ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ থেকে পাস করা গোলাম মোস্তাকিম একাধারে জার্মান, ফ্রান্সসহ অন্তত চারটি ভাষায় কথাবলা এবং লেখায় পারদর্শী ছিলেন। এই সফলতার পিছনে ছিল একজন পরশ পাথরের স্পর্শ। সেই স্পর্শকে তিনি ধারণ ও সংরক্ষণ করে রেখেছেন নিজের সৈয়দ মুজতবা আলীঃ প্রসঙ্গ অপ্রসঙ্গ বইটিতে।
সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা সাহিত্যের প্রবাদ পুরুষ। বিচিত্র জীবন তাঁর, নানান দেশ বিদেশ ঘুরেছেন। পেয়েছেন জনপ্রিয়তা, খ্যাতি ও সম্মান। কিন্তু তাঁর শেষ জীবন বেশ ট্র্যাজিক। নানান জটিলতায় শেষ জীবনে নিঃসঙ্গ জীবন-যাপন করতে হয়েছে। গোলাম মোস্তাকীম মুজতবা আলীর সাথে তাঁর জীবনের শেষ দশক একইসাথে পার করেছেন। সেই সুবাদে নানান মুজতবা-রঙ্গ উঠে এসেছে। মুজতবার উইট, বিচিত্র অভ্যেস আর জ্ঞানের আলোকচ্ছটা চমৎকারভাবে মোস্তাকীম সাহেব বইতে তুলে এনেছেন। মুস্তাকীমের বর্ণনা প্রাঞ্জল, খুব হ্নদ্যতার সাথে সত্যিকার মুজতবা আমাদের সামনে প্রস্ফুটিত হয়েছে।
২৮ শে এপ্রিল, ১৯৭১ সালে কলকাতার বাসায় যেদিন প্রথম দেখা হয় সেদিন মুজতবা আলী নব্য তরুণ গোলাম মোস্তাকিমকে বললেন, "You coward. Get out. I say, get out. বেরোও বলছি, বেরোও এখান থেকে। বাংলাদেশের লোকজন প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে পাঞ্জাবী সৈন্যদের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। আর উনি এই সুযোগে কলকাতা দেখতে এসেছেন। ভিসা-পাসপোর্ট লাগেনা তো তাই।"
কিন্তু এরপরও গোলাম মোস্তাকিম দমে যায় না। ঠিক ৯ দিন পর আবার যায়। এবার আর ভুল করেনা। পরিচয়ে সে জানান সে বাংলাদেশ থেকে এসেছে। ঢাকা কলেজের সাথে ছাত্র। ব্যস! এখান থেকেই গোলাম মোস্তাকীমের সাথে বাংলা ভ্রমণ সাহিত্যের বাঁক ঘুরিয়ে দেয়া ছোট গল্পকার ও ঔপন্যাসিক সৈয়দ মুজতবা আলীর আমৃত্যু স্নেহের বন্ধন যাত্রারম্ভ করে।
লেখক গোলাম মোস্তাকীম পরবর্তীতে হয়েছিলেন সফল একজন মানুষ। হয়েছিলেন বিসিএস প্রশাসন একাডেমির মহাপরিচালক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগ থেকে পাস করা গোলাম মোস্তাকিম একাধারে জার্মান, ফ্রান্সসহ অন্তত চারটি ভাষায় কথাবলা এবং লেখায় পারদর্শী ছিলেন। এই সফলতার পিছনে ছিল একজন পরশ পাথরের স্পর্শ। সেই স্পর্শকে তিনি ধারণ ও সংরক্ষণ করে রেখেছেন নিজের সৈয়দ মুজতবা আলীঃ প্রসঙ্গ অপ্রসঙ্গ বইটিতে।
স্মৃতির সঞ্চয় থেকে লেখক গোলাম মোস্তাকিম তাঁর বইটিতে যে ব্যক্তি মুজতবা আলীকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন সেই মুজতবা আলী আড্ডাবাজ, অকপট এবং বিদগ্ধ এক পন্ডিত। টুকরো আলাপ আর আড্ডার অগোছালো ভাবটা একদম ঢাকা পড়ে গেছে মুজতবা আলীর বলা বিভিন্ন প্রসঙ্গ উপস্থাপনের মুন্সিয়ানায়।
