কথাসরিৎসাগর মানে হলো গল্প-নদীর সাগর। আনুমানিক একাদশ শতাব্দীতে কাশ্মিরী কবি সোমদেব ভট্ট এটি সংস্কৃত ভাষায় রচনা করেন।
সোমদেবের লিখিত কিংবদন্তি রাজা উদয়ন ও তার পুত্র নরবাহনদত্তের বিভিন্ন অভিযানের কাহিনি সংক্ষিপ্ত আকারে ছোটদের উপযোগী করে পরিবেশন করেছেন কুলদারঞ্জন রায়।
এই বইয়ের মধ্যে রাজা, রানী, যোদ্ধা, জাদুকর, পশু-পাখি, দেবতা আর দৈত্যদের নিয়েও অনেক গল্প আছে। কেউ সাহস করে বিপদ কাটিয়ে ওঠে, কেউ মিথ্যা বলার শাস্তি পায়, আবার কেউ দয়া আর বুদ্ধির জন্য পুরস্কৃত হয়। এক গল্পের ভিতরে আরেকটা গল্প লুকিয়ে থাকে—একটা শেষ হতে না হতেই আরেকটা শুরু হয়।
এই গল্পগুলো শুধু সময় কাটানোর জন্য নয়—এসব গল্প আমাদের শিখিয়ে দেয় কীভাবে ভালো মানুষ হতে হয়, কী ভুল করা যাবে না, আর কেমন করে সাহসী ও বুদ্ধিমান হওয়া যায়। তাই কথাসরিৎসাগর শুধু একটা বই নয়, যেন এক যাদুর ঝাঁপি, যেটা খুললেই বের হয় গল্পের রাশি!
একাধারে শিশুসাহিত্যিক, আলোকচিত্রশিল্পী, সঙ্গীতজ্ঞ ও ক্রীড়াবিদ কুলদারঞ্জন রায় ১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে অবিভক্ত ভারতের ময়মনসিংহ জেলার মসূয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। সংস্কৃতিবান পিতা কালীনাথ রায়ের প্রেরণায় কুলদারঞ্জনের প্রতিভা, তাঁর অগ্রজ উপেন্দ্রকিশোরের মতোই, বহু বিচিত্র দিকে বিকশিত হয়েছিল। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে কুলদারঞ্জন কলকাতার আর্ট স্কুলে ভর্তি হন। চারুকলায় এই প্রথাগত তালিম তাঁর সাহিত্যকেও প্রভাবিত করেছিল। বর্ণিত কাহিনি দৃষ্ট, শ্রুত তথা অনুভূত হয়ে যেন জীবন্ত হয়ে উঠত তাঁর লেখার অমোঘ প্রসাদগুণে।
দাদা উপেন্দ্রকিশোর প্রতিষ্ঠিত সন্দেশ পত্রিকায় ১৯১৩ সালে কুলদারঞ্জনের লেখালেখির শুরু। পুরাণ, লোককথা এবং বিদেশি চিরায়ত সাহিত্যকে স্বাদু, সাবলীল ভাষায় শিশুদের উপযোগী করে তিনি অনুবাদ করতে থাকেন 'রবিনহুড' (১৯১৪), 'ওডিসিয়ুস' (১৯১৫), 'ছেলেদের বেতালপঞ্চবিংশতি' (১৯১৭), 'কথাসরিৎসাগর', 'পুরাণের গল্প', 'ছেলেদের পঞ্চতন্ত্র' প্রভৃতি গ্রন্থে। তাঁর অনুবাদে জুল ভের্নের 'The Mysterious Island' হয়ে ওঠে 'আশ্চর্য দ্বীপ'- বিজ্ঞান, রোমাঞ্চ ও কল্পনার মেলবন্ধন যেখানে তাঁর ভাষায় এমন অনবদ্যভাবে উপস্থাপিত যে, তা আর নিছক অনুবাদ থাকে না, হয়ে ওঠে স্বতন্ত্র সাহিত্যকর্ম।
বাংলা ভাষায় হোমস কাহিনির প্রথম পূর্ণাঙ্গ অনুবাদের কৃতিত্বও কুলদারঞ্জনের। স্যার আর্থার কনান ডয়েলের 'The Hound of the Baskervilles' উপন্যাসটি তাঁর অনুবাদে 'বাস্কারভিল কুকুর' নামে প্রকাশিত হয়। সেই প্রথম শার্লক হোমস নামের ক্ষীণকায়, তীক্ষ্ণবুদ্ধিসম্পন্ন গোয়েন্দাপ্রবরের সঙ্গে বাঙালি পাঠকের নিবিড় পরিচয়। পরে, লেডি কনান ডয়েলের অনুমতি নিয়ে তিনি শার্লক হোমসের বিচিত্র কীর্ত্তি-কথা নামে আরও একটি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করেন। 'The Adventures of Sherlock Holmes' এর সম্পূর্ণ অনুবাদও তিনি নাকি করেছিলেন, যদিও তা বর্তমানে দুর্লভ।
সাহিত্যের পাশাপাশি চিত্রকলা, আলোকচিত্র ও সংগীতেও সমান দক্ষ কুলদারঞ্জন রায় ছিলেন একজন সফল ক্রীড়াবিদ। ক্রিকেট ও হকিতেও তাঁর নৈপুণ্য সমসময়ে প্রশংসিত হয়েছিল।