মানব সভ্যতার সূচনা লগ্ন থেকেই ‘প্রাণ’ কি এবং এর উৎপত্তি কোথা থেকে এই কৌতূহল মানুষকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। জীব এবং জড়ের পার্থক্য এতোই প্রখর এবং বৈচিত্র্যময় যে এদের সীমানা নির্ধারণে কি নিয়ামক কাজ করেছে তা নিয়ে মানুষ মাথা ঘামিয়ে আসছে বহুদিন ধরে। তবে সাম্প্রতিক কিছু বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ফলশ্রুতিতে বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকদের কাছে জীব এবং জড়ের সীমারেখা ক্রমশ বিলীন হয়ে যেতে শুরু করেছে বলেই মনে হচ্ছে। কিছু কিছু ভাইরাস, ভিরইডস, প্রিয়ন এবং কিছু পেপটাইডের শিকল জীব এবং জড়ের সীমারেখার মধ্যে এমনভাবে সেতুবন্ধন হিসাবে কাজ করে যে জীব এবং জড়ের মধ্যে পরিষ্কার সীমারেখা টানা আসলেই দুষ্কর হয়ে গেছে। এই অণুজীবগুলো কখনো মনে হয় জীবন্ত আবার কখনো মনে হয় পুরোপুরি জড়। প্রাণকে দীর্ঘকাল ধরেই ‘রহস্যময় উপাদান’ হিসাবে চিহ্নিত করে এসেছে বিজ্ঞানী, দার্শনিক সহ সাধারণ মানুষেরা। পৃথিবীতে কিভাবে প্রাণের সূত্রপাত হল তার পুরোপুরি রহস্য উন্মোচন এখন পর্যন্ত কেউই সঠিক ভাবে করতে পারেনি। এমনকি চার্লস ডারউইন ১৮৫৯ সালে লেখা যুগান্তকারী বই ‘Origin of Species’- এ প্রাণের নান্দনিক বিকাশ ও এর বিবর্তনকে সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করলেও প্রাণের উৎস সম্পর্কে ছিলেন নীরব। ডারউইনের বক্তব্য ছিল, ‘এর চেয়ে বরং পদার্থের উৎপত্তি নিয়ে ভাবা যেতে পারে।’ বলা বাহুল্য, বিগত শতকের আশির দশকে স্ফীতি তত্ত্বের আবির্ভাবের পর থেকে পদার্থের উৎপত্তির রহস্য অনেকটাই সমাধান করে ফেলেছেন পদার্থবিজ্ঞানীরা। কিন্তু প্রাণের উৎপত্তি বিজ্ঞানীদের জন্য এখনও একটা বড় চ্যালেঞ্জ। এ জন্যই ডিএনএ যুগল সর্পিলের রহস্য ভেদকারী নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক তার ‘Life itself: Its nature and origin’ গ্রন্থে বলেন : ‘সমস্ত প্রয়োজনীয় শর্তকে পরিতুষ্ট করে জীবনের উদ্ভব যেন প্রায় অলৌকিক ঘটনা’!
প্রাণ নিয়ে সবচেয়ে পুরাতন এবং সবচেয়ে জনপ্রিয় বিশ্বাসী ধারণা হচ্ছে যে, ঈশ্বর বা অলৌকিক কোন সত্তা পৃথিবীতে প্রাণের উদ্ভব ঘটিয়েছে। ইতিহাসের একটা বড় অংশ জুড়েই বিশ্বাস করা হয়েছে যে প্রাণ স্বর্গ থেকে এসেছে এবং ঈশ্বর মানুষসহ সব প্রাণীদেরকে বর্তমান-রূপেই পৃথিবীতে পাঠিয়েছে। প্লেটোর ভাববাদী দর্শনও শিখিয়েছে যে, প্রাণী বা উদ্ভিদ কেউ জীবিত নয়, কেবলমাত্র ঈশ্বর যখন প্রাণী বা উদ্ভিদ দেহে আত্মা প্রবেশ করান, তখনই তাতে জীবনের লক্ষণ পরিস্ফুট হয়। প্লেটোর এই ‘জীবনীশক্তি তত্ত্ব’ অ্যারিস্টটলের দর্শনের রূপ নিয়ে প্রায় দু’হাজার বছর মানব সভ্যতাকে শাসন করেছিল। পরবর্তীতে পৃথিবীর অধিকাংশ ধর্মমত এই দর্শনকে ‘মূল উপজীব্য’ হিসেবে আত্মস্থ করে নেয়। তাই অধিকাংশ মানুষ আজও আত্মা দিয়ে জীবন-মৃত্যুকে ব্যাখ্যা করার প্রাচীন প্রয়াস থেকে মুক্তি পায়নি। ধর্মবিশ্বাসীরা এবং বিশেষ করে আধুনিক ‘ইনটেলিজেন্ট ডিজাইন’-এর প্রবক্তাদের মতে প্রাণের উৎপত্তির কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা থাকতে পারে না। ভাগ্য ভাল যে এই শ্রেণীর লোকজনদের কুপমুন্ডুক চিন্তাভাবনা বা বিশ্বাস নির্ভর ‘তত্ত্ব’গুলোকে আজকের দিনের বিজ্ঞানীরা তেমন একটা আমলে নেন না। যেহেতু প্রাণের উৎপত্তির এই অতীন্দ্রিয় ধারণাকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণ বা অপ্রমাণ কোনটাই করা যায় না, সেহেতু বিজ্ঞানীরা এই ধরণের ধারণাকে বৈজ্ঞানিক সীমারেখার বাইরেই রেখে দিতে বেশি পছন্দ করেন। আর তাছাড়া বিজ্ঞান অজ্ঞেয়বাদী নয়, খুব কঠোরভাবেই বস্তুবাদী। কাজেই বিজ্ঞানীরা বৈজ্ঞানিক ভাবেই প্রাণের উৎপত্তির রহস্যের সমাধান চান। বেশিরভাগই বিজ্ঞানীই মনে করেন এ পৃথিবীতেই নিষ্প্রাণ থেকে প্রাণের উৎপত্তি হয়েছে এবং তা কোন রহস্যজনক কারণে নয়, বরং জানা কিছু রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে। তারা মনে করে থাকেন যে, সাড়ে তিনশ কোটি বছর আগে পৃথিবীর বিজারকীয় পরিবেশে অসংখ্য রাসায়নিক বিক্রিয়ার ফলশ্রুতিতে পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি ঘটেছে। জীবনের এই ‘রাসায়নিক উৎপত্তি’ তত্ত্ব নিয়ে এ বইয়ে বিস্তৃতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। বেশ কিছু সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ ফলাফল এতে সন্নিবেশিত হয়েছে।
দ্বিতীয় ধরনের মতবাদ অনুযায়ী মহাকাশ থেকে ধূমকেতু বা উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণের বিকাশ হতে পারে। অনেক বিজ্ঞানীই বর্তমানে এই ধারণার উপর তথ্য প্রমাণ সংগ্রহের চেষ্টা করছেন। আগে মনে করা হত মহাকাশের বিশাল দূরত্ব, তেজস্ক্রিয়তা, বায়ুশূন্যতা ইত্যাদি সামলিয়ে সুদূর বহির্বিশ্ব থেকে কোন অণুজীবের পৃথিবীতে এসে প্রাণের উন্মেষ ঘটানো স্রেফ অসম্ভব একটি ব্যাপার। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু গবেষণালব্ধ ফলাফল এ সিদ্ধান্তের বিপক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে প্যানস্পারমিয়া নামের ‘বহির্বিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি’ তত্ত্বটি ইদানীংকালে অনেক বিজ্ঞানীদের কাছ থেকেই জোরালো সমর্থন পাচ্ছে। গত সপ্তদশ শতক থেকেই বিজ্ঞানীদের মধ্যে প্রাণের বিকাশের ধারণার ক্ষেত্রে বার বার বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আর বিংশ শতাব্দীর শেষভাগ এবং এই শতাব্দীতে প্রাণের উৎপত্তির প্রশ্ন এবং মহাবিশ্বে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।
আমাদের এ পৃথিবী ছাড়াও অন্য কোন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে কিনা, কিংবা এর সম্ভাব্যতা কতটুক এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়ত এ বইটির আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হিসেবে পাঠকদের সামনে চলে আসতে পারে। সমগ্র মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্রহ তারকারাজির মধ্যে পৃথিবীর অবস্থান যেন সাহারা মরুভূমিতে পড়ে থাকা একটি বালুকণার চেয়েও ক্ষুদ্র। শুধুমাত্র আমাদের আকাশগঙ্গা গ্যালাক্সিতেই নক্ষত্রের সংখ্যা চল্লিশ হাজার কোটি। আর এ ধরণের গ্যালাক্সির সংখ্যা পুরো মহাবিশ্বে কম করে হলেও অন্ততঃ একশ কোটি। আবার গ্যালাক্সিগুলোতে সূর্যের মত অনেক নক্ষত্রেরই আছে গ্রহমণ্ডল। সুবিশাল এই মহাবিশ্বের অনন্ত নক্ষত্রমালার কোন কোন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব থাকাটা তাই মোটেই অস্বাভাবিক নয়। মহাবিশ্বে বুদ্ধিদীপ্ত প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা কতটুকু, আমাদের এ সৌরজগতের মধ্যেই কোন গ্রহে প্রাণের উদ্ভবের উপযোগী পরিবেশ বিরাজ করছে কিনা, সৌরজগতের বাইরে মহাজাগতিক কাল্পনিক বন্ধুদের প্রতি আমরা মর্তবাসীরা এর মধ্যে কোন বার্তা পাঠিয়েছি কিনা, কিংবা মহাজাগ...