জুতো সেলাই থেকে চন্ডীপাঠ কিছুই বাদ রাখেননি গোলাম মোস্তাকীম মুজতবা আলীর জন্য। এই ভাগ্যকে তিনি আজীবন শ্রদ্ধা করেছেন পরম সৌভাগ্যরূপে। নিজের কথা, কলকাতার অভিজ্ঞতার কথাও বলেছেন ৪৯ পৃষ্ঠা থেকে ৭১ পৃষ্ঠা পর্যন্ত। এটুকু হয়তো ওনার অপ্রসঙ্গ। কিন্তু প্রসঙ্গের মত সাবলীল, সুপাঠ্য আর তথ্যসমৃদ্ধ।
সৈয়দ মুজতবা আলী গোলাম মোস্তাকীমকে আলাপের সময় যা বলেছেন সেটি এই বইটির মুখ্য আকর্ষণ। ভাষা, ভ্রমণ, সংস্কৃতি, ইতিহাস, রবীন্দ্রনাথ, নারীদেহ কোনকিছু বাদ যায়নি। ব্যক্তি মুজতবা আলীকে জানার এক অপরিহার্য বই মনে হচ্ছিল পড়তে পড়তে। মনে হচ্ছিল আমিই গোলাম মোস্তাকীম আর মুজতবা আলী আমাকে কথাগুলি বলছেন।
পাতায় পাতায় চমক আর তথ্যসমৃদ্ধ একটি বই। মুজতবা পাঠকদের একাধিকবার অবশ্য পাঠ্য। তবু শেষ কররার আগে একটা নমুনা দিয়ে রাখি,
হিন্দু-মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে একদিন কথা উঠল। তিনি (মুজতবা আলী) আমাকে বললেন, "আমি সাহিত্যিক হিসেবে নাম করেছি বলে আমার আত্মীয়-স্বজনেরা গর্ব করে। কিন্তু তার চেয়েও তারা আরো বেশি গর্ব করে যে আমি হিন্দুদের সঙ্গে টেক্কা দিয়ে কলকাতায় টিকে আছি। দেখো ১৯৪৬ সালের হিন্দু-মুসলমান রায়ট নিয়ে কথা উঠলেই সবাই সোহরাওয়ার্দীকে দোষ দেয়। কথাটা কিন্তু সম্পূর্ণ ঠিক নয়। সর্দার বল্লবভাই প্যাটেলকে বলা হল ভারত ভাগ হচ্ছে। প্যাটেল জিজ্ঞেসা করলেন, 'ক্যালকাটা কে পাবে?' বলা হল পাকিস্তান কলকাতা পেতে পারে। তখন বল্লব ভাই বলেছিলেন, 'Swaraj without Calcutta!'
An the riot broke out. এই কথাটা অনেকেই স্বীকার করতে চান না। কিন্তু কথাটা সত্যি।"
১৯৭১ সাল থেকে জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত গোলাম মুস্তাকিম সৈয়দ মুজতবা আলীর সংস্পর্শে ছিলেন। স্মৃতিচারণমূলক এই বইয়ের প্রতিটা লাইনে লাইনে সৈয়দ মুজতবা আলীর জীবন দর্শন ফুটে উঠেছে। তিনি এক জায়গায় বলেছেন, বইয়ের পাতা উল্টানো দেখেই মানুষের ব্যক্তিত্ব বুঝা যায়। রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিজীবন নিয়ে বিভিন্ন বইয়ে আমরা অনেক আজেবাজে কথা পড়েছি ।কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলী উনার লেখাতে, রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর প্রতি রবীন্দ্রনাথের কতটা ভালোবাসা ছিলো, সেটিও বর্ণনা করেছেন। এক একটা লাইন পড়ে মনে হচ্ছে -রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসার চেয়ে;সৈয়দ মুজতবা আলীর রবীন্দ্রনাথের প্রতি টান কোন অংশে কম ছিলো না। যখন জার্মানিতে পড়তেন তখন কোন এক অচেনা রমনী প্রত্যেকটা লেকচারের নোট দিয়ে তাকে কিভাবে সাহায্য করেছেন; সেটি ও কৃতজ্ঞতাভরে বর্ণনা করতে ভেলেননি। সৈয়দ মুজতবা আলীর এরকম শত শত স্মৃতিবিজড়িত ঘটনা জানতে চাইলে এই বইটি পড়তে হবে।
