ইউরোপের ছোট্ট একটা দেশ যদি সুপার নিউক্লিয়ার বোমা বানিয়ে ফেলে তবে কি ঘটবে? যে করে হোক ঠেকাতে হবে ভিজিলের বোমা তৈরির পরিকল্পনা, ধ্বংস করতে হবে তার ফর্মুলার সব কটা কপি। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টা বাঁধবে কে? নিজের জীবন বাজি রেখে শত্রুশিবিরে হানা দেয়ার ক্ষমতা কার আছে? মাসুদ রানার? ও কি পারবে মানব জাতিকে নিশ্চিত ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে?
কাজী আনোয়ার হোসেন এর বড় ছেলে কাজী শাহনূর হোসেন। দুই ভাই কাজী শাহনূর হোসেন ও কাজী মায়মুর হোসেন মিলে আমাদেরকে দেন কৌতুক সিরিজের বই ‘সাড়ে চারশো কৌতুক’ জুলাই ১৯৮৯ সালে। এর পরে তিনি লিখেন মজার উপন্যাস ‘নাসিরুদ্দীন হোজ্জা’ ডিসেম্বর ১৯৯১ সালে। নিয়মিত হয়ে যান লেখালেখি নিয়ে। ‘আরও সাড়ে চারশো কৌতুক’ ও ইসলামিক সিরিজের ‘কোরানের কাহিন’ প্রকাশিত হয় সেপ্টেম্বর ১৯৯৩ সালে। রোমাঞ্চোপন্যাস ‘প্রফেসর মাসুদ রানা’ ডিসেম্বর ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। একই সালে কিশোর থ্রিলার সিরিজের সাব সিরিজ অ্যাডভেঞ্চার সিরিজের ৭ম ও শেষ বই ‘মাকড়সার জাল’ লিখে ফেলেন। কৌতুক সিরিজের আরেকটি বই পাই তার থেকে ’কৌতুকরঙ্গ’।
এর মাঝে বলে রাখি পেপারব্যাক ফরম্যাটের জন্য সেবাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে প্রচুর সমালোচনার। অনেকের মতে সেবার বই অল্পদিনেই নষ্ট হয়ে যায়, সংরক্ষণ করা যায় না, সংগ্রাহক হিসেবে সাজিয়ে রাখবার উপযোগী নয় এমন অভিযোগের মুখে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে হার্ডব্যাকে হোয়াইটপ্রিণ্ট পাবলিশ করার সিদ্ধান্ত নেন কাজীদা। ঠিক করা হলো, আলাদা একটি অঙ্গ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ছাপা হবে এসব বই। কাজী শাহনূর হোসেন প্রতিষ্ঠানের নাম রাখলেন “#প্রজাপতি_প্রকাশন”। সেবার মনোগ্রামের প্রজাপতি থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে মনোগ্রাম তৈরি করে দিলেন তখনকার নব্য শিল্পী ধ্রুব এষ। প্রতিষ্ঠানের স্বত্বাধিকারী কাজীদা হলেও তার কাজের বোঝা কমাবার জন্য শাহনূর হোসেনের হাতে অর্পিত হলো প্রধান নির্বাহীর দায়িত্ব, বইগুলোর ভিতরেও প্রকাশক হিসেবে কাজী শাহনূর হোসেনের নাম থাকতো। ১৯৯২ সালের জানুয়ারিতে আত্মপ্রকাশ করল প্রজাপতি প্রকাশন। সে সময় থেকে কাজী শাহনূর হোসেন আমাদের অনেক বই উপহার দিয়ে আসছেন। ১৯৯২ থেকে প্রজাপতি প্রকাশনে নিয়মিত প্রকাশিত হয় তার কিশোর ক্লাসিক ও অনুবাদ সিরিজের অনেক ভালো ভালো বই। বড় কাহিনির আসল অংশটুকু নিয়ে ছোট সাইজের বই প্রকাশিত হওয়ায় ছোটদের কাছে ছিল তা অনেক প্রিয়। প্রজাপতি ও সেবা দুই প্রকাশনী থেকে আমরা অনুবাদ ও কিশোর ক্লাসিক সিরিজের বই পেয়েছি তার সংখ্যা ৪৫ এর বেশি হবে।
১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ তিনি লিখেন নীল-ছোটমামা সিরিজ। যার ১২ বই এর মাঝে ১১টি প্রজাপতি থেকে এবং ১টি সেবা থেকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে এই সিরিজের বইগুলো তিন গোয়েন্দা রূপান্তরিত করা হয়েছে। রূপকথা সিরিজের ৩টি বই ও ছোটদের অবাক করা মজার তথ্য প্রজাপতি থেকে প্রকাশিত হয়। এখানেই শেষ না, ওয়েস্টার্ন সিরিজের ৯০তম বই যৌথ ভাবে লিখেন কাজী শাহনূর হোসেন ও আলীম আজিজ, বইটির নাম ছিল ‘মুক্তপুরুষ’। পাঠক জনপ্রিয়তার পর থেকে তিনি আর ওয়েস্টার্ন সিরিজ থেকে নিজেকে সরাতে পারেননি। নিয়মিত বিরতি দিয়ে লিখে ফেলেন ১২টির বেশি ওয়েস্টার্ন বই।
কয়েক বছর পর মাসুদ রানা পড়লাম । হাতের কাছে পেয়েছি, তাই পুরনো স্বাদটা ঝালাই করে নেবার শখ হলো। বইটার লেখক ও কাজী আনোয়ার হোসেন না। আগ্রহ নিয়েই বসা হল।
কিন্তু আমি হতাশ। স্টোরিলাইনের অবস্থা বেগতিক। লেখার মান ও সুবিধার না। সহজ অর্থে মাসুদ রানার লক্ষ্য একটা দেশকে নিউক্লিয়ার অস্ত্র বানানো থেকে বিরত রাখা। ছদ্মবেশ নিয়ে তাই শত্রুদেশে পদার্পণ। এরপরে কোন টুইস্ট ছাড়াই সফল মিশনের সমাপ্তি।
আমার কাছে বইটা সময়ের অপচয় মনে হয়েছে। অন্য কারো জন্য সাজেশনে বইটা না রাখায় ভালো।
মাসুদ রানা—এই নামটা শুনলেই আমার চোখে ভেসে ওঠে এক ইস্পাত-দৃঢ় ব্যক্তিত্ব, যার ক্ষুরধার বুদ্ধি আর অপ্রতিরোধ্য অ্যাকশনের সামনে বিশ্ব জুঁড়ে থাকা কোনো ষড়যন্ত্রই টিকতে পারে না। আমি নিজেও রানার একজন অন্ধ ভক্ত, আর সেই কারণেই যখন জানতে পারলাম, পদার্থবিদ প্রফেসর সালামের ছদ্মবেশে রানা ছুটছে ইক্সানিয়ার দিকে, তখন উত্তেজনায় আমি প্রায় ফুটছিলাম!