[Dr. Avijit Roy is a Bangladeshi-American blogger, published author, and prominent defender of the free thought movement in Bangladesh. He is an engineer by profession, but well-known for his writings in his self-founded site, Mukto-Mona—an Internet congregation of freethinkers, rationalists, skeptics, atheists, and humanists of mainly Bengali and South Asian descent. As an advocate of atheism, science, and metaphysical naturalism, he has published eight Bangla books, and many of his articles have been published in magazines and journals. His last two books, Obisshahser Dorshon (The Philosophy of Disbelief) and Biswasher Virus (The Virus of Faith), have been critically well-received and are popular Bengali books on science, skepticism, and rationalism. }
লেখক হবার কোন বাসনা ছিলো তা নয়। কিন্তু ছোট্ট একটা স্বপ্ন হয়তো ছিলো একটা মনের গহীনে। স্বপ্নটা পালটে দেবার। সেই পালটে দেবার স্বপ্ন থেকেই ২০০১ সালের দিকে একদিন সমমনা কয়েকজন লেখকদের নিয়ে তৈরি করে ফেললাম মুক্তমনা সাইট (www.mukto-mona.com)। এর পর থেকেই সাইটটির বিস্তৃতি বেড়েছে। এখন বাঙালি বিজ্ঞানকর্মী, যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদীদের কাছে মুক্তমনা একটি বিশ্বস্ত নাম। ২০০৭ সালে মুক্তবুদ্ধি, বিজ্ঞানমনস্কতার প্রসার আর মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সম্যক অবদান রাখার প্রেক্ষিতে তার মুক্তমনা সাইট অর্জন করেছে শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মৃতি পদক।
শখের বশে টুকিটাকি লেখা লিখছিলাম ইন্টারনেটে, ম্যাগাজিনে আর দৈনিক পত্র-পত্রিকায়। পছন্দের বিষয় প্রথম থেকেই ছিলো আধুনিক বিজ্ঞান এবং দর্শন। আমার সেসময়ের চিন্তাভাবনার গ্রন্থিত রূপ ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ (২০০৫)। এরপর একে একে অনেকগুলো বইই বের হয়েছে। তার মধ্যে, মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে (২০০৭, পুনর্মুদ্রণ ২০০৮), স্বতন্ত্র ভাবনা : মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধির মুক্তি (২০০৮), সমকামিতা: বৈজ্ঞানিক এবং সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান (২০১০,পুনর্মুদ্রণ ২০১৩), অবিশ্বাসের দর্শন (২০১১, দ্বিতীয় প্রকাশ: ২০১২, তৃতীয় প্রকাশ: ২০১৪), বিশ্বাস ও বিজ্ঞান (২০১২), ভালবাসা কারে কয় (২০১২),এবং শূন্য থেকে মহাবিশ্ব (২০১৪: প্রকাশিতব্য)। পাঠকদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ যে, বইগুলো পাঠকদের ভাল লেগেছে। অনেকেই বইগুলোকে ‘ব্যতিক্রমী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, কেউবা আবার আগ বাড়িয়ে বলেছেন ‘মাইল ফলক’। তা যে ফলকই হোক না কেন, আমি এই বইগুলোর প্রতি আগ্রহ দেখে একটি ব্যাপার বুঝতে পারি যে, বাংলাদেশের শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী ও সাধারণ মানুষেরা বিজ্ঞান বিমুখ নয় মোটেই, নয় দর্শনের প্রতি অনাগ্রহীও। ভাল বই তাদের আগ্রহ তৈরি করতে পারে পুরোমাত্রায়।
পেশায় প্রকৌশলী। পড়াশুনা করেছি বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট), পি.এইচ.ডি করেছি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সিঙ্গাপুরে (এন.ইউ.এস)। বর্তমানে আমেরিকায় কম্পিউটার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত । অবসর সময় কাটে বই পড়ে, লেখালিখি করে, গান শুনে, জীবনসঙ্গিনী বন্যার নিয়মিত বকা খেয়ে, আর নিঃসীম আঁধারে আলোকিত স্বপ্ন দেখে - ‘মানুষ জাগবে তবেই কাটবে অন্ধকারের ঘোর’...
