা, অদেখা থেকে যায়, সেই জগতের মুখোমুখি হওয়ার তিনটি আখ্যান…
লাভক্রাফটিয়ান হরর ব্যাপারটা এখন এমনভাবে সরল করা হয়েছে যেন বডি হররের সঙ্গে কিছু অপার্থিব, অমানুষিক, অভাবনীয় ইত্যাদি বিশেষণ যোগ করে দিলেই সেটা কসমিক হরর হয়ে যায়। কসমিক হররের নিয়মকানুন না থাকলেও কিছু ধরন-ধারণ অবশ্যই আছে। সেই মাটিটা ভালো করে বুঝতে গেলে লেখককে প্রথমে একজন দক্ষ পাঠক হতে হয়। আর ঋজু গাঙ্গুলী মহাশয় পাঠক হিসেবে ভয়ানক শক্তিশালী। তাই কসমিক হরর লিখতে বসে ঋজুবাবু একেবারেই ভুল করেননি।
এবং গুঞ্জন বইটিতে তিনটি বড়গল্প রয়েছে - অতল, গুঞ্জন এবং শিকার। অতল গল্পটি সত্যি-মিথ্যে মেশানো অত্যন্ত উপভোগ্য একটি গল্প যেখানে একটি গোপন গভর্নমেন্ট ফেসিলিটি মাটির নীচের একটি সুরকে খুঁজে বের করতে চায়। গুঞ্জন আমার মতে এই বইয়ের সেরা গল্প। এই গল্পে একটি অদ্ভুত রেকর্ডিং একের পর এক মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শিকার গল্পটি অবশ্য কসমিক হরর অপেক্ষা পাল্প ফিকশন হিসেবেই বেশি সফল।
ভালো: কসমিক হররকে যেমন অনেক ক্ষেত্রেই সাই-ফাই হিসেবেও বিবেচনা করা হয়, ঋজুবাবুও তাই করেছেন। বিজ্ঞান ও বৈজ্ঞানিক টার্মের ব্যবহার প্রতিটি গল্পে স্পষ্ট লক্ষণীয়। আর একটা ভালো ব্যাপার হল লেখক অসীম হতাশার বদলে গল্পের চরিত্রকে জিতিয়ে দিতে ভালোবাসেন। এ জিনিস নতুন নয়। ব্রায়ান লুমলে এর মতো লেখকরা কসমিক হররের গল্পে অনেক আগেই লড়াকু মনোভাব দেখিয়েছেন। কিন্তু এমন লেখা লেখে ক'জন?
খারাপ: বইয়ের ভিতরের অলঙ্করণ। বিভিন্ন ক্লাসিক ইলাস্ট্রেশনের প্রিন্টগুলি গল্পের সাথে অনেক ক্ষেত্রেই সম্পর্কহীন এবং কিছু ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক।
লাভক্রাফটিয়ান হররের জমাটি স্বাদ পাওয়ার জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য।
ভীষণ ভার্সেটাইল পাঠক তথা প্রসিদ্ধ গ্রন্থসমালোচক ঋজু গাঙ্গুলীর মৌলিক লেখা বেরোলে চেষ্টায় থাকি পড়ে ফেলার। বইটায় তিনটে গল্প আছে। লাভক্র্যাফট ঘরানার সিগনেচার কসমিক হরর। কলকাতায় হালকা শীতের আমেজে ধীরে ধীরে জাঁকালো শিরশিরানি ধরিয়ে দেওয়ার মতোই প্লট একেকটার! প্রথম গল্প '"অতল"-এ শিহরণ জাগানো পাতালের ডাক রোহিণীর সাথে পাঠকও মনে হয় উপেক্ষা করতে পারবে না। দ্বিতীয় গল্প "গুঞ্জন" কিছুটা ইউনিক। অ্যাপের মাধ্যমে আত্মহত্যার সুরেলা মন্ত্রে মানুষের মগজধোলাই করছে কোন মহাজাগতিক শক্তি? তৃতীয় গল্প "শিকার"। নির্দিষ্ট এক হোটেলের ঘরে বারবার আগমন ঘটিয়ে দুর্বলদের শিকার করছে "কিছু একটা"। এবার এই "কিছু একটা"-কে পাল্টা শিকার করতে চাইলে? ইচ্ছে করে স্পয়লার-ফ্রি ব্রিফ করলাম গল্পগুলোর। এই ঘরানার গল্প আনকমন না হলেও ঋজু গাঙ্গুলীর লেখা আলাদা করে ছাপ রেখে যায়, পাঠককে বিশ্বসাহিত্যের পথে আগুয়ান হওয়ায় আগ্রহী করে। বইতে আরও কয়েকটা গল্প বেশি থাকলে ভালো লাগতো। ভেতরের আর্টওয়ার্ক ঠিকঠাক লাগলেও দুটো সাজেশন— পুরো পাতা জুড়ে (বর্ডারলেস) ছবিগুলো থাকুক এবং কিছু ছবির ক্ষেত্রে সাদা-কালো রঙের গ্রেডিয়েন্টের ব্যবহারে লাইট-ডিপ এফেক্ট আরেকটু ডিস্টিঙ্গুইশেবল হোক।
বিখ্যাত পুস্তক সমালোচক ঋজু বাবু আমায় অনেক ভালো বই পড়ার জন্য বেছে নিতে সাহায্য করেছেন। এবার তাঁর লেখা এই বইটি বর্ষ শেষে পড়ার জন্য তুলে নিয়েছিলাম। রোববারের সন্ধ্যায় সারাদিন পিকনিকের পর পড়তে এই ছোট বইটি যা তিনটি লাভ্ক্রাফটিয়ান গল্পের সংকলন শুরু করেছিলাম। গল্প তিনটি যথাক্রমে -
১. অতল - এ মানুষের সাথে মহাবিশ্বের আদি কালের এক জীবের সাক্ষাতের গল্প যারা এক প্রাচীন কালে পৃথিবীর অভ্যন্তরে বাসা বেঁধেছিল। মাঝে মাঝে তারা ফিরে আসে এক অশ্রুতপূর্ব গান বা মন্ত্র উচ্চারণের টানে।
২. গুঞ্জন - তুলনামূলক বড় গল্প যেখানে এক গোপন সংস্থা শব্দের মাধ্যমে মানুষকে বশে রাখার চেষ্টা করছিল কিন্তু একজন তার মাধ্যমে এক আমাদের বিশ্বের এক আগন্তুক কে ডেকে আনে বাহু নিরীহ মানুষের বলিদানের মাধ্যমে।
৩. শিকার - এখানে দক্ষিণ কলকাতার আপাত আধুনিক শহরের মধ্যে হানা দিচ্ছে এক অবিশ্বাস্য প্রাণী যে প্রাণ নিচ্ছে এক দুর্বল মানুষের।
তিনটি গল্পই বেশ শ্বাস রুদ্ধকর রচনা, প্রতিটাই একবার বসেই পড়ে ফেলা যায়, এবং আমিও তাই করেছি। আমি সাধারনত এরকম আতঙ্কের গল্প পড়ি না। কিন্তু এইরকম এক আবহ এবং দ্রুত গতির গল্প পড়ে আমার বেশ ভালই লাগলো।