"আমি মনে করি, মানুষ নিজের ভাগ্য নিজেই গড়তে পারে, যদি তার মধ্যে থাকে পুরুষকার, স্থির লক্ষ্য এবং অদম্য জেদ। সেই দিন আসন্ন, যেদিন নতুন পথে বইবে এদেশের ইতিহাস।"
মগধের সিংহাসনে ধননন্দ, চারদিকে রাজনৈতিক অস্থিরতা, ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার লোভ আর শাসনের নির্মমতা, চন্দ্রগুপ্তের উত্থান এবং মৌর্য সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা - এই সমগ্র রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মানুষ: আচার্য চাণক্য। একজন মানুষ, যিনি ধননন্দের সভায় নিজের অপমানকে ব্যক্তিগত প্রতিশোধে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সেই আগুন দিয়েই জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন এক যুগের অবসান এবং সূচনা করেছিলেন নতুন এক সাম্রাজ্যের, এক নতুন ভারতের স্বপ্নের।
চাণক্য - যুগ যুগ ধরে এক বিস্ময়। ধূর্ত কূটনীতিক হিসেবেই সাধারণত তাঁকে চিনলেও, এই উপন্যাস সেই প্রচলিত ধারণার বাইরেও তাঁকে দেখার সুযোগ দেয়। তিনি যেমন ধূর্ত, তেমনি দূরদর্শী; যেমন রাজ্যসংকটে অসাধু বণিকদের প্রতি নির্মম, তেমনি সাধারণের প্রতি গভীর স্নেহশীল, যেমন প্রতিশোধস্পৃহায় দগ্ধ এক অপমানিত ব্রাহ্মণ, তেমনই শিষ্য চন্দ্রগুপ্তকে গড়ে তুলতে তিনি এক নিবেদিত গুরু, একজন রাষ্ট্রচিন্তক, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা এবং গভীর আবেগে ভরা মানুষ। তাঁর প্রতিটি শিক্ষা শুধু রাজনীতি নয়, জীবনেরও পাঠ।
চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এই উপন্যাসের অন্যতম শক্তিশালী দিক। কীভাবে এক সাধারণ বালককে ধাপে ধাপে তিনি সম্রাট হিসেবে গড়ে তোলেন, কীভাবে যুদ্ধনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও জীবনের কঠিন বাস্তব শেখান - সেই পথচলা অত্যন্ত আকর্ষণীয়। বিশেষ করে ‘কৃশর’ রান্নার সময় এক সাধারণ মা ও সন্তানের কার্যলাপ থেকে মগধ আক্রমণৈর ক্ষুরধার পরিকল্পনা ও যুদ্ধকৌশল শেখানোর মুহূর্তগুলো চাণক্যের অসামান্য প্রজ্ঞাকে জীবন্ত করে তোলে।
উপন্যাসের দ্বিতীয় ভাগে চন্দ্রগুপ্তের রাজ্যশাসন, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, সেলুকাসের মতো প্রতিপক্ষের মোকাবিলা, বৈবাহিক জীবন এবং পরবর্তী সময়ে বিন্দুসারের শাসন - সবকিছুতেই ছায়ার মতো উপস্থিত চাণক্য। মৌর্যবংশের প্রথম দুই পুরুষের সুরক্ষাকবচ হয়ে তিনি যেন ইতিহাসের অন্তরালে থেকেও প্রধান চালিকাশক্তি। অথচ মৌর্যবংশের প্রাণপুরুষের ভীষণ করুণ - ইতিহাসের নির্মমতা তখন বড় ব্যক্তিগত মনে হয়।
লেখকের ভাষা সহজ, ঝরঝরে এবং অত্যন্ত সুখপাঠ্য। কোথাও ভারী ইতিহাসচর্চার ক্লান্তি নেই; বরং গল্পের ছলে রাজনীতি, নীতি, দর্শন, প্রেম, যুদ্ধ, বিশ্বাসঘাতকতা - সব মিলিয়ে পাঠককে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখে। চাণক্যকে অলৌকিক বা অতিমানব না বানিয়ে রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা বিশেষভাবে প্রশংসনীয়। তাঁর নিষ্ঠুরতার পাশে মমতা, কৌশলের পাশে মানবিকতা - এই দ্বৈততাই চরিত্রটিকে গভীরতা দিয়েছে।তবে এই গল্পের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য সম্ভবত চাণক্যের মানবিক রূপ। তিনি কোনো পৌরাণিক অতিমানব নন - তিনি ভুল করেন, আঘাত পান, ভালোবাসেন, হারান, এবং শেষ পর্যন্ত এক ভীষণ করুণ পরিণতির দিকে এগিয়ে যান।
তবে কিছু জায়গা অন্যরকম হলে হয়তো ভালো হতো। দুই সিংহের লড়াইয়ের ব্যাপারটা শিক্ষনীয় হলেও, তা যেন একটু বেশিই নাটকীয়। তেমনি চন্দ্রগুপ্তের তার জন্মদাত্রী মা মুরার সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারটাও কিছুটা তাই। আবার অন্যদিকে তক্ষশীলায় থাকাকালীন চাণক্যের অভিজ্ঞতা, যুদ্ধের প্রস্তুতি, চন্দ্রগুপ্তের প্রশিক্ষণ, সেলুকাসের সম্মুখীন হওয়া, দুরধরা বা হেলেনের রাজনৈতিক উপস্থিতির মতো বিষয়গুলো - আরো বিস্তৃত প্রেক্ষাপট দাবি করে। কোথাও কোথাও দ্রুত ঘটনাপ্রবাহ খানিক অসম্পূর্ণতার অনুভূতিও দেয়। তবু সামগ্রিকভাবে প্রেম, বিরহ, যুদ্ধ, দর্শন, রাজনীতি এবং নীতিশিক্ষা মিলিয়ে এটি একটি ছিমছাম উপন্যাস।
চাণক্য আসলে এক মানুষের জেদের ইতিহাস। একজন অপমানিত ব্রাহ্মণের গল্প, যিনি নিজের ক্ষতকে অস্ত্র বানিয়ে বদলে দিয়েছিলেন উপমহাদেশের ভাগ্য।
A King-Maker can also be a King-Breaker.