পাঠ প্রতিক্রিয়া: মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে লিখেছেন: প্রদীপ দেব
অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদের ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’ বই আকারে বেরিয়েছে ২০০৭ সালে। পরের বছর বেরিয়েছে এর পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ। মুক্তমনায় যখন ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল – তখনই পড়েছিলাম সবগুলো পর্ব। কিন্তু আমার স্বভাব কুঁড়েমির কারণে কোন প্রতিক্রিয়াই লিখে রাখা হয়নি তখন। ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে দেশে গিয়ে ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেটের প্রায় সবগুলো বইয়ের দোকানে খোঁজ করেও বইটা পাইনি। ২০০৯ এবং ২০১০-এও একই অবস্থা। একুশের বইমেলার পরে দরকারি বইগুলো কোথায় যেন উধাও হয়ে যায়। বাংলাদেশের বই-বিপণন ব্যবস্থা এখনো তেমন পেশাদারী দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। ফেব্রুয়ারিতে আমাদের সেমিস্টার শুরু হয়ে যায়- তাই বইমেলায় থাকা হয় না কোন বছরই। সুতরাং বন্ধুরাই ভরসা। তারা আমার টেলিফোন-অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে বইমেলায় গিয়ে প্রকাশকের কাছ থেকে বই জোগাড় করে পাঠায়। মহাদেশ পাড়ি দিয়ে আমার হাতে এসে পৌঁছোয় ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় এসেও এর ভ্রমণ শেষ হয় না। বইটা যখন আবার পড়ে শেষ করলাম তখন আমি লস এঞ্জেলেসের টম ব্রাডলি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তিন নম্বর টার্মিনালে। আর পাঠ-প্রতিক্রিয়া লিখছি মেক্সিকো সিটির একটা হোটেলে বসে।
একটা ভালো বই নাকি অনন্ত যৌবনা। সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘বই কেনা’ প্রবন্ধ থেকে জেনেছি এ’কথা। অবশ্য বইয়ের যৌবন পরিমাপ করার মাপকাঠি কী তা নিয়ে অনেক মতভেদ আছে। আমি সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না এখন। তবে আমার মনে হয় কোন বইয়ের আবেদন ও গ্রহণযোগ্যতা অনেকখানি পাঠক-নির্ভর। আবার বিজ্ঞান-বিষয়ক বইয়ের ‘যৌবন কাল’ পরিমাপ করার জন্য আলাদা একটা মাপকাঠি দরকার হয়। তা হলো- বিষয়বস্তু। আধুনিক বিজ্ঞান এতটাই গতিশীল যে এক সময়ের দুর্দান্ত-যৌবনা বিজ্ঞানের বইগুলো নতুন তত্ত্ব, তথ্য ও প্রযুক্তি আবিষ্কারের সাথে সাথে দ্রুত ‘বিগত-যৌবনা’ হয়ে যায়। তখন বইগুলোর স্থান হয় বিজ্ঞানের ইতিহাস বিভাগে। যেমন ‘আলকেমি’ ‘ফ্লপি-ড্রাইভ’ বা ‘ওয়ার্ড পারফেক্ট’ সম্পর্কিত বিজ্ঞানের বইগুলো এখন বিগত-যৌবনা। আবার কিছু কিছু বিজ্ঞানের বই আছে যেগুলো ভবিষ্যতের কথা বলে, ভবিষ্যতের দিক নির্দেশনা দেয়। সে ধরণের বইগুলোর যৌবন অনেক বেশি দীর্ঘায়িত। ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’ এমনই একটা বিজ্ঞানের বই।
যাঁরা বিজ্ঞান বিষয়ে বাংলায় লেখেন তাঁরা জানেন কী পরিশ্রম সাধ্য কাজ এটা। বাঙালি পাঠক-পাঠিকা যত সহজে কবিতা বা গল্প-উপন্যাসের প্রতি ভালোবাসা দেখান- বিজ্ঞান-বিষয়ের প্রতি তত সহজে নয়। যতই সহজ সাবলীল ভাষায় লেখা হোক না কেন – বিজ্ঞান লেখকের পাঠক-পাঠিকার সংখ্যা খুবই কম। গল্প-উপন্যাস বা কবিতা যাঁরা লেখেন তাঁদের অনেক ভক্ত থাকে। পড়তে পড়তে ভালো লাগলে- বিশেষ করে পাঠক-পাঠিকা যখন মনে করতে শুরু করেন যে লেখক তাঁদের মনের কথাই বলে ফেলেছেন তখন লেখকের প্রতি এক ধরনের ভালোবাসা তৈরি হয়। ভালোবাসা থেকে এক ধরনের অন্ধত্বও তৈরি হতে পারে। লেখক তখন সহজেই পাঠক-পাঠিকার চিন্তার ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। তখন অবস্থা এমন হয় যে প্রিয় লেখক যা-ই লেখেন পাঠকের সবই ভালো লাগে। ভাল-মন্দ বিচারে কিছুটা হলেও পক্ষপাতিত্ব চলে আসে। পকেট বিহীন হলুদ পাঞ্জাবি পরে খালি পায়ে নগর পরিক্রমা করতে বেরিয়ে পড়া সম্ভব তখন। কিন্তু বিজ্ঞান লেখকদের পক্ষে এরকম নির্ভেজাল অন্ধ ভালোবাসা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব। কারণ বিজ্ঞানে মিরাকল বা গোঁজামিলের কোন স্থান নেই। কেউ দিতে চেষ্টা করলে ধরা পড়তে সময় লাগে না। বিজ্ঞানে কল্পনার স্থান খুব একটা নেই। ভালো কল্প-বিজ্ঞান লিখতে হলেও বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বগুলো মেনেই কল্পনার মেঘে চড়তে হয়। তাই রোমেনা আফাজ যখন দস্যু বনহুরকে মঙ্গল গ্রহে পাঠিয়ে দেন (দ্রষ্টব্যঃ মঙ্গল গ্রহে দস্যু বনহুর) – তখন তা কিছুতেই কল্প-বিজ্ঞান বলে চালানো সম্ভব নয়। তাই বলে কি বিজ্ঞানে কোন ধরণের ভবিষ্যতের স্বপ্নের কথা থাকে না? কল্পনা থাকে না? অবশ্যই থাকে – এবং যেগুলো থাকে তা থেকেই শুরুতে বৈজ্ঞানিক ধারণা- পরে আস্তে আস্তে তত্ত্ব এবং সীমাহীন পরীক্ষণ-পর্যবেক্ষণ-বিশ্লেষণ-গ্রহণ-বর্জন-পরিবর্ধন-পরিমার্জনের পর হয়ে ওঠে বিজ্ঞান। বড় দীর্ঘ এ প্রক্রিয়া। সাহিত্য ও বিজ্ঞানের মৌলিক পার্থক্য এখানেই। সাহিত্য একক প্রচেষ্টা আর বিজ্ঞান সমন্বিত প্রচেষ্টা। তাই সাধারণের জন্য বিজ্ঞানের বই যাঁরা লেখেন তাঁদের লেখায় উঠে আসে আরো অনেক বিজ্ঞানীর কথা, বিজ্ঞান-লেখকের কথা। মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজ পাবার জন্য সারা বিশ্বের শত শত বিজ্ঞানী কয়েক দশক ধরে যে কঠোর পরিশ্রম করে বিজ্ঞানের যে বিপুল অজানা তথ্য জানতে পেরেছেন তা আমাদের মত সাধারণ পাঠককে সহজভাবে বুঝিয়ে দেবার জন্য অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদকে কী কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে তা তাঁদের এই বইটির প্রতিটি পাতায় স্পষ্ট ভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
