মফস্বল শহর অশোকনগরে বেড়ে ওঠা। কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন হেরিটেজ ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি থেকে। ছোটবেলা থেকেই পড়ার বইয়ের পাশাপাশি গল্পের বইয়ের নেশা ছিল। লেখার নেশা জাঁকিয়ে বসে কলেজে পড়াকালীন৷ ওই সময়েই "আদরের নৌকা" লিটল ম্যাগ প্রকাশের মাধ্যমে সাহিত্য জগতে প্রবেশ। প্রথম বই ২০০৮ সালের বইমেলাতে প্রকাশিত হয় , "এক কুড়ি গল্প"। পরবর্তী কালে অফিস থেকে ফিরে ফেসবুকে লিখতে বসা এবং ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাওয়া।
গান গাইবার পাশাপাশি ঘুরতে, ফটোগ্রাফি করতে ভালবাসেন লেখক।
“চরম মুগ্ধ হয়ে যাওয়া” বোঝেন?এই বইটা পড়া শেষ করার পরে এটাই মনে হচ্ছে আমার। রিভিউ কিভাবে লিখব বুঝতে পারছি না। পড়ে শেষ করলাম অভীক দত্তের লেখা ❝হৃদয়ের পদ্মবনে❞, নিজের পাঠ অনুভূতি এবং আত্ম উপলব্ধি এখানে তুলে ধরলাম।
🌷কাহিনী সংক্ষেপ:- উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র ঋজু। অফিস থেকে ছুটি ম্যানেজ করে বেনারসে ঘুরতে চলে যায়, অথচ তার নাকি বেনারসে যাবার কোন পূর্ব পরিকল্পনাই ছিল না। অফিস কেরানী, ভবঘুরে , সংসারত্যাগী যুবক এই ঋজু। পূর্বে সে এক বিবাহ করলেও পরবর্তীতে তা স্থায়ী সম্পর্কে পৌঁছায়নি। সেখানেই একদিন হঠাৎ দেখা হয়ে যায়, আঁখির (ঋজুর প্রাক্তন স্ত্রী) মেসো,মাসি ও বোনের সঙ্গে। মাসির নিষেধ সত্ত্বেও মেসোর ঋজুপ্রীতি এবং আড়ালে আড়ালে ঋজুকে সবসময় স্নেহ করা একটা প্রবল ভালোলাগার বিষয় লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন। ঋজুর কি আত্ম উপলব্ধি হলো? সেকি খুঁজে পেল অস্তিত্বের পরিভাষা? ব্যক্তিত্বের শব্দার্থ?
✨যা কিছু ব্যক্তিগত/থিম বর্ণনা:- ১.উপন্যাসের শুরুতে ঋজুর চালচুলোহীন, ভবঘুরে, আপনভোলা ব্যক্তিত্বকে দেখিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু শব্দ সংখ্যার সাথে এগোনোর সাথে সাথে ঋজুকে এক পরিণত যুবকে পরিণত করেছেন লেখক।
২.উপন্যাসের তথাকথিত পাঠ প্রতিক্রিয়া হয়তো লিখতেই পারতাম না, কিন্তু উপন্যাসের পটভূমিকা এমনটাই আমার মনের মধ্যে কড়া নেড়েছে, যেন স্বয়ং অভীক স্যারই যেন "ঋজু" হয়ে আমাকে দিয়ে এই রিভিউ লিখে নিচ্ছেন।
৩.বইটির মধ্যে লেখক অহেতুক কোন জটিলতার সৃষ্টি করেননি, খুব স্নিগ্ধ একটি বিষয়, কিন্তু গভীর তার ভাবনা। এ যেন, "ঋজুর" একার কাহিনী নয়, এ আমার, আপনার, সবার জীবনে হয়তো ঘটেছে বা ঘটছে, কিংবা অদূর ভবিষ্যতে ঘটতে পারে।
৪.সত্যি কথা বলতে এতটা স্নিগ্ধ, শান্ত, মনোরম নিজেকে কোনদিন অনুভূত হয়নি। বইটা পড়ে সত্যিই এই অনুভূতি গুলো কাজ করছিল, এখন রিভিউ লিখতে বসেও যেন সেই রেশ কাটানো যাচ্ছে না। বইটি তাদের উদ্দেশ্যে অবশ্যই পড়ার জন্য অনুরোধ রইল, যারা রিটার্ন টিকিট না কেটে ঘুরতে এসেছেন।
৫.ঋজুর বাস্তব উপলব্ধি, জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া, স্মৃতি স্মরণী দিয়ে হেঁটে যাওয়া, বেনারসের অলিগলি, সেখানকার প্রত্যেক রিকশাওয়ালা, পন্ডিত জি, মেসোমশাই, মাসীমা, সোমনাথ, অম্বালিকা, চন্দন প্রত্যেকটা ঘটনা এবং চরিত্র যেন মনের মধ্যে দাগ কেটে যায়। প্রত্যেক চরিত্রে নিজস্ব কিছু বক্তব্য রয়েছে, তাদের উপস্থিতির একটা যথার্থতা রয়েছে।
🌸 সবশেষে এটুকুই বলবো, অভীক স্যারের এই লেখাটা আমার মন,তন ,ক্ষণ কে গভীরভাবে বিদ্ধ করেছে। পাঠ সুখকর হলো।