ব্যক্তি মুজতবা আলীর দর্শন, চিন্তা আর টুকরো টুকরো কথাগুলোকে দারুণভাবে পাঠকের জন্য সাজিয়েছেন সৈয়দ সাহেবের সান্নিধ্য পাওয়া গোলাম মোস্তাকীম। সাথে তিনি তাঁর নিজের কথাও লিখতে ভোলেন নি।
সুন্দরতম একটি বই। বিশেষত, মুজতবা আলীর কথাগুলো খুব ভাবায়, নিজের অজ্ঞতাকে আঘাত দেয়।
সৈয়দ মুজতবা আলী বাংলা সাহিত্যে "দেশে বিদেশে"ভ্রমণকাহিনীর জন্য তাকে সবাই কমবেশি চিনে।। তিনি নিজের লেখায় নিজেকে লুকিয়ে রাখেন। নিজের সম্পর্কে কোথাও কিছু বলতেন না, বললেও নিজেকে নিয়ে করেছেন রসিকতা ।আড্ডার মোড়কে নিজেকে পরিবেশন করতেন। আলী সাহেবের বিভিন্ন দিক তার ফুর্তিবাজ মুখোশে ঢাকা পড়ে গেছে। এসব আর কখনোই জানা যাবে না।তার সম্পর্কে হাতেগোনা যেটুকু লেখা আছে,তাতে তার বাইরের খবর মেলে,ভেতরের নয়।
তার সম্পর্কে ভিতরের বাইরের নানা প্রসঙ্গ- অপ্রসঙ্গ ও তার সাথে কাটানো সময়ের নানা স্মৃতিকথা তুলে নিয়ে এসেছেন গোলাম মুস্তাকীম লিখিত "সৈয়দ মুজতবা আলী : প্রসঙ্গ,অপসঙ্গ" স্মৃতিচারণমূলক বইয়ে।
গোলাম মুস্তাকীম ১৯৭১ সালের ২৮ এপ্রিল থেকে ১৯৭৪ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত সৈয়দ মুজতবা আলীর সহচার্যে ছিলেন। আলী সাহেবের শৈশব-কৈশোর থেকে শান্তিনিকেতন অধ্যয়ন,বিদেশে লেখাপড়াসহ জীবনের অনেক অজানা গল্প! ১৬০ পৃষ্টার এ বইটি পড়লে জানতে পারবেন মুজতবা আলীর জীবনের নানা ঘটনা, অনেক সাহিত্যিক সম্পর্কে ।
নিচে কিছু কথা তুলে ধরলাম -
১."বিদ্যাসাগর এবং মাইকেল নিয়ে আর একদিন কথা উঠলো। তিনি বললেন, একবার এক লোক এসে বিদ্যাসাগরকে বললে, আপনি যে মাইকেলকে টাকা ধার দেন সেই টাকা দিয়ে সে কি করে জানেন? বিদ্যাসাগর অম্লানবদনে বললেন, সে ঐ টাক�� দিয়ে মদ খায়। লোকটি বলল, আপনি মদ্যপান বিরোধী হয়ে জেনেশুনে মাইকেলকে মদ খাওয়ার জন্য টাকা দেন? এ কেমন ধারা কথা হল? উত্তরে বিদ্যাসাগর বললেন, টাকা না পেলে মাইকেল আজেবাজে মদ খেয়ে অকালে মারা যাবে। 'তাহলে আমাদের টাকা দিন মদ খাওয়ার জন্য। হেসে বিদ্যাসাগর বললেন, হ্যাঁ তুমি আর একখানা মেঘনাদবধ কাব্য লিখে নিয়ে আসো, তোমাকেও আমি মদ খাওয়ার জন্য টাকা দিবো।"
২."তুমি যে দেশের ভাষা শিখবে সেই দেশের লোকের কাছে শিখতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয়।কারণ প্রথম তুমি যে উচ্চারণ শেখো সেটাই তোমার অভ্যাস হয়ে যাবে।"