বহুমাত্রিক লেখক অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদের লেখা যাঁরা পড়েছেন তাঁরা জানেন যে একই সাথে ভাষা ও বিষয়-বস্তুর ওপর কী ঈর্ষণীয় দখল তাঁদের। বিগ ব্যাং থেকে মহাবিশ্বের উৎপত্তির পর কোটি বছরের প্রাকৃতিক রাসায়নিক ও জীববৈজ্ঞানিক বিক্রিয়ার ফলে প্রাণের উদ্ভব থেকে শুরু করে এই অসীম বিশ্বব্রহ্মান্ডের অন্যান্য নক্ষত্রপুঞ্জেও প্রাণের সম্ভাবনার এত বিশাল ব্যাপ্তির তথ্য ও তত্ত্বকে মাত্র একশ’ পৃষ্ঠায় বলে ফেলার মত দুরুহ কাজটি অবলীলায় করে ফেলেছেন এঁরা। এটা সত্যি যে বিজ্ঞানের বই উপন্যাসের মত একটানে পড়ে ফেলা যায় না। বিজ্ঞানের বই পড়তে পড়তে ভাবতে হয়, নিজের উপলব্ধির সাথে যাচাই করে নিতে হয়- সর্বোপরি বিজ্ঞানের বই পড়ার পর আরো জানার যখন একটা তৃষ্ণা তৈরি হয় – তখনই বিজ্ঞানের বই সার্থক হয়ে ওঠে। সে বিবেচনায় ‘মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে’ অনায়াসে প্রথম শ্রেণী অর্জন করেছে।
নয়টি অধ্যায়ে বিভক্ত বইটির প্রত্যেকটি অধ্যায় স্বয়ং-সম্পূর্ণ, আবার অন্যান্য অধ্যায়গুলোর সাথেও সম্পৃক্ত। ফলে অধ্যায় থেকে অধ্যায়ান্তরে যাবার সময় প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় না মোটেও। তবুও দুটো প্রধান অংশে ভাগ করা যায় বইটাকে। প্রথম থেকে পঞ্চম অধ্যায় পর্যন্ত আমাদের পরিচিত প্রাণের উৎপত্তির তত্ত্ব ও রসায়ন, আর ষষ্ঠ থেকে নবম অধ্যায়ে পৃথিবীর বাইরের মহাবিশ্বে প্রাণের খোঁজ সংক্রান্ত গবেষণা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হয়েছে।
“জীবন কী?”- এই চিরন্তন প্রশ্নটি দিয়েই শুরু হয়েছে প্রথম অধ্যায় ‘প্রাণের প্রাণ জাগিছে তোমারি প্রাণে’। প্রাণের সংজ্ঞার দার্শনিক আলোচনায় রেখাপাত করে লেখক আমাদের দাঁড় করিয়ে দেন প্রাণের জৈব-রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের মুখোমুখি। পড়তে পড়তে মনে হয় জীবন আর মৃত্যুর মাঝখানের দেয়ালটা অনেক স্বচ্ছ হয়ে গেছে। প্রাণের দাবিদার বৈশিষ্ট্যগুলো – প্রজনন, বিপাক ক্রিয়া, পুষ্টির জোগান, জটিলতা, সংগঠন, বৃদ্ধি ও বিস্তার প্রভৃতি ব্যাখ্যার সাথে সাথে জীবনের মৌলিক উপাদান প্রোটিন ও নিউক্লিক এসিডকে কম্পিউটারের হার্ডওয়্যার ও সফ্টওয়ার এর সাথে তুলনা অনবদ্য।
“মৃত্যুও বোধহয় সিফিলিস বা গনোরিয়ার মতো একধরনের ‘sexually transmitted disease’ যা আমরা বংশপরম্পরায় সৃষ্টির শুরু থেকে বহন করে চলেছি!” – খুবই মজার একটা উদ্ধৃতি বটে। তবে এর উৎস হিসেবে “এক প্রখ্যাত জীববিজ্ঞানী হালকাচালে তাঁর একটি লেখায় বলেছেন” (পৃঃ১৭) বলাতে ব্যাপারটা আসলেই হাল্কা হয়ে গেছে। সংশ্লিষ্ট জীববিজ্ঞানীর পরিচয় ও লেখাটির উৎস উল্লেখ করলে ভালো হতো।
দ্বিতীয় অধ্যায় “জীবনের প্রাণ রাসায়নিক উপাদান”-এ আলোচিত হয়েছে জীবনের প্রাণ রাসায়নিক ভিত্তি। আমাদের পৃথিবীতে জীবনের ভিত্তি তৈরি হয়েছে কার্বন (C), হাইড্রোজেন (H), অক্সিজেন (‘O’) এবং নাইট্রোজেন (‘N’) এই চারটি মৌলিক পদার্থ দিয়ে; যাদেরকে একত্রে সংক্ষেপে বলা হচ্ছে ‘খন’(CHON)। স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠেছে অন্যান্য মৌলিক পদার্থগুলোর ভূমিকা জীবন-গঠনে এরকম ভাবে নেই কেন? অন্য কোন গ্রহে যদি প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় – তবে কি সেখানেও খনের ভূমিকা থাকবে? নাকি অন্য কোন পদার্থ সে ভূমিকা নেবে? এ প্রশ্নের অবশ্য সরাসরি উত্তর দেবার মত যৌক্তিক ভিত্তি এখনো আমাদের নেই সেভাবে।
“জীবনের উদ্ভবের সম্ভাব্য ধারণাগুলো” শিরোনামের তৃতীয় অধ্যায়ে “কীভাবে, কখন আর কোথায় প্রাণের উৎপত্তি হল?” – জীববিদ্যার এ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার ব্যাপারে বিভিন্ন রকমের বৈজ্ঞানিক ধারণাগুলো ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যাঁরা বিজ্ঞান পড়েন, বিজ্ঞান মানেন আবার চেতনার একটা অংশে ঈশ্বরকেও লালন করেন – তাঁরা হোঁচট খাবেন এ অধ্যায়ে। প্রাণের উদ্ভবের সাথে ঈশ্বরের হাতে প্রাণ-সৃষ্টির কোন ভূমিকা নেই। মহাকাশের উল্কাপিন্ডের মধ্যে এমাইনো এসিডের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। মহাকাশ থেকে আসা এমাইনো এসিড ও পৃথিবীতে তৈরি এমাইনো এসিডের মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য হলো পৃথিবীর এমাইনো এসিডগুলো সব বামাবর্তী, কিন্তু মহাকাশ থেকে আসা এমাইনো এসিডগুলো বামাবর্তী ও ডানাবর্তীর যে কোনটাই হতে পারে। বামাবর্তী ও ডানাবর্তী ব্যাপারটার কিছুটা ব্যাখ্যা দিলে পাঠকের বুঝতে আরো কিছুটা সুবিধে হতো।
চতুর্থ ও পঞ্চম অধ্যায় পরস্পরের পরিপূরক। এ অধ্যায় দুটোতে ‘অজৈবজনিঃ জীবনের রাসায়নিক উৎপত্তি’ ও “প্রাণের উৎপত্তির ধাপগুলো” বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত স্বতঃজননবাদের ব্যাপারে বিশ্বাস ছিল অনেকের। কিন্তু ১৮৬০ সালে লুই পাস্তুর প্রমাণ করেন যে অণুজীবের স্বতঃজনন হয় না। অবশ্য এর আগে ১৮২৮ সাল পর্যন্ত আরো একটা ব্যাপারে মানুষের বিশ্বাস ছিল – তা হলো অজৈব যৌগ থেকে জৈব-যৌগের উৎপত্তি হয় না। জৈব-যৌগ যা প্রাণের ভিত্তি – তা ঈশ্বরের হাতেই তৈরি হয় এরকম একটা ধারণা প্রচলিত ছিল। ১৮২৮ (বইতে ১৮২০ সাল বলা হয়েছে) সালে জার্মান বিজ্ঞানী ফ্রেডরিক ভুহ্লার অজৈব-যৌগ এমোনিয়াম সায়ানাইট থেকে ইউরিয়া তৈরি করে দেখান যে অজৈব-যৌগ থেকে জৈব-যৌগের উৎপত্তি সম্ভব। প্রাকৃতিক নিয়মে জীবনের রসায়ন ব্যাখ্যার সময় জৈবযৌগের উৎপত্তি থেকে শুরু করে জৈববিবর্তনের ধাপসমূহের কোনটাই বাদ যায় নি। এর সাথে উপরি পাওনা ফ্রিম্যান ডাইসন, এলসো স্টেরেনবার্গ, রিচার্ড ডকিন্স সহ আরো অনেকের প্রাসঙ্গিক তত্ত্ব ও প্রকাশনার ব্যাপারে আলোকপাত। প্রাকৃতিক নির্বাচনের সম্ভাবনার তত্ত্ব ব্যাখ্যায় কেরন্স-স্মিথের বানরের টাইপ করার উদাহরণটি মোক্ষম। এ অধ্যায়ে লিন মার্গোলিসের প্রসঙ্গ এসেছে। এই বিজ্ঞানীর একটু পরিচিতি দিলে ভালো হতো।