জীবনকে আমরা অনেক সময় সরল রেখায় ভাবতে চাই, অথচ বাস্তবে তা বক্র, অনিশ্চিত আর স্মৃতির ভারে নুয়ে থাকা এক দীর্ঘ পথচলা... এই উপলব্ধিই নতুনভাবে ধরা দেয় হৃদয়ের পদ্মবনে উপন্যাসে। এই বইটি মূলত এক অন্তর্মুখী যাত্রার গল্প, যেখানে বাহ্যিক ভ্রমণের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে আত্মার ভেতরের পথচলা।
কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে ঋজু, একজন ক্লান্ত, অতীতের ভুল আর ভাঙা সম্পর্কের ভারে জর্জরিত মানুষ। হঠাৎ করেই তার বেনারসে যাওয়ার সিদ্ধান্ত যেন একরকম পালিয়ে যাওয়া, কিন্তু সেই পালানোই ধীরে ধীরে তাকে নিজের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বারাণসী এখানে শুধু একটি শহর নয়, বরং জীবনের প্রতীক, যেখানে প্রতিটি ঘাট, প্রতিটি গলি যেন স্মৃতি আর উপলব্ধির স্তর খুলে দেয়।
ঋজুর যাত্রাপথে যেসব মানুষের সঙ্গে তার দেখা হয়, তারা কেউই নিছক পার্শ্বচরিত্র নয়; বরং প্রত্যেকেই তার জীবনের আয়না। পুরনো সম্পর্ক, অপূর্ণতা, আক্ষেপ, সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত জটিল আবহ তৈরি হয়, যেখানে পাঠক বুঝতে পারে যে অতীত কখনও পুরোপুরি পেছনে ফেলে আসা যায় না। বিশেষ করে প্রাক্তন স্ত্রীর স্মৃতি ও উপস্থিতি ঋজুর ভেতরের অস্থিরতাকে আরও গভীর করে তোলে।
উপন্যাসটির বড় শক্তি তার ভাবনায়। এখানে বড় কোনো নাটকীয় মোড়ের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে ছোট ছোট উপলব্ধি—জীবনের ক্ষণস্থায়িত্ব, সম্পর্কের ভঙ্গুরতা এবং মেনে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা। কোথাও কোথাও মনখারাপের আবেশ থাকলেও তা ভারী হয়ে ওঠে না; বরং এক ধরনের নীরব শান্তি এনে দেয়।
সব মিলিয়ে, হৃদয়ের পদ্মবনে এমন একটি উপন্যাস যা পাঠককে শুধু গল্প শোনায় না, বরং তাকে নিজের জীবন নিয়ে ভাবতে বাধ্য করে। এটি তাদের জন্য বিশেষভাবে উপভোগ্য, যারা ধীর গতির, ভাবনাপ্রবণ এবং আত্মঅনুসন্ধানী সাহিত্য পছন্দ করেন।
সোলো ট্রিপ জিনিসটা শুরুতে বোকা বোকা লাগলেও একটা সময় পড় বেশ উপভোগ্য হয়ে ওঠে। ট্রেনে চেপে বেনারস, সেখানকার পরিবেশ, ভৌগোলিক সৌন্দর্য, মানুষজন - এক কথায় ঋজু তথা লেখকের চোখ দিয়েই ফুটে ওঠে আস্ত বেনারস। তাই বইটার শুরুতেই ভ্রমণ কাহিনী মূলক একটা আবহ পাওয়া যায়। উপন্যাস এগোতে এগোতে তুলে ধরে এক দিকে বৈবাহিক জীবনের অস্থিরতা, ক্লান্তি, অপরদিকে ডিভোর্স পরবর্তী জীবনের একাকিত্ব যেখানে ঋজু ডিভোর্স এর পড়েও আঁখিকে নিয়ে চিন্তিত কিংবা ভুলতে না পাড়ার যন্ত্রনা স্পষ্ট। আর একদম শেষে ঋজুর যে আত্মপোলব্ধি তা এটাই বুঝিয়ে যায় যে জীবনের বহুমুখী স্রোতে নিজেকে ধরে রাখাটা জরুরি পাশাপাশি যে সম্পর্ক একবার শেষে হয়ে যায় সামান্য ইগোর লড়াইতে জিতবে বলে সে সম্পর্ক আর জোড়া লাগার নয়। আর ঠিক তার পাশেই যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার উল্লেখ আছে তা পড়ে মন বিষণ্ণ হয়ই। এই বই আপনার মনে সরু সুতর মতন একটা রেশ ধরে রাখবে কিছুদিন। একদম হালকা চালের বই, একবার বসেই পড়ে ফেলার মত। তাই ঋজুর চোখে বেনারস ঘুরতে কিংবা মনের আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিগুলোকে শান দিতে একবার পড়েই ফেলুন হৃদয়ের পদ্মবনে।