৩."আমি ছাত্রছাত্রীদের বলতাম, তোমার কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে না চাইলে প্রথমে তোমার মাতৃভাষায় লিখবে,তারপর সেটা ইংরেজীতে অনুবাদ করবে।এর দুটো সুফল ফলবে।প্রথমত তুমি দুটো ভাষা শিখবে।দ্বিতীয়তঃউত্তরটা তোমার নিজের হবে।"
৪."পাঞ্জাবীরা নিজেদের খাটি মুসলমান বলে দাবী করে।কিন্তু আমার জানামতে ওদের মত অসভ্য ও বর্বর জাত দুনিয়ার তে দুটি নেই।অদের মধ্যে যত লম্পট, মদ্যপ আর হোমোসেক্সুয়াল আছে দুনিয়ার আর কোন জাতে আছে কিনা সন্দেহ। সত্যি কথা বলতে কি, সত্যিকার অর্থে পূর্ব বাংলার মুসলমানদের মধ্যেই আমি ধর্মভীরু,খোদাভীরু মুসলমান দেখেছি। জানো ত দুনিয়ার সব বড় বড় পোর্টে দুনিয়ার নামকরা প্রস্টিটিউশন আছে।আমি যখন ইউরোপ গিয়েছি,তখন পূর্ব বাংলার কোন খালাসীঃসিলেট,চিটাগাং নোয়াখালীর কোন খালাসীকে আমি প্রস্টিটিউশনে যেতে দেখিনি।"
৫."যদি কোনদিন সাহিত্য চর্চা করতে চাও তাহলে দুটো বই খুব ভাল করে পড়বেঃআরব্যপোন্যাস ও জাতক।জাতকের মত ভাল বই খুব কম আছে।বাংলায় সাহিত্য চর্চা করতে চাইলে তোমাকে জাতক অবশ্যই পড়তে হবে।"
৬."টলস্টয়ের যে কোন উপন্যাস ই তোমাকে কমপক্ষে তিনবার পড়তে হবে।"
"হিটলারের একটা মজার কথা আছে।তিনি বলতেন, ১০০ টা বই পড়ে নব্বইটা ভুলে যাওয়ার চেয়ে ১০ টা বই পড়ে ৯টা মনে রাখা অনেক ভালো।"
শ্রুতি-স্মৃতি-পুরাণাদি সকল শাস্ত্রেই গুরুভক্তি কথা স্পষ্টরূপে ঘোষণা করিয়াছেন । শ্রীল কবিরাজ গোস্বামীর লেখনীতেও গুরুর লক্ষণ এরূপ বর্ণিত আছে। যেমন জহুরীর সাহায্য ব্যতীত জহরতের পরিচয় পাওয়া যায় না এবং প্রকৃত জহরৎ গ্রহণ করিতে হইলে প্রকৃত জহুরীর আশ্রয় গ্রহণ করিতে হয় এবং উপযুক্ত মূল্যাদির দ্বারা তাহা যেমন লাভ হয়, তদ্রূপ যদি কোন ব্যক্তির ভগবৎভক্তি লাভ করিবার পিপাসা হৃদয়ে থাকে তবে তিনি শাস্ত্রীয় লক্ষ্মণযুক্ত প্রকৃত সদ্গুরুপাদপদ্ম-আশ্রয় গ্রহণ করিবেন এবং নিষ্কপট গুরু-সেবাবৃত্তিরূপ মূল্যের দ্বারা ভগবৎ ভক্তি লাভ করিবেন । ছোট বেলায় 'পরশ পাথর' নামক একটি পাথরের গল্প আমরা সকলেই শুনেছি। সেই পাথর সন্নিকটে যেকোন ধাতব বস্তু এলে উক্ত ধাতব বস্তু খাঁটি সোনায় পরিনত হয়। গুরু হইলো সেই পরশ পাথর, আমাদের গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার পরশে সৃষ্টি করেছেন অনেক খাঁটি সোনা তার মধ্যে একজন সৈয়দ মুজতবা আলী। এই বইটি মুজতবা আলীর শেষ বয়সের সান্নিধ্য পাওয়া এক ছাত্রের ব্যক্তিগত ডাইরি। খুব সাধারণ সাধাসিধে ডায়েরি, কিন্তু প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক সচিব জনাব গোলাম মোস্তাকিম তার গুরুভক্তি লেখনীর মাধ্যমে জানালার ওপাশের মুজতবা আলীকে জানার মাধ্যম তৈরী করে দিয়েছেন। বইটি আমার জন্য নির্দেশিকা স্বরুপ এবং মনে হয় সব স্তরের পাঠকও তাই বলবেন৷