ভিন্গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ত্ব নিয়ে মানুষের কৌতূহল ও কল্পনার শেষ নেই। এ ব্যাপারে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের জন্য বিভিন্ন প্রকল্পে শত শত কোটি ডলার খরচ করা হচ্ছে। এ ব্যাপারে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে বইয়ের ষষ্ঠ থেকে নবম অধ্যায়ে। চারশ কোটি থেকে ৩৬০ কোটি বছর আগের পৃথিবী ও মঙ্গল গ্রহের পরিবেশে প্রচুর অণুজীব ও প্রাণ উদ্ভবের অনুকুল পরিবেশের প্রমাণ বিজ্ঞানীদের হাতে আছে। সৌরজগতের দূরের প্রান্তের অনেক গ্রহাণু ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সৌরজগতের বিভিন্ন জায়গায়। এ প্রসঙ্গে সি ও ডি ধরণের গ্রহাণু’র কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ‘সি’ ও ‘ডি’ ধরণ সম্পর্কে কিছুটা পূর্ব-ধারণা দেয়া থাকলে পাঠকের সুবিধে হতো।
মহাবিশ্বে প্রাণের সম্ভাব্যতার ব্যাপক পরিচিত সমীকরণ হলো ফ্রাঙ্ক ড্রেকের সমীকরণ। ড্রেকের সমীকরণ ও প্রাসঙ্গিক ব্যাপারগুলো আলোচিত হয়েছে অষ্টম অধ্যায়ে। মহাবিশ্বে প্রাণের উদ্ভবের নিয়ামকগুলো অনেক বেশি জটিল এবং এদের সংখ্যাও অনেক। সভ্যতার সংখ্যা, সভ্যতার আয়ুষ্কাল, প্রাণের বিকাশ সম্ভব এমন গ্রহ-সমূহের সংখ্যা – এসব সঠিক ভাবে হিসেব করা প্রায় অসম্ভব। কাছাকাছি একটা অনুমান হয়তো সম্ভব। খুব সহজ এবং সাবলিল ভাবে উদাহরণসহ ব্যাপারটা এখানে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটা কথা এখানে উল্লেখ না করে পারছি না। পল ডেভিসের সাম্প্রতিক বই “The Eerie Silence: Renewing Our Search for Alien Intelligence” -এ আলোচিত ড্রেকের সমীকরণের ব্যাখ্যার চেয়ে অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদের ব্যাখ্যা আমার কাছে অনেক বেশি আকর্ষণীয় মনে হয়েছে।
সার্চ ফর এক্সট্রাটেরেস্ট্রিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা সংক্ষেপে ‘সেটি’র যাত্রা শুরু হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে। পঞ্চাশ বছর ধরে আকাশ ছেঁকে উপাত্ত সংগ্রহ করা হচ্ছে যদি কোন ধরনের বুদ্ধিমত্তার সন্ধান পাওয়া যায় আমাদের গ্রহের বাইরের কোথাও। যদিও এখনো তেমন সুনির্দিষ্টভাবে উত্তেজিত হওয়ার মত কোন ফল পাওয়া যায়নি ‘সেটি’ সম্পর্কে হাল ছেড়ে দেয়ার মত অবস্থাও হয়নি। বরং সাম্প্রতিক সময়ে পল ডেভিস সহ আরো অনেকেই নতুন ‘সেটি’ বিস্তারের পক্ষপাতী। শুধুমাত্র ‘সেটি’ প্রকল্পের পক্ষে ভালো ভালো কথাগুলোই লেখকেরা বলেছেন বললে ভুল বলা হবে। সেটি’ প্রকল্পে বিলিয়ন ডলার খরচের পরও ‘সো ফার সো ব্যাড’ ফলাফল উল্লেখও তাঁরা করেছেন নির্মোহ ভঙ্গিতে। প্রশ্ন করেছেন এগুলো ‘বিজ্ঞান নাকি অপবিজ্ঞান?’ বা মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার সন্ধান কি এক বর্ণাঢ্য জুয়াখেলা? তারপরও দ্বিতীয় পৃথিবী খুঁজে পাবার ব্যাপারে আমাদের আশা জেগে থাকে।
বাংলায় বিজ্ঞান রচনার ক্ষেত্রে ভাষার গতিশীলতা খুবই দরকার। অক্সিজেনকে ‘অম্লজান’, হাইড্রোজেনকে ‘উদ্জান’ বা কার্বন-ডাই-অক্সাইডকে ‘অঙ্গার-দ্বি-অম্লজ’ বললে প্রতি পদে পদে হোঁচট খেতে হয়। প্রচলিত শব্দগুলোর ভাষান্তর না করেও বাংলায় যে উন্নত মানের বিজ্ঞান রচনা সম্ভব তার অন্যতম প্রমাণ এই বই। ভাষার গতিশীলতার দিকে লেখকদের সচেতনার কথা ভূমিকায় উল্লেখ করা হয়েছে (পৃঃ৭)। তবে কিছু কিছু শব্দ মনে হয় বদলে দিলে ভালো হতো। যেমন – ‘ভেজিটেশনে চলে যাওয়া’ (পৃঃ১৯), ‘কঙ্কাল পেশি’ (পৃঃ২০), ‘নিউক্লিয়াসের তেজস্ক্রিয় অবক্ষয়’ (পৃঃ২২), ‘মাধ্যমিক বিকিরণ’ (secondary radiation) (পৃঃ৮১), ‘বিদ্ঘুটে ধরণের’ (পৃঃ ১০৩) ইত্যাদি।
বেশ কিছু আরোপিত অর্থের বাক্যাংশ ব্যবহৃত হয়েছে বইতে। যেমন “ভাগ্য ভালো যে এই চিন্তাভাবনা বা বিশ্বাসনির্ভর তত্ত্বগুলোকে আজকের দিনের বিজ্ঞানীরা তেমন একটা আমলে নেন না” (পৃঃ ৬)। জানি এখানে ‘ভাগ্য’ শুধুমাত্র কথার কথা। তবুও যার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই তা কি আমরা এড়িয়ে চলতে পারি না? অন্তত বিজ্ঞান লেখার ক্ষেত্রে?
বইতে তাপমাত্রার একক হিসেবে কখনো ফারেনহাইট (পৃঃ৪৭) আবার কখনো সেলসিয়াস (পৃঃ৭৯) ব্যবহার করা হয়েছে। মনে হয় সব জায়গায় সেলসিয়াস স্কেল রাখলেই সুবিধে হতো। পঞ্চম অধ্যায়ের এক জায়গায় (পৃঃ৪৮) বলা হচ্ছে “আমরা সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে ভাইরাস নিয়ে—” ইত্যাদি। এখানে সিরিজের বদলে ‘অধ্যায়’ হবে। বানান ভুল নেই বললেই চলে। হাতে গোনা মাত্র কয়েকটা ভুল বানান চোখে পড়েছেঃ হ৩য় (পৃঃ৭), হচ্ছ (পৃঃ৩১), ‘Since ‘tis certain…’, ‘মুহুমুর্হ’ (পৃঃ৭৮), ‘টেল্সা (Telsa)’ (পৃঃ ৯৫)।
ওয়েবসাইট ছাড়াও ষাটের অধিক রেফারেন্স বইয়ের উল্লেখ আছে এই বইতে। তবে ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত পল ডেভিসের “Are We Alone?: Philosophical Implications of the Discovery of Extraterrestrial Life” বইটি রেফারেন্স তালিকায় নেই দেখে কিছুটা বিস্মিত হয়েছি। এটা কি লেখকদের ইচ্ছাকৃত?
