মাত্র আটাশ বছরের ক্ষীণ আয়ুষ্কালের তুলনায় আবুল হাসান এক জীবনে কবিতা লিখেছেন বিস্তর, এমনকি লিখে গেছেন কতক চমৎকার গদ্য এবং গল্পও। একাধিক খণ্ডে তাঁর রচনাবলি প্রকাশ পেলেও এখনও মলাটবন্দি হয়নি তাঁর বহু অসামান্য রচনা। অগ্রন্থিত আবুল হাসান বইতে একত্রিত হলো তাঁর একগুচ্ছ অগ্রন্থিত দুর্লভ লেখাজোখা— ৮৪টি কবিতা, ৮টি গদ্য, ৪টি গল্প ও আরও ২টি প্রকীর্ণ রচনা। ১৯৬৫ সালে, আঠারো বছর বয়সে পা দেবার পরপরই মুদ্রিত মাধ্যমে আবুল হাসানের কবিতা প্রকাশ পেতে শুরু করে। ১৯৭৫ সালের নভেম্বরে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত নিয়মিতভাবে তাঁর কবিতা প্রকাশ পেয়েছে সর্বপ্রকারের মুদ্রিত মাধ্যমে। দৈনিক পত্রিকার সাপ্তাহিক সাহিত্য আয়োজন কি বিশেষ সংখ্যা থেকে শুরু করে সাপ্তাহিক-পাক্ষিক-মাসিক পত্রিকা, একুশের সংকলন, বিভিন্ন ছোটকাগজ আর স্মরণিকা—বহুরকমের দুষ্প্রাপ্য সূত্র ঘেঁটে এই অগ্রন্থিত উজ্জ্বল কবিতাগুলো এ সংকলনে জড়ো করা হয়েছে। অগ্রন্থিত ৮টি গদ্যের বিষয়-আশয় বিচিত্র—আগ্রহজাগানিয়া বৈদেশিক ইস্যুকে ঘিরে রচিত সংবেদী উপসম্পাদকীয়, শাসকশ্রেণির সমালোচনামুখর রাজনৈতিক কলাম, ঢাকার লেখকদের আড্ডা সংক্রান্ত ব্যক্তিগত সরস কড়চা, কবি অডেনের মৃত্যুর পর লেখা বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ কিংবা আততায়ীর বুলেটে নিহত কবিবন্ধু হুমায়ুন কবিরের মৃত্যুত্তর শোকাতুর স্মৃতিলিখন। তিনি গল্প লিখেছেন ষাট দশকের শেষ থেকে ১৯৭৪ অবধি; ১৯৭০ সালে প্রকাশিত ২টি, ১৯৭১-এর ১টি ও ১৯৭৪-এর ১টি—সব মিলিয়ে ৪টি অগ্রন্থিত গল্প রইল এখানে। সবশেষে বিবিধ অংশে আছে আবুল হাসানের গদ্যচর্চার আদিতম নমুনা ও জার্মান কবিবন্ধু রাইনহার্ট হেভিকের সঙ্গে মিলে লেখা ১টি যৌথকবিতার বঙ্গানুবাদ।
কবি আবুল হাসান ছিলেন ষাট ও সত্তরের দশকে বাংলাদেশের প্রধান কবিদের একজন।
১৯৪৭ সালের ৪ আগস্ট গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়ার বর্ণিগ্রামে তাঁর জন্ম। এটি ছিল তাঁর মাতুলালয়। পৈতৃক নিবাস ছিল পিরোজপুর জেলার নাজিরপুরের ঝনঝনিয়া গ্রামে। বাবা ছিলেন পুলিশ অফিসার। নাম আলতাফ হোসেন মিয়া। আবুল হাসানের প্রকৃত নাম ছিল আবুল হোসেন মিয়া। কিন্তু আবুল হাসান নামেই তিনি লেখালেখি করতেন, আর এ নামেই স্মরণীয় হয়ে আছেন।
আবুল হাসান এসএসসি পাস করেন ১৯৬৩ সালে ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি বিদ্যালয় থেকে। তারপর বরিশালের বিএম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক। ইংরেজিতে অনার্স নিয়ে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ইংরেজিতে অনার্স পড়ছেন আর পাশাপাশি চলছে কবিতা লেখা, সাহিত্যসংগ্রাম।
এ সময়ই তাঁর সাহিত্য-চেতনা ও রাজনৈতিক-চেতনা বিকশিত হয়ে ওঠে। গণমানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখেন তিনি। ছাত্র হিসেবে ছিলেন মেধাবী। কিন্তু অনার্স পরীক্ষা দেননি। ১৯৬৯ সালে যোগ দিলেন দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা বিভাগে। সাংবাদিকতায় মেধার পরিচয় দিয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর ছিলেন গণবাংলা (১৯৭২-৭৩) এবং দৈনিক জনপদের (১৯৭৩-৭৪) সহকারী সম্পাদক। মাত্র ২২ বছর বয়স থেকেই তিনি ছিলেন খ্যাতিমান কবি, ঢাকা শহরের আলোচিত তরুণ। ব্যক্তিজীবনেও স্বকীয়তায় ভাস্বর প্রেম, দ্রোহ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে। ১৯৭০ সালে এশীয় কবিতা প্রতিযোগিতায় প্রথম হন তিনি। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর কাব্যগ্রন্থ রাজা যায় রাজা আসে, ১৯৭৪-এ যে তুমি হরণ করো এবং ১৯৭৫-এ সব শেষে পৃথক পালঙ্ক।
কবিতায় বলিষ্ঠ মানুষটি শারীরিকভাবে ছিলেন কিছুটা দুর্বল। হৃদযন্ত্রের সমস্যা ছিল তাঁর। অসুস্থতা তাঁকে ক্রমেই নিয়ে যেতে থাকে মৃত্যুর দিকে। ১৯৭৫ সালের ২৬ নভেম্বর কবিতা ও ভালোবাসা ছেড়ে তাঁর যাত্রা অনন্তলোকের দিকে।
তাঁর কাব্যনাট্য ওরা কয়েকজন (১৯৮৮) এবং আবুল হাসান গল্প সংগ্রহ (১৯৯০) প্রকাশিত হয়েছে মৃত্যুর অনেক পর। কবিতার জন্য তিনি মরণোত্তর বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৭৫) এবং একুশে পদক (১৯৮২) পেয়েছেন। আবুল হাসানের কবিতা আধুনিক বাংলা কবিতায় নিয়ে এসেছিল নতুন সড়ক, নতুন আবহ। আধুনিক নাগরিক, মানুষের নিঃসঙ্গতা, যন্ত্রণা, মৃত্যু চেতনা, বিচ্ছিন্নতা তাঁর কলমে পেয়েছে ভিন্ন মাত্রা।
কবি আবুল হাসান অনেক অবিস্মরণীয় কবিতার জনক। তিনি আজও জনপ্রিয়, বহুল পঠিত।