একটা ছোট্ট ভুলের মাশুল দিতে গিয়ে উজ্জ্বল সায়েন্টিফিক কেরিয়ার প্রশ্নের মুখে পড়ে গেছে ডক্টর লীলা নাম্বিয়ারের। ওদিকে, প্যাসিফিক ওশ্যানের ইকোলজি নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয়েছে তার বন্ধু পার্সিসকে। দুই বন্ধুর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে সমুদ্রের অতল থেকে উঠে আসা কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্ন! সেই প্রশ্ন মনুষ্যজাতির অস্ত্বিত্বের। বায়োলুমিনিসেন্ট প্রাণীদের নীরব ভাষা, জলমগ্ন স্থাপত্য থেকে নির্গত আলোর সংকেত, ডিপ স্পেস থেকে রিসিভ করা এক অজানা রেডিও সিগন্যাল— সব মিলিয়ে খুলে যেতে থাকে এমন এক অভাবনীয় সত্য, যা পৃথিবীর জলবায়ু আর মানুষের ভঙ্গুর সভ্যতার ইতিহাস দুটোকেই নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। সায়েন্স ফিকশনের আদলে 'সাবলিমিনাল' স্পেসটাইমের ভিন্ন ভিন্ন বিন্দুতে ঘটে চলা আবহমান অভিবাসনের এক নীরব, বিষণ্ণ আখ্যান।
সুদীপ চট্টোপাধ্যায়ের ‘সাবলিমিনাল’ বাংলা ভাষায় লেখা একটা ক্লাইমেট থ্রিলার, কিন্তু বইটার আসল প্রশ্নটা বিজ্ঞানের নয়, নীতির।
সাবলিমিনাল · সুদীপ চট্টোপাধ্যায় · অরণ্যমন প্রকাশনী, কলকাতা · প্রথম প্রকাশ বইমেলা ২০২৬ · ১৯২ পৃষ্ঠা (মূল উপন্যাস ৭–১৮৪, লেখকের বৈজ্ঞানিক টীকা ১৮৫–১৯২) · ধরন: ডিপ-সি সায়েন্স থ্রিলার / ক্লাইমেট ফিকশন
প্রথম পর্ব — স্পয়লারমুক্ত
‘সাবলিমিনাল’-এর শেষ আটটা পাতা জুড়ে লেখক ছাব্বিশটা বৈজ্ঞানিক শব্দের ব্যাখ্যা দিয়ে রেখেছেন — গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ একো থেকে কোয়ান্টাম এন্ট্যাঙ্গলমেন্ট, ম্যারিন স্নো থেকে কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশন। বাংলা জঁর-সাহিত্যে এই জিনিস বিরল। আরও বিরল হল, টীকাগুলো পড়লে বোঝা যায় লেখক নিজে জিনিসগুলো বুঝে লিখেছেন, উইকিপিডিয়া থেকে টুকে দেননি।
গল্পটা এইরকম। ২০২৯ সাল। লীলা নাম্বিয়ার একজন রেডিও সিস্টেম ইঞ্জিনিয়ার, অস্ট্রেলিয়ার এক বহুজাতিক অফশোর ড্রিলিং কোম্পানির চাকরি থেকে তাঁকে সদ্য বরখাস্ত করা হয়েছে — একটা গবেষণাপত্র প্রকাশ করার অপরাধে, যেটা কোম্পানির ব্যবসায়িক স্বার্থের বিরুদ্ধে গেছে। ঠিক সেই দিনই একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। ওদিকে প্রশান্ত মহাসাগরের অতলে, ফিলিপিন ট্রেঞ্চের পাঁচ হাজার মিটার নীচে, ম্যারিন বায়োলজিস্ট পার্সিস সান্তোস একা সাবমার্সিবল নামিয়ে এমন কিছু দেখে ফেলেন যা তাঁর দেখার কথা ছিল না। বিরাট একটা স্থাপত্য, জ্যামিতিক, স্পষ্টতই কেউ বানিয়েছে। আর তার গা থেকে ঠিক সেই ছন্দে আলো বেরোচ্ছে, যে ছন্দে আলো বেরোচ্ছে পাশে ভেসে থাকা একটা জায়ান্ট স্কুইডের শরীর থেকে।