কবিতা ও বিজ্ঞানের একটা সুন্দর সমন্বয় ঘটিয়েছেন লেখকেরা। প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে রবীন্দ্রনাথ বা জীবনানন্দের কবিতার লাইন নির্বাচনে লেখকদ্বয়ের শৈল্পিক পরিচয় চাপা থাকে না। কবিতার লাইনগুলো পাঠকের উপরি পাওনা।
“মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে” পড়তে গিয়ে পাঠকের বুদ্ধিতে যে নিজের অজান্তেই শান দেয়া হয়ে যায় – তার সবটুকু কৃতিত্বই লেখকদ্বয়ের। ভূমিকায় যেভাবে উল্লেখিত হয়েছে- “আমাদের এই লেখা পড়ে বাংলাভাষী মাত্র একজন লোকও যদি ছোটবেলা থেকে রক্তের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সত্যকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেন, তবে সে ক্ষেত্রেই আমরা আমাদের কষ্টকে সার্থক বলে মনে করব”। এটুকু নির্দ্বিধায় বলা যায় ‘রক্তের মধ্যে বিশ্বাস’ থাকলে তাতে চিড় ধরবেই। শুধু বিজ্ঞানের জন্য বিজ্ঞান নয়, সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকেও যে বিজ্ঞান সচেতনতার দরকার সেই সচেতনতা সৃষ্টিতে বিপুল ভূমিকা রাখবে এই বই। অভিনন্দন অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ। এরকম বই আরো চাই।
[মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে। লেখকঃ অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ। অবসর প্রকাশন সংস্থা, ঢাকা। পৃষ্ঠা সংখ্যা ১১২। মূল্যঃ ১৩০ টাকা]।
.............................. প্রদীপ দেব চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে কৃতিত্বপূর্ণ ভাবে স্নাতকোত্তর শেষে নিউক্লিয়ার ফিজিক্সে পিএইচডি করেছেন দ্যা ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নে। শিক্ষকতা করেছেন মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি, ট্রিনিটি কলেজ, অকল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, ওহাইও স্টেট ইউনিভার্সিটি, তাসমানিয়া ইউনিভার্সিটিতে। বর্তমানে রেমিট ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ায় শিক্ষকতা করছেন।
আমি অনেক দিন থেকেই প্রকৃতি ও পরিবেশ নিয়ে লিখছি। যখন শুরু করেছিলাম তখন একা ছিলাম। এখন অনেকেই লিখছেন। কেউ কেউ আমার লেখায় অনুপ্রাণিত হয়ে থাকবেন এবং তাতে আমি আনন্দিত। কেননা সবাই নিজের কাজের ফল দেখতে চান। একসময় ডারউইন ও বিবর্তনবাদ নিয়েও অনেক লিখেছি; শুরু বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রজীবন থেকে। আমরা সেখানে পড়েছি বিবর্তনবাদের ঢাউস সব বই এবং ইংরেজিতে। পরে কর্মজীবনে কলেজে ডারউইন ও তাঁর তত্ত্ব পড়িয়েছি এবং আশা করেছি, আমার পাঠদান বা বই পড়ে কেউ উদ্বুদ্ধ হয়ে এ বিষয়ে প্রবন্ধ ও বইপত্র লিখবেন। কেননা বিষয়টির পরিসর বিজ্ঞানের ক্ষেত্র অতিক্রম করে দর্শন, সমাজতত্ত্ব, রাজনীতি, সাহিত্যসহ মানববিদ্যার প্রায় সব শাখায়ই বিস্তৃত। কিন্তু আমার সেই আশা পূরণ হয়নি। ইদানীং উচ্চ মাধ্যমিক থেকে ডারউইনবাদ বাদ পড়েছে, বদলি হিসেবে এসেছে জীবপ্রযুক্তিবিদ্যা। কেন এই পরিবর্তন জানি না, তবে ডারউইনবাদের প্রতি আদ্যিকালের অনীহা যদি কারণ হয়ে থাকে, তবে বলতেই হয়, পরিকল্পকেরা ভুল করেছেন। কেননা জীবপ্রযুক্তি আসলে ডারউইনবাদেরই সম্প্রসারণ, খোদার ওপর খোদকারির জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। আমার কর্মজীবনের গোড়ার দিকের ছাত্ররা এখন অবসর নিয়েছেন, তাঁরা আমাকে জানিয়েছেন, কলেজে জীববিদ্যার অনেক শিক্ষক নাকি ডারউইনবাদ পড়াতে চান না, কিংবা পড়ালেও শুরুতেই ছাত্রদের এই তত্ত্বটি বিশ্বাস না করতে বলেন। অথচ পাকিস্তানি জামানায় আমরা ডারউইনবাদ পড়েছি। আমাদের কোনো শিক্ষক এমন কথা বলেননি। বরং তাঁরা এই তত্ত্বের যথার্থতা প্রমাণের চেষ্টাই করেছেন। তাঁরা কেউ নাস্তিক ছিলেন না। ডারউইনের সহযোগী সমর্থকেরাও (লায়েল, হুকার, ওয়ালেস প্রমুখ) প্রায় সবাই ছিলেন ধার্মিক। তাহলে আমাদের এই পশ্চাদ্গতি কেন? উত্তরটি আমাদের শিক্ষাপরিকল্পকেরা জানতে পারেন।
ডারউইনবিষয়ক আমার প্রথম বই ডারউইন: পিতামহ সুহৃদ সহযাত্রী’ বেরোয় ১৯৭৫ সালে। তারপর আরও দুটি। আমার বন্ধু, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ম. আখতারুজ্জামান যিনি বিবর্তনবিদ্যা (১৯৯৮) নামের একটি মৌলিক পাঠ্যবইয়ের লেখক ও ডারউইনের অরিজিন অব স্পেসিজ (প্রজাতির উৎপত্তি, ২০০০) গ্রন্থের অনুবাদক। তিনি এক সভায় দুঃখ করে বলেছিলেন, গোটা কর্মজীবনটাই ছাত্রছাত্রীদের বিবর্তনবাদ পড়িয়ে কাটালেন, অথচ আজও তারা বলে, প্রজাতি সৃষ্টি হয়েছে, উৎপন্ন হয়নি। আমি অতঃপর ধরেই নিয়েছিলাম, আমাদের সব চেষ্টাই ব্যর্থ, দেশ উল্টো পথে চলছে। ভুলটি ভাঙল অকস্নাৎ, মার্কিন মুলুকের তিন বাঙালির লেখা বিবর্তনবিষয়ক দুটি বই হাতে এলে। আরও বিস্নয়ের ব্যাপার, তাঁদের দুজন প্রকৌশলী, একজন সমাজবিজ্ঞানী। আমি অভিভুত ও আনন্দিত। তাঁরা কেউই আমার বই পড়েননি, আমার প্রভাববলয়ের মানুষও নন, কিন্তু তাঁরা নিশ্চিত আমার উত্তরসুরি। তাঁরা বাংলাদেশে পড়াশোনা করেছেন; দেশের পরিস্থিতি সম্পর্কে যথেষ্ট ওয়াকিবহাল। তবে তাঁদের জন্য সম্ভবত আমেরিকায় একটি ‘শক’ অপেক্ষিত ছিল, আর তা হলো, জ্ঞানেবিজ্ঞানে অত্যুন্নত একটি দেশে বিদ্যমান পশ্চাৎমুখিনতা, সমাজের একটি অগ্রসর অংশের বিবর্তনবাদ তথা ডারউইনবিরোধিতা। ব্যাপারটা আসলে ওই দেশের পুরোনো ব্যাধি। অনেক বছর আগে স্কুলে বিবর্তনবাদ পড়ানো নিয়ে এক শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা হয়, শাস্তি হয়। শেষে তিনি মুক্তিও পান এবং এ নিয়ে নাটক লেখা ও চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। কিন্তু সবই এখন ইতিহাস।
