চাণক্য। একটি নাম, একটি যুগ, অলৌকিক এক ব্যক্তিত্ব। অপমানকে তিনি ব্যক্তিগত প্রতিশোধে সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং তা দিয়ে পাল্টে দিয়েছেন উপমহাদেশের ইতিহাস। তিনি আচার্য চাণক্য— অগাধ পাণ্ডিত্য, দুর্দমনীয় সংকল্প আর অনন্য কূটনৈতিক বুদ্ধির এক বিস্ময়কর সমন্বয়। তাঁর চরিত্রে যেমন আছে ভয়ংকর নিষ্ঠুরতা, তেমনই আছে গভীর মমতা ও স্নেহের আশ্চর্য সংমিশ্রণ।
তিনি একজন গুরু, একজন কৌশলী রাষ্ট্রনির্মাতা, একজন প্রতিহিংসায় দগ্ধ অথচ আদর্শে অটল মানুষ। চাণক্য কি শুধুই এক নিষ্ঠুর কূটনীতিক ? নাকি তিনি ছিলেন সময়ের দাবিতে গড়ে ওঠা এক অনিবার্য প্রতিভা ? এই উপন্যাস ইতিহাসের গর্ভে লুকিয়ে থাকা এক জটিল চরিত্রের অগ্নিপথে অভিযাত্রার অনন্য কাহিনি।
কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম.এসসি। শিশু কিশোর ও প্রাপ্তমনস্ক সাহিত্যের ইতিহাস, বিজ্ঞান, রহস্য, হাসিমজা...নানা শাখায় বিচরণ। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় প্রচুর লেখালিখি। প্রকাশিত ও সম্পাদিত বইয়ের সংখ্যা ৫০ ছাড়িয়েছে। জনপ্রিয় চরিত্র বিজ্ঞানী জগুমামা ও টুকলু। ১৯৯৫ থেকে কিশোর ভারতী পত্রিকার সম্পাদক। ২০০৭ সালে পেয়েছেন শিশু সাহিত্যে রাষ্ট্রপতি সম্মান। শিশু-কিশোর সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য ২০২৩ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিদ্যাসাগর স্মৃতি পুরস্কারে সম্মানিত। মধ্যবর্তী সময়ে পেয়েছেন রোটারি বঙ্গরত্ন, অতুল্য ঘোষ স্মৃতি সম্মান, প্রথম আলো সম্মান ও নানা পুরস্কার
সম্প্রতি শেষ করলাম ত্রিদিব কুমার চট্টোপাধ্যায়ের লেখা "চাণক্য অগ্নিপথের যাত্রী"। শুরুতেই বলে রাখা ভালো, এটি কোনো প্রথাগত ইতিহাস আশ্রিত বই নয়। চাণক্যকে নিয়ে প্রচলিত বিভিন্ন তথ্য ও জনশ্রুতির ওপর ভিত্তি করে লেখক নিজের কল্পনায় প্রায় ২০০ পাতার একটি উপন্যাস সাজিয়েছেন। গল্পের প্রেক্ষাপট বইটি মূলত দুটি ভাগে বিভক্ত: প্রথম ভাগ: নন্দ রাজা কর্তৃক অপমানিত হয়ে চাণক্যের সেই বিখ্যাত শপথ—অত্যাচারী ধননন্দকে সিংহাসনচ্যুত করে নতুন রাজা প্রতিষ্ঠা করা। যোগ্য ব্যক্তির সন্ধানে বেরিয়ে তিনি খুঁজে পান চন্দ্রগুপ্তকে। এই পর্বের শেষে চন্দ্রগুপ্ত সৈন্যদল গঠন করে মগধের সিংহাসন দখল করেন, যেখানে তাঁর প্রধান পরামর্শদাতা ও শিক্ষাগুরু ছিলেন চাণক্য। দ্বিতীয় ভাগ: সিংহাসনে বসার পর মগধের অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র এবং অন্তর্ঘাত থেকে রাজ্য রক্ষা করার লড়াই। এখানেও ছায়ার মতো পাশে ছিলেন চাণক্য। পাশাপাশি চন্দ্রগুপ্তের ব্যক্তিগত জীবনের নানা টানাপোড়েনও ফুটে উঠেছে এই পর্বে। যা যা ভালো লেগেছে ১. সহজ ও গতিময় ভাষা: বইটির ভাষা অত্যন্ত সহজবোধ্য। পড়ার সময় একটা দারুণ থ্রিল কাজ করে, যা পাঠককে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়। ২. তথ্যের উপস্থাপন: গল্পের ছলে অনেক ঐতিহাসিক ও চাণক্য নীতি সংক্রান্ত তথ্য উঠে এসেছে, যা মনে রাখা সহজ হয়। ৩. মানবিক চাণক্য: লেখক চাণক্যকে রক্ত-মাংসের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। তিনি কোনো অতিমানব নন, বরং আমাদের মতোই এক মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান যিনি ভুলত্রুটি করেন। এই মানবিক দিকটি দারুণ লেগেছে। ৪. চরিত্রায়ন: চাণক্য এবং চন্দ্রগুপ্তের চরিত্র দুটিকে ধাপে ধাপে খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ৫. অলঙ্করণ: বইটির প্রচ্ছদ এবং ভেতরের ইলাস্ট্রেশনগুলো ছিল অসাধারণ, যা পড়ার অভিজ্ঞতাকে আরও সমৃদ্ধ করে। যেখানে খামতি মনে হয়েছে ১. কিছুটা অপরিপক্ক বর্ণনা: কিছু দৃশ্য (যেমন—দুই সিংহের লড়াই) বেশ শিশুতোষ বা দুর্বল মনে হয়েছে। ২. সাসপেন্সের অভাব: গল্পে সারপ্রাইজ এলিমেন্ট বা রহস্যের অভাব ছিল, যা থ্রিলারধর্মী উপন্যাসে থাকা প্রয়োজন। ৩. গতি ও স্টেপ জাম্প: লেখক বেশ কিছু জায়গায় তাড়াহুড়ো করেছেন। হুট করে এক ঘটনা থেকে অন্য ঘটনায় চলে যাওয়ায় খেই হারিয়ে ফেলেছি। ৪. ডিটেইলিং-এর অভাব: যুদ্ধের বর্ণনা বা চাণক্য কীভাবে চন্দ্রগুপ্তকে গড়ে তুললেন, সেই প্রস্তুতির পর্বগুলো আরও বিস্তারিত হতে পারত। ৫. অযৌক্তিকতা: শুধুমাত্র গায়ের রঙের জন্য অপমানিত হয়ে চাণক্যের এত বড় সিদ্ধান্ত নেওয়াটা কিছুটা অবাস্তব মনে হয়েছে। উপসংহার সামগ্রিকভাবে বইটি বেশ ভালো। এতে প্রেম, বিরহ, যুদ্ধ, রাজনীতি, নীতিশিক্ষা, দর্শন এবং আধ্যাত্মিকতার এক চমৎকার মিশ্রণ রয়েছে। চাণক্য নীতির ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং তাঁর দৃঢ় সংকল্প পাঠককে অনুপ্রাণিত করবে। সময় কাটানোর জন্য এবং চাণক্য সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে বইটি অবশ্যই একবার পড়ে দেখা যেতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে আমি বইটি আরও কয়েকবার পড়তে চাই।