প্রথম কুড়ি পাতার এই ডাইভ-দৃশ্যটাই বইয়ের সবচেয়ে ভালো লেখা। অন্ধকার, চাপ, ল্যান্টার্ন ফিশ আর গাল্পার ইলের ভিড়, ম্যারিন স্নো-এর নিঃশব্দ তুষারপাত — সুদীপ এখানে তাড়াহুড়ো করেননি, বিস্ময় আর আতঙ্ক দুটোকেই সময় দিয়েছেন। তারপর তৃতীয় অধ্যায়ে বইটা হঠাৎ থ্রিলারে বদলে যায়, এবং সেই বদলটা ধাক্কা দেওয়ার মতোই নির্মম।
বইয়ের সবচেয়ে বড়ো সম্পদ কিন্তু তার বিজ্ঞান নয়, তার মানুষগুলো। বিশেষ করে দুজন।
প্রথমজন জোমারি — ফিলিপিন্সের কালায়ান দ্বীপের ছেলে, এখন সমুদ্রের মাঝখানের একটা রিসার্চ ফ্যাসিলিটির ডিজাইনার। ছোটোবেলায় সে ‘জলের গান’ শুনতে পেত, সেই গান শুনে কবিতা লিখত। তারপর জলস্তর বেড়ে তার দ্বীপ ডুবে যায়, বাবার রোজগার বন্ধ হয়, দাদা মারা যায়, পরিবার ম্যানিলার ক্যাম্পে গিয়ে ওঠে। আজ সে আর গান শুনতে পায় না, কবিতাও লেখে না। ‘এখন জল দেখলে শুধু দাদার মুখটা মনে পড়ে।’ — এই একটা লাইনে সুদীপ যা করেছেন, গোটা একটা ক্লাইমেট নভেল অনেক সময় তা পারে না। জলবায়ু বিপর্যয়কে তিনি সংখ্যায় মাপেননি, মেপেছেন একটা ছেলের কবিতা হারিয়ে ফেলা দিয়ে।
দ্বিতীয়জন আলোক কুমার ব্যানার্জি। ব্যাঙ্গালোরের ইন্দিরানগরের একটা টু-বিএইচকে ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকেন, লিফট মাসখানেক খারাপ, রবিবার সকালে হ্যাল মার্কেটে গিয়ে ঢ্যাঁড়সের পেছন ভেঙে দেখেন কচি কিনা। ইনিই পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো সেফালোপড-কমিউনিকেশন বিশেষজ্ঞ। কোনোদিন সাবমার্সিবলে চড়েননি, উডস হোল ডেকেছিল, যাননি। ভারতে বসে গ্রান্টের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন, ‘স্কুইড গবেষক’ পরিচয় দিলে লোকে হেসেছে, তবু ছাত্র পড়িয়ে এসে রাতে ক্রোমাটোফোর পালস চার্ট ম্যাপ করে গেছেন। এই চরিত্রটা তৈরি করার জন্যই বইটা পড়া যায়। ভারতীয় বিজ্ঞানের অর্থাভাব আর আমলাতান্ত্রিক জটিলতা নিয়ে সুদীপ যে দু-পাতা লিখেছেন, তাতে বিলাপ নেই, রাগও নেই — আছে একটা শান্ত, ক্লান্ত সততা, যা অনেক বেশি কার্যকর।
এবার অভিযোগের তালিকা
সবচেয়ে বড়ো সমস্যা ভাষা। বইটা ইংরেজি শব্দের বাংলা প্রতিবর্ণীকরণে ভেসে গেছে। পরিভাষার ক্ষেত্রে সেটা মানা যায় — ‘হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট’-এর বাংলা করতে গেলে হাস্যকর হত। কিন্তু সংলাপে যখন গোটা ইংরেজি বাক্য বাংলা হরফে বসে — ‘ইউ জাস্ট স্টেটেড দ্য ফ্যাক্ট’, ‘ডাজন্ট ম্যাটার’, ‘দ্যাটস হোয়াই ইউ আর হিয়ার, ম্যাম’। চরিত্ররা আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী, ইংরেজিতেই কথা বলবে, মানলাম; কিন্তু ঔপন্যাসিকের কাজ তো সেই কথোপকথনকে বাংলায় অনুবাদ করা, বাংলা হরফে প্রতিলিপি করা নয়।