সৃষ্টিতত্ত্বেও বিশ্বাসের এই ধারা যে আজ সেখানে আইডি (ইনটেলিজেন্ট ডিজাইন) নামে একটি নতুন তত্ত্বের আশ্রয়ে বেশ পাকাপোক্ত হয়েছে এবং স্কুলে বিবর্তনবাদের পাঠদানে বাধা সৃষ্টি করছে বিভিন্ন স্কুল বোর্ড, অভিভাবক ও সৃষ্টিবাদী গোষ্ঠীরা, সেই খবরটি জানান আমার আরেক বন্ধু, যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইয়ো রাজ্যের মিয়ামি বিশ্ববিদ্যালয়ের অণুজীববিদ্যার অধ্যাপক জ্ঞানেন্দ্র কুমার ভটাচার্য । তিনি আরও জানান, তাঁরা তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ে সমস্যাটি মোকাবিলার জন্য স্কুল-শিক্ষকদের সামার কোর্সে বিবর্তনবিদ্যার প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন, ডারউইনবাদের পক্ষে ক্লাসিক্যাল সাক্ষ্যপ্রমাণের সঙ্গে বংশানুবিদ্যার অধুনাতম আবিষ্ককারগুলো শেখাচ্ছেন। এবার মূল প্রতিপাদ্যে ফেরা যাক। যে দুটি বইয়ের কথা বলেছিলাম সেগুলো হলো বিবর্তনের পথ ধরে এবং মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে ; লিখেছেন যথাক্রমে বন্যা আহমেদ এবং অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ; প্রকাশকাল ফেব্রুয়ারি ২০০৭, প্রকাশক ঢাকার অবসর।
দুটি বই পরস্পর সম্পুরক। প্রথমটির প্রধান আলোচ্য বিবর্তনবাদ, দ্বিতীয়টির প্রাণের উৎপত্তি। সম্ভবত তাঁরা পরস্পর ঘনিষ্ঠ এবং প্রকল্পটি যৌথ। তাতে আমাদের লাভই হলো, একত্রে জানা গেল পৃথিবীতে প্রাণের উৎপত্তি, বিবর্তন এবং গ্রহান্তরে প্রাণের উৎপত্তি, বিকাশ ও সভ্যতার সম্ভাব্যতা নিয়ে বিস্তারিত।
দুটি বইই তথ্যসমৃদ্ধ, আধুনিক আবিষ্ককারের নানা সহযোগী সাক্ষ্যে ভরপুর। বিবর্তনের পথে বইয়ের লেখক বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন বিবর্তনের সাক্ষ্য প্রমাণের ওপর এবং নৃতত্ত্বে, বিশেষত মানুষের উৎপত্তি বিষয়ে। এটা সহজবোধ্য, কেননা আমরা যদিওবা জীববিবর্তনের সত্যতা স্বীকারও করি, কিন্তু অভিন্ন ধারায় মানুষের উৎপত্তি মানতে রাজি নই। মানুষের সঙ্গে বানরসদৃশ বন্যজীবের আত্মীয়তা স্বীকারে আমাদের অপার লজ্জা। অথচ বিশ্বখ্যাত জীববিজ্ঞানী ও লেখক গেলর্ড সিস্পসন এই সহজ সত্যটি বোঝাতে বলেছেন যে, আমাদের পূর্বপুরুষ খুঁজতে বাইরে চোখ মেলে তাকানোই যথেষ্ট। কিন্তু সেখানেই যত ঝামেলা। স্বয়ং ডারউইন, আমরা সবাই জানি, প্রজাতির উৎপত্তি (১৮৫৯) লেখার পর অনেক চাপ সত্ত্বেও মানুষের উৎপত্তি (১৮৭১) লিখেছেন আরও বারো বছর পর। আর রাচেল ওয়ালেস, যিনি প্রজাতির উৎপত্তিতত্ত্বের অন্যতম শরিক, তিনিও মানুষের উৎপত্তিতে প্রাকৃতিক নির্বাচনের বদলে আইডিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। আসলে এটা আমাদের একটা দৃঢ়বদ্ধ সংস্কার এবং তা থেকে মুক্তি সুকঠিন। বন্যা সমস্যাটি ভালোই বোঝেন, যে জন্য মানব বিবর্তনকে সর্বজনগ্রাহ্য করার জন্য প্রদত্ত বিবরণের সঙ্গে হাজির করেছেন প্রচুর ছবি, আমাদের মানবসদৃশ পূর্ব পুরুষদের সম্ভাব্য দেহকাঠামো ও নানা চার্ট। বইতে আইডি তত্ত্বের সমর্থকদের কার্যকলাপের বিস্তা��িত আলোচনা আছে।
ইউরোপে এটি নেই, অথচ আমেরিকায় আছে, সে এক রহস্য। আমেরিকা কি তাহলে ইউরোপীয় ঐতিহ্যের সম্প্রসারণ নয়, কিংবা আমেরিকার ইতিহাসের এমন কোনো দুর্বলতা আছে, যেজন্য সেখানে এমন পশ্চাৎপদতা স্থান করে নিতে পেরেছে? নাকি সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বদাতা এ দেশের এখন আত্মিক অবক্ষয় শুরু হয়েছে? বন্যাও তাই ভাবছেন। যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বাস্তু-চারিত্র্যও অন্যতম কারণ হতে পারে।
পাঠকদের সুবিধার জন্য বইয়ের অধ্যায়গুলোর নাম উল্লেখ করছি, কেননা বিস্তারিত আলোচনার অবকাশ এখানে নেই: এলাম আমরা কোথা থেকে?, বিবর্তনে প্রাণের স্পন্দন, অনন্ত সময়ের উপহার, চোখের সামনেই বিবর্তন ঘটছে!, ফসিল এবং প্রাচীন উপাখ্যানগুলো, ফসিলগুলো কোথা থেকে এল, এই প্রাণের মেলা কত পুরোনো?, মিসিং লিঙ্কগুলো আর মিসিং নেই, আমাদের গল্প, ইন্টেলিজেন্ট ডিজাইন: সৃষ্টিতত্ত্বের বিবর্তন, যে গল্পের শেষ নেই, বিবর্তনতত্ত্ব সম্পর্কে প্রচলিত ভুল ধারণাগুলো। এসব নাম থেকেই স্পষ্ট যে বন্যার বইটি শুষ্ককং কাষ্ঠং নয়, অত্যন্ত সহজবোধ্য শৈলীতে সুললিত ভাষায় লেখা।
মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে বইটি পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, আমরা যখন কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছি, সেই পঞ্চাশের দশকে, এমন কোনো বই বাংলায় ছিল না। বন্যার মতো আমিও দেবীপ্রসাদের জনপ্রিয় বিজ্ঞানলহরী পড়েছি। আর ইংরেজি পেপারব্যাক, সেও সহজলভ্য ছিল না। ওপারিনের হোয়াট ইজ লাইফ পেয়েছি অনেক পরে। ওয়াটসন বা ক্রিকরা সৌভাগ্যবান, তাঁরা ছেলেবেলায়ই শ্রোডিংগারের বই পড়ার সুযোগ পেয়েছেন।
