মানুষের জীবনের পথে-ঘাটে ছড়িয়ে থাকে সম্পর্ক আর শিক্ষার নীরব গল্প। সেই সকল কঠিন গল্প সহজভাবে এই বইয়ের মধ্যে ধরা দিয়েছে কোমল কাব্যিকতায়। যেন সকালবেলার শিশিরভেজা পাতায় জীবনের ছোট-বড় সত্যিগুলো ঝিলমিল করে জ্বলে ওঠে। প্রতিটি গল্প মানসিক বোঝাপড়ার নতুন দরজা খুলে দেয়। শেখায় স্নেহ, বন্ধুত্ব, আত্মপ্রেম, সংবেদনশীলতা এবং মমতার সূক্ষ্ম ভাষা। শিশুর মন যেমন নদীর মতো সহজে গ্রহণ করে নতুন প্রবাহ, আশা করা যায় তেমনভাবে এই গল্পগুলো পাঠকমনে বুনে দেবে মানবিকতার শান্ত সুর। পাঠকের অন্তরে আলো ছড়াতে এই বই হয়ে উঠুক স্বস্তির বাহক, উষ্ণ সহচর।
📕 উল্টোনদীর বাঁকে ✍️ সাথী দাস মুদ্রিত মূল্য:- ২৭৫ লালমাটি প্রকাশন ১৬৮ পাতার একটি বই
সবে মাত্র পড়ে শেষ করলাম লেখিকা সাথী দাসের লেখা 'উল্টোনদীর বাঁকে' বইটি। বইটিতে মোট পাঁচটি গল্প রয়েছে। এর আগে লেখিকার অনেকগুলো বই পড়েছি। বছরটা শুরু করেছিলাম লেখিকার লেখা 'হুইলচেয়ার' বইটি দিয়ে আবার বছরটা শেষও করতে চলেছি লেখিকার লেখা দিয়ে।
পাঠ প্রতিক্রিয়া
১) 'ডাক' গল্পটি মূলত মা ও মেয়ের জীবনের গল্পকে কেন্দ্র করে। তাদের জীবনের গল্প থেকে আমরা জানতে পারি জগতে কিছুই চিরন্তন নয়। সবই পরিবর্তনশীল। তারা মনে করে যাত্রা মানে শুধুমাত্র নদী মাঠ বন পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অপরপ্রান্তে ছুটে চলা নয় বরং মনের মধ্যে যে সুবিশাল জগত আছে সেইখানেও ছুটে চলা। জীবনের সমস্ত আলো-অন্ধকার, সুখ-দুঃখ, বাধা বিপত্তি কাটিয়ে মা ও মেয়ে একটি স্থায়ী বাসস্থান জোগার করতে পেরেছে নিজেদের নামে। কিন্তু মা ও মেয়ে দুজনেই বিশ্বাস করে জীবন গতিময়। তাই হয়তো তাদের এই স্থায়ী বাসস্থান বেশিদিনের জন্য নয়। হয়তো তারা কোনো একদিন আবার বেরিয়ে পড়বে নতুন বাসস্থানের উদ্দেশ্যে। সবশেষে বলতে পারি 'ডাক' গল্পটি পাঠকদের 'জীবন' নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করাবে। মনের মধ্যে জীবন নিয়ে নানারকম প্রশ্ন আসতে বাধ্য।
২) 'টান' এই গল্প থেকে আমরা মণিদীপা আর করবীদির সম্বন্ধে জানতে পারি। মণিদীপার জীবনে একমাত্র আপনজন মানুষ ছিলেন করবী দি। তাদের মধ্যে কোনো রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও তাদের মধ্যে ছিল আত্মার সম্পর্ক, বন্ধুত্বের সম্পর্ক। করবী দির মেয়ে তোর্সাকে পড়াতে গিয়েই, করবী দির সঙ্গে আলাপ মণিদীপার। এরপর অনেকগুলো বছর কেটে গেছে। এখন অবসরপ্রাপ্ত মণিদীপা একাই থাকে তার বাড়িতে। রোজ দৈনন্দিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে পুরোনো স্মৃতিগুলো তার মনের মধ্যে ঘোরাফেরা করে। আজ মণিদীপা খুব ব্যস্ত কারন তার বাড়িতে তার একজন অত্যন্ত প্রিয় অতিথি আসবে। তাকে নিজের হাতে রেঁধে খাওয়ানোর অনেকদিনের ইচ্ছা মণিদীপার। মণিদীপার এই ইচ্ছা কী শেষপর্যন্ত পূরণ হবে? আর কে এই বিশেষ অতিথি? মণিদীপা আর করবীদির সম্পর্ক কী আগের মতই আছে না এতো বছরে সেই সম্পর্কেও পরিবর্তন এসেছে? গল্পের শেষটা কিন্তু পাঠককে একেবারে চমকে দেবে। গল্পটি ছোটো হলেও খুব সহজেই মন ছুঁয়ে যায়।
৩) 'গতি' গল্পটি মূলত প্লাটফর্মে য়ারা জীবিকা নির্বাহ করে তাদের উপর। মদন একজন চা বিক্রেতা। মদনের বয়স খুবই কম। তার মা তাকে বলে এই অঘ্রানেই তার নাকি আঠেরো বছর হবে। একজন পঙ্গু বাবা আর কচুরির দোকানে বাসন মাজা কাজ করা মা ছাড়া তার পরিবারে কেউ নেই। পাশের দোকানের কাজ করা পিয়াকে মদন ভালোবাসে। পিয়াকে ছাড়া মদনের একমুহুর্তও চলে না। মদনের কাছে তার জীবনটা হলো অনেকটা গতিময় ব্যস্ততায় ভরা স্টেশনের মতো। তাদের জীবনের একদিক হলো সবসময় চলমান আর অন্যদিক হলো স্থির। তাদের কোনসময় থেমে থাকলে চলবে না কাজ করে যেতে হবে। গল্পে আমরা মোটা বুড়ি আর আনোয়ারের আব্বার কথা জানতে পারি। এই স্টেশনের গতিতে কতো মানুষ তার প্রিয়জনকে হারিয়েছে। এইভাবে ছুটতে ছুটতে কতো মানুষের জীবনের গতি যে থেমে গেছে চিরতরে, মদনও কি সেইসব মানুষের দলে তার ভবিষ্যতে এটাই লেখা আছে?