দ্বিতীয় সমস্যা গঠনের। তৃতীয় অধ্যায়ের রক্তাক্ত ঘটনার ঠিক পরেই লেখক প্রায় দশ পাতা জুড়ে দুই বন্ধুর কথোপকথনে গোটা ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপট — জাপান-আমেরিকা টানাপোড়েন, ইউক্রেন, এসএআর প্রযুক্তি হস্তান্তর — বুঝিয়ে দেন। তথ্যগুলো আকর্ষণীয়, কিন্তু জায়গাটা ভুল। যে গতিটা তিনি এত কষ্টে তৈরি করেছিলেন, সেটা এখানে থেমে যায়। একই দোষ পরে আরও দু-এক জায়গায় ফিরে আসে: নাটক বন্ধ রেখে ব্রিফিং চলে।
তৃতীয়ত, ভিলেন। ডিপড্রিল ভেলারিস একটা মুখহীন কর্পোরেট অপশক্তি, আর চোখের উপর কাটা দাগওয়ালা ভাড়াটে খুনিটি সিনেমা থেকে সোজা উঠে আসা। অথচ বইয়ের একমাত্র সত্যিকারের জটিল প্রতিপক্ষ — ডক্টর হোল্ডার, যিনি মেয়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে বিক্রি হয়ে গিয়েছিলেন — তাঁকে লেখক প্রায় শুরুতেই সরিয়ে দেন, তারপর তাঁর অস্তিত্ব শুধু অন্যের বয়ানে। এতবড়ো একটা নৈতিক জটিলতা এভাবে খরচ করে ফেলাটা অপচয়।
তবু, এতগুলো অভিযোগের পরেও বলতে হয় — বাংলায় এই মাপের, এই প্রস্তুতির কল্পবিজ্ঞান-থ্রিলার সাম্প্রতিক কালে বিশেষ লেখা হয়নি। প্রেমেন্দ্র মিত্র বা সত্যজিতের কল্পবিজ্ঞান ছিল আবিষ্কারের আনন্দে ভরা, অনেকটাই কৌতুকমিশ্রিত। সুদীপ অন্য জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন: তাঁর বিজ্ঞান আনন্দের নয়, দায়ের। এবং সেই দায়টা তিনি শেষ পর্যন্ত পাঠকের ঘাড়েও চাপিয়ে দেন।
নীচের অংশে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় রহস্য এবং শেষ দৃশ্য নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা আছে। বইটি না পড়ে থাকলে এখানেই থামুন।
সাবলিমিনাল সুদীপ চট্টোপাধ্যায় অরণ্যমন প্রকাশন ৩০০ টাকা ________________________________________ ক্লাইফাই বা ক্লাইমেট ফিকশন নামটার সাথে সাইফাইপ্রিয় বাঙালি পরিচিত। মূলতঃ আমাদের পরিবেশের ক্রমবর্ধমান ক্ষতির বিভিন্ন দিক সম্বন্ধে সচেতন করার বার্তা পেশ করা হয় বাস্তব পৃথিবীর মাটিতে সামাজিক গল্প, সায়েন্স ফিকশন, রহস্য গল্প অথবা পাঠকপ্রিয় বিভিন্ন ঘরানার গল্পের মোড়কে, যার ভিত্তি পিওর সায়েন্স। সুদীপ চট্টোপাধ্যায় আগেও ক্লাইফাই লিখেছেন (অনলগর্ভা)। এবারের ক্লাইফাই আগেরটার থেকে প্লটবিচারে আলাদা এবং আরও পরিণত। কারা পড়বেন না? ১) যারা হার্ড সাইফাই দুচক্ষে দেখতে পারেন না। ২) সায়েন্টিফিক টার্মিনোলোজি দেখলেই পিত্তি চটে যায়। ৩) অচেনা ঘরানার গল্প যারা পছন্দ করেন না। কারা (পড়তে চাইলে) পড়তে পারেন? ১) যারা নতুন নতুন প্লটের বিজ্ঞানভিত্তিক গল্প