পশ্চিমে বিখ্যাত বিজ্ঞানীরা পাঠ্যবই ও জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বই লেখেন। আমাদের দেশ তথা ভারতেও এমন দৃষ্টান্ত দুর্লভ। একটি গ্রন্থ একজন মানুষকে অবশ্যই বদলে দিতে পারে; একজন তরুণকে জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে। তবে এটুকুই যথেষ্ট নয়, চাই অনুকুল পরিবেশ, যা আমাদের নেই। বন্যা, অভিজিৎ, ফরিদ কি দেশে থাকলে এসব বই লিখতেন? আমি ৯৯ ভাগ নিশ্চিত যে লিখতেন না। প্রাণ যেহেতু পদার্থের শুষ্কক কাঠখড় দিয়ে তৈরি, হয়তো সে জন্য লেখকেরা তাঁদের বইটি শুরু করেছেন মৃত্যুর সজ্ঞার্থ ও নানা কৌতুহলজনক কাহিনী দিয়ে এবং পরে এসেছেন জড় থেকে জীবনে, জীবনের ধর্ম ব্যাখ্যা এবং শেষ পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানী ও কেলাসবিদ জেডি বার্নালের সজ্ঞার্থে:
"‘জীবন হচ্ছে একটি অতিজটিল ভৌত-রাসায়নিক তন্ত্র যা একগুচ্ছ সুসংহত বা একীভুত ও স্বনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ও ভৌত বিক্রিয়ার মাধ্যমে তার পরিপার্শ্বের বস্তু ও শক্তিকে স্বীয় বৃদ্ধির কাছে ব্যবহার করে।’"
এই পঙ্ক্তিমালা একটু জটিল বটে, তবে গোটা অধ্যায়টি এতটাই সহজ ও সরলভাবে লেখা যে বিজ্ঞানের দশম শ্রেণীর ছাত্রের পক্ষেও বোঝা কঠিন হবে না। শুধু একটি কেন, গোটা বইটি এভাবে লেখা।
প্রাণের উৎপত্তি বিষয়ে ডারউইনের ধারণার একটি উদ্ধৃতি বইতে আছে, যা আমাদের অনেকেরই অজানা এবং সেই সঙ্গে বিস্নয়করও। ডারউইন তাঁর বন্ধু ডালটন হুকারকে এক চিঠিতে লিখেছেন: ‘একটা ছোট উষ্ণ পুকুরে বিভিন্ন ধরনের অ্যামোনিয়া, ফসফরিক লবণ, আলো, তাপ, তড়িৎ সবকিছু মিলেমিশে... প্রোটিন যৌগ উৎপন্ন হয়েছে।’ অর্থাৎ অজৈব পদার্থ থেকেই জৈব পদার্থ উৎপন্ন হয়ে প্রাণের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটছে। অনুমেয়, গ্রহান্তরে প্রাণের অস্তিত্ব থাকলে তাও ঘটেছে এই এক ও অভিন্ন প্রক্রিয়ার। পরের ঘটনা আমরা জানি, ওপারিন ও হালডেন প্রাণের সজ্ঞার্থ দেন, ইউরে ও মিলার ডারউইনের ধারণারই যেন বাস্তবায়ন করেন পরীক্ষাগারে অ্যামাইনো এসিডের সংশ্লেষ ঘটিয়ে। বইয়ের ৫৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত আছে প্রাণের উৎপত্তির আলোচনা, বাকি ৫০ পৃষ্ঠায় রয়েছে ভিন গ্রহে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার সন্ধান। এই কাহিনী বড়ই চিত্তাকর্ষক, গল্পের মতোই সম্মোহক। এতে আছে কার্ল সাগানসহ বিজ্ঞানীদের নানা পরীক্ষার কথা, এনরিকো ফার্মির গোলকধাঁধা, ড্রেকের সমীকরণ, ইউ এফ ও বা উড়ন্ত চাকি ইত্যাদি। বিস্তারিত নিষ্কপ্রয়োজন। বাকিটা পাঠকের জন্য।
পরিশেষে সেই পুরোনো প্রসঙ্গ: বইগুলোর প্রভাব কি ঈপ্সিত ফল ফলাবে, আমাদের ক্ষেত্রে যা ঘটেনি, অন্তত দৃশ্যত, সেটা কি ওদের ক্ষেত্রে ঘটবে? বইগুলো কি নতুন প্রজন্ন লুফে নেবে? আমি নিশ্চিত নই, কেননা আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা অবক্ষয়ের চরম সীমায় পৌঁছেছে। শিক্ষকেরা বাইরের বইয়ের খোঁজ রাখেন না, ছাত্ররা কোচিংয়ের ঘুর্ণাবর্তে দিশেহারা। এই তরুণ লেখকদের তবু আশা না হারাতে বলি। তাঁদের যেতে হবে অনেক দুর, মাইলস টু গো... এবং বিঘ্নসংকুল পথে।
বিবর্তনের পথ ধরে; বন্যা আহমেদ; ফেব্রুয়ারি ২০০৭; অবসর, ঢাকা; প্রচ্ছদ: প্রতীক ডট ডিজাইন; ২৫৬ পৃষ্ঠা; ৩৫০ টাকা।
মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে; অভিজিৎ রায় ও ফরিদ আহমেদ; ফেব্রুয়ারি ২০০৭; অবসর, ঢাকা; প্রতীক ডট ডিজাইন; ১১২ পৃষ্ঠা; ১৩০ টাকা।
প্রচুর তথ্যের সমাহার। অভিজিৎ রায় আজ আমাদের মাঝে নেই। বাঙালের যে কী ভীষণ ক্ষতি হয়ে গেছে, তা বাঙালেরা জানে না। সহজসরল বাঙলা ভাষায় বিজ্ঞান বিষয়ক লেখাপত্র তো খুব বেশি হয় না। অথচ এই মুক্তমনা মানুষটাকে মৌলবাদী'রা সহ্য করতে পারলো না।
এবার আসি বইয়ের কথায়। ২ জন লেখক মিলে এই বইটি লিখেছেন। বস্তুত মহাবিশ্বে প্রাণের উৎপত্তি কীভাবে হয়েছে, সেই ব্যাপারেই বস্তুনিষ্ঠ আলাপ করা হয়েছে বইটাতে। অভিজিৎ রায় আলাপ করেছেন পৃথিবীর ব্যাপারে। পৃথিবীতে কীভাবে প্রাণের জন্ম হলো, এই বিষয়ক আলোচনাই ১ম অংশ জুড়ে। বিভিন্ন বই, বিজ্ঞানী, গবেষণাপত্রকে রেফারেন্সে রেখে এইসব আলাপ তিনি করেছেন।
বইয়ের ২য় অংশটা লিখেছেন ফরিদ আহমেদ। তিনি লিখেছেন পৃথিবী ব্যতীত মহাবিশ্বের অন্য যে কোনো জায়গায় প্রাণের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে কিনা সেই বিষয়ে। এমনকি পৃথিবী ব্যতীত অন্য যে কোনো গ্রহে বুদ্ধিমত্তার সন্ধান মিলতে পারে কিনা, এ বিষয়েও তিনি আলোচনা করেছেন; বিভিন্ন বিজ্ঞানী, বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব, সম্ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে যুক্তিনির্ভর বস্তুবাদী আলোচনা।
বাংলা ভাষায় এরকম আরো বস্তুবাদী বিজ্ঞাননির্ভর লেখা প্রয়োজন। খুব বেশি প্রয়োজন।