গল্পের শুরুটা কিন্তু মন্দ ছিল না। পদার্থবিদ প্রফেসর সালাম, যিনি কিনা নিজেও মাসুদ রানার বিশাল ভক্ত এবং এককালে স্পাই হতে চাইতেন, তাঁর সাথে পরিচয় হয় হ্যামণ্ড রবিন্সের। রবিন্স পেশায় 'গানস অ্যান্ড ব্লিস'-এর ফরেন রিপ্রেজেন্টেটিভ। আর রবিন্সই প্রফেসরকে দেয় এক অবিশ্বাস্য প্রস্তাব: ইউরোপের দেশ ইক্সানিয়া নাকি গোপনে পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে! তাদের মিশন হলো রবিন্সের সাথে জোভোগোরোডে গিয়ে সেই তথ্য সংগ্রহ করা। স্বাভাবিকভাবেই প্রফেসর সালাম রাজি হননি, কিন্তু পাঠক তো জানেন, শেষ পর্যন্ত কে এই মিশনে যাবে! প্রফেসর সালামের ছদ্মবেশে আমাদের প্রিয় মাসুদ রানা ঠিকই রবিন্সকে নিয়ে রওনা দিল ইক্সানিয়ার উদ্দেশ্যে।
পর্যালোচনা: যখন রানা রানার মতো থাকে না আমার সবচেয়ে বড় জিজ্ঞাসা ছিল, এই গল্পটা কি মৌলিক, নাকি কোনো বিদেশী কাহিনির অনুবাদ বা অনুপ্রেরণায় লেখা। ইন্টারনেট ঘেঁটেও এর উত্তর আমি পাইনি। কিন্তু সত্যি বলতে, গল্পটা যা-ই হোক না কেন, এর শেষ পরিণতি এক কথায় আমার কাছে অখাদ্য লেগেছে।
মাসুদ রানা নামটি শুনলে পাঠকের মনে যে উচ্চমানের, পেশাদার স্পাইয়ের ছবিটি ভেসে ওঠে, এই উপন্যাসের রানার সাথে তার কোন দিক দিয়েই কোনো সম্পর্ক নেই। সেই ইস্পাত-দৃঢ় ব্যক্তিত্ব অনুপস্থিত, প্রখর বুদ্ধির ঝলকানিও চোখে পড়েনি। আমার মনে হয়েছে, গল্পের প্লট এবং লেখনী দুটোই ছিল অপরিপক্ক—যা পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে বিরক্তি উদ্রেক করেছে। আমি মনে করি, এই গল্পটি একমাত্র সেই পাঠকেরাই শেষ করতে পারবে, যারা আমার মতো মাসুদ রানার অন্ধ ভক্ত। কেবল রানার নামটার টানেই হয়তো শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পৌঁছানো সম্ভব। মাসুদ রানার অন্যান্য উপন্যাসের মান বিচার করলে, এই বইটি পুরোপুরিভাবে বর্জনীয়। এটি শুধু 'নট রেকমেন্ডেড অ্যাট অল'ই নয়, এটি যেন রানার লেগ্যাসির সঙ্গে পুরোপুরি বেমানান।
আমি এই বইটিকে কোনো রেটিং দেব না। এটি অখাদ্য বলেই নয়, এর পেছনে অন্য একটা কারণ আছে যা আমি অন্য কোনো মাসুদ রানা উপন্যাসের রিভিউতে আলোচনা করব।
অনেকদিন পর মাসুদ রানা পড়লাম। এক নিঃশ্বাসে পড়ে শেষ করা রুদ্ধশ্বাস একটা থ্রিলার। সমকালীন প্রেক্ষাপটের সাপেক্ষেও বইটি অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক। #unputdownablebook
মাসুদ রানার আদলে প্রফেসর মাসুদ রানা লেখা। নিজে একটা নতুন চরিত্র তৈরি না করে আগের চরিত্রের উপর ভিত্তি করে মিলিয়ে লেখাটা দুরূহ কাজ। লেখক খুব সুন্দর ভাবেই কাজটা শেষ করতে পেরেছেন।
তবে যাদের মাসুদ রানা পড়ে অভ্যাস, তাদের কাছে কিছুটা বিরক্তিকর লাগতে পারে।