জীবনের শেষ পানপাত্র আকণ্ঠ পান করার জন্যে এই উপন্যাসের বিচিত্র ও বিভিন্ন নরনারী কত যে প্রয়াস করে, কত যে হাতড়ায়! তখন মনে হয় পানপাত্রখানাই বুঝি চূর্ণ হয়ে যাবে, এমন আস্ফালন, ক্ষধা আর তৃষ্ণা জীবনের। চলমান ইতিহাসের একটা সাম্প্রতিক অধ্যায়কে লেখক এ উপন্যাসে মর্মরিত করে তুলেছেন। নিম্নমধ্যবিত্তের ভীরু বিকাশের রোমাঞ্চ, কিন্তু শ্যামল অন্ধকারে ওঁৎ পেতে আছে সব বিষাক্ত ছোবল, আর সেই চিরায়ত সর্বহারার রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের প্রখর উন্মাদনা, এই হচ্ছে উপন্যাসটির অন্তর্গত কাঠামো। কিন্তু সন্তাপ, সংগ্রাম ও স্বপ্নের সেই বাঙময়ী প্রতিমা নির্মানের যে কৌশল লেখক দেখিয়েছেন তার স্বাদ ও সৌন্দর্য অপরূপ। এ উপন্যাসে দরদী একটি গল্প আর উন্নত জীবনদৃষ্টির সঙ্গে সাযুজ্য ঘটেছে ভাষা-শিল্পের।
বশীর আল-হেলালের জন্ম মুর্শিদাবাদ জেলার তালিবপুর গ্রামের মীর পাড়ায় ১৯৩৬ সালের ৬ জানুয়ারি। ছোটবেলা থেকেই তিনি লেখালেখি করতেন। ১৯৫৬ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দ্বিতীয় বিভাগে বাংলায় এম এ পাস করেন। তাঁর প্রথম গল্পের বই 'স্বপ্নের কুশীলব' কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬৮ সালের শুরুর দিকে তিনি মাকে নিয়ে চলে আসেন ঢাকায়। তারপর ১৯৬৯ সালের শুরুতে সহ-অধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত হন বাংলা একাডেমিতে। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। আর চব্বিশ বছর বাংলা একাডেমিতে কাজ করার পর ১৯৯৩ সালে পরিচালক পদে থেকে অবসর নেন।
গ্রামীণ ও শহুরে মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনকে আরও অর্থবহ করতে জীবনধর্মী ও সমাজ সচেতনতামূলক অসংখ্য ছোটগল্প ও উপন্যাস লিখেন বশীর আল-হেলাল। প্রায় চল্লিশটি প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে বাংলাভাষার ওপরেই তাঁর গ্রন্থ সংখ্যা ছয়টি। তাঁর আটশো পৃষ্ঠার ভাষা-আন্দোলনের ইতিহাস (১৯৮৫) একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক গবেষণালব্ধ গ্রন্থ। তাঁর প্রকাশিত গল্পের বইগুলো হলো-'প্রথম কৃষ্ণচূড়া', 'আনারসের হাসি', 'বিপরীত মানুষ', 'ক্ষুধার দেশের রাজা', 'গল্পসমগ্র-প্রথম খণ্ড'। প্রকাশিত উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে- 'কালো ইলিশ', 'ঘৃতকুমারী', 'শেষ পানপাত্র', 'নূরজাহানদের মধুমাস', 'শিশিরের দেশে অভিযান' ও 'যে পথে বুলবুলিরা যায়'।
সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে বশীর আল-হেলাল পেয়েছেন আলাওল সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি পুরস্কার।
২০২১ সালের ৩১ আগস্ট জীবনাবসান ঘটে বশীর আল-হেলালের।
স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হয়েছে ঘনঘন। সবদিক থেকেই, শক্তি চট্টোপাধ্যায় এর ভাষায়, সে সময়টা নিয়ে বলা যায়, "সে বড়ো সুখের সময় নয়, সে বড়ো শান্তির সময় নয়।" কিন্তু শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নয়, দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থারও দ্রুত পরিবর্তন ঘটছিলো। সে পরিবর্তন এতো দ্রুত ও বিপর্যয়কর যে, সাধারণ মানুষের পক্ষে এর সাথে তাল মিলিয়ে চলা সম্ভব ছিলো না। এই পট-পরিবর্তন নিয়ে বশীর আল হেলাল লিখেছেন "শেষ পানপাত্র"।
উপন্যাসের কাহিনি আমার নিজের এলাকা কেরানীগঞ্জ বা এর আশেপাশের কোনো অঞ্চলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে বাড়ছে নগরায়ণ। মানুষ বুড়িগঙ্গার ওপারে জমি কিনছে, সেতু নির্মিত হচ্ছে, জীবনমান উন্নত হচ্ছে; সেইসাথে বাড়ছে সন্ত্রাস, শ্রেণিবিভেদ, ভূমিদখল আর চাপা উদ্বেগ। গল্পের "নায়ক" আবদুল আজীজ জমি কিনেছে গ্রামে কিন্তু সেই গ্রাম শ্রমিক, ভূমিদস্যু আর ব্যবসায়ীদের সংঘর্ষে উত্তাল। ভীতু আজিজের নিস্তেজনাপূর্ণ জীবন ভয়, সংশয়, নতুনত্ব আর আশঙ্কার ঘেরাটোপে বন্দী হয়ে যায়। "শেষ পানপাত্র " সত্তর ও আশির দশকের দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন ও এর অভিঘাতের জীবন্ত দলিল। স্কুল শিক্ষক আবদুল আজিজ মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতিনিধি। তার জীবন ও মানসিকতার সাথে (অন্তত আমার) মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই। মধ্যবিত্তের জীবন কালে কালে একইরকম থেকে যায়। সব মিলিয়ে, "শেষ পানপাত্র " কিঞ্চিৎ বিবর্ণ, কিঞ্চিৎ একঘেয়ে কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে গুরুত্বপূর্ণ।
বশীর আল হেলালের 'ঘৃতকুমারী' পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। 'শেষ পানপাত্র' পড়ে হতাশ ও বিরক্ত হলাম। অথচ শেষ পানপাত্র লেখা হয়েছে ঘৃতকুমারীর প্রায় বছর আষ্টেক পরে। শেষ পানপাত্র মধ্য আশি'র সময়কাল নিয়ে লেখা হলেও ঐ সময়কার জীবনযাত্রা, নগর ও গ্রামের জীবনের জটিলতা, বাজার ব্যবস্থার পরিবর্তন, রাজনৈতিক অস্থিরতা, মানুষের রুচি ও জীবনদর্শনে পরিবর্তন, নগরায়ণের প্রভাবের প্রকৃতি কিছুরই প্রকৃত রূপ ফুটে ওঠেনি। এগুলোর যে রূপ ফোটানো হয়েছে সেগুলোর কোনটা ষাটের দশকের, কোনটা পঞ্চাশের দশকের এবং কোনটা এমনকি চল্লিশের দশকেরও। এই উপন্যাস কোন বিচারে পিরিয়ড পিস নয়, মানব মনের চিরন্তন জটিলতার কোন মনোহারী চিত্রও নয়। সময়-শ্রম-অর্থ যেটুকু নষ্ট হলো তার জন্য ১ তারা দিলাম।