ভালবাসেন। ২) যারা হার্ড সাইফাইয়ে গল্পের প্রয়োজনে ব্যবহৃত পিওর সায়েন্স রিলেটেড ইনফর্মেশন ডাইজেস্ট করার ব্যাপারে ওয়াকিবহাল। ৩) লেখকের লেখা আগে পড়েছেন এবং লেখকের ক্যালিবার সম্পর্কে শ্রদ্ধাশীল। কেন পড়ে দেখতে পারেন? ১) ক্লাইমেট ফিকশন নিয়ে বিশ্ব জুড়ে তুখোড় সব কাজ হচ্ছে, সেখানে বাঙালি লেখকদের কন্ট্রিবিউশন এবং তুলনামূলক অবস্থান ট্র্যাক করার জন্য। ২) লেখকের ইউনিক স্টোরি টেলিংয়ের আস্বাদ নেওয়ার জন্য। যা ভালো লাগলো — ১) গল্পের চরিত্র তৈয়ারিতে লেখক প্রকৃত অর্থেই বিশ্বনাগরিক। ২) সমুদ্র বিজ্ঞান, ফিজিক্সের সাথে জিওপলিটিক্স মিশিয়ে ক্লাইফাইয়ের হাইফাই ককটেল। ৩) গল্পের স্লো বার্ন টাইপের গতি এবং গল্পের প্রয়োজনে গতির হেরফের। ৪) নামকরণের সার্থকতা। ৫) বইয়ের শেষে প্রয়োজনীয় কিছু টীকা। উপন্যাসের স্পয়লারফ্রি অতি-সামারি — সমুদ্রের তলার ইকোসিস্টেম সংক্রান্ত গবেষণা এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের কাজে বড়সড় মাপের দুর্নীতিতে যুক্ত হয়ে পড়েছে বিভিন্ন দেশের সরকার পোষিত সব ডিপ সি ড্রিলিং কোম্পানি। তারা কিছু একটা বড় জিনিস খুঁজে পেয়েছে এবং আরও খুঁজে চলেছে ডিপ সি ড্রিলিং করে। অদ্ভুত কিছু রেডিও সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে তার ফলে এবং নির্দিষ্ট কিছু সামুদ্রিক প্রাণীও তাতে রিয়্যাক্ট করছে। সিগন্যালের সাথে আবার মিল আছে বহির্জগতের রেডিও ফ্রিকোয়েন্সির। এরই ফাঁকে পরিবেশের ভারসাম্য অলমোস্ট নষ্ট হওয়ার পথে বিভিন্ন কারণে। জিওপলিটিক্স এবং সাধারণ মানুষের সামাজিক মূল্যবোধের সাথে সাযুজ্য রেখে পরিবেশের ইন্তেকাল কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করা যাবে? ভুরু কোঁচকানোর মত কিছু পয়েন্ট — ১) (গল্পের প্রয়োজনে করা হলেও) ইনফোর ছড়াছড়ি ক্লান্ত করে দিতে পারে পাঠককে। ২) প্রুফ রিডিং বিলো অ্যাভারেজ।
বাংলায় এরকম সায়েন্স / ক্লাইমেট ফিকশন এই প্রথম পড়লাম । এবং - বেশ, বেশ, ভালো লাগলো। অযথা ইনফোডাম্পিং না করে, অহেতুক বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার না করে, চরিত্রের চচ্চড়ি না বানিয়ে ভালোভাবে বলা গল্প।
সুদীপবাবুর লেখার ফ্যান সেই অপারেশন ব্ল্যাক অ্যারো পড়ার পর থেকেই, এবং এবারেও তার ব্যতিক্রম হলো না।
ভীষণ বাস্তব এবং জ্বলন্ত (নাকি ডুবো / submerged) সমস্যা নিয়ে এই কাহিনী। যারা সিরিয়াস লেখা পছন্দ করেন, তাদের জন্য রেকমেণ্ডেড। আর আপনি যদি সমুদ্রের নীচের জগত নিয়ে জানতে আগ্রহী হন তাহলে অবশ্যই ভালো লাগবে এই বই।
একটাই একটু খারাপ লাগা / চোখে পড়লো - এক একটি অধ্যায়ে প্রথম এবং তৃতীয় পুরুষের ব্যবহার একটু খাপছাড়া লাগলো ।