৪) 'রোদ্দুর' বিছানায় শয্যাশায়ী মৃত্যুর সঙ্গে লড়তে থাকা লক্ষণ জানতে পারে তার মেজদা আর এই পৃথিবীতে নেই। এই সংবাদ লক্ষণের কানে আসা মাত্রই সে জীবনের যত সুখ দুঃখের স্মৃতি আছে তা হাতরে চলেছে। মেজদা ছিল লক্ষণের সবসময়ের সঙ্গী, ছায়ার মতোই তার সঙ্গে সবসময় জুড়ে থাকত। লক্ষ্মণ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তার মেজদাকে সবসময় পাশে পেয়েছে। কিন্তু সেই মেজদার শেষ মুহূর্তে তার পাশে থাকতে পারছে না লক্ষণ। ছোটো একটি হৃদয়স্পর্শী গল্প। গল্পটা পড়ে মনটা কেমন যেন ভার হয়ে গেল।
৫) 'উল্টোনদীর বাঁকে' এই গল্পের নাম দিয়েই বইয়ের নামকরণ। এটি বইয়ের শেষ গল্প। এই গল্পে আমরা সুবর্ণ অর্থাৎ সোনার জীবন সম্বন্ধে জানতে পারি। সুবর্ণ দেখতে ভালো হলেও সে খারাপ একটি ছেলে। সে তার মায়ের অবৈধ সন্তান। তাই সে নিজের মা আর সমস্ত নারীজাতকে ভালো চোখে দেখে না। অবৈধ পিতা তাকে বাসস্থানের আর কাজের ব্যবস্থা করে দেয় একটি গ্রামে। সেখানে তার সঙ্গে আলাপ হয় অনেক মানুষের। সেইসব মানুষদের সাথে সে ভদ্রলোক সেজে অভিনয় করতে থাকে। এই ভদ্রলোক সেজে অভিনয় করতে করতে কি সুবর্ণর জীবনে আমূল পরিবর্তন আসবে? না সে সেই একই সুবর্ণ থাকবে? একটা কথা কিন্তু সত্যি মানুষ পরিস্থিতির শিকার। সেই পরিস্থিতিতে সে ভালোর পথে যেতে পারে আবার খারাপ পথেও যেতে পারে।
এই গল্পগুলোতে লেখিকা আমাদের আশেপাশের সহজসরল ভাবে বসবাস করা মানুষগুলোর কঠিন জীবনের কথা তুলে ধরেছি। এইসব মানুষগুলোর আমাদের মাঝে থেকে রোজ হারিয়ে যায় তার খোঁজ আমরা রাখি না😔। বইয়ের সবথেকে আমার ভালো লেগেছে লেখিকা যাকে বইটি উৎসর্গ করেছে🙂।
উল্টোনদীর বাঁকে' মূলত একটি গল্পসংকলন। এতে ভিন্ন স্বাদের পাঁচটি গল্প রয়েছে। গল্প গুলি হল-
◾️ডাক - মা ও মেয়ের 'ঘর' সন্ধানী জীবনের করুণ কাহিনি।
◽️টান - অবসরপ্রাপ্ত এক নারীর অতীত-বর্তমানের টানাপড়েন।
◾️গতি - রেলস্টেশন সংলগ্ন এক চা বিক্রেতার জীবনযুদ্ধ।
◽️রোদ্দুর - ভাইয়ের স্মৃতিতে এক আবেগঘন আত্মসমর্পণ।
◾️উল্টোনদীর বাঁকে - এক প্রান্তিক পুরুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিবর্তনের গল্প।
ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে যে গল্পটি বেশী ভালো লেগেছে সেটি হলো 'উল্টোনদীর বাঁকে'। এখানে লেখিকা সুবর্ণ চরিত্রটির মাধ্যমে সমাজের এক জ্বলন্ত সত্যমুখী হয়েছেন - একজন পুরুষ যে নিজেকে অবৈধ সন্তান হিসেবে দেখে, নারীকে ভোগ্যপণ্য জ্ঞান করে। তবু শেষ পর্যন্ত গ্রামের লালুর জীবনবোধে বদলে যেতে শুরু করে তার জীবন। লেখিকা এখানে নারীবাদী উপদেশ দেননি; বরং অভদ্র জন্তুটিকে নিজের গতিতেই বিবর্তিত হতে দিয়েছেন।
☘️যা আমার কাছে ভালো লেগেছে তা হলো- 🔹️জীবনের বৈচিত্র্যকে ছোট ছোট গল্পে ধরার চেষ্টা। 🔸️কিছু গল্পে সমাজ ও সম্পর্কের অস্বস্তিকর সত্য উঠে আসা। 🔹️পড়তে সহজ, কিন্তু কয়েকটা জায়গায় ভাবিয়ে তোলে।
☘️যা ভালো লাগেনি তা হলো- 🔹️সব গল্প সমানভাবে শক্তিশালী নয়। কয়েকটায় শেষটা একটু তাড়াহুড়ো করে শেষ করা হয়েছে মনে হলো। 🔸️গল্পগুলোর মধ্যে সংযোগ আরেকটু জোরালো হলে